আকাশ নিউজ ডেস্ক:
ব্রাজিল থেকে অস্ট্রেলিয়া-সমুদ্রপথে প্রায় ১৫ হাজার কিলোমিটার ভ্রমণ করে নতুন রেকর্ড গড়েছে একটি হাম্পব্যাক তিমি।গবেষকদের মতে, একই হাম্পব্যাক তিমিকে দুই ভিন্ন স্থানে পুনরায় শনাক্ত করার ক্ষেত্রে এটিই এখন পর্যন্ত নথিভুক্ত দীর্ঘতম দূরত্ব।
গবেষণা অনুযায়ী, ২০০৩ সালে প্রথমবার তিমিটিকে ব্রাজিলের বাহিয়া অঙ্গরাজ্যের উপকূলে অবস্থিত অ্যাব্রোলহোস ব্যাংক এলাকায় দেখা যায়। এটি হাম্পব্যাক তিমিদের অন্যতম প্রধান প্রজননক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত। এরপর দীর্ঘ ২২ বছর আর কোনো খোঁজ মেলেনি প্রাণিটির।
অবশেষে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড উপকূলের হার্ভে উপসাগরে আবারও দেখা মেলে একই তিমির। দুই স্থানের মধ্যকার দূরত্ব প্রায় ১৫ হাজার ১০০ কিলোমিটার।
গ্রিফিথ ইউনিভার্সিটির পিএইচডি শিক্ষার্থী এবং রয়্যাল সোসাইটি ওপেন সায়েন্স -এ প্রকাশিত নতুন গবেষণার সহ-লেখক স্টেফানি স্ট্যাক বলেছেন, এত দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করা একটি তিমিকে পুনরায় শনাক্ত করা সত্যিই অভূতপূর্ব ঘটনা। ২২ বছর পর একই তিমির সন্ধান পাওয়া গবেষণার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষকরা জানান, তিমিটিকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে ‘হ্যাপিহোয়েল’ নামের একটি অনলাইন তথ্যভাণ্ডারের মাধ্যমে। তিমির লেজের নিচের অংশের নকশা, রঙের বিন্যাস ও ক্ষতচিহ্ন দেখে প্রতিটি প্রাণিকে আলাদাভাবে শনাক্ত করা হয়। মানুষের আঙুলের ছাপের মতোই প্রতিটি তিমির লেজও স্বতন্ত্র।
এই শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তিও ব্যবহার করা হয়েছে। মানুষের মুখ শনাক্তকরণের মতো পদ্ধতিতে ছবির মিল খুঁজে বের করেছে বিশেষ অ্যালগরিদম।
গবেষণায় আরও জানা যায়, এর আগেও ২০০৭ সালে অস্ট্রেলিয়ার হার্ভে উপসাগরে দেখা একটি হাম্পব্যাক তিমিকে ২০১৯ সালে ব্রাজিলের সাও পাওলোর উপকূলে আবারও শনাক্ত করা হয়েছিল। সেই যাত্রাপথ ছিল প্রায় ১৪ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ।
গবেষকদের ভাষ্য মতে, এই দুটি ঘটনা প্রমাণ করে যে ব্রাজিল ও পূর্ব অস্ট্রেলিয়ার হাম্পব্যাক তিমিদের মধ্যে বিরল পরিযায়ী আদান-প্রদান ঘটে থাকে। তবে এটি নিয়মিত নয়, বরং জীবনে একবার ঘটে যেতে পারে এমন অস্বাভাবিক ঘটনা।
গবেষণাটিতে ১৯৮৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা ১৯ হাজারের বেশি তিমির লেজের ছবি বিশ্লেষণ করা হয়। এর মধ্যে মাত্র দুটি তিমির ক্ষেত্রে এমন দীর্ঘ ভ্রমণের প্রমাণ মিলেছে।
স্ট্যাক বলেন, ছবি দেখে শনাক্তকরণের সীমাবদ্ধতা হলো- তিমিটি কোথা থেকে কোথায় গেছে তা জানা গেলেও মাঝপথে কী ঘটেছে, কোন রুট ব্যবহার করেছে বা আরও কত দূর ভ্রমণ করেছে, সে তথ্য অজানাই থেকে যায়।
সাধারণত অস্ট্রেলিয়ার হাম্পব্যাক তিমিরা অ্যান্টার্কটিকার খাদ্যসমৃদ্ধ জলভাগ থেকে গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ সংলগ্ন প্রজনন এলাকায় যাতায়াত করে। বছরে প্রায় ১০ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তারা এই চক্র সম্পন্ন করে।
গবেষকদের মতে, এই ঘটনা সামুদ্রিক প্রাণি সংরক্ষণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার গুরুত্ব নতুন করে সামনে এনেছে। কারণ এসব পরিযায়ী প্রাণি একাধিক দেশের জলসীমা অতিক্রম করে চলাচল করে।
একই সঙ্গে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে তিমির পরিযায়ী আচরণেও বড় পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে দক্ষিণ মহাসাগরে অ্যান্টার্কটিক ক্রিলের সংখ্যা কমে যাওয়ায় খাদ্য সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
উল্লেখ্য, হাম্পব্যাক তিমি হলো ব্যালিন তিমির একটি প্রজাতি। এটি একটি রোরকুয়াল এবং মেগাপটেরা গণের একমাত্র প্রজাতি। পূর্ণবয়স্ক হাম্পব্যাক তিমিদের দৈর্ঘ্য ১৪-১৭ মিটার (৪৬-৫৬ ফুট) এবং ওজন ৪০ মেট্রিক টন (৪৪ শর্ট টন) পর্যন্ত হয়ে থাকে।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 
























