ঢাকা ০৯:১৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২৬, ১০ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
‘একটি স্বার্থান্বেষী দল ইসলামী আন্দোলনকে ধোঁকা দিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে’:রেজাউল করিম ছেলে এনসিপির প্রার্থী, বাবা ভোট চাইলেন ধানের শীষে পর্যাপ্ত খেলার মাঠের অভাবে তরুণ সমাজ বিপদগামী হচ্ছে : মির্জা আব্বাস বাংলাদেশি সন্দেহে ভারতে যুবককে পিটিয়ে হত্যা নতুন বিশ্ব ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হয়ে উঠছে তুরস্ক: এরদোগান জনগণ জেনে গেছে ‘হ্যা’ ভোট দেওয়া হলে দেশে স্বৈরাচার আর ফিরে আসবে না: প্রেস সচিব উন্নয়ন, অগ্রগতি ও গণতন্ত্রের বিকল্প নাম বিএনপি: সালাহউদ্দিন আহমদ ধর্মকে পুঁজি করে চালানো অপচেষ্টা ও ষড়যন্ত্রের বিষয়ে সতর্ক থাকুন: আমিনুল হক কেউ কেউ বসন্তকালে আইসা কুহু কুহু ডাক শুরু করে: জামায়াতের আমির ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পর এই নির্বাচন ইনসাফ প্রতিষ্ঠার নির্বাচন: নাহিদ ইসলাম

রোহিঙ্গাদের সঙ্গে প্রহসন

অাকাশ নিউজ ডেস্ক:

মিয়ানমারের রাখাইনে অবিলম্বে জাতিগত নিধন বন্ধ, বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা মুসলিমদের ফিরিয়ে নেওয়া ও সুরক্ষা প্রদান, গণহত্যা, ধর্ষণসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষী জেনারেল ও তাঁদের সহযোগীদের বিচারের আওতায় আনার বিষয়ে উচ্চকণ্ঠে আওয়াজ তুলেছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রায় সব সদস্য রাষ্ট্র। গত বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের এক উন্মুক্ত বৈঠকে তারা এ আওয়াজ তোলে।

তবে এই বৈঠকের দিকে নির্যাতিত রোহিঙ্গাসহ সারা বিশ্বের মানুষ তাকিয়ে থাকলেও কোনো ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হয়েছে নিরাপত্তা পরিষদ। এর মধ্য দিয়ে প্রহসনে পরিণত হলো এই বৈঠক আহ্বান। বৈঠকে দুই স্থায়ী সদস্য চীন ও রাশিয়া মিয়ানমারের গৃহীত পদক্ষেপকে সমর্থন জানিয়েছে। তবে তারাও নিরপরাধ মানুষের ক্ষতি হয় এমন পদক্ষেপ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে।

সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সরব ছিল যুক্তরাষ্ট্র। বৈঠকে মার্কিন প্রতিনিধি বলেন, ‘ভালো কথার দিন শেষ হয়ে গেছে’ এবং কোনো ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানাতে যুক্তরাষ্ট্র ভীত হবে না। যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের কাছে অস্ত্র বিক্রি বন্ধ রাখার আহ্বানের পাশাপাশি অভিযুক্ত সেনা কর্মকর্তাদের বিচারের দাবি জানায়।

গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১টায় শুরু হয় নিরাপত্তা পরিষদের এক উন্মুক্ত বৈঠক। বৈঠকে সদস্য রাষ্ট্রগুলো কফি আনান কমিশনের সুপারিশ পূর্ণ বাস্তবায়নের ওপর জোর দেয়।

এটি ছিল গত আট বছরে নিরাপত্তা পরিষদের প্রথম উন্মুক্ত বৈঠক, যা রোহিঙ্গা সংকট ইস্যুতে স্থায়ী ছয়টি সদস্য দেশের মধ্যে বিভাজনও স্পষ্ট করল। এর আগে রাখাইনে সাম্প্রতি সেনা অভিযানের প্রেক্ষাপটে দুটি রুদ্ধদ্বার বৈঠক করে নিরাপত্তা পরিষদ। গত বৃহস্পতিবার রাতে অনুষ্ঠিত উন্মুক্ত বৈঠকে নিরাপত্তা পরিষদের ১৫টি সদস্য রাষ্ট্রের বাইরে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকেও বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট, এ বিষয়ে জাতিসংঘের অবস্থান তুলে ধরে ব্রিফ করেন জাতিসংঘের মহাসচিব।

বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জোরালো ভাষায় বক্তব্য দেওয়া হয়। বাংলাদেশ মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ধর্ষণকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ এনে বিনা শর্তে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়া ও সুরক্ষা প্রদান এবং জাতিসংঘের মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্তের দাবি জানানো হয়। সীমান্তে মিয়ানমারের সেনা মোতায়েন, বারবার আকাশসীমা লঙ্ঘনের কথা তুলে ধরে বাংলাদেশ বলেছে, ‘মুসলমানরা মুসলমানকে হত্যা করছে’, ‘মুসলমানরা অন্যদের হত্যা করছে’—দেশটির এই নতুন দাবি মূলত তাদের রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতাকেই তুলে ধরছে। তবে মিয়ানমার প্রতিনিধি বলেছেন, তাঁর দেশ গণহত্যা ও জাতিগত নিধনের মতো বিষয়কে কখনোই প্রশ্রয় দেয় না।

রাজনৈতিক সমাধান চান জাতিসংঘের মহাসচিব : বৈঠকের শুরুতে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে ব্রিফ করেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। তিনি বলেন, এ সংকটের মূলে রয়েছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নাগরিকত্ব না থাকা। তিনি মনে করেন রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের পূর্বশর্ত হলো নাগরিকত্ব এবং তাদের সে নাগরিকত্ব দেওয়ার দাবি জানান। তিনি রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভিযান বন্ধ এবং সেখানে মানবাধিকারকর্মীদের প্রবেশের আহ্বান জানান। মহাসচিব কফি আনান কমিশনের পূর্ণ বাস্তবায়ন চান। তিনি সংকট সমাধানে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে অব্যাহত সংলাপের ওপর গুরুত্ব দেন।

ভীত হবে না যুক্তরাষ্ট্র : বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত নিকি হ্যালি বলেন, এখনো মিয়ানমার থেকে মানুষ পালাচ্ছে। মিয়ানমার সরকার পরিস্থিতির গভীরতা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি বলেন, তাঁর দেশ মিয়ানমার কর্তৃপক্ষে বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আহ্বান জানাতে ভীত হবে না। সেনাবাহিনীকে অবশ্যই মানবাধিকারের প্রতি সম্মান জানানো এবং তাদের অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের চাকরিচ্যুতি ও দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়া ও তাদের সুরক্ষা দিতে হবে। তিনি মিয়ানমারে অস্ত্র বিক্রি স্থগিত রাখার জন্য বিশ্বের সব দেশের প্রতি আহ্বান জানান। নিকি হ্যালি রাখাইন রাজ্যে চলা সহিংসতা এবং গত ২৫ আগস্ট রাখাইনে পুলিশের তল্লাশি চৌকিতে রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) হামলার নিন্দা জানান। একই সঙ্গে তিনি বলেন, মিয়ানমার সেনাবাহিনী যে পাল্টা ব্যবস্থা নিচ্ছে তা গ্রহণযোগ্য নয়।

