প্রেমের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সঠিক মানুষকে খুঁজে পাওয়া কিংবা চলমান সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে আধুনিক তরুণ প্রজন্ম অর্থাৎ জেন-জিরা নতুন এক ধারায় ঝুঁকছেন। সোলমেট খুঁজে পেতে আধুনিক প্রযুক্তির পাশাপাশি জাদুবিদ্যার প্রতিও কেন বাড়ছে আগ্রহ। প্রেমের ক্ষেত্রে কেউ কেমন জীবনসঙ্গী চান, সম্পর্কের মধ্যে কী ধরনের অনুভূতি ও বোঝাপড়া আশা করেন, সেসব লিখে রাখেন। এতে নিজের কাঙ্ক্ষিত সম্পর্কটি বাস্তবে তৈরি হয়েছে, এমনভাবে মনের ভাবনা লিখে রাখেন অনেকে। ডেটিং অ্যাপে হতাশা, জাদুবিদ্যায় বাড়তি আগ্রহ। কিন্তু মনের কথা বোঝা কিংবা সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিত হওয়া সহজ হয়নি।
কেউ ম্যানিফেস্টেশন বা স্ক্রিপ্টিং করছেন, কেউ পরামর্শ নিচ্ছেন ট্যারো কার্ড রিডারের, আবার কেউ অনলাইনে ভালোবাসার বিশেষ জাদু বা ‘লাভ স্পেল’-এর ওপর ভরসা করছেন। এই প্রক্রিয়ার একটি পরিচিত ধরন স্ক্রিপ্টিং।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশিত ডেটিং নিউজ (DatingNews)-এর ১ হাজার ১৩ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ওপর পরিচালিত এক সাম্প্রতিক জরিপে তরুণদের প্রেমের ক্ষেত্রে আধ্যাত্মিক চর্চার এসব চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে। হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের গবেষক মাইকেল নর্টন ও ফ্রান্সেসকা জিনো ২০১৪ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, প্রিয়জন হারানো কিংবা প্রেমের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর বিভিন্ন রিচুয়াল পালন মানুষের শোক ও মানসিক কষ্ট কিছুটা কমাতে পারে। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলের গবেষকদের ২০১৬ সালের একটি গবেষণাও প্রাসঙ্গিক। গবেষণায় এর পেছনে নিজের পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার অনুভূতিকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, অংশ নেওয়া মার্কিন জেন-জিদের মধ্যে ৬৪ শতাংশ তরুণ-তরুণী জীবনে অন্তত একবার ভালোবাসার মানুষ পাওয়ার জন্য বা প্রেমের সম্পর্ক মধুর রাখতে আধ্যাত্মিক, সাইকিক অথবা জাদুবিদ্যাসংশ্লিষ্ট কোনো না কোনো প্রতীকী পদ্ধতি চেষ্টা করে দেখেছেন। আধুনিক প্রযুক্তি ও ডেটিং অ্যাপের প্রাচুর্যের মধ্যে সম্পর্কে স্থায়ী প্রতিশ্রুতি বা নিশ্চয়তার অভাববোধ থেকেই এই প্রবণতা তৈরি হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে অনলাইন সংস্কৃতিতে ছড়িয়ে পড়া এই প্রবণতা তরুণ প্রজন্মের প্রেম ও সম্পর্ক নিয়ে ভাবনার একটি নতুন দিক তুলে ধরছে।
জেন-জিদের প্রেমচর্চায় ব্যবহৃত প্রধান পদ্ধতিসমূহ
- ম্যানিফেস্টেশন বা স্ক্রিপ্টিং: জরিপে অংশ নেওয়া ২৯ শতাংশ জেন-জি কাঙ্ক্ষিত সঙ্গীকে জীবনে পাওয়ার জন্য এই পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন।
