অাকাশ জাতীয় ডেস্ক:
আর মাত্র ৭ দিন পর ঈদুল আজহা। কিন্তু বাড়ি ফেরা নিয়ে মানুষের দুশ্চিন্তার শেষ নেই। চরম শঙ্কা থাকলেও শেষটায় মানুষ নির্বিঘ্নে গ্রামে ফিরতে পেরেছিল ঈদুল ফিতরের আগে। কিন্তু এবারের চিত্র ভিন্ন। অতি বৃষ্টি ও বন্যার কারণে দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোর এখন বেহাল দশা। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের ২১ জেলার ৭ হাজার ১৩০ কিলোমিটার সড়ক। ফলে ঈদযাত্রা নিয়ে চরম আতঙ্ক ও উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে মানুষ।
দেশের চার মহাসড়কের মধ্যে সবচেয়ে বেশি খারাপ অবস্থা ঢাকা-টাঙ্গাইল-রংপুর-কুড়িগ্রাম মহাসড়কের। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ঢাকা-যশোর-খুলনা এবং তৃতীয় অবস্থানে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক। তবে এ তিন মহাসড়কের তুলনায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ক্ষতির পরিমাণ কম বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এদিকে সড়ক-মহাসড়কের এই বেহাল অবস্থার মধ্যেও আশার কথা শুনিয়ে যাচ্ছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের । তিনি বলেছেন, ‘সড়ক পথে ভয়, আতঙ্কের কোনও কারণ নেই। বৃষ্টি-বাদল, ঝড় যাই হোক, যে কোনও মূল্যে সড়ক-মহাসড়ক সচল রাখা হবে।’
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের জাতীয় দুর্যোগ সাড়াদান সমন্বয় কেন্দ্রের (এনডিআরসিসি) উপ-সচিব জি এম আব্দুল কাদের জানিয়েছেন, বন্যায় ৭ হাজার কিলোমিটার রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে ঈদ যাতায়াতে দুর্ভাবনা তৈরি হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, বন্যায় সব চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জামালপুর জেলা। এ জেলার ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তার পরিমাণ ১ হাজার ১০৪ কিলোমিটার। অন্যান্য জেলার মধ্যে টাঙ্গাইলে ৯৯৭ কিলোমিটার, কুমিল্লায় ৮৮০ কিলোমিটার, পঞ্চগড়ে ৮৫৮ কিলোমিটার ও নীলফামারীতে ৫৩৬ কিলোমিটার রাস্তার ক্ষতি হয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের তথ্য অনুযায়ী, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, রংপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোণা, রাঙামাটি, নীলফামারী, গাইবান্ধা, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, দিনাজপুর, জামালপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, ময়মনসিংহ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, রাজবাড়ী, নওগাঁ, জয়পুরহাট, যশোর, মৌলভীবাজার, ফরিদপুর, টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ, মাদারীপুর, মুন্সীগঞ্জ, নাটোর, চাঁদপুর, কুমিল্লা, ঢাকা ও শেরপুর জেলার বিস্তীর্ণ জনপদ বন্যার কবলে পড়েছে।
সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদফতরের মহাসড়ক ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দেশের ৩৯ শতাংশ সড়ক-মহাসড়ক ভালো অবস্থায় রয়েছে। ৩৭ শতাংশ সড়ক-মহাসড়ক ভাঙাচোরা, ২৪ শতাংশ সড়ক মোটামুটি চলনসই। তবে এরমধ্যে কিছু অংশে হালকা বা ভারি মেরামত প্রয়োজন। বাকি সড়ক পুনর্নির্মাণ করতে হবে। সওজের ১০টি জোনের জাতীয় মহাসড়কের মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থা ঢাকা ও রংপুরের। আর সবচেয়ে খারাপ অবস্থা কুমিল্লা ও খুলনার। এর বাইরে রাজশাহী, সিলেট, ময়মনসিংহ, বরিশাল, গোপালগঞ্জ ও কুমিল্লা জোনের সড়কের বড় অংশই মোটামুটি ভালো অবস্থায় আছে। উল্লেখ্য, সারাদেশে সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের (সওজ) অধীনে জাতীয়, আঞ্চলিক মহাসড়ক এবং জেলা সড়ক রয়েছে ২১ হাজার ১২৩ কিলোমিটার।