জাতিগত নিধন এখনো চলছে—ফ্রান্স : রাখাইনে জাতিগত নিধন এখনো চলছে উল্লেখ করে বৈঠকে ফ্রান্সের প্রতিনিধি বলেন, বক্তৃতা-বিবৃতি কেবল নৃশংসতার আরো অবনতি ঘটাতে পারে। তিনি নাগরিকত্ব অস্বীকার করা রোহিঙ্গাদের প্রতি সহিংসতা ও বৈষম্যের মূল কারণের অবসান ঘটানোর ওপর জোর দেন। ফ্রান্সের প্রতিনিধি বলেন, নিরাপত্তা পরিষদের একতাবদ্ধ থাকা এবং নেতিবাচকতার বিস্তার আটকাতে দায়িত্ব নেওয়ার দরকার ছিল। এখন সহিংসতা বন্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে মনোযোগ দিতে হবে। ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত বলেন, কোনো ধরনের বৈষম্য ছাড়াই মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনীকে সবার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। প্রথম অগ্রাধিকার হলো সহিংসতা বন্ধ করা এবং মানবিক সহায়তা দেওয়া। তিনি বলেন, ফ্রান্স মনে করে, এ বিষয়ে দ্বিতীয় অগ্রাধিকার হলো সেখানে সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে বৈষম্যের অবসান ও কফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করা। একই সঙ্গে তিনি মিয়ানমারে বেসামরিক সরকার ও গণতন্ত্রের রূপান্তরে সমর্থন জানিয়ে বলেন, ‘তবে মানবাধিকার লঙ্ঘনে নীরব থাকা সম্ভব নয়। ’ ফ্রান্স জাতিগত নিধন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনকে অবাধে কাজ করার সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।

ব্রিটেন বলল, সেনাবাহিনীর দায়ই মুক্তির পথ : বৈঠকে যুক্তরাজ্যের প্রতিনিধি জোনাথন গাই অ্যালেন বলেন, এক মাস আগে যে সহিংসতা শুরু হয়েছে, তাতে বিশ্ব এক বিভীষিকাই প্রত্যক্ষ করছে। এখনো রাখাইনে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গ্রামগুলো জ্বালিয়ে দেওয়া ও স্থলমাইন স্থাপন করা হচ্ছে। এর বেশির ভাগ ক্ষতিগ্রস্ত মানুষই হচ্ছে রোহিঙ্গা মুসলিম। এই পরিস্থিতি হচ্ছে একটি মানবিক ট্র্যাজেডি ও তীব্র মানবিক সংকট, যা নজিরবিহীন দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়েছে। এটা ক্রমাগতভাবেই পরিষ্কার হচ্ছে যে এই ইস্যুতে বিশ্ব এক কাতারে রয়েছে এবং মিয়ানমারকে তা অনুধাবন করতে ও সামরিক বাহিনীকে সেভাবেই সাড়া দিতে হবে। সংকট সমাধানে সেনাবাহিনীকেই প্রাথমিক দায় নিতে হবে। এটাই মুক্তির উপায়। তাদের সহিংসতা বন্ধ করে সবার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। ব্রিটিশ প্রতিনিধি আরো বলেন, রাখাইনে দ্রুত মানবিক সহায়তা পৌঁছে দিতে হবে। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষকে ঘটনা তদন্তে জাতিসংঘ ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিশনকে সহযোগিতা করতে হবে। ব্রিটেনের পক্ষ থেকে সংকট সমাধানে একটি নিরাপদ ও স্থায়ী পথ খুঁজে বের করতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়।

নমনীয় রাশিয়া : বৈঠকে রাশিয়ার প্রতিনিধি ভ্যাসিলি এ নিভেনজিয়া সতর্ক করে দিয়ে বলেন, রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা বিষয়ে মিয়ানমার সরকারের ওপর ‘অতিরিক্ত চাপ’ প্রয়োগ পরিস্থিতির কেবল অবনতিই ঘটাতে পারে। রাশিয়া মনে করে, রাজনৈতিক উদ্যোগ এবং সংশ্লিষ্ট সব নাগরিক ও বিশ্বাসের লোকদের মধ্যে সংলাপ ছাড়া সমস্যার সমাধানের আর কোনো উপায় নেই। ভ্যাসিলি এ নিভেনজিয়া সব পক্ষ থেকেই সহিংসতা বন্ধ রাখার আহ্বান জানান। তিনিও মিয়ানমারের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে বলেন, রাশিয়ার কাছে এ তথ্য আছে যে রোহিঙ্গা মুসলিম বিদ্রোহীরা সীমান্তে থাকা হিন্দুদেরও তাদের সঙ্গে বাংলাদেশে যেতে বাধ্য করেছে। তিনি বলেন, রাশিয়া মনে করে, মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যা ও জাতিগত তকমা দেওয়ার আগে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সতর্ক থাকতে হবে।

