অাকাশ নিউজ ডেস্ক:
ব্যবস্থাপত্র নির্দেশিত ওষুধ কিনতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে আমেরিকাবাসীকে। এ নিয়ে উদ্বেগ এখন ক্ষোভে রূপান্তরিত হচ্ছে। কিন্তু ওষুধের দাম বাড়ছেই। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, ওষুধের উচ্চমূল্য এখন সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় উৎকণ্ঠার একটি। বিষয়টি নিয়ে দুই দলের রাজনীতিকেরাও চিন্তিত। এমনকি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এ বিষয়ে কিছু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এসবই সুস্পষ্ট। কিন্তু যা বোঝা যাচ্ছে না তা হলো, ওষুধের দাম কেন বাড়ছে? আর এর জন্য দায়ীই-বা কারা?
চার মাস ধরে এ প্রশ্নের পেছনেই ছুটেছে নিউইয়র্ক টাইমস ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাবিষয়ক সংগঠন প্রোপাবলিকার একটি দল। ওষুধের উচ্চমূল্যের জন্য পর্দার পেছনে কী
ঘটছে, তা খুঁজে বের করাই এই দলের মূল লক্ষ্য। এ দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন নিউইয়র্ক টাইমস-এর স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত প্রতিবেদক কেটি থমাস ও প্রোপাবলিকার এ-সম্পর্কিত জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক চার্লস অর্নস্টেন। আর অনুসন্ধানী এ কার্যক্রমে উঠে এসেছে চমকপ্রদ কিছু তথ্য। এতে প্রায় ১ হাজার ব্যক্তির কাছ থেকে সংগৃহীত অভিজ্ঞতা ও তথ্য সন্নিবেশিত হয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, কিছু বিমা কোম্পানি রোগীদের ব্যবস্থাপত্রে ওষুধের জেনেরিক নাম উল্লেখের বদলে নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের নাম উল্লেখ করে। আর চিকিৎসা ব্যয়ের বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে এসব বিমা কোম্পানির ওপর নির্ভর করায় বেশি দামের ওষুধ কিনতে হলেও রোগীরা একরকম বাধ্য হয়েই এতে সম্মতি জানান।
প্রতিবেদকেরা জানান, সম্প্রতি তাঁদের হাতে কিছু তথ্য এসেছে। উদাহরণস্বরূপ টেক্সাসের এক নারী জানিয়েছেন, অপটামআরএক্স নামের একটি কোম্পানি থেকে তিনি ওষুধসেবা নেন। সম্প্রতি বুপ্রেনোরফিন জেনেরিক নামের একটি ব্যথানাশকের জন্য তারা তাঁর কাছ থেকে বেশি অর্থ দাবি করে। ইউনাইটেড হেলথ গ্রুপের মালিকানাধীন অপটামআরএক্স এ জন্য অক্সিকোনটিন ওষুধটি গ্রহণের পরামর্শ দেয়। যদিও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি থাকা উচ্চমূল্যের ওষুধটি ছাড়া অন্য বিকল্পও ছিল বাজারে।
ওই নারী বলেন, ‘আমি নিজে একজন ফার্মাসিস্ট। আমি একটি ছোট ওষুধের দোকান চালাই, যেখানে আমি নিজে অনেককে ওষুধ নির্বাচনে সহায়তা করি। ব্যথানাশক গ্রহণের সময় খুব সতর্ক থাকতে হয়। যত কম ওষুধ নিয়ে ব্যথা মোকাবিলা করা যায়, ততই ভালো। কিন্তু আমার সঙ্গে এমনটা ঘটেনি, যা ভীষণ আশঙ্কার বিষয়।’ ওষুধ সংকটের পেছনে তাঁর ফার্মেসি সেবা ব্যবস্থাপক প্রতিষ্ঠানের যথেষ্ট দায় রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
এ বিষয়ে ইউনাইটেড হেলথের মুখপাত্র ম্যাথিউ এন উইগিন বলেন, ‘আমরা সংকটটিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি। তবে একই সঙ্গে এ-ও বলতে চাই, দীর্ঘমেয়াদি ব্যথার নিরাময়ে উপযুক্ত ওষুধ নির্বাচন খুবই জরুরি।’
