আকাশ জাতীয় ডেস্ক:
পাঁচ ভাইয়ের চারজনই থাকতেন পারস্য উপসাগরীয় দেশ ওমানে। এরমধ্যে দেশে ফেরার কথা ছিলো দুই ভাইয়ের। বাড়িতে চলছিল তাদের বিয়ের আয়োজন। স্বজনদের মধ্যে ছিলো উৎসবের আমেজ। কিন্তু এরমধ্যেই চার ভাই মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারান। এমন আকস্মিক ঘটনায় চলছে শোকের মাতম। কেবল স্বজনরা নয়; প্রতিবেশী, গ্রামবাসীরাও এমন দৃশ্যে লুকাতে পারেননি চোখের জল।
এই দৃশ্য রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় লালানগর ইউনিয়নের বন্দর রাজা পাড়ার একটি বাড়ির। মৃত জামাল উদ্দিনের পাঁচ সন্তান। তারা হলেন- রাশেদুল ইসলাম, সাহেদুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম ও শহিদুল ইসলাম ও এনামুল ইসলাম। এদের মধ্যে এনামুল ছাড়া বাকী সবাই থাকতেন ওমানে। এরমধ্যে গত ১৫ মে সিরাজুল ও শহিদুলের দেশে ফেরার কথা ছিলো। কিন্তু তার আগে ১৩ মে চার ভাই একটি গাড়ির ভেতরে বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারান।
গত মঙ্গলবার (১৯ মে) রাতে চার ভাইয়ের কফিনবন্দি লাশ ওমান থেকে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। সেখানে চট্টগ্রাম-৭ আসনের এমপি হুমাম কাদের চৌধুরী লাশগুলো গ্রহণ করেন। পরে দুটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অ্যাম্বুলেন্সে করে চার ভাইয়ের লাশ বুধবার (২০ মে) ভোরে রাঙ্গুনিয়ায় গ্রামের বাড়িতে আনা হয়।
লাশগুলো বাড়িতে আনার খবরে বুধবার ভোর থেকেই তাদের বাড়িতে স্বজন, গ্রামবাসীসহ এলাকায় অনেক মানুষ জড়ো হন। চার ভাইয়ের লাশ দাফনের জন্য আগে থেকেই চারটি কবরও প্রস্তুত করা হয়। পরে লাশগুলো যখন বাড়ি পৌঁছায় তখন সেখানে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে বাড়ির আঙিনা। গ্রামবাসীও এমন মর্মান্তিক দৃশ্যে চোখের পানি ধরে রাখতে পারছিলেন না।
বেলা ১১টার দিকে লালানগর উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত হয় চার ভাইয়ের জানাজা। হাজারো মুসল্লির উপস্থিতিতে সেই জানাজা যেন শোকের সমুদ্রে পরিণত হয়। একমাত্র জীবিত ভাই এনামুল নিজেই ইমামতি করেন। ভাইদের জন্য দোয়া চাইতে গিয়ে তিনি বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন, আর উপস্থিত মানুষের চোখও অশ্রু সজল হয়ে ওঠে। পরে পাশাপাশি চারটি কবরে চিরনিদ্রায় শায়িত হন চার সহোদর।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, যে বাড়িতে বিয়ের আনন্দের প্রস্তুতি চলছিল, সেই বাড়ির আঙিনায় এখন চারটি নতুন কবর। স্বপ্ন, পরিকল্পনা আর আনন্দ সবকিছু একসাথে থেমে গেছে। গ্রামের মানুষ বলছেন, এমন মর্মান্তিক দৃশ্য তারা কখনো দেখেননি। চার ভাইয়ের এই করুণ বিদায় মনে করিয়ে দিচ্ছে- জীবন কতটা অনিশ্চিত। মুহূর্তেই আনন্দের মাঝে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসতে পারে।
মর্মান্তিক এই ঘটনা প্রসঙ্গে স্থানীয় এমপি হুমাম কাদের চৌধুরী বলেন, ‘যে কারো স্বজনের বিয়োগে মানুষ শোকাহত হয়। সবরাই মৃত্যু হবে। কিন্তু একসাথে চার ভাইয়ের চলে যাওয়া এটা গভীর শোকের বিষয়। এলাকার প্রত্যেকটি মানুষ তাদের পরিবারকে সমবেদনা জানিয়েছেন। তাদের লাশের দাফন ও পরিবহণ খরচের জন্য সরকারের তরফ থেকেও কিছু আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে।’
লালানগর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আমির হোসেন সুমন জানান, একসাথে চার ভাইয়ের মৃত্যু পুরো এলাকাকে শোকাহত করেছে। পরিবারের জন্য এই আঘাত আরও গভীর, কারণ তাদের বাবা আগেই মারা গেছেন। বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ভুগছেন মা ফরিদা বেগম। ছেলেদের মৃত্যুসংবাদ শুনে তিনি বারবার অচেতন হয়ে পড়ছেন। চিকিৎসকরা তাকে ঘুমের ওষুধ দিয়ে শান্ত রাখার চেষ্টা করছেন।
জানা গেছে, নিহত চার ভাই জীবিকার তাগিদে দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ওমানে থাকতেন। গত ১৫ মে তাদের মধ্যে দুইজনের বাড়িতে ফেরার কথা ছিলো। ছোট দুই ভাইয়ের বিয়ের আয়োজনও প্রায় চূড়ান্ত ছিলো। সে জন্য তারা বিয়ের জন্য কেনাকাটাও করেছিলেন। কিন্তু ১৩ মে চার ভাই একটি গাড়িতে বিষাক্ত গ্যাসের সংস্পর্শে গিয়ে প্রাণ হারান। ফলে স্বজনদের আনন্দ মুহূর্তেই শোকে রূপ নিয়েছে।
রয়্যাল ওমান পুলিশের বরাতে টাইমস অব ওমানে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, ওমানের দক্ষিণ আল বাতিনা গভর্নরেট পুলিশের নেতৃত্বে আল-মাসনা গভর্নরেট এলাকায় ১৩ মে রাতে একটি গাড়ির ভেতর থেকে ওই চার সহোদরের লাশ উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক তদন্তে, গাড়ি চালু থাকা অবস্থায় শ্বাস গ্রহণের সময় এসির এক্সজস্ট থেকে নির্গত কার্বন-মনোক্সাইড গ্যাস তাদের শ্বাসনালিতে ঢুকে মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ময়নাতদন্ত শেষে মৃত্যুর কারণ আরো স্পষ্ট হবে।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 



















