অাকাশ জাতীয় ডেস্ক:
২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনায় দায়ের হওয়া দুই মামলার বিচার ১৩ বছরেও শেষ হয়নি। তবে রাষ্ট্রপক্ষ আশা করছে চলতি বছরের মধ্যেই বিচারকাজ সম্পন্ন হবে। মামলা দুটি বর্তমানে সাফাই সাক্ষী গ্রহণের পর্যায়ে রয়েছে। এর মধ্যে কারাগারে থাকা ২৩ জন আসামির মধ্যে ছয়জন আসামির পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। আর দুজন আসামির পক্ষে আটজনের সাফাই সাক্ষ্য গ্রহণের আবেদন ট্রাইব্যুনালে জমা আছে।
মামলা দুটিতে কারাগারে থাকা ২৩ জন আসামি এবং জামিনে থাকা আটজন আসামি সাফাই সাক্ষ্য প্রদানের সুযোগ পাবেন। সাফাই সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে রাষ্ট্র এবং আসামিপক্ষের যুক্তিতর্কের শুনানি শেষেই রায় ঘোষণা করবে ট্রাইব্যুনাল। পলাতক ১৮ জনের মধ্যে সাতজনই হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশের (হুজি) সদস্য। তারা কোথায় রয়েছে তা জানা নেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। বিদেশে থাকা আসামিদের বিরুদ্ধে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন ন্যাশনাল কাউন্সিল ব্যুরোর (এনসিবি) এআইজি মাহবুবুর রহমান।
পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের পুরনো কারারক্ষী ব্যারাক ভবনে ঢাকার এক নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিশেষ এজলাসে এ মামলার বিচার কাজ চলছে। আগামী ২২ ও ২৩ আগস্ট আসামিপক্ষের সাফাই সাক্ষীর জন্য দিন ধার্য করেছেন বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন। এদিকে বিচার বিলম্বের কারণ সম্পর্কে মামলা দুটির রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী সৈয়দ রেজাউর রহমান বলেন, প্রথমে মামলার তদন্ত ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। পরে চার্জশিট হলেও তা সম্পূর্ণ ছিল না। তাই ন্যায়বিচারের স্বার্থে মামলা দুটি অধিকতর তদন্তে যায়। দুই দফা তদন্তেই ছয় বছর সময় ব্যয় হয়। এ ছাড়া আসামিপক্ষ বিচার বিলম্বের বিভিন্ন আদেশের বিরুদ্ধে কয়েক দফা উচ্চ আদালতে যওয়ায় ২৯২ কার্যদিবস সময় ব্যয় হয়। তিনি আরও বলেন, আমরা রাষ্ট্রপক্ষ এ মামলায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি। তাই নির্দিষ্ট করে বিচার শেষ হওয়ায় দিনক্ষণ বলা সম্ভব নয়। তবে আশা করছি চলতি বছরের মধ্যেই অবশিষ্ট বিচারকাজ সম্পন্ন হবে।
অন্যদিকে মামলার আসামি সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবর ও সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর আইনজীবী অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ মামলা দুটি বিচার শেষ করতে তড়িঘড়ি করছে। তারা তড়িঘড়ি করে বিচার শেষ করে রাজনৈতিক নেতাদের সাজা দেওয়ার চেষ্টা করছে। যদিও রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ নেই।
এদিকে মামলা দুটিতে চার্জশিটের ৪৯১ জন সাক্ষীর মধ্যে ২২৫ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য শেষ হওয়ার পর রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষ্য সমাপ্ত ঘোষণা করে। যা গত ৩০ মে সম্পন্ন হয়। এরপর গত ১২ জুন মামলাটিতে জামিনে ও কারাগারে থাকা ৩১ আসামির আত্মপক্ষ শুনানি শুরু হয়, যা গত ১১ জুলাই শেষ হয়। আত্মপক্ষ শুনানিতে ৩১ আসামিই নিজেদের নির্দোষ দাবি করে। গত ১২ জুলাই আসামিদের সাফাই সাক্ষ্য শুরু হয়। এর আগে মামলাটিতে ২০০৮ সালের ১১ জুন ২২ জনের বিরুদ্ধে আদালতে প্রথম চার্জশিট দাখিল করে সিআইডি। ওই বছর ২৯ অক্টোবর আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জগঠন করে ট্রাইব্যুনাল। ২০০৯ সালের ৯ জুন পর্যন্ত ৬১ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল। ২০০৯ সালের ৩ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনে অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল। ২০১১ সালের ৩ জুলাই অধিকতর তদন্ত শেষে তারেক রহমাসসহ আরও ৩০ জনের বিরুদ্ধে সম্পূরক চার্জশিট দাখিল করে সিআইডি।
