বিমানবাহিনীর বরখাস্ত হওয়া ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরির অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় তদন্তের মোড় ঘুরেছে। পুলিশের তদন্তকারীরা এখন ঘটনার রাতে তাহসিফের সঙ্গে থাকা এক রহস্যময় তরুণীকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, ঘটনার দিন ২৭ অক্টোবর রাত ১০টা ১৭ মিনিটে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের ‘নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারে’ তাহসিফ ওই তরুণীর সঙ্গে প্রবেশ করেছিলেন। তদন্তের স্বার্থে ওই তরুণীকে শনাক্ত ও জিজ্ঞাসাবাদ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাহসিফ নিখোঁজ হওয়ার আগে উত্তরার সোনারগাঁও জনপথ রোডের ১৩ নম্বর সেক্টরে অবস্থিত ‘নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বার’-এ তাকে ওই তরুণীর সঙ্গে দেখা গিয়েছিল। ওই তরুণীর বয়স ২৪-২৫ বছর। বারের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, তরুণী গেঞ্জি, প্যান্ট ও কেডস পরেছিলেন।
ঘটনার সাথে জড়িত সন্দেহে তাহসিফের জুনিয়র বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে শুক্রবার রাতে আটক করে পুলিশ। এরপর শনিবার তাকে ঢাকার মেট্রোপলিটন আদালতে হাজির করা হয়। নৌপুলিশের পক্ষ থেকে মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে সাত দিনের রিমান্ড চাওয়া হলে বিচারক চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এর আগে পিবিআই ও পুলিশ যৌথভাবে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে।
তদন্তকারীদের কাছে দেওয়া প্রাথমিক জবানবন্দিতে দীপ দাবি করেছেন, টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় তারা দুজন পুলিশের ধাওয়া খেয়ে পালানোর সময় তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন। তবে এই দাবির সত্যতা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, ঘটনাস্থল ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে দীপকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া অসংগতিগুলোও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। রিমান্ড আবেদনে আরও বলা হয়, তথ্যপ্রযুক্তি ও গোপন তথ্যের ভিত্তিতে তদন্তে জানা গেছে, ঘটনার দিন তাহসিফকে নিয়ে টঙ্গী পশ্চিম থানার মাজার বস্তি এলাকায় গিয়েছিলেন দীপ। প্রাথমিক তদন্তে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে দীপের সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তার বক্তব্যে কিছু অসংগতি ও এলোমেলো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। সেগুলো অন্যান্য তথ্যপ্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদে বেশকিছু তথ্য সামনে আসছে। সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর আল আমিন বলেন, এ ঘটনা তারা ছেড়ে দেবেন না।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টার দিকে তাহসিফ তার ১৮ নম্বর সেক্টরের বাসা থেকে দীপের ডাকে সাড়া দিয়ে বেরিয়েছিলেন। পরের দিন ২৮ অক্টোবর বিকাল সাড়ে ৪টায় জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে খবর পেয়ে পুলিশ তুরাগ নদ থেকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার করে। তার ট্রাউজারের পকেটে পাওয়া আইফোন দেখে তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গিয়েছিল। পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে উত্তরখান থানার রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদে একটি লাশ ভাসার খবর পায় পুলিশ। শনিবার দুপুরে উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের রাজউক অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের ‘করবী’ ভবনে তাহসিফের বাসায় গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন সংগঠনটির নেতারা।
নৌপুলিশ ঢাকা রেঞ্জের পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, দীপ ঘটনার পুরো সময় তাহসিফের সঙ্গে ছিলেন। তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে মৃত্যুর মূল কারণ ও রহস্য উদ্ঘাটন সহজ হবে। তদন্তকারীরা এখন তাহসিফের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের ফরেনসিক পরীক্ষা করছেন। এছাড়া ঘটনার রাতে তারা কোথায় কোথায় গিয়েছেন, সেই রুটম্যাপ তৈরি করা হচ্ছে। তারা আশা করছেন, দ্রুত প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় তার বাবা কেএম এনায়েতুল করিম শুক্রবার রাত ১টার দিকে উত্তরখান থানায় অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। ওই মামলায় দীপকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। পুলিশের ধারণা, ঘটনার রাতে ওই এলাকায় কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে থাকতে পারে যা এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে, অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তাদের কল্যাণ সংস্থা ‘রাওয়া’ তাহসিফের মৃত্যুর সুষ্ঠু বিচার দাবি করেছে। শনিবার সংস্থার প্রতিনিধিরা তাহসিফের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করেন। রাওয়ার যুগ্মসম্পাদক অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু নওরোজ খুরশিদ আলম বলেন, তারা ঘটনার স্বচ্ছ তদন্ত পর্যবেক্ষণ করছেন এবং পরিবারকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। তারা প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলছে এবং সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করছে।
তদন্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, বারে প্রবেশ করার সময় ওই তরুণীর হাতে থাকা সাদা পলিথিনের ব্যাগ এবং তাদের মোটরসাইকেলে যাতায়াতের বিষয়টি। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, ওই তরুণীর পরিচয় মিললে ঘটনার আগের সময়ের অনেক অমীমাংসিত তথ্যের যোগসূত্র পাওয়া যেতে পারে। এছাড়া ঘটনাস্থলে তাহসিফের মোটরসাইকেলটি কীভাবে এলো এবং কী পরিস্থিতিতে সেটি সেখানে রাখা ছিল, তাও তদন্তের স্বার্থে অত্যন্ত গুরুত্ব পাচ্ছে।
পুলিশ ও তদন্তকারী সংস্থাগুলোর লক্ষ্য হলো—তাহসিফের মৃত্যু নিছক দুর্ঘটনা নাকি পরিকল্পিত কোনো ঘটনার ফলাফল, তা নিশ্চিত করা। রিমান্ড শেষে দীপকে আরও বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদের সুযোগ তৈরি হবে এবং তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে তখন আরও স্পষ্ট তথ্য জানানো সম্ভব হবে বলে নৌপুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তবে তিনি কেন নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন, এরপর কী ঘটেছিল কিংবা তার মৃত্যু নিছক দুর্ঘটনা নাকি এর পেছনে অন্য কোনো ঘটনা রয়েছে-এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 















