ঢাকা ১২:২০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬, ৩০ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ক্রকস: ‘কুৎসিত’ জুতা থেকে যেভাবে তৈরি হলো ৪.৪ বিলিয়ন ডলার সাম্রাজ্য

আকাশ নিউজ ডেস্ক:

২০০২ সালের এক গ্রীষ্মের দিন। মেক্সিকো উপসাগরে নৌভ্রমণে বেরিয়েছেন তিন আমেরিকান বন্ধু—ডিউক হ্যানসন, স্কট সিমন্স এবং জর্জ বেডেকার। ভ্রমণের একপর্যায়ে স্কট ডেকের নিচ থেকে কালো রঙের এক জোড়া অদ্ভুত ফোমের জুতা নিয়ে ওপরে আসেন। জুতা জোড়া দেখে বাকি দুই বন্ধু হাসি চেপে রাখতে পারেননি। জুতাটির অদ্ভুত আকৃতি ও স্থূল নকশার কারণে তারা সরাসরি একে ‘কুৎসিত’ বলে উড়িয়ে দেন। কিন্তু সমুদ্রের মাঝে দাঁড়িয়ে সেদিন কেউ কল্পনাও করতে পারেননি যে, এই ‘কুৎসিত’ জুতাই একদিন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের পায়ে শোভা পাবে এবং তৈরি করবে ৪.৪ বিলিয়ন ডলার এক বিশাল বিজনেস সাম্রাজ্য!

এটি বিশ্ববিখ্যাত ব্র্যান্ড ‘ক্রকস’-এর ঘুরে দাঁড়ানোর এক অবিশ্বাস্য গল্প।

যেভাবে শুরু হয়েছিল এই যাত্রা:

২০০২ সালে ক্রকসের অন্যতম সহ-প্রতিষ্ঠাতা ডিউক হ্যানসনের জীবন প্রায় ধ্বংসের মুখে ছিল। চাকরি হারানো, স্ত্রীর ডিভোর্স ফাইল করা এবং ক্যানসারে মায়ের মৃত্যুর পর তিনি পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিলেন। তাকে মানসিকভাবে চাঙ্গা করতেই তার দুই বন্ধু স্কট এবং জর্জ মেক্সিকো উপসাগরে একটি নৌ ভ্রমণের পরিকল্পনা করেন।

স্কট সিমন্স আগে থেকেই কানাডার ‘ফোম ক্রিয়েশন্স’ নামে একটি কোম্পানির তৈরি ‘ক্রসলাইট’ নামক উপাদানের জুতার সন্ধান জানতেন। জুতোটির বাণিজ্যিক সম্ভাবনা দেখে তিনি এর ডিজাইনে কিছুটা পরিবর্তন আনেন—দুই পাশে দুটো ফুটো করেন এবং পেছনে একটি স্ট্র্যাপ যুক্ত করেন। নৌভ্রমণের সময় এই জুতাই তিনি বন্ধুদের দেখান।

কুৎসিত ডিজাইনই যখন সেরা মার্কেটিং কৌশল:

প্রাথমিক উপহাসের পর দুই বন্ধু যখন জুতাটি পায়ে দেন, তখন তারা এর কার্যকারিতা দেখে রীতিমতো অবাক হয়ে যান। প্রতিটি জুতার ওজন ছিল মাত্র ১৭০ গ্রাম! শরীরের গরমে জুতাটি নরম হয়ে পায়ের আকৃতি ধারণ করত, ফলে এটি ছিল অত্যন্ত আরামদায়ক। এছাড়া এটিতে কোনো দুর্গন্ধ হতো না এবং ভেজা জায়গায় এর গ্রিপ ছিল চমৎকার।

তিন বন্ধু মিলে এই জুতা বাজারজাত করার জন্য একটি স্টার্টআপ শুরু করেন:

২০০২ সালের নভেম্বরে ফ্লোরিডার একটি আন্তর্জাতিক বোট শো-তে তারা ‘দ্য বিচ’ নামে এই জুতা প্রদর্শন করেন। সেখানেও মানুষ একে কুৎসিত বলে হাসাহাসি করে, কিন্তু এর আরামদায়ক গুণের কারণে কেউ একে উপেক্ষা করতে পারেনি। এমনকি স্টলে মানুষের উপচে পড়া ভিড় সামলাতে ফায়ার সার্ভিসকে অ্যানাউন্সমেন্ট করতে হয়েছিল।

