ঢাকা ০৩:৪৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মক্কা-মদিনায় হুমকি এলে বাংলাদেশ চুপ থাকবে না: শামা ওবায়েদ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে সফল পারমাণবিক বিক্রিয়া সম্পন্ন চলতি অক্টোবরের শেষ দিকে জাপান সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাৎ করলেন চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন উদ্বোধনের আগেই কক্সবাজার বিমানবন্দরের নতুন টার্মিনালে যাত্রীসেবা শুরু সাইবার সুরক্ষা আইন যেন নিপীড়নমূলক না হয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অক্টোবর-নভেম্বরে তিন দেশ সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘের সন্ত্রাস দমন তহবিলে কাতারের ১৪১ মিলিয়ন ডলার অনুদান নিউইয়র্কে চার দিনে ৩০টি কর্মসূচিতে প্রধানমন্ত্রীর ব্যস্ত সফর জাতিসংঘে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি রোধে চার প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর

মোহামেডান ও জন্মভূমির টানে প্রতাপ শঙ্কর হাজরার জীবনসংগ্রাম

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা নিজেকে মোহামেডানের প্রতাপ হিসেবে পরিচিত করতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তাঁর ভাষ্যমতে, জীবনের প্রতিটি কঠিন সময়ে মোহামেডান ক্লাব তাঁর পাশে থেকেছে, যেমনটা দলটি চ্যাম্পিয়ন হওয়ার আনন্দও তাঁকে দিয়েছে। ১৯৬৩ সালে এই ক্লাবে যুক্ত হওয়ার পর থেকে তিনি আজও এর সাথেই রয়েছেন। তবে তাঁর পরিচয় কেবল ক্লাবের খেলোয়াড় হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসের এক অন্যতম সাক্ষী হিসেবেও। তিনি ফুটবল, হকি ও ক্রিকেট—তিনটি খেলাতেই সমান পারদর্শী ছিলেন। কারণটাও তিনি নিজেই বলেছেন, ‘আমার জীবনের প্রত্যেকটা কষ্টের সময়েই আমার পাশে দাঁড়িয়েছিল মোহামেডান। আর এই মোহামেডানই আবার যখন চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, একেক বছরের পর বছর, তখন আনন্দও দিছে আবার সাংঘাতিক।’। ১৯৬৩ সালে মোহামেডানে যোগ দিয়েছিলেন। তবে প্রতাপ শঙ্কর হাজরার পরিচয় শুধু মোহামেডানের খেলোয়াড় হিসেবে নয়। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে তিনি এক বিরল চরিত্র। ‘ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলো’ অনুষ্ঠানে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বুঝতে পারছিলাম, এই মানুষটির জীবনের গল্প আসলে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনেরও ইতিহাস। আমার প্রিয় শিক্ষক জামিলুর রেজা চৌধুরী। স্কুলটির ক্রীড়া-পরিবেশের কথা বলতে গিয়ে তিনি বললেন, ‘এই স্কুল আশির দশক পর্যন্ত কোনো সময়ই রানার্সআপ হয়নি। আমরা তো গায়ের জোর দিয়ে মারি, ও শুধু ব্যাটটা উঠিয়ে দিল, ছয় হয়ে গেল।

১৯৪২ সালের ৩ এপ্রিল (১৩ চৈত্র ১৩৫০ বঙ্গাব্দ) প্রতাপ শঙ্কর হাজরা জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশব কেটেছে তৎকালীন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও পঞ্চাশের মন্বন্তরের অস্থির সময়ে। তাদের আদি নিবাস ফরিদপুরের শিবচরে হলেও নদীভাঙনের কারণে পরিবার মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগরের দোগাছিতে স্থায়ী হয়। তাঁর বাবা প্রিয় শঙ্কর হাজরা ছিলেন ঢাকা বারের আইনজীবী এবং মা অন্নপূর্ণা হাজরা বেনারসে পড়াশোনা করেছিলেন। পারিবারিক ঐতিহ্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়ার পাশাপাশি তাঁর বেড়ে ওঠায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ছিল আরমানিটোলা গভর্নমেন্ট স্কুলের। ১৯৫০ সালের দাঙ্গার কারণে কিছুদিন কলকাতা, কাশী ও রাঁচিতে কাটিয়ে ১৯৫২ সালে তিনি আরমানিটোলার ওই স্কুলে ভর্তি হন। জন্মের সময় দেশে পঞ্চাশের মন্বন্তর, পৃথিবীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। বাবাও শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু ঠাকুরমার ইচ্ছায় ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া ছেড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়েন। স্কুলে ছোটদের জন্য আলাদা মাঠ, বয়সভিত্তিক দল, আন্তস্কুল ও আন্তহাউস প্রতিযোগিতা—সবকিছুরই ব্যবস্থা ছিল। ছোটদের মধ্যে ভালো খেলোয়াড়দের বড় দলে নেওয়া যেত।

স্কুল জীবনের ক্রীড়া পরিবেশ তাকে খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে তোলে। তিনি জানান, সেই সময় স্কুলগুলোয় গেম টিচারের উপস্থিতি ও সুশৃঙ্খল প্রতিযোগিতার পরিবেশ ছিল চমৎকার। ফুটবল ও হকি মৌসুমে নিয়মিত চর্চার সুযোগ পেতেন শিক্ষার্থীরা। তার খেলোয়াড়ি জীবনের শুরুটা ছিল ১৩ বছর বয়সে ওয়ারী ক্লাবের হয়ে প্রথম বিভাগ হকি খেলার মধ্য দিয়ে। এরপর ১৯৬১ সালে ভিক্টোরিয়া ক্লাবের হয়ে ফুটবল এবং পরে পূর্ব পাকিস্তান দলের হয়ে হকি ও ফুটবলে প্রতিনিধিত্ব করেন। সেই ইতিহাসে আছে আরমানিটোলা স্কুলের মাঠ, পুরান ঢাকার ক্লাব, পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলে সুযোগ পাওয়ার আনন্দ, মুক্তিযুদ্ধের সময় বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা এবং সবকিছুর পরও বাংলাদেশে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত। বর্ষায় নদীভাঙনে সেই বাড়ি বারবার বিলীন হয়েছে। ফোনে স্ক্রল না করে যে ১১৮টি কাজ করা যায়। ফাইভ, সিক্স, সেভেনের জন্য এক দল, এইট, নাইন, টেনের জন্য আরেক দল। মাত্র ১৩ বছর বয়সে ওয়ারী ক্লাবের হয়ে প্রথম বিভাগ হকি খেলেছেন। ১৯৫৮ সালে প্রথম বিভাগে হকি, ১৯৬১ সালে ভিক্টোরিয়া ক্লাবের হয়ে প্রথম বিভাগ ফুটবল। ১৯৬২ সালে পূর্ব পাকিস্তান হকি দলে ডাক পান, পরের বছর ফুটবল দলে।

১৯৬৬ সালে টম গ্রেভনির ব্যাটিং দেখার পর তিনি ক্রিকেট থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নেন। তার মতে, গ্রেভনির অসামান্য সাবলীল ব্যাটিং দেখার পর মনে হয়েছিল তারা ক্রিকেট খেলার নামে বরং খেলার সাথে অন্যায় করছিলেন। তবে ১৯৭৩ সালে খেলোয়াড় সংকটের সময় তিনি কিছুদিনের জন্য আবারও ক্রিকেটে ফিরেছিলেন। গ্রেভনির ব্যাটিং দেখে তাঁর মনে হয়েছিল, ক্রিকেট খেলার সঙ্গে তাঁরা যেন অন্যায় করছেন। তাঁর ভাষায়, ‘