- সাইকিকের পরামর্শ: ২৫ শতাংশ তরুণ-তরুণী প্রেমের ভবিষ্যৎ বা সম্পর্কের দিকনির্দেশনা পেতে সাইকিকের কাছে গিয়েছেন।
- ট্যারো কার্ড রিডিং: ১৭ শতাংশ তরুণ নিজেদের প্রেমের সম্পর্ক এবং সঙ্গী নিয়ে ট্যারো কার্ড রিডারের শরণাপন্ন হয়েছেন।
- অ্যাস্ট্রোলজি ও রাশিচক্র: ১৬ শতাংশ তরুণ-তরুণী সম্পর্কের সামঞ্জস্য বুঝতে জ্যোতিষশাস্ত্র বা অ্যাস্ট্রোলজির সহায়তা নিয়েছেন।
- লাভ স্পেল ও পেইড রিচুয়াল: ১৯ শতাংশ জেন-জি অনলাইন মাধ্যম থেকে ভালোবেসে কাউকে কাছে পাওয়ার বিশেষ আচার বা লাভ স্পেল শেখার জন্য অর্থ ব্যয় করেছেন।
আধুনিক ডেটিং সংস্কৃতির সহজলভ্যতার মাঝেও অস্পষ্ট যোগাযোগ ও মনস্তাত্ত্বিক অনিশ্চয়তা একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনলাইন মেসেজের উত্তর না পাওয়া, ডেটিং অ্যাপ ব্যবহার করেও একা বোধ করা কিংবা প্রাক্তন সঙ্গী জীবনে ফিরবেন কি না—এই অনিশ্চয়তাগুলো কাটিয়ে মানসিক আশ্বাস পেতে তরুণরা প্রতীকী আচারের আশ্রয় নিচ্ছেন। এসব মাধ্যমে অনিশ্চিত সময়ে নিজেদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য স্পষ্ট করার সুযোগ পাওয়া যায়। কখনো মেসেজের উত্তর আসে না, কখনো সম্পর্কের নাম দেওয়া যায় না, আবার কখনো দীর্ঘদিনের সম্পর্কও ভেঙে যায় কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই। তাঁর গবেষণা বলছে, শুধু কাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যতের স্বপ্নে ডুবে থাকলে লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রচেষ্টা কমে যেতে পারে।
গবেষণাভিত্তিক তথ্য ও প্রাসঙ্গিক তথ্যাবলি
১. ডেটিং নিউজ জরিপ পদ্ধতি ও পরিচিতি
- উৎস: DatingNews (৬ অক্টোবর ২০২৬)
- অংশগ্রহণকারী: ১,০১৩ জন মার্কিন প্রাপ্তবয়স্ক জেন-জি।
- বিষয়বস্তু: জেন-জির প্রেমসংক্রান্ত আধ্যাত্মিক চর্চার পরিসংখ্যান ও গবেষণাপদ্ধতি।
২. শোক ও বিচ্ছেদ কমাতে আচারের ভূমিকা
- উৎস: Harvard Business School (২০১৪)
- গবেষক: Michael I. Norton ও Francesca Gino
- গবেষণাপত্র: Rituals Alleviate Grieving for Loved Ones, Lovers, and Lotteries (PubMed)
- সারসংক্ষেপ: গবেষণায় দেখা গেছে প্রিয়জন হারানো বা বিচ্ছেদের মানসিক কষ্ট কমাতে বিভিন্ন আচার ও অনুভূতির প্রতীকী প্রকাশ ইতিবাচক মানসিক প্রভাব ফেলে।
৩. উদ্বেগ হ্রাস ও মানসিক পারফরম্যান্স
- উৎস: Harvard University ও UC Berkeley (২০১৬)
- গবেষণাপত্র: Don’t Stop Believing: Rituals Improve Performance by Decreasing Anxiety
- সারসংক্ষেপ: নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিগত বা প্রতীকী রিচুয়াল উদ্বেগের মাত্রা কমিয়ে মানসিক স্বস্তি ও আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সক্ষম।
৪. মানসিক কল্পনা ও আচরণের পরিবর্তন
- উৎস: Gabriele Oettingen (২০১৬)
- গবেষণাপত্র: The Power of Prospection: Mental Contrasting and Behavior Change (Wiley Online Library)