পুরো অনুসন্ধানে ওষুধ উৎপাদন, সরবরাহ, খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র, চিকিৎসকসহ প্রতিটি সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্র ও ব্যক্তিদের সঙ্গে প্রতিবেদকেরা যোগাযোগ করেন। কিন্তু রোগীদের কাছ থেকে পাওয়া এমন অভিজ্ঞতার গল্প তাঁদের কাছে একেবারে নতুন ছিল। ১৮ সেপ্টেম্বর ওষুধের মূল্য নিয়ে নিউইয়র্ক টাইমস-এ একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। পরে এ বিষয়ে পাঠক প্রতিক্রিয়া দেখতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নজর রাখা হয়। এতে আরও কিছু ভুক্তভোগীর অভিজ্ঞতা সামনে আসে। পরে দুই প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে তাঁদের অভিযোগের সপক্ষে প্রমাণ-সংবলিত নথিপত্র চাওয়া হয়। মূলত বিমা কোম্পানির বিভিন্ন বিল, তাদের সঙ্গে হওয়া কথোপকথন কিংবা চিঠি ও ই-মেইলের নথি চাওয়া হয়। অনেকেই এতে সাড়া দেন। এর মধ্যে একজন হলেন অ্যালিসা আরকেস। তিনি তাঁর অভিজ্ঞতা সবিস্তারে তুলে ধরেন। তিনিও ছিলেন ইউনাইটেড হেলথের একজন গ্রাহক।
পরে বিভিন্ন জনের কাছ থেকে সংগৃহীত ব্যবস্থাপত্র ও অন্যান্য নথি দেওয়া হয় প্রোপাবলিকার উপতথ্য সম্পাদক রায়ান গ্রোচোস্কি জোনসকে। তিনি এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে জানান, বিমা কোম্পানিগুলো ব্যবস্থাপত্রে জেনেরিক নামের বদলে ব্র্যান্ড নাম লিখতে বাধ্য করছে। আর এতে কম মূল্যের ওষুধের বদলে উচ্চমূল্যের ওষুধই লিপিবদ্ধ হচ্ছে বেশি।
এ বিষয়ে বিমা কোম্পানিগুলো বলছে, তারা তাদের কাজটিই করছে। কোনো ব্যথানাশকের কারণে যেন আসক্তির ঘটনা না ঘটে, সে বিষয়ে তারা নজর রাখছে। একই সঙ্গে চিকিৎসকদের ব্যবস্থাপত্র দেওয়ার বিষয়টিও তারা তদারকি করছে। এরই মধ্যে অনেকটা অগ্রগতি হয়েছে বলেও তারা মনে করে। কারণ, সম্প্রতি ব্যবস্থাপত্রে নির্দেশিত ওষুধ থেকে, বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আসক্তির যে ঘটনা ব্যাপক মাত্রায় ঘটছিল, তার হার কমে এসেছে।
কিন্তু তাদের আচরণ অনেক রোগীকেই শঙ্কাগ্রস্ত করছে, বিশেষ করে যাঁরা ব্যথানাশক গ্রহণে ইচ্ছুক নন, তাঁদের মধ্যে বিমা কোম্পানিগুলোর আচরণ সংশয়ের সৃষ্টি করছে। তাঁরা জানান, বিমা কোম্পানিগুলোর ফার্মেসি-সেবা ব্যবস্থাপকেরা ওষুধের দামের বিষয়েই বেশি আগ্রহী। আসক্তির আশঙ্কা নেই এমন ব্যথানাশকের দাম সাধারণত বেশি হয়। আর এটিকেই তারা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।
এ বিষয়ে কেটি থমাস ও চার্লস অর্নস্টেন বলেন, তাঁদের অনুসন্ধান এখনো শেষ হয়নি। তাঁরা এরই মধ্যে এ বিষয়ে আরও অনেকটা অগ্রসর হয়েছেন। ওষুধের অস্বাভাবিক উচ্চমূল্যের পেছনের কারণ অনুসন্ধানে তাঁরা সম্ভাব্য সব বিষয়েই খোঁজ করছেন। এখন পর্যন্ত এ-সংকটের পেছনে বিমা কোম্পানিগুলোর দায়ের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। তবে তার মাত্রা ও দায়ী অন্য শক্তিগুলো এখনো আলোয় আসেনি।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 

























