আকাশ জাতীয় ডেস্ক:
কুমিল্লায় ২০০৭ সালে তিন ব্যবসায়ীর গলা কেটে হত্যা মামলার মূল ঘাতক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নেওয়াজ শরীফ রাসেল ওরফে বাবু ওরফে সবুজকে গ্রেফতার করেছে র্যাাব-১১ সিপিসি ২। রোববার (২৮) আগস্ট রাতে জেলার আলেখারচর এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
গ্রেফতারকৃত নেওয়াজ শরীফ রাসেল (৩৭) জেলার লাকসাম উপজেলার শ্রীয়াং দক্ষিণপাড়া এলাকার সেলিম রেজার ছেলে।
সোমবার (৩০ আগস্ট) বেলা সাড়ে ১১টায় এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব কথা জানান র্যা ব ১১ সিপিসি-২ এর কোম্পানি অধিনায়ক মেজর সাকিব হোসেন।
তিনি বলেন, ২০০৭ সালের ৬ জানুয়ারি কুমিল্লা জেলার লাকসাম উপজেলার শ্রীয়াং বাজারে ১ হাজার ৪০০ টাকা ডাকাতি করার জন্য তিন ব্যবসায়ীকে গলা কেটে হত্যা করা হয়। নির্মম ঘটনাটি র্যা ব-১১ সিপিসি-২ কুমিল্লার নজরে আসে। আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর খুনসহ ডাকাতি মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামিদের গ্রেফতারের লক্ষ্যে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়। গোয়েন্দা সূত্র হতে প্রাপ্ত তথ্য ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় গত ২৮ আগস্ট রাতে র্যা্ব-১১, সিপিসি-২, কুমিল্লা এর একটি আভিযানিক দল কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার আলেখারচর এলাকায় অভিযান চালিয়ে পলাতক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মো. নেওয়াজ শরীফ রাসেল ওরফে সবুজ ওরফে বাবুকে (৩৭) গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়।
২০০৭ সালের ৬ জানুয়ারি শীত ও ঘন কুয়াশার রাতে শরীফ রাসেলসহ আরও কয়েকজন ডাকাতির উদ্দেশ্যে কুমিল্লা জেলার লাকসাম উপজেলার শ্রীয়াং এলাকার বদির পুকুরপাড় সংলগ্ন একটি জঙ্গলে লুকিয়ে ছিল। এ সময় লাকসাম উপজেলার শ্রীয়াং বাজারের দোকান বন্ধ করে কাঁচামাল ব্যবসায়ী মনোহরগঞ্জ উপজেলার প্রতাপপুর গ্রামের মনিন্দ দেবনাথের ছেলে উত্তম দেবনাথ ও পরীক্ষিত দেবনাথ এবং পান ব্যবসায়ী লাকসাম উপজেলার জগৎপুর গ্রামের সামছুল হকের ছেলে বাচ্চু মিয়া বাড়ি ফিরছিলেন। তারা বদির পুকুরপাড় এলাকায় এসে পৌঁছলে জঙ্গল থেকে রাসেল ও তার সহযোগীরা চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে এবং যার যা কিছু আছে সব কিছু দিয়ে দেওয়ার জন্য তাদের হাতে থাকা দেশীয় অস্ত্র দ্বারা ভয়ভীতি প্রদর্শন করে।
ভিকটিমরা তাদের টাকা-পয়সা দিতে অস্বীকৃতি জানালে রাসেলসহ তার সহযোগীরা ভিকটিমদের অনবরত কিল, ঘুসি ও লাথি মারতে থাকে। একপর্যায়ে ভিকটিমরা তাদের সঙ্গে থাকা টাকা-পয়সা বাধ্য হয়ে আসামিদের দিয়ে দেয়। হঠাৎ ভিকটিম উত্তম দেবনাথ আসামি রাসেল ও তার সহযোগীদের চিনতে পেরে এবং পরের দিন স্থানীয় মেম্বার ও চেয়ারম্যানের কাছে তাদের বিরুদ্ধে নালিশ করবে মর্মে চিৎকার করে ওঠে। ভিকটিমরা আসামিদের চিনে ফেলায় রাসেল ও তার সহযোগীরা ভিকটিমদের হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়। পরবর্তীতে আসামিরা ভিকটিমদের পার্শ্ববর্তী একটি মাঠে নিয়ে চাপাতি ও ছোরা দিয়ে গলা কেটে নির্মমভাবে হত্যা করে।
এ ঘটনায় ২০০৭ সালের ৭ জানুয়ারি ভিকটিম বাচ্চু মিয়ার ভাই কবির হোসেন বাদী হয়ে কুমিল্লা জেলার লাকসাম থানায় খুনসহ ডাকাতি মর্মে একটি মামলা দায়ের করেন। সেই মামলায় ২০১৮ সালে কুমিল্লার তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ ৪র্থ, আদালতের বিচারক নুর নাহার বেগম শিউলী অভিযুক্ত ৫ জন আসামির বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেন।
ওই ৫ জনের মধ্যে গ্রেফতার রাসেল অন্যতম। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্যরা হলেন- লাকসাম শ্রীয়াং এলাকার আব্দুল কাদেরের ছেলে আব্দুর রহমান, ইয়াকুব আলীর ছেলে শহীদুল্লাহ, আব্দুল মান্নানের ছেলে ফারুক হোসেন ও মোহাম্মদ উল্লাহর ছেলে স্বপন। দণ্ডপ্রাপ্ত ৫ জন আসামির মধ্যে আব্দুর রহমান, শহীদুল্লাহ, ফারুক হোসেন বর্তমানে কারাগারে রয়েছে। অপর আসামি স্বপন পলাতক রয়েছে।
গ্রেফতারকৃত নেওয়াজ শরীফ রাসেল ওরফে সবুজ ওরফে বাবুকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, হত্যার ঘটনার পর দিন সকালে রাসেল ও তার পরিবার কুমিল্লা জেলা ত্যাগ করে ঢাকা জেলার সাভার থানাধীন ডগরমুরা এলাকায় তার পিতার এক বন্ধুর বাড়িতে আশ্রয় নেয় এবং পরবর্তীতে সপরিবারে সেখানে ভাড়াবাসায় বসবাস শুরু করে। নিজের আসল পরিচয় গোপন রাখার জন্য আসামি রাসেল ডগরমুরা এলাকায় পরিচিতি লাভ করে সবুজ নামে। এই এলাকায় তিন থেকে চার বছর অর্থাৎ ২০০৭ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত হকার ব্যবসা করে নিরাপত্তার সঙ্গে বসবাস করে আসছিল।
২০১০ সালের শেষের দিকে তাদের পার্শ্ববর্তী গ্রামের একটি পরিবারের ডগরমুরা এলাকায় যাতায়াত পরিলক্ষিত হলে তারা সাভার নবীনগর থানাধীন নিরিবিলি এলাকায় নতুন বাসা ভাড়া নেয়। এই এলাকায় এসে আসামি রাসেল পরিচিতি লাভ করে বাবু নামে। নিরিবিলি এলাকায় ২-৩ বছর ভ্যানগাড়িতে করে হকারি ব্যবসা করার পরে ২০১৩ সালে নীলফামারী জেলার একটি মেয়ের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়। পরবর্তীতে অধিক অর্থ উপার্জনের জন্য হকারি ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে সড়কে পলাশ ও নিরাপদ পরিবহণে হেলপারের কাজ করা শুরু করে।
২০১৬ সালে তার স্ত্রী তার আসল পরিচয় ও মামলার বিষয়টি জানতে পেরে তার সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ করে। তাই ভয়ে আসামি রাসেল সাভার এলাকা ত্যাগ করে ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশন এলাকায় বসবাস শুরু করে। পরবর্তীতে ২০২০ সালে তার পিতার মৃত্যুর পর তার পরিবার সাভার এলাকা ত্যাগ করে কুমিল্লা জেলার বরুড়া এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস শুরু করে। বরুড়া এলাকায় বসবাসকালীন তার মা গোপনে লাকসাম এলাকায় বিভিন্ন সময়ে যাতায়াত করে এবং বুঝতে পারে ২০০৭ সালের হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি এলাকায় তেমন কোনো আলোচনা নেই; তাই রাসেল ২০২০ সাল থেকে বরুড়ায় তার মায়ের সঙ্গে ভাড়া বাসায় বসবাস শুরু করে। বরুড়ায় তার বাড়ির আশেপাশে সে রাজমিস্ত্রির সহযোগী হিসাবে কাজ শুরু করে। ১ বছর অতিক্রম হয়ে গেলে পদ্মা পরিবহণ নামের বাসে হেলপারের কাজ শুরু করে। ২০২২ সালে বোগদাদ পরিবহণে হেলপারের কাজ শুরু করে।
কোম্পানি অধিনায়ক মেজর সাকিব হোসেন আরও বলেন, গ্রেফতারকৃত রাসেলকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 



