ফাউন্ডাররা বুঝতে পারেন, এই জুতার কুৎসিত রূপই আসলে এর সবচেয়ে বড় মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি। প্রথম প্রদর্শনীতেই তারা এক হাজার জোড়া জুতা বিক্রি করে ফেলেন।

কুমিরের মতো পানি ও ডাঙা উভয় জায়গায় সমান উপযোগী হওয়ায় জুতাটির নাম দেওয়া হয় ‘ক্রকস’।

সাফল্যের আকাশ ছোঁয়া এবং তারপর চরম বিপর্যয়:

২০০৬ সালে ‘ক্রকস’ আমেরিকার শেয়ার বাজারে পা রাখে এবং এটি আমেরিকার জুতা শিল্পের ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম আইপিওতে পরিণত হয়। ২০০৭ সালের মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশকেও ক্রকস পায়ে হাঁটতে দেখা যায়।

কিন্তু এই দ্রুত সাফল্যই কোম্পানির জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়:

অতিরিক্ত লাভের আশায় ক্রকস তাদের মূল পণ্য বাদ দিয়ে হাই হিল, বুট, সানগ্লাস, এমনকি জামাকাপড়ও তৈরি করা শুরু করে। ফলস্বরূপ, ২০০৭ সালের শেষে প্রায় ৩ কোটি জোড়া জুতা অবিক্রিত থেকে যায় এবং কোম্পানির ২৪৮ মিলিয়ন ডলারের ইনভেন্টরি আটকে পড়ে।

একই সঙ্গে চারদিকে ক্রকসের বিরুদ্ধে এক ধরনের ক্লান্তি তৈরি হয়:

ইন্টারনেটে ‘আই হেইট ক্রকস’ নামে ওয়েবসাইট খোলা হয়, টাইম ম্যাগাজিন একে পৃথিবীর ‘৫০টি সবচেয়ে বাজে আবিষ্কারের’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। এমনকি ক্রকসের নরম ফোম এস্কেলেটরে আটকে বেশ কিছু শিশু আহত হওয়ার খবর এলে ব্র্যান্ড ইমেজ ধুলোয় মিশে যায়।

২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার সময় যে কোম্পানিটি আগের বছর বড় অঙ্কের লাভে ছিল, তারা প্রায় ১৮৫ মিলিয়ন ডলার লোকসানের মুখে পড়ে। অডিটররা ঘোষণা করেন, ক্রকস কোম্পানি যেকোনো সময় দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে।

অ্যান্ড্রু রিস এবং জিবিত্স: জুতা শিল্পের ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন:

যখন সবাই ক্রকসের শেষ দেখে ফেলেছিল, ঠিক তখন ‘ব্ল্যাকস্টোন’ নামক প্রাইভেট ইকুইটি ফার্ম ‘ক্রকস’-এ ২০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে তাদের লাইফলাইন দেয়। তারা অ্যান্ড্রু রিসকে কোম্পানির দায়িত্ব দেন, যিনি পরবর্তীতে ক্রকসের সিইও হন।

অ্যান্ড্রু রিস এসে কোম্পানির ভুলগুলো ধরেন। তিনি বুঝতে পারেন, ক্রকস তাদের আসল পরিচয় অর্থাৎ ক্লাসিক ফর্মুলা ভুলে ফ্যাশন লাইনে গিয়ে ভুল করেছে। তিনি বাকি সব ফালতু ক্যাটাগরি বন্ধ করে দিয়ে আবার মূল ক্লাসিক ক্রকস উৎপাদনে মনোযোগ দেন। নাইকির মতো নিজের ফ্যাক্টরি বন্ধ করে ম্যানুফ্যাকচারিং আউটসোর্স করেন।

তবে ক্রকসের ভাগ্য পুরোপুরি বদলে দেয় একটি ছোট প্লাস্টিক অনুষঙ্গ—জিবিত্স। ক্রকসের জুতার ফুটোগুলোতে লাগানোর জন্য রঙিন প্লাস্টিক বাটন বা এক্সেসরিজ তৈরি শুরু হয়। জেন-জি বা তরুণ প্রজন্মের কাছে নিজের জুতাকে নিজের মতো করে সাজানোর এই আইডিয়া ব্যাপক সাড়া ফেলে।