দৈনিক আকাশ প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল থেকে বগুড়ার শেরপুর পর্যন্ত মহাসড়ক এখনো চলাচলের উপযোগী হয়নি। সেখানে এক ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে সময় লাগছে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা । ঢাকা থেকে গাজীপুরের রাস্তাটিরও বেহাল দশা। ঢাকা-দৌলতদিয়া-খুলনা মহাসড়কে কমপক্ষে ৬৮ কিলোমিটারজুড়ে খানাখন্দ। ফেনী-নোয়াখালী-লক্ষীপুর মহাসড়কটিও চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কেও গত কয়েক দিন ধরে যানজটের সৃষ্টি হয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানবাহন আটকে থাকছে। ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কেও যানজট লেগেই আছে। এর বাইরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় জেলা মহাসড়কগুলো সংস্কার না করায় খানাখন্দ ও বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়ে আছে। কোনো যানবাহনই ওই সব সড়ক-মহাসড়ক দিয়ে স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারছে না।
ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের চিত্র :মির্জাপুর (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা জানান, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে তীব্র যানজট থাকায় এ রোডে চলাচলকারী যাত্রীদের চরম দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে। মির্জাপুর উপজেলার গোড়াই হাইওয়ে থানার পুলিশ ও মির্জাপুর থানা পুলিশ সুত্র জানায়, গত বুধবার থেকে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যানজট শুরু হয়। বৃহস্পতিবার মহাসড়কের মির্জাপুর বাইপাস, দেওহাটা ও জামুর্কী এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, যানজটে স্থবির হয়ে পরেছে পুরো মহাসড়ক। ঈদের আগে ও পরে এ মহাসড়কে যানজট কমার সম্ভাবনা নেই বলে পুলিশ ও পরিবহন শ্রমিক সূত্র জানিয়েছে। ঈদে মহাসড়ক সচল রাখতে ও যানজট দূরীকরণের জন্য পুলিশের পাশাপাশি সেনা ও বিজিবি মোতায়েনের দাবি জানিয়েছেন সাধারণ যাত্রীরা।
পুলিশ সূত্র জানায়, এ মহাসড়কে যানজটের অন্যতম কারণ হচ্ছে, চার লেন প্রকল্প ও দীর্ঘ দিন ধরে লাগাতার বৃষ্টির কারণে বেশির ভাগ রাস্তায় খানাখন্দের সৃষ্টি হওয়া। বিশেষ করে চন্দ্রা থেকে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা পর্যন্ত এই ৭০ কিমি মহাসড়কের অধিকাংশ স্থানে পিচ ঢালাই উঠে ছোট বড় অসংখ্য খানাখন্দ সৃষ্টি হওয়ায় যানবাহন চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পরেছে।
ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের চিত্র : শিবচর (মাদারীপুর) সংবাদদাতা জানান, আসন্ন ঈদে সড়কপথে দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রীদের বাড়ি ফেরা এবারও খুব একটা সুখকর হবে না। ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে ছয় লেনে উন্নয়নের কাজ চলায় বিড়ম্বনায় পড়তে হবে যাত্রীদের। ফলে ভোগান্তির সঙ্গে দীর্ঘ পথে সড়কের পাশের মাটি সরে যাওয়ায় রয়েছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি।
সরেজমিনে জানা যায়, ঢাকার যাত্রাবাড়ী থেকে শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ি ঘাট হয়ে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত ৫৬ কিলোমিটার মহাসড়ক দুই থেকে ছয় লেনে উন্নীতের কাজ শুরু হয়েছে। প্রতিনিয়ত বিপুলসংখ্যক গাড়ি মালামাল লোড-আনলোড করায় বর্তমান দুই লেনের সড়কে এবারের ঈদে যাত্রীদের ভোগান্তি ও দীর্ঘ সময় ব্যয় করতে হবে। মহাসড়কেই দীর্ঘ যানজটের আশঙ্কা করছেন যাত্রীরা।
বাস ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও সোহাগ পরিবহনের মালিক ফারুক তালুকদার সোহেল বলেন, অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে ঢাকা-যশোর-খুলনা-বেনাপোল মহসড়কের অবস্থা খুবই খারাপ। ঈদের আগে মেরামত না হলে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হবে ঘরমুখো মানুষদের। যেখানে ঢাকা থেকে দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে যেতে ৭/৮ ঘন্টা লাগতো। সেখানে এখন লেগে যাচ্ছে ১২ থেকে ১৩ ঘন্টা। ঈদুল আজহার আগে পশুবাহী ট্রাক যখন চলাচল শুরু করবে তখন পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে ভাবতেই পারছিনা।
এদিকে দেশের উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের ৩২ জেলায় সরাসরি সড়ক যোগাযোগের একমাত্র পথ কুষ্টিয়া-ঈশ্বরদী মহাসড়ক। সড়ক বিভাগের হিসাব মতে, এই মহাসড়কে প্রতিদিন ১১ হাজারেরও বেশি যানবাহন চলাচল করে। এ কারণে এ মহাসড়ক দুই বঙ্গের মানুষের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সওজ সূত্রে জানা যায়, চলতি বর্ষা মৌসুমে কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ মহাসড়কের ৪৩ কিলোমিটারের অধিকাংশ, কুষ্টিয়া-ঈশ্বরদী মহাসড়কের ২৩ কিলোমিটারের মধ্যে প্রায় ১৫ কিলোমিটার এবং কুষ্টিয়া-রাজবাড়ী মহাসড়কের ২৮ কিলোমিটারের অধিকাংশই বিধ্বস্ত হয়ে গেছে।
সোহাগ পরিবহনের মালিক সোহেল তালুকদার আরও বলেন, হাইওয়ে পুলিশের তথ্য মতে দেশের উত্তরাঞ্চলের সড়কগুলোর ১৫৬ টি পয়েন্ট ব্যাপক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। বহু ব্রিজ কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঈদের আগে এগুলো মেরামত করা সম্ভব না হলেও চরম ভোগান্তিতে পড়তে হবে।
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের চিত্র: ঢাকা-সিলেট ২১২ কিলোমিটার রাস্তা। এ রাস্তার বেশ কিছু স্থানে অতিবৃষ্টির কারণে খানাখন্দ তৈরি হয়েছে। তবে অন্যান্য সড়কের চেয়ে এ মহাসড়ক কিছুটা ভালো। ক্ষতিগ্রস্ত জায়গায় মেরামতের কাজ চলছে। ঈদের আগে যদি চলাচলের উপযোগী হয় তবে খুব একটা সমস্যা হবেনা। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ বাস ট্রাক ওনারস এসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট শ্যামলী পরিবহনের ম্যানেজিং ডাইরেক্টর রমেশ চন্দ্র ঘোষ বলেন, ঢাকা – সিলেট মহাসড়কে তার পরিবহনের বাস প্রতি ঘন্টায় ঢাকা থেকে ছেড়ে যাচ্ছে। চালকরা জানিয়েছে, বৃষ্টি না হলে এ রুটে খুব একটা সমস্যা হবেনা।
এদিকে শ্যামলী পরিবহনের ম্যানেজিং ডাইরেক্টর রমেশ চন্দ্র ঘোষ জানিয়েছেন, দেশের অন্য তিনটি মহাসড়কের তুলনায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ক্ষতির পরিমাণ কিছুটা কম। বাংলাদেশ ট্রাক কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতির সাধারণ সস্পাদক রুস্তম আলী খান বলেন, ওজন নিয়ন্ত্রণের নামে দাউদকান্দি টোল প্লাজায় ওজন নিয়ন্ত্রণ স্কেলে চাঁদাবাজি নিয়ে দরকষাকষির কারণে ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। এই চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে আসন্ন ঈদুল আজহার ছুটির সময় যানজট বৃদ্ধি পেয়ে যাত্রীদের ভোগান্তি আরও বাড়বে।
পরিস্থিতি দেখতে মহাসড়কে মন্ত্রী: সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাওঁয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহসড়কের মেঘনা টোল প্লাজা এলাকায় যানজট পরিস্থিতি দেখতে যান। এসময় তিনি বলেন, সড়ক পথে ভয়, আতঙ্কের কোনও কারণ নেই। বৃষ্টি-বাদল, ঝড় যাই হোক, যে কোনও মূল্যে সড়ক- মহাসড়ক সচল রাখা হবে। তিনি বলেন, এই মুহূর্তে রাস্তা সচল রাখাই আমাদের বড় দায়িত্ব। এবারে ঈদে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা মোটামুটি স্বস্তিদায়ক হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
ওবায়দুল কাদের আরও বলেন, দেশের সব মহাসড়ক ভাল আছে। তবে জেলা সড়কের অনেক জায়গায় সমস্যা আছে। বন্যা ও ভারি বৃষ্টিতে দেশের কমপক্ষে ৩০টি স্থানে রাস্তায় ৫শ থেকে ১ হাজার মিটার আবার কোথাও কোথাও এক কিলোমিটার পর্যন্ত রাস্তা ভাঙাচোরা আছে। এই মুহূর্তে দেশে বন্যার কারণে ৫০টির বেশি সড়ক পানির নিচে তলিয়ে আছে। এই অবস্থায় আমাদের ঈদ যাত্রার প্রস্তুতি কিছুটা বিঘ্নিত হচ্ছে। তবে এগুলো দ্রুত মেরামত করে রাস্তা সচল করে তোলার চেষ্টা চলছে।
এদিকে হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি আতিকুর রহমান বলেন, ঈদের সময় বৃষ্টি না হলে খুব এক সমস্যা হবেনা। আমরা মহাসড়ক সচল রাখার জন্য সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি। তবে তিনি ঘরে ফেরা মানুষদের উদ্দেশে বলেন, আপনার ঝুঁকি নিয়ে ট্র্াক ও বাসের ছাদে চড়বেন না।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 




