২০১২ সালের ১৮ মার্চ বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ সম্পূরক চার্জশিটের ৩০ আসামির অভিযোগ গঠন করার পর পুনরায় সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। মামলাটিতে আসামি খালেদা জিয়ার ভাগ্নে লে. কমান্ডার (অব.) সাইফুল ইসলাম ডিউক, সাবেক আইজিপি মো. আশরাফুল হুদা, শহিদুল হক ও খোদা বক্স চৌধুরী এবং মামলাটির তিন তদন্ত কর্মকর্তা সাবেক বিশেষ পুলিশ সুপার রুহুল আমিন, সিআইডির সিনিয়র এএসপি মুন্সি আতিকুর রহমান, এএসপি আবদুর রশীদ ও সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার আরিফুল ইসলাম জামিনে রয়েছেন।
অন্যদিকে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবর, সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ ২৩ জন কারাগারে রয়েছেন। মামলার আসামি জামায়াত নেতা আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এবং হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি হান্নান ও শরিফ শাহেদুল ইসলাম বিপুলের ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর হামলার মামলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। পলাতক রয়েছেন বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ ১৮ জন আসামি। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশে গ্রেনেড হামলায় প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভী রহমানসহ ২৪ জনের নির্মম মৃত্যু হয়। গ্রেনেডের স্প্লিন্টারের আঘাতে আহত হন কয়েকশ’ নেতা-কর্মী ও সমর্থক। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, পলাতক আসামিদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বড় ছেলে ও দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি লন্ডনে রয়েছেন। বিএনপির চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী ওয়ান-ইলেভেন আসার সঙ্গে সঙ্গেই আত্মগোপনে চলে যান। পরে ভারত হয়ে দুবাই ও সর্বশেষ লন্ডনে আছেন। হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশের (হুজি-বি) শীর্ষ নেতা মাওলানা তাজউদ্দিন রয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকায়। ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল এটিএম আমিন আহমদ আছেন যুক্তরাষ্ট্রে, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার কানাডায় এবং সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপি নেতা কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ রয়েছেন সংযুক্ত আরব আমিরাতে। হানিফ পরিবহনের মালিক মোহাম্মদ হানিফ প্রথমে কলকাতায় থাকলেও এখন রয়েছেন থাইল্যান্ডে। পুলিশের সাবেক ডিআইজি খান সাঈদ হাসান ও ঢাকা মহানগর পুলিশের সাবেক ডিসি (পূর্ব) ওবায়দুর রহমান খান ইউরোপে অবস্থান করছেন। রাতুল আহমেদ বাবু ওরফে রাতুল বাবু আছে ভারতে। মাওলানা মহিবুল মুত্তাকিন ও আনিসুল মুরসালিন ওরফে মুরসালিনও রয়েছে ভারতের তিহার কারাগারে। হুজি সদস্য মোহাম্মদ খলিল, জাহাঙ্গীর আলম বদর, ইকবাল, মুফতি আবদুল হাই, মাওলানা লিটন ওরফে দেলোয়ার হোসেন ওরফে জোবায়ের ও মুফতি শফিকুর রহমান কোথায় আছে, সেই তথ্য কারও কাছেই নেই। তবে গোয়েন্দাদের ধারণা, নাম-ঠিকানা পাল্টে তারা দেশেই অবস্থান করছে।
২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় জজ মিয়াকে দিয়ে নাটক সাজানোর অভিযোগ ওঠে পুলিশের বিরুদ্ধে। জজ মিয়াকে খুনের মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকি এবং শফিকুল ইসলাম ও আবুল হাসেম রানাকে ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে মামলা তদন্তের নামে নাটক সাজানো হয়।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 



