দ্রুত সিদ্ধান্ত নয়—চীন : বৈঠকে চীনের প্রতিনিধি জাতিসংঘে দেশটির উপরাষ্ট্র দূত ওউ হেইতাও সাম্প্রতিক সহিংস হামলার নিন্দা জানান। তবে সমাধানের ব্যাপারে ‘দ্রুত সিদ্ধান্ত’ নয় বলেও মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, রাখাইনে দীর্ঘদিন ধরেই পার্থক্য ও বিরোধ চলে আসছে। চীন সেখানে অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে মিয়ানমারের সব প্রচেষ্টা সমর্থন করে। তিনি সব পক্ষকে গঠনমূলক উপায়ে পরস্পরকে সহযোগিতার আহ্বান জানান।

চাপ অব্যাহত রাখতে হবে—বাংলাদেশ : নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে সোচ্চার ছিল বাংলাদেশ। জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি মাসুদ বিন মোমেন বৈঠকে বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত রাখতে হবে। গত তিন দশকের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, আন্তর্জাতিক চাপ সরে গেলে মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা গতি হারিয়ে ফেলে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও নিরাপত্তা পরিষদকে আহ্বান জানাই, তারা যেন চাপ অব্যাহত রাখে। ’

মাসুদ বিন মোমেন নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ ও মিয়ানমার সফরের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘রাখাইনে সাম্প্রতিক ঘটনাবলি একটি বড় ধরনের নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি করেছে এবং মিয়ানমারের নাগরিকদের নিরাপত্তা না দিতে পারাটা রাষ্ট্রের ব্যর্থতা। ’ তিনি নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, রাখাইনে মানবতাবিরোধী অপরাধ তদন্ত করতে হবে।

মোমেন অভিযোগ করে বলেন, ‘আগস্টের শুরু থেকে দুই ডিভিশন মিয়ানমার সৈন্য বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে অবস্থান করছে। অন্তত ১৯ বার মিয়ানমার হেলিকপ্টার ও ড্রোন বাংলাদেশ আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছে, সীমান্তে ল্যান্ডমাইন পুঁতে রাখছে, এমনকি বাংলাদেশের একজন জেলেকে তারা হত্যা করেছে। ’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ একটি ভালো প্রতিবেশী হিসেবে সংযমের পরিচয় দিচ্ছে। ’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পাঁচ দফা প্রস্তাব উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘অবিলম্বে সহিংতা থামাতে হবে এবং মানবিক সহায়তা কার্যক্রম শুরু করতে হবে। ’ এ ছাড়া রোহিঙ্গাদের নিরাপদে ফেরত পাঠানো ও আনান কমিশনের রিপোর্টও বাস্তবায়নের ওপর জোর দেন স্থায়ী প্রতিনিধি।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

শ্রীলংকায় শুটিং ফেলে কক্সবাজারে শাকিব খান

রোহিঙ্গাদের সঙ্গে প্রহসন

আপডেট সময় ১২:৫৮:৫৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১ অক্টোবর ২০১৭

অাকাশ নিউজ ডেস্ক:

মিয়ানমারের রাখাইনে অবিলম্বে জাতিগত নিধন বন্ধ, বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা মুসলিমদের ফিরিয়ে নেওয়া ও সুরক্ষা প্রদান, গণহত্যা, ধর্ষণসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষী জেনারেল ও তাঁদের সহযোগীদের বিচারের আওতায় আনার বিষয়ে উচ্চকণ্ঠে আওয়াজ তুলেছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রায় সব সদস্য রাষ্ট্র। গত বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের এক উন্মুক্ত বৈঠকে তারা এ আওয়াজ তোলে।

তবে এই বৈঠকের দিকে নির্যাতিত রোহিঙ্গাসহ সারা বিশ্বের মানুষ তাকিয়ে থাকলেও কোনো ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হয়েছে নিরাপত্তা পরিষদ। এর মধ্য দিয়ে প্রহসনে পরিণত হলো এই বৈঠক আহ্বান। বৈঠকে দুই স্থায়ী সদস্য চীন ও রাশিয়া মিয়ানমারের গৃহীত পদক্ষেপকে সমর্থন জানিয়েছে। তবে তারাও নিরপরাধ মানুষের ক্ষতি হয় এমন পদক্ষেপ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে।

সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সরব ছিল যুক্তরাষ্ট্র। বৈঠকে মার্কিন প্রতিনিধি বলেন, ‘ভালো কথার দিন শেষ হয়ে গেছে’ এবং কোনো ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানাতে যুক্তরাষ্ট্র ভীত হবে না। যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের কাছে অস্ত্র বিক্রি বন্ধ রাখার আহ্বানের পাশাপাশি অভিযুক্ত সেনা কর্মকর্তাদের বিচারের দাবি জানায়।

গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১টায় শুরু হয় নিরাপত্তা পরিষদের এক উন্মুক্ত বৈঠক। বৈঠকে সদস্য রাষ্ট্রগুলো কফি আনান কমিশনের সুপারিশ পূর্ণ বাস্তবায়নের ওপর জোর দেয়।

এটি ছিল গত আট বছরে নিরাপত্তা পরিষদের প্রথম উন্মুক্ত বৈঠক, যা রোহিঙ্গা সংকট ইস্যুতে স্থায়ী ছয়টি সদস্য দেশের মধ্যে বিভাজনও স্পষ্ট করল। এর আগে রাখাইনে সাম্প্রতি সেনা অভিযানের প্রেক্ষাপটে দুটি রুদ্ধদ্বার বৈঠক করে নিরাপত্তা পরিষদ। গত বৃহস্পতিবার রাতে অনুষ্ঠিত উন্মুক্ত বৈঠকে নিরাপত্তা পরিষদের ১৫টি সদস্য রাষ্ট্রের বাইরে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকেও বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট, এ বিষয়ে জাতিসংঘের অবস্থান তুলে ধরে ব্রিফ করেন জাতিসংঘের মহাসচিব।

বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জোরালো ভাষায় বক্তব্য দেওয়া হয়। বাংলাদেশ মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ধর্ষণকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ এনে বিনা শর্তে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়া ও সুরক্ষা প্রদান এবং জাতিসংঘের মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্তের দাবি জানানো হয়। সীমান্তে মিয়ানমারের সেনা মোতায়েন, বারবার আকাশসীমা লঙ্ঘনের কথা তুলে ধরে বাংলাদেশ বলেছে, ‘মুসলমানরা মুসলমানকে হত্যা করছে’, ‘মুসলমানরা অন্যদের হত্যা করছে’—দেশটির এই নতুন দাবি মূলত তাদের রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতাকেই তুলে ধরছে। তবে মিয়ানমার প্রতিনিধি বলেছেন, তাঁর দেশ গণহত্যা ও জাতিগত নিধনের মতো বিষয়কে কখনোই প্রশ্রয় দেয় না।

রাজনৈতিক সমাধান চান জাতিসংঘের মহাসচিব : বৈঠকের শুরুতে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে ব্রিফ করেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। তিনি বলেন, এ সংকটের মূলে রয়েছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নাগরিকত্ব না থাকা। তিনি মনে করেন রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের পূর্বশর্ত হলো নাগরিকত্ব এবং তাদের সে নাগরিকত্ব দেওয়ার দাবি জানান। তিনি রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভিযান বন্ধ এবং সেখানে মানবাধিকারকর্মীদের প্রবেশের আহ্বান জানান। মহাসচিব কফি আনান কমিশনের পূর্ণ বাস্তবায়ন চান। তিনি সংকট সমাধানে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে অব্যাহত সংলাপের ওপর গুরুত্ব দেন।

ভীত হবে না যুক্তরাষ্ট্র : বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত নিকি হ্যালি বলেন, এখনো মিয়ানমার থেকে মানুষ পালাচ্ছে। মিয়ানমার সরকার পরিস্থিতির গভীরতা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি বলেন, তাঁর দেশ মিয়ানমার কর্তৃপক্ষে বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আহ্বান জানাতে ভীত হবে না। সেনাবাহিনীকে অবশ্যই মানবাধিকারের প্রতি সম্মান জানানো এবং তাদের অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের চাকরিচ্যুতি ও দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়া ও তাদের সুরক্ষা দিতে হবে। তিনি মিয়ানমারে অস্ত্র বিক্রি স্থগিত রাখার জন্য বিশ্বের সব দেশের প্রতি আহ্বান জানান। নিকি হ্যালি রাখাইন রাজ্যে চলা সহিংসতা এবং গত ২৫ আগস্ট রাখাইনে পুলিশের তল্লাশি চৌকিতে রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) হামলার নিন্দা জানান। একই সঙ্গে তিনি বলেন, মিয়ানমার সেনাবাহিনী যে পাল্টা ব্যবস্থা নিচ্ছে তা গ্রহণযোগ্য নয়।

