অাকাশ জাতীয় ডেস্ক:
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের জাতীয় দুর্যোগ সাড়াদান সমন্বয় কেন্দ্রের (এনডিআরসিসি) উপসচিব জিএম আবদুল কাদের জানান, বন্যায় দেশের ২১ জেলার সাত হাজার ১৩০ কিলোমিটার রাস্তার ক্ষতি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে জামালপুর জেলায়।
এ জেলার এক হাজার ১০৪ কিলোমিটার রাস্তার ক্ষতি হয়েছে। প্রাণহানিও ঘটেছে এ জেলায় সবচেয়ে বেশি। পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানায়, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৩২ জেলার ১৯৯টি উপজেলা ও ৫১টি পৌরসভা বন্যাকবলিত হয়েছে। গত দুই সপ্তাহে বন্যায় সব মিলিয়ে ১৩৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছে দিনাজপুরের ৩০, নীলফামারীতে ৬, লালমনিরহাটে ৬, কুড়িগ্রামে ২৩, ঠাকুরগাঁওয়ে ১, গাইবান্ধায় ১৩, বগুড়ায় ৪, সিরাজগঞ্জে ৬, জামালপুরে ১৪, সুনামগঞ্জের ২, নেত্রকোনায় ৪, যশোরে ৩, টাঙ্গাইলে ২, শেরপুরে ৪, মৌলভীবাজারে ২, নওগাঁয় ৬, কুমিল্লায় ২, রংপুরে ৬, মানিকগঞ্জে ১ ও জয়পুরহাটে ২ জন।
এছাড়া বানের জলে ৬ লাখ ১২ হাজার ৩৬২ হেক্টর ফসলি জমি ও ৪ হাজার ২৮৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া দুর্গত জেলাগুলোতে ৬১ হাজার ১০৮টি টিউবওয়েল, ৫০টি ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট, ৩৭৮ কিলোমিটার বাঁধ, ৪৪৬টি ব্রিজ ও কালভার্টের ক্ষতি হয়েছে বলেও জানিয়েছে ত্রাণ মন্ত্রণালয়।
এদিকে বিভিন্ন জেলায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক-মহাসড়ক মেরামতের কাজ চলছে। তুলনামূলক কম ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলোর খানাখন্দে ইট-পাথর দিয়ে এরই মধ্যে যান চলাচল স্বাভাবিক করা হয়েছে।
অন্যদিকে যেসব সড়কে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, সেগুলো অস্থায়ীভাবে সারিয়ে তোলা হচ্ছে। ঈদের পর এসব সড়ক স্থায়ীভাবে মেরামত করা হবে। বিভিন্ন জেলার সড়ক ও জনপথ বিভাগ থেকে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখ করে তা মেরামতের জন্য বরাদ্দ চেয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
জানা যায়, বানের পানির তোড়ে ৩৯ জেলায় প্রায় ১ হাজার ১৭৭ কিমি. সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে কুষ্টিয়ায় অতিবর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত তিনটি মহাসড়কের মেরামত শুরু করেছে সওজ। ওই তিনটি মহাসড়কের ৮৬ কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
জামালপুরে যেসব স্থানে বন্যার পানি নেমে গেছে, সেখানে সংস্কারের কাজ শুরু হয়েছে। সিরাজগঞ্জে মহাসড়কের খানাখন্দের সংস্কার কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এভাবে অন্যান্য জেলায়ও সড়ক মেরামতের কাজ চলছে।
সওজের কর্মকর্তারা আশা করছেন, ঈদের আগেই সড়কগুলোর মেরামত শেষ হবে। ফলে ঘরমুখো যাত্রীদের দুর্ভোগে পড়তে হবে না।
সিরাজগঞ্জ ও শাহজাদপুর:
জেলার ক্ষতিগ্রস্ত মহাসড়কের খানাখন্দের সংস্কার কাজ শেষ পর্যায়ে। এ ব্যাপারে সড়ক ও জনপথ বিভাগের বিভাগীয় প্রকৌশলী (উল্লাপাড়া সাব-ডিভিশন) জহুরুল ইসলাম বলেন, বৃষ্টি থাকায় সংস্কার কাজ ধীরে সম্পন্ন হয়েছে। আবহাওয়া ভালো থাকলে শুক্রবারের মধ্যে মহাসড়কের মূল সংস্কার কাজ শেষ হবে।
তবে ছোট ছোট কিছু কাজ আছে, যা ২৮ আগস্টের আগে শেষ করা সম্ভব নয়। এছাড়া রোলার মেশিন সংকটের কারণে সড়কটির সংস্কার কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। তবে ঈদে যাতে যাত্রীরা নির্বিঘেœ বাড়ি ফিরতে পারেন, সেজন্য দু-একদিনের মধ্যেই বেড়া থেকে রোলার মেশিন সংগ্রহ করে সংস্কার কাজ শুরু হবে।
কুষ্টিয়া:
চলতি বর্ষায় কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ মহাসড়কের ৪৩ কিলোমিটার, কুষ্টিয়া-ঈশ্বরদী মহাসড়কের ২৩ কিলোমিটারের মধ্যে প্রায় ১৫ কিলোমিটার এবং কুষ্টিয়া-রাজবাড়ী মহাসড়কের ২৮ কিলোমিটারের অধিকাংশই বিধ্বস্ত হয়েছে।