ক্রকস এরপর বিশ্বখ্যাত তারকা জাস্টিন বিবার, পপ তারকা পোস্ট ম্যালোন এবং মার্ভেল, হ্যারি পটার, ডিজনি ও কেএফসি-এর মতো বড় বড় ব্র্যান্ডের সঙ্গে কোলাবোরেশন বা পার্টনারশিপ করে লিমিটেড এডিশন জুতা বাজারে ছাড়ে, যা মাত্র ১০ মিনিটে সোল্ড আউট হয়ে যেত। ২০১৯ সালের মধ্যে ক্রকসের রাজস্ব রেকর্ড ১.২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়।

কোভিড-১৯ এবং টিকটক উন্মাদনা:

২০২০ সালে করোনা মহামারির সময়ে যখন পুরো বিশ্বের জুতা শিল্প ধসে পড়েছিল, তখন ক্রকসের বিক্রি রকেট গতিতে বাড়ে। লকডাউনে ঘরে থাকার জন্য এর চেয়ে আরামদায়ক ও সহজে স্যানিটাইজ করা যায় এমন জুতা আর ছিল না।

ফ্রন্টলাইন ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রিয় পছন্দ হয়ে ওঠে ক্রকস। কোম্পানি নিজেও বিশ্বজুড়ে প্রায় ৮ লাখ ৬০ হাজার জোড়া জুতা ডাক্তারদের বিনামূল্যে দান করে অনন্য নজির গড়ে।

একই সময়ে টিকটকে ক্রকস কাস্টমাইজেশনের ভিডিওগুলো মিলিয়ন মিলিয়ন ভিউ পেতে শুরু করে, যা কোম্পানিকে বিলিয়ন ডলারের ফ্রি পাবলিসিটি এনে দেয়। ২০২৪ সালের মধ্যে ক্রকসের বার্ষিক আয় ৪.১ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে পৌঁছায়।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ক্রকস: ‘কুৎসিত’ জুতা থেকে যেভাবে তৈরি হলো ৪.৪ বিলিয়ন ডলার সাম্রাজ্য

আপডেট সময় ১১:০৫:০০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬

আকাশ নিউজ ডেস্ক:

২০০২ সালের এক গ্রীষ্মের দিন। মেক্সিকো উপসাগরে নৌভ্রমণে বেরিয়েছেন তিন আমেরিকান বন্ধু—ডিউক হ্যানসন, স্কট সিমন্স এবং জর্জ বেডেকার। ভ্রমণের একপর্যায়ে স্কট ডেকের নিচ থেকে কালো রঙের এক জোড়া অদ্ভুত ফোমের জুতা নিয়ে ওপরে আসেন। জুতা জোড়া দেখে বাকি দুই বন্ধু হাসি চেপে রাখতে পারেননি। জুতাটির অদ্ভুত আকৃতি ও স্থূল নকশার কারণে তারা সরাসরি একে ‘কুৎসিত’ বলে উড়িয়ে দেন। কিন্তু সমুদ্রের মাঝে দাঁড়িয়ে সেদিন কেউ কল্পনাও করতে পারেননি যে, এই ‘কুৎসিত’ জুতাই একদিন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের পায়ে শোভা পাবে এবং তৈরি করবে ৪.৪ বিলিয়ন ডলার এক বিশাল বিজনেস সাম্রাজ্য!

এটি বিশ্ববিখ্যাত ব্র্যান্ড ‘ক্রকস’-এর ঘুরে দাঁড়ানোর এক অবিশ্বাস্য গল্প।

যেভাবে শুরু হয়েছিল এই যাত্রা:

২০০২ সালে ক্রকসের অন্যতম সহ-প্রতিষ্ঠাতা ডিউক হ্যানসনের জীবন প্রায় ধ্বংসের মুখে ছিল। চাকরি হারানো, স্ত্রীর ডিভোর্স ফাইল করা এবং ক্যানসারে মায়ের মৃত্যুর পর তিনি পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিলেন। তাকে মানসিকভাবে চাঙ্গা করতেই তার দুই বন্ধু স্কট এবং জর্জ মেক্সিকো উপসাগরে একটি নৌ ভ্রমণের পরিকল্পনা করেন।