জাতিগত নিধন এখনো চলছে—ফ্রান্স : রাখাইনে জাতিগত নিধন এখনো চলছে উল্লেখ করে বৈঠকে ফ্রান্সের প্রতিনিধি বলেন, বক্তৃতা-বিবৃতি কেবল নৃশংসতার আরো অবনতি ঘটাতে পারে। তিনি নাগরিকত্ব অস্বীকার করা রোহিঙ্গাদের প্রতি সহিংসতা ও বৈষম্যের মূল কারণের অবসান ঘটানোর ওপর জোর দেন। ফ্রান্সের প্রতিনিধি বলেন, নিরাপত্তা পরিষদের একতাবদ্ধ থাকা এবং নেতিবাচকতার বিস্তার আটকাতে দায়িত্ব নেওয়ার দরকার ছিল। এখন সহিংসতা বন্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে মনোযোগ দিতে হবে। ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত বলেন, কোনো ধরনের বৈষম্য ছাড়াই মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনীকে সবার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। প্রথম অগ্রাধিকার হলো সহিংসতা বন্ধ করা এবং মানবিক সহায়তা দেওয়া। তিনি বলেন, ফ্রান্স মনে করে, এ বিষয়ে দ্বিতীয় অগ্রাধিকার হলো সেখানে সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে বৈষম্যের অবসান ও কফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করা। একই সঙ্গে তিনি মিয়ানমারে বেসামরিক সরকার ও গণতন্ত্রের রূপান্তরে সমর্থন জানিয়ে বলেন, ‘তবে মানবাধিকার লঙ্ঘনে নীরব থাকা সম্ভব নয়। ’ ফ্রান্স জাতিগত নিধন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনকে অবাধে কাজ করার সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।

ব্রিটেন বলল, সেনাবাহিনীর দায়ই মুক্তির পথ : বৈঠকে যুক্তরাজ্যের প্রতিনিধি জোনাথন গাই অ্যালেন বলেন, এক মাস আগে যে সহিংসতা শুরু হয়েছে, তাতে বিশ্ব এক বিভীষিকাই প্রত্যক্ষ করছে। এখনো রাখাইনে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গ্রামগুলো জ্বালিয়ে দেওয়া ও স্থলমাইন স্থাপন করা হচ্ছে। এর বেশির ভাগ ক্ষতিগ্রস্ত মানুষই হচ্ছে রোহিঙ্গা মুসলিম। এই পরিস্থিতি হচ্ছে একটি মানবিক ট্র্যাজেডি ও তীব্র মানবিক সংকট, যা নজিরবিহীন দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়েছে। এটা ক্রমাগতভাবেই পরিষ্কার হচ্ছে যে এই ইস্যুতে বিশ্ব এক কাতারে রয়েছে এবং মিয়ানমারকে তা অনুধাবন করতে ও সামরিক বাহিনীকে সেভাবেই সাড়া দিতে হবে। সংকট সমাধানে সেনাবাহিনীকেই প্রাথমিক দায় নিতে হবে। এটাই মুক্তির উপায়। তাদের সহিংসতা বন্ধ করে সবার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। ব্রিটিশ প্রতিনিধি আরো বলেন, রাখাইনে দ্রুত মানবিক সহায়তা পৌঁছে দিতে হবে। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষকে ঘটনা তদন্তে জাতিসংঘ ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিশনকে সহযোগিতা করতে হবে। ব্রিটেনের পক্ষ থেকে সংকট সমাধানে একটি নিরাপদ ও স্থায়ী পথ খুঁজে বের করতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়।