ঈদের আগেই গুরুত্বপূর্ণ এ তিন মহাসড়ক যান চলাচলের উপযোগী করতে কাজ শুরু করেছে সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ)। বড় গর্তগুলো ইট-বালু ফেলে আর ছোট গর্তগুলো বিটুমিন দিয়ে মেরামত চলছে।
জামালপুর:
জেলার ৭টি উপজেলার ৬২টি ইউনিয়ন, ৮টি পৌরসভা এলাকা প্লাবিত হয়। পানির স্র্রোতে ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ, মাদারগঞ্জ, মেলান্দহ, সরিষাবাড়ী, বকশিগঞ্জ ও জামালপুর সদর উপজেলার রাস্তাঘাট ভেঙে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী বন্যায় জেলায় ২ হাজার ১৫৫ কিমি. কাঁচা এবং ৫৯৫ দশমিক ৫০ কিমি. পাকা সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভেঙে গেছে ২৫টি ব্রিজ-কালভার্ট।
গাইবান্ধা:
রংপুর-বগুড়া মহাসড়ক ও গোবিন্দগঞ্জ-ফুলবাড়ী হাইওয়ে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ব্যাপারে সড়ক ও জনপথ বিভাগের গাইবান্ধা নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আসাদুজ্জামান জানান, ঈদ সামনে রেখে সড়কগুলো যানবাহন চলাচলের উপযোগী করতে অস্থায়ীভাবে মেরামতের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। ঈদের পর প্রকল্প গ্রহণ করে স্থায়ী মেরামতের উদ্যোগ নেয়া হবে।
দিনাজপুর:
ঢাকা-দিনাজপুর মহাসড়কের ভাঙা স্থানগুলোয় বালুর বস্তা দিয়ে আংশিক মেরামত করে আংশিকভাবে শুরু হয়েছে যান চলাচল। তবে গ্রামাঞ্চলের স্থানীয় পাকা সড়কগুলো এখনও বেহাল। জেলায় মোট জাতীয়, আঞ্চলিক ও জেলা মহাসড়ক ৪৮২ কিলোমিটার। এর মধ্যে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১১৯ কিলোমিটার মহাসড়ক।
দিনাজপুর সদর উপজেলার পাঁচবাড়ীসহ বিভিন্ন স্থানে রাস্তা ভেঙে গর্ত সৃষ্টি হওয়ায় ১২ থেকে ১৮ আগস্ট পর্যন্ত দিনাজপুর-ঢাকা মহাসড়কে সরাসরি যান চলাচল বন্ধ থাকে। এসব স্থান বালুর বস্তা দিয়ে কোনো মতে সংস্কার করায় ১৯ আগস্ট থেকে আংশিকভাবে ওই মহাসড়কে যান চলাচল শুরু হয়।
কুড়িগ্রাম:
দু’দফা বন্যায় জেলার ৯ উপজেলায় ৬২টি ইউনিয়নে পাকা ও কাঁচা সড়ক পানির তোড়ে ভেঙে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। বিশেষ করে জেলার সঙ্গে নাগেশ্বরী, ভুরুঙ্গামারী ও ফুলবাড়ী উপজেলার সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা দু’সপ্তাহ ধরে বন্ধ। এতে এ তিন উপজেলার সোয়া ৭ লক্ষাধিক মানুষ সারা দেশের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
লালমনিরহাট:
কালীগঞ্জ উপজেলার তুষভাণ্ডার-কালভৈরব ও কাকিনা-মহিপুর সড়ক বন্যায় বিধ্বস্ত হয়েছে। এ ব্যাপারে কালীগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী পারভেজ নেওয়াজ খান বলেন, কাকিনা-মহিপুরের ক্ষতিগ্রস্ত সড়কটির প্রতিবেদন ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। আর তুষভাণ্ডার-কালভৈরব সড়কটি সংস্কারের চেষ্টা চলছে।
রংপুর:
রংপুর অঞ্চলের ১০ জেলায় পাকা সড়কের প্রায় সাড়ে ৬০০ কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলাগুলো হল- রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, গাইবান্ধা, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, বগুড়া ও জয়পুরহাট। এ ছাড়া ১৯টি সেতু ও ১৪৩টি কালভার্টের ক্ষতি হয়েছে।
ঈদের আগে এসব সড়ক-সেতু সংস্কারে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। রংপুর পীরগঞ্জের ধাপেরহাট থেকে শুরু করে সৈয়দপুর মহাসড়কে সৃষ্ট খানাখন্দ ও গর্তে ইট বিছিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক রেখেছে সড়ক ও জনপথ বিভাগ। অপরদিকে সড়কে পানি জমে থাকায় রংপুর নগরীর পার্কের মোড় থেকে তিস্তা সেতু পর্যন্ত রাস্তায় বড় বড় খানাখন্দ ও গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। এখানেও ইট বিছিয়ে যানচলাচল স্বাভাবিক রাখা হয়েছে।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 



















