ঢাকা ১১:২৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬, ২৯ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
এমপি যদি সৎ হন, ঠিকাদারের বাপের সাধ্য নেই চুরি করার: রুমিন ফারহানা ‘ধর্মের নামে ব্যবসা করে যারা নির্বাচনে জিততে চায়, তারা এ দেশে আর কখনো গ্রহণযোগ্যতা পাবে না’:ফারুক পার্থকে ছেড়ে দিলেন বিএনপির প্রার্থী গোলাম নবী গণহত্যার বিচারে ধরনের কম্প্রোমাইজ নয়: প্রসিকিউটর তামিম স্ত্রীর কোনো স্বর্ণ নেই, তাহেরির আছে ৩১ ভরি স্বর্ণ নির্বাচনে ভোট ডাকাতি যেন আর কখনো না ঘটে, সে ব্যবস্থা করতে হবে : প্রধান উপদেষ্টা ইরানে অর্ধশতাধিক মসজিদ-১৮০ অ্যাম্বুলেন্সে আগুন দিয়েছে বিক্ষোভকারীরা নির্বাচনে ৩০ আসনে লড়বে এনসিপি: আসিফ মাহমুদ নির্বাচন বানচালে দেশবিরোধী শক্তি অপচেষ্টা ও সহিংসতা চালাচ্ছে : মির্জা আব্বাস বিজয় আমাদের হয়েই গেছে, ১২ ফেব্রুয়ারি শুধু আনুষ্ঠানিকতা: নুরুল হক নুর

ভুয়া ডাক্তারের সিজারের পর দুই নবজাতকের মৃত্যু

অাকাশ জাতীয় ডেস্ক:

কুমিল্লায় গাইনি ডাক্তারের পরিচয়ে এক নার্সের কাছে প্রসব করাতে গিয়ে সন্তান হারিয়েছেন দুইজন মা। এই ঘটনায় কথিত ক্লিনিকটি ভাঙচুর করেছেন স্থানীয়রা। আর পালিয়ে গেছেন ডাক্তার পরিচয়ধারী ওই নারী। আর এই ঘটনার পর জানা যায়, কামরুন্নাহার নামে ওই নারী আসলে চিকিৎসক নন। যদিও ১০ বছর ধরেই তিনি রোগী দেখে আসছিলেন।

জেলার চান্দিনা উপজেলার নবাবপুর বাজারে ‘নবাবপুর মেডিকেল সেন্টার’ নামে দোকান ঘরে করা কথিত ক্লিনিকে গত রাতে দুই নবজাতকের মৃত্যুও ঘটনা ঘটে। দোকান ঘরে ওই নামে সাইন বোর্ড থাকলেও কথিত ডাক্তার এর চিকিৎসাপত্রে ‘নাহার কনসালটেশন সেন্টার’ নাম রয়েছে। এ ঘটনায় বিক্ষুদ্ধ জনতা দোকান ঘরে থাকা ওই ক্লিনিকটি ভেঙে দেয়।

খবর পেয়ে চান্দিনা থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে কথিত চিকিৎসক কামরুন্নাহারের সহযোগী ইয়াসমিনকে আটক করে। মারা যাওয়া দুই নব জাতকের একজন চান্দিনা উপজেলার বিচুন্দাইর-করইয়ারপাড়া গ্রামের প্রবাসী সফিকুল ইসলামের ছেলে। অন্যজন কংগাই গ্রামের ওমর ফারুক এর সন্তান।

স্থানীয়রা জানান, উপজেলার জোয়াগ ইউনিয়নের কৈলাইন গ্রামের ডিপ্লোমাধারী গ্রাম চিকিৎসক খলিলুর রহমান পলাশ প্রায় ১০ বছর আগে চিকিৎসক পরিচয়ে রোগী দেখা কামরুন্নাহারকে বিয়ে করেন। পরে নবাবপুর বাজারের একটি দোকান ঘর ভাড়া নিয়ে ‘ক্লিনিক’ চালু করেন খলিল।