স্কট সিমন্স আগে থেকেই কানাডার ‘ফোম ক্রিয়েশন্স’ নামে একটি কোম্পানির তৈরি ‘ক্রসলাইট’ নামক উপাদানের জুতার সন্ধান জানতেন। জুতোটির বাণিজ্যিক সম্ভাবনা দেখে তিনি এর ডিজাইনে কিছুটা পরিবর্তন আনেন—দুই পাশে দুটো ফুটো করেন এবং পেছনে একটি স্ট্র্যাপ যুক্ত করেন। নৌভ্রমণের সময় এই জুতাই তিনি বন্ধুদের দেখান।

কুৎসিত ডিজাইনই যখন সেরা মার্কেটিং কৌশল:

প্রাথমিক উপহাসের পর দুই বন্ধু যখন জুতাটি পায়ে দেন, তখন তারা এর কার্যকারিতা দেখে রীতিমতো অবাক হয়ে যান। প্রতিটি জুতার ওজন ছিল মাত্র ১৭০ গ্রাম! শরীরের গরমে জুতাটি নরম হয়ে পায়ের আকৃতি ধারণ করত, ফলে এটি ছিল অত্যন্ত আরামদায়ক। এছাড়া এটিতে কোনো দুর্গন্ধ হতো না এবং ভেজা জায়গায় এর গ্রিপ ছিল চমৎকার।

তিন বন্ধু মিলে এই জুতা বাজারজাত করার জন্য একটি স্টার্টআপ শুরু করেন:

২০০২ সালের নভেম্বরে ফ্লোরিডার একটি আন্তর্জাতিক বোট শো-তে তারা ‘দ্য বিচ’ নামে এই জুতা প্রদর্শন করেন। সেখানেও মানুষ একে কুৎসিত বলে হাসাহাসি করে, কিন্তু এর আরামদায়ক গুণের কারণে কেউ একে উপেক্ষা করতে পারেনি। এমনকি স্টলে মানুষের উপচে পড়া ভিড় সামলাতে ফায়ার সার্ভিসকে অ্যানাউন্সমেন্ট করতে হয়েছিল।

ফাউন্ডাররা বুঝতে পারেন, এই জুতার কুৎসিত রূপই আসলে এর সবচেয়ে বড় মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি। প্রথম প্রদর্শনীতেই তারা এক হাজার জোড়া জুতা বিক্রি করে ফেলেন।

কুমিরের মতো পানি ও ডাঙা উভয় জায়গায় সমান উপযোগী হওয়ায় জুতাটির নাম দেওয়া হয় ‘ক্রকস’।

সাফল্যের আকাশ ছোঁয়া এবং তারপর চরম বিপর্যয়:

২০০৬ সালে ‘ক্রকস’ আমেরিকার শেয়ার বাজারে পা রাখে এবং এটি আমেরিকার জুতা শিল্পের ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম আইপিওতে পরিণত হয়। ২০০৭ সালের মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশকেও ক্রকস পায়ে হাঁটতে দেখা যায়।

কিন্তু এই দ্রুত সাফল্যই কোম্পানির জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়:

অতিরিক্ত লাভের আশায় ক্রকস তাদের মূল পণ্য বাদ দিয়ে হাই হিল, বুট, সানগ্লাস, এমনকি জামাকাপড়ও তৈরি করা শুরু করে। ফলস্বরূপ, ২০০৭ সালের শেষে প্রায় ৩ কোটি জোড়া জুতা অবিক্রিত থেকে যায় এবং কোম্পানির ২৪৮ মিলিয়ন ডলারের ইনভেন্টরি আটকে পড়ে।

একই সঙ্গে চারদিকে ক্রকসের বিরুদ্ধে এক ধরনের ক্লান্তি তৈরি হয়:

ইন্টারনেটে ‘আই হেইট ক্রকস’ নামে ওয়েবসাইট খোলা হয়, টাইম ম্যাগাজিন একে পৃথিবীর ‘৫০টি সবচেয়ে বাজে আবিষ্কারের’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। এমনকি ক্রকসের নরম ফোম এস্কেলেটরে আটকে বেশ কিছু শিশু আহত হওয়ার খবর এলে ব্র্যান্ড ইমেজ ধুলোয় মিশে যায়।

