বলিউডের দাপুটে অভিনেতা নানা পাটেকর কয়েক দিন আগে আমাদের ছেড়ে পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন। পাঁচ দশকের দীর্ঘ অভিনয় ক্যারিয়ারে বহু স্মরণীয় কাজ উপহার দেওয়া এই বরেণ্য তারকা পদ্মশ্রীসহ অসংখ্য সম্মাননা পেয়েছেন। তার বর্ণাঢ্য জীবনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এমন কিছু তথ্য রয়েছে, যা অনেকেরই অজানা। এছাড়া তার উপার্জনের বড় একটি অংশ চ্যারিটিতে দান করেছেন এই অভিনেতা।
নানা পাটেকরের শৈশব ছিল তীব্র আর্থিক সংকটের। মাত্র ১৩ বছর বয়স থেকেই তিনি উপার্জনের পথ বেছে নেন। তখন স্কুলের ক্লাস শেষে প্রায় ৮ কিলোমিটার পথ হেঁটে সিনেমার পোস্টার ও সাইনবোর্ড আঁকার কাজ করতেন। দৈনিক ৩৫ রুপি পারিশ্রমিকের পাশাপাশি একবেলা খাবার জুটত। এই ছবি আঁকার প্রতিভা পরবর্তীতে মুম্বাই পুলিশের স্কেচ আর্টিস্ট হিসেবে কাজ করার সুযোগ করে দেয়। পুলিশের কাছে আসা অপরাধী বা সন্দেহভাজনদের শারীরিক বর্ণনার ভিত্তিতে তিনি নিখুঁত সব স্কেচ তৈরি করে দিতেন। এই কাজের জন্য দিনে প্রায় ৩৫ রুপি পারিশ্রমিক পেতেন। তার পরিবার আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছিল।
ব্যক্তিগত জীবনের সবচেয়ে বড় বেদনা ছিল তার প্রথম সন্তান দুর্বাসের মৃত্যু। জন্ম থেকেই নানা শারীরিক প্রতিবন্ধকতায় ভোগা শিশুটি আড়াই বছর বয়সে মারা যায়। সন্তানের মৃত্যুর পর নানা পাটেকর নিজের অপরাধবোধ নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছিলেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, সন্তানের শারীরিক অবস্থা নিয়ে ভাবার পরিবর্তে তিনি বরং সমাজ কী ভাববে—তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় মগ্ন ছিলেন, যা তার জীবনের এক আবেগঘন অধ্যায় হয়ে আছে। কেবল পর্দায়ই কাঁপাতেন না নানা পাটেকর, তার দারুণ রান্নার দক্ষতাও ছিল।
ধূমপানের অভ্যাস নিয়ে নানা পাটেকর বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় ছিলেন। তিনি এক পর্যায়ে দিনে ৬০টি পর্যন্ত সিগারেট খেতেন, এমনকি স্নানের সময়ও ধূমপান করতেন। লোকে তার গাড়িতে উঠতে পর্যন্ত চাইত না। তবে ৫৬ বছর বয়সে তিনি আচমকা এই অভ্যাস ত্যাগ করেন। ২০১২ সালে টাইমস অব ইন্ডিয়াকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “এটা হঠাৎ করেই ঘটেছিল। একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে বললাম—‘আর সিগারেট নয়।” তবে ৫৬ বছর বয়সে ধূমপান ছেড়ে দেন।
অভিনয়ের পাশাপাশি রান্নায় ছিল তার বিশেষ দক্ষতা। সহ-শিল্পী পরেশ রাওয়াল তার প্রশংসা করে বলেছিলেন, শুটিং সেটের মানুষজন নানার তৈরি করা খাবার না খেয়ে থাকতে পারতেন না। তিনি বাড়ি এবং শুটিং স্পট—উভয় জায়গাতেই রান্না করতে খুব পছন্দ করতেন। এমনকি রসিকতা করে একবার এক প্রযোজককে দিয়ে থালাবাসনও মাজিয়েছিলেন তিনি।
প্রখ্যাত পরিচালক সত্যজিৎ রায় নানা পাটেকরের বাস্তবসম্মত অভিনয়শৈলীতে মুগ্ধ ছিলেন। তিনি নানাকে প্রধান চরিত্রে রেখে একটি সিনেমা নির্মাণের পরিকল্পনাও করেছিলেন, যদিও দুর্ভাগ্যবশত সেই প্রজেক্টটি আর আলোর মুখ দেখেনি।
জনসেবা ও সমাজকল্যাণেও নানা পাটেকরের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। বিশেষ করে মহারাষ্ট্রের কৃষকদের দুরবস্থা তাকে গভীরভাবে স্পর্শ করত। ২০১৫ সালের খরা ও ঋণের দায়ে কৃষকদের আত্মহত্যার ঘটনায় ব্যথিত হয়ে তিনি অভিনেতা মকরন্দ আনাসপুরের সঙ্গে ‘নাম ফাউন্ডেশন’ গড়ে তোলেন। এমনকি দেড় কোটি রুপি মূল্যের গাড়ি কেনার শখ বিসর্জন দিয়ে সেই টাকা তিনি খরাকবলিত কৃষক পরিবারদের সহায়তায় ব্যয় করেছিলেন।
বলিউডের চাকচিক্য থেকে দূরে সাধারণ জীবন যাপনে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন তিনি। পুনের ডনজে গ্রামে ২৭ একর জমির ওপর গড়ে তুলেছিলেন একটি ফার্মহাউজ। সেখানে ধান ও গম চাষের পাশাপাশি গরু ও বিভিন্ন পশুপাখি পালন করতেন। ব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি দূর করতে তিনি সেখানে গান, আড্ডা ও প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটাতে পছন্দ করতেন, যা তাকে তারকাখ্যাতির বন্দিদশা থেকে মুক্তি দিত। নিউজ১৮, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 