সেখানে স্ত্রীকে স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞ গাইনি ডাক্তার হিসেবে পরিচয় করান পলাশ। পরে দুই জনেই এলাকায় রোগী দেখে দিয়ে আসছিলেন। প্রায় চার বছর আগে পলাশের সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটলেও ওই ক্লিনিক ছাড়েননি কামরুন্নাহার।

‘নবাবপুর মেডিকেল সেন্টার’ নামে দোকান ঘরের সাইনবোর্ডে ‘ডা. খলিলুর রহমান’ এর নাম থাকলেও বিচ্ছেদের পর কামরুন্নাহার নিজের নামে চিকিৎসাপত্রে ‘নাহার কনসালটেশন সেন্টার’ এবং নিজের নাম ‘ডা. আর এ কামরুন্নাহার’ লিখে প্রেসক্রিপশন ছাপান।

ওই প্রেসক্রিপশনে কামরুন্নাহার নিজের নামের পাশে ‘সনোলজিস্ট, মেডিসিন, মা ও শিশু, গাইনি, প্রসূতি ও স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞ’ বলে উল্লেখ করেন। কামরুন্নাহার সেখানে গর্ভবতী মায়েদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, অকাল গর্ভপাত, প্রসব, সিরাজিয়ান অপারেশনসহ বিভিন্ন চিকিৎসা সেবা দিয়ে আসছিলেন।

একটি নবজাতকের বাবা ওমর ফারুক বলেন, ‘আমার স্ত্রী প্রথম সন্তান ধারণ করার পর এলাকার লোকমুখে ডাক্তার কামরুন্নাহারের নাম শুনে তারা কাছে প্রায়ই নিয়ে আসতাম। বুধবার বিকালেও তিনি (কামরুন্নাহার) আমার স্ত্রীর আল্ট্রাসনোগ্রাফি করে বলেন আগামীদিন সকালে আমার স্ত্রীকে নিয়ে আসতে।’

‘তার কথামত আমি বৃহস্পতিবার সকাল ১১টার দিকে তার (কামরুন্নাহার) চেম্বারে নিয়ে আসি। সেখানে আনার পর তিনি আমার স্ত্রীকে ইজেকশন ও স্যালাইন দেন। বিকাল পাঁচটার দিকে আমার ছেলে সন্তান হয়েছে বলে আমাকে জানান। কিছুক্ষণ পর আবারও জানান, আমার স্ত্রীর সাইড সিজারে সন্তান ডেলিভারি হওয়ায় আমার স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েছে এবং আমার সন্তান মারা গেছে।’

মারা যাওয়া অপর শিশুর খালা কুলসুমা বলেন, ‘আমার ছোট বোনের প্রসব ব্যথা শুরু হলে সকাল নয়টায় আমরা কামরুন্নাহারের চেম্বারে নিয়ে আসি। দুপুর দুইটায় আমার বোনের সন্তান প্রসব হওয়ার পর থেকে শিশুটির শরীর ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে আসছিল।’

“বিষয়টি আমি তাকে (কামরুন্নাহারকে) জানালে তিনি বলেন, ‘আমি ডাক্তার না আপনরা ডাক্তার?’। বেলা চারটার দিকে তিনি আমাদের হাতে একটি কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বলেন, ‘এই ইনজেকশনটি নিয়ে আসেন, বাচ্চার অবস্থা ভালো না’। আমরা বাজার থেকে ওই ইনজেকশন এনে দিলে তারা ওই ইনজেকশনটি শিশুটির শরীরে প্রবেশ করার কিছুক্ষণের মধ্যে মৃত্যু ঘটে তার।”

এক ঘন্টার মধ্যে প্রসবের পর দুটি বাচ্চার মৃত্যুর বিষয়ে জানতে চাইলে কামরুন্নাহার ‘আমি একটু বাজার থেকে আসছি। আপনারা থাকেন’ বলেই পালিয়ে যান। পরে তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন করে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।

এ ব্যাপারে চান্দিনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আলী মাহমুদ বলেন, ‘আমরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে দুটি নবজাতকের মরদেহ উদ্ধার করেছি। কথিত ডাক্তার কামরুন্নাহার আত্মগোপন করায় তাকে পাওয়া যায়নি। তবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তার সহযোগীকে আটক করেছি। এ ঘটনায় নবজাতকের পরিবারের পক্ষ থেকে এখনও কেউ কোন অভিযোগ দেয়নি। তদন্ত সাপেক্ষে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’

এ ব্যাপারে কুমিল্লার সিভিল সার্জন মুজিব রহমান বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে আমার আগে জানা ছিল না। এখন যেহেতু জেনেছি, ভুয়া চিকিৎসকের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার-পরিকল্পনা কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেব।’

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

এমপি যদি সৎ হন, ঠিকাদারের বাপের সাধ্য নেই চুরি করার: রুমিন ফারহানা

ভুয়া ডাক্তারের সিজারের পর দুই নবজাতকের মৃত্যু

আপডেট সময় ০৯:৩৭:২৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৪ মে ২০১৮

অাকাশ জাতীয় ডেস্ক:

কুমিল্লায় গাইনি ডাক্তারের পরিচয়ে এক নার্সের কাছে প্রসব করাতে গিয়ে সন্তান হারিয়েছেন দুইজন মা। এই ঘটনায় কথিত ক্লিনিকটি ভাঙচুর করেছেন স্থানীয়রা। আর পালিয়ে গেছেন ডাক্তার পরিচয়ধারী ওই নারী। আর এই ঘটনার পর জানা যায়, কামরুন্নাহার নামে ওই নারী আসলে চিকিৎসক নন। যদিও ১০ বছর ধরেই তিনি রোগী দেখে আসছিলেন।

জেলার চান্দিনা উপজেলার নবাবপুর বাজারে ‘নবাবপুর মেডিকেল সেন্টার’ নামে দোকান ঘরে করা কথিত ক্লিনিকে গত রাতে দুই নবজাতকের মৃত্যুও ঘটনা ঘটে। দোকান ঘরে ওই নামে সাইন বোর্ড থাকলেও কথিত ডাক্তার এর চিকিৎসাপত্রে ‘নাহার কনসালটেশন সেন্টার’ নাম রয়েছে। এ ঘটনায় বিক্ষুদ্ধ জনতা দোকান ঘরে থাকা ওই ক্লিনিকটি ভেঙে দেয়।

খবর পেয়ে চান্দিনা থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে কথিত চিকিৎসক কামরুন্নাহারের সহযোগী ইয়াসমিনকে আটক করে। মারা যাওয়া দুই নব জাতকের একজন চান্দিনা উপজেলার বিচুন্দাইর-করইয়ারপাড়া গ্রামের প্রবাসী সফিকুল ইসলামের ছেলে। অন্যজন কংগাই গ্রামের ওমর ফারুক এর সন্তান।

স্থানীয়রা জানান, উপজেলার জোয়াগ ইউনিয়নের কৈলাইন গ্রামের ডিপ্লোমাধারী গ্রাম চিকিৎসক খলিলুর রহমান পলাশ প্রায় ১০ বছর আগে চিকিৎসক পরিচয়ে রোগী দেখা কামরুন্নাহারকে বিয়ে করেন। পরে নবাবপুর বাজারের একটি দোকান ঘর ভাড়া নিয়ে ‘ক্লিনিক’ চালু করেন খলিল।

সেখানে স্ত্রীকে স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞ গাইনি ডাক্তার হিসেবে পরিচয় করান পলাশ। পরে দুই জনেই এলাকায় রোগী দেখে দিয়ে আসছিলেন। প্রায় চার বছর আগে পলাশের সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটলেও ওই ক্লিনিক ছাড়েননি কামরুন্নাহার।

‘নবাবপুর মেডিকেল সেন্টার’ নামে দোকান ঘরের সাইনবোর্ডে ‘ডা. খলিলুর রহমান’ এর নাম থাকলেও বিচ্ছেদের পর কামরুন্নাহার নিজের নামে চিকিৎসাপত্রে ‘নাহার কনসালটেশন সেন্টার’ এবং নিজের নাম ‘ডা. আর এ কামরুন্নাহার’ লিখে প্রেসক্রিপশন ছাপান।