২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার সময় যে কোম্পানিটি আগের বছর বড় অঙ্কের লাভে ছিল, তারা প্রায় ১৮৫ মিলিয়ন ডলার লোকসানের মুখে পড়ে। অডিটররা ঘোষণা করেন, ক্রকস কোম্পানি যেকোনো সময় দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে।

অ্যান্ড্রু রিস এবং জিবিত্স: জুতা শিল্পের ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন:

যখন সবাই ক্রকসের শেষ দেখে ফেলেছিল, ঠিক তখন ‘ব্ল্যাকস্টোন’ নামক প্রাইভেট ইকুইটি ফার্ম ‘ক্রকস’-এ ২০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে তাদের লাইফলাইন দেয়। তারা অ্যান্ড্রু রিসকে কোম্পানির দায়িত্ব দেন, যিনি পরবর্তীতে ক্রকসের সিইও হন।

অ্যান্ড্রু রিস এসে কোম্পানির ভুলগুলো ধরেন। তিনি বুঝতে পারেন, ক্রকস তাদের আসল পরিচয় অর্থাৎ ক্লাসিক ফর্মুলা ভুলে ফ্যাশন লাইনে গিয়ে ভুল করেছে। তিনি বাকি সব ফালতু ক্যাটাগরি বন্ধ করে দিয়ে আবার মূল ক্লাসিক ক্রকস উৎপাদনে মনোযোগ দেন। নাইকির মতো নিজের ফ্যাক্টরি বন্ধ করে ম্যানুফ্যাকচারিং আউটসোর্স করেন।

তবে ক্রকসের ভাগ্য পুরোপুরি বদলে দেয় একটি ছোট প্লাস্টিক অনুষঙ্গ—জিবিত্স। ক্রকসের জুতার ফুটোগুলোতে লাগানোর জন্য রঙিন প্লাস্টিক বাটন বা এক্সেসরিজ তৈরি শুরু হয়। জেন-জি বা তরুণ প্রজন্মের কাছে নিজের জুতাকে নিজের মতো করে সাজানোর এই আইডিয়া ব্যাপক সাড়া ফেলে।

ক্রকস এরপর বিশ্বখ্যাত তারকা জাস্টিন বিবার, পপ তারকা পোস্ট ম্যালোন এবং মার্ভেল, হ্যারি পটার, ডিজনি ও কেএফসি-এর মতো বড় বড় ব্র্যান্ডের সঙ্গে কোলাবোরেশন বা পার্টনারশিপ করে লিমিটেড এডিশন জুতা বাজারে ছাড়ে, যা মাত্র ১০ মিনিটে সোল্ড আউট হয়ে যেত। ২০১৯ সালের মধ্যে ক্রকসের রাজস্ব রেকর্ড ১.২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়।

কোভিড-১৯ এবং টিকটক উন্মাদনা:

২০২০ সালে করোনা মহামারির সময়ে যখন পুরো বিশ্বের জুতা শিল্প ধসে পড়েছিল, তখন ক্রকসের বিক্রি রকেট গতিতে বাড়ে। লকডাউনে ঘরে থাকার জন্য এর চেয়ে আরামদায়ক ও সহজে স্যানিটাইজ করা যায় এমন জুতা আর ছিল না।

ফ্রন্টলাইন ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রিয় পছন্দ হয়ে ওঠে ক্রকস। কোম্পানি নিজেও বিশ্বজুড়ে প্রায় ৮ লাখ ৬০ হাজার জোড়া জুতা ডাক্তারদের বিনামূল্যে দান করে অনন্য নজির গড়ে।

একই সময়ে টিকটকে ক্রকস কাস্টমাইজেশনের ভিডিওগুলো মিলিয়ন মিলিয়ন ভিউ পেতে শুরু করে, যা কোম্পানিকে বিলিয়ন ডলারের ফ্রি পাবলিসিটি এনে দেয়। ২০২৪ সালের মধ্যে ক্রকসের বার্ষিক আয় ৪.১ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে পৌঁছায়।