নমনীয় রাশিয়া : বৈঠকে রাশিয়ার প্রতিনিধি ভ্যাসিলি এ নিভেনজিয়া সতর্ক করে দিয়ে বলেন, রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা বিষয়ে মিয়ানমার সরকারের ওপর ‘অতিরিক্ত চাপ’ প্রয়োগ পরিস্থিতির কেবল অবনতিই ঘটাতে পারে। রাশিয়া মনে করে, রাজনৈতিক উদ্যোগ এবং সংশ্লিষ্ট সব নাগরিক ও বিশ্বাসের লোকদের মধ্যে সংলাপ ছাড়া সমস্যার সমাধানের আর কোনো উপায় নেই। ভ্যাসিলি এ নিভেনজিয়া সব পক্ষ থেকেই সহিংসতা বন্ধ রাখার আহ্বান জানান। তিনিও মিয়ানমারের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে বলেন, রাশিয়ার কাছে এ তথ্য আছে যে রোহিঙ্গা মুসলিম বিদ্রোহীরা সীমান্তে থাকা হিন্দুদেরও তাদের সঙ্গে বাংলাদেশে যেতে বাধ্য করেছে। তিনি বলেন, রাশিয়া মনে করে, মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যা ও জাতিগত তকমা দেওয়ার আগে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সতর্ক থাকতে হবে।

দ্রুত সিদ্ধান্ত নয়—চীন : বৈঠকে চীনের প্রতিনিধি জাতিসংঘে দেশটির উপরাষ্ট্র দূত ওউ হেইতাও সাম্প্রতিক সহিংস হামলার নিন্দা জানান। তবে সমাধানের ব্যাপারে ‘দ্রুত সিদ্ধান্ত’ নয় বলেও মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, রাখাইনে দীর্ঘদিন ধরেই পার্থক্য ও বিরোধ চলে আসছে। চীন সেখানে অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে মিয়ানমারের সব প্রচেষ্টা সমর্থন করে। তিনি সব পক্ষকে গঠনমূলক উপায়ে পরস্পরকে সহযোগিতার আহ্বান জানান।

চাপ অব্যাহত রাখতে হবে—বাংলাদেশ : নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে সোচ্চার ছিল বাংলাদেশ। জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি মাসুদ বিন মোমেন বৈঠকে বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত রাখতে হবে। গত তিন দশকের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, আন্তর্জাতিক চাপ সরে গেলে মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা গতি হারিয়ে ফেলে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও নিরাপত্তা পরিষদকে আহ্বান জানাই, তারা যেন চাপ অব্যাহত রাখে। ’

মাসুদ বিন মোমেন নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ ও মিয়ানমার সফরের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘রাখাইনে সাম্প্রতিক ঘটনাবলি একটি বড় ধরনের নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি করেছে এবং মিয়ানমারের নাগরিকদের নিরাপত্তা না দিতে পারাটা রাষ্ট্রের ব্যর্থতা। ’ তিনি নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, রাখাইনে মানবতাবিরোধী অপরাধ তদন্ত করতে হবে।

মোমেন অভিযোগ করে বলেন, ‘আগস্টের শুরু থেকে দুই ডিভিশন মিয়ানমার সৈন্য বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে অবস্থান করছে। অন্তত ১৯ বার মিয়ানমার হেলিকপ্টার ও ড্রোন বাংলাদেশ আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছে, সীমান্তে ল্যান্ডমাইন পুঁতে রাখছে, এমনকি বাংলাদেশের একজন জেলেকে তারা হত্যা করেছে। ’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ একটি ভালো প্রতিবেশী হিসেবে সংযমের পরিচয় দিচ্ছে। ’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পাঁচ দফা প্রস্তাব উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘অবিলম্বে সহিংতা থামাতে হবে এবং মানবিক সহায়তা কার্যক্রম শুরু করতে হবে। ’ এ ছাড়া রোহিঙ্গাদের নিরাপদে ফেরত পাঠানো ও আনান কমিশনের রিপোর্টও বাস্তবায়নের ওপর জোর দেন স্থায়ী প্রতিনিধি।