ওই প্রেসক্রিপশনে কামরুন্নাহার নিজের নামের পাশে ‘সনোলজিস্ট, মেডিসিন, মা ও শিশু, গাইনি, প্রসূতি ও স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞ’ বলে উল্লেখ করেন। কামরুন্নাহার সেখানে গর্ভবতী মায়েদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, অকাল গর্ভপাত, প্রসব, সিরাজিয়ান অপারেশনসহ বিভিন্ন চিকিৎসা সেবা দিয়ে আসছিলেন।

একটি নবজাতকের বাবা ওমর ফারুক বলেন, ‘আমার স্ত্রী প্রথম সন্তান ধারণ করার পর এলাকার লোকমুখে ডাক্তার কামরুন্নাহারের নাম শুনে তারা কাছে প্রায়ই নিয়ে আসতাম। বুধবার বিকালেও তিনি (কামরুন্নাহার) আমার স্ত্রীর আল্ট্রাসনোগ্রাফি করে বলেন আগামীদিন সকালে আমার স্ত্রীকে নিয়ে আসতে।’

‘তার কথামত আমি বৃহস্পতিবার সকাল ১১টার দিকে তার (কামরুন্নাহার) চেম্বারে নিয়ে আসি। সেখানে আনার পর তিনি আমার স্ত্রীকে ইজেকশন ও স্যালাইন দেন। বিকাল পাঁচটার দিকে আমার ছেলে সন্তান হয়েছে বলে আমাকে জানান। কিছুক্ষণ পর আবারও জানান, আমার স্ত্রীর সাইড সিজারে সন্তান ডেলিভারি হওয়ায় আমার স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েছে এবং আমার সন্তান মারা গেছে।’

মারা যাওয়া অপর শিশুর খালা কুলসুমা বলেন, ‘আমার ছোট বোনের প্রসব ব্যথা শুরু হলে সকাল নয়টায় আমরা কামরুন্নাহারের চেম্বারে নিয়ে আসি। দুপুর দুইটায় আমার বোনের সন্তান প্রসব হওয়ার পর থেকে শিশুটির শরীর ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে আসছিল।’

“বিষয়টি আমি তাকে (কামরুন্নাহারকে) জানালে তিনি বলেন, ‘আমি ডাক্তার না আপনরা ডাক্তার?’। বেলা চারটার দিকে তিনি আমাদের হাতে একটি কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বলেন, ‘এই ইনজেকশনটি নিয়ে আসেন, বাচ্চার অবস্থা ভালো না’। আমরা বাজার থেকে ওই ইনজেকশন এনে দিলে তারা ওই ইনজেকশনটি শিশুটির শরীরে প্রবেশ করার কিছুক্ষণের মধ্যে মৃত্যু ঘটে তার।”

এক ঘন্টার মধ্যে প্রসবের পর দুটি বাচ্চার মৃত্যুর বিষয়ে জানতে চাইলে কামরুন্নাহার ‘আমি একটু বাজার থেকে আসছি। আপনারা থাকেন’ বলেই পালিয়ে যান। পরে তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন করে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।

এ ব্যাপারে চান্দিনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আলী মাহমুদ বলেন, ‘আমরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে দুটি নবজাতকের মরদেহ উদ্ধার করেছি। কথিত ডাক্তার কামরুন্নাহার আত্মগোপন করায় তাকে পাওয়া যায়নি। তবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তার সহযোগীকে আটক করেছি। এ ঘটনায় নবজাতকের পরিবারের পক্ষ থেকে এখনও কেউ কোন অভিযোগ দেয়নি। তদন্ত সাপেক্ষে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’

এ ব্যাপারে কুমিল্লার সিভিল সার্জন মুজিব রহমান বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে আমার আগে জানা ছিল না। এখন যেহেতু জেনেছি, ভুয়া চিকিৎসকের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার-পরিকল্পনা কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেব।’