- সারসংক্ষেপ: নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি ও হামবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গবেষণায় বলা হয়েছে, কেবল ইতিবাচক কল্পনা সাফল্য আনে না, বাস্তব পদক্ষেপের সঙ্গে বৈপরীত্যের সমন্বয় জরুরি।
৫. অ্যাস্ট্রোলজি ও আধ্যাত্মিক চর্চা নিয়ে জরিপ
- উৎস: Pew Research Center (২০২৫)
- অংশগ্রহণকারী: ৯,৫৯৩ জন মার্কিন প্রাপ্তবয়স্ক।
- সারসংক্ষেপ: জরিপে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের অনেকেই বিনোদনমূলক ও মানসিক স্বস্তির উদ্দেশ্যে অ্যাস্ট্রোলজি ও ট্যারো কার্ড ব্যবহার করেন।
জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে যাঁরা আধ্যাত্মিক বা প্রতীকী পদ্ধতিগুলো চেষ্টা করেছেন, তাঁদের ৪৬ শতাংশের মতে অভিজ্ঞতায় এগুলো কার্যকর হয়েছে।
এদের মধ্যে ১৭ শতাংশ মনে করেন এগুলো পুরোপুরি সফল হয়েছে এবং ২৯ শতাংশের দাবি তারা আংশিক সুফল পেয়েছেন। অন্যদিকে ২৯ শতাংশের অভিজ্ঞতা ছিল আংশিক সফলতার।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লাভ স্পেল বা ট্যারো কার্ডের মাধ্যমে সম্পর্ক ভালো হয়েছে বা কোনো মানুষ বদলে গেছে—এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায় না।
এটিকে কেবলই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বা মনস্তাত্ত্বিক স্বস্তি হিসেবে দেখা হয়।
বাস্তব জীবনে সুসম্পর্ক গড়তে শুধু ইতিবাচক চিন্তাই যথেষ্ট নয়। মনোবিজ্ঞানী গ্যাব্রিয়েলে ওটিঙ্গেন গবেষণায় প্রমাণ করেছেন যে, জীবনসঙ্গীর বিষয়ে কেবল রূপকথার মতো স্বপ্ন দেখলে কাজ হয় না। তার জন্য নিজেদের মধ্যকার মনস্তাত্ত্বিক যোগাযোগ স্পষ্ট করা, সমান পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্পর্কের প্রতি সৎ অনুভূতির মতো বাস্তবিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য। শুধু স্বপ্ন দেখলেই কি মিলবে ভালোবাসা।
জাদুবিদ্যার প্রতি আকর্ষণের খবর সত্ত্বেও জেন-জিরা কিন্তু পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে ইতিবাচক মানসিকতার পরিচয় দিচ্ছেন। ডেটিং নিউজের জরিপে দেখা গেছে, ৩৮ শতাংশ জেন-জি প্রেমের সম্পর্কের সংকট দূর করতে থেরাপির ওপর সর্বোচ্চ আস্থা রেখেছেন। এর বিপরীতে মাত্র ১৪ শতাংশ দৈনন্দিন রাশিফল, ১০ শতাংশ সাইকিক-ট্যারো এবং ৮ শতাংশ তরুণ সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে লাভ স্পেলের সাহায্য নেওয়ার মতো চরম পথ বেছে নিয়েছেন।
চূড়ান্ত বিচারে ম্যানিফেস্টেশন বা বিশেষ কোনো রিচুয়াল কোনো তরুণের নিজের অনুভূতি ও জীবন থেকে চাওয়াগুলোকে পরিষ্কার বুঝতে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু টেকসই ও আনন্দময় সম্পর্কের জন্য দুজনের মধ্যকার স্পষ্ট আলোচনা, আস্থার পরিবেশ ও গভীর শ্রদ্ধাবোধই আসল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। অনেক সময় কোনো ঘটনার সঙ্গে একটি রিচুয়ালের সময় মিলে গেলেই মানুষ সেটিকে কার্যকারণ হিসেবে ধরে নিতে পারেন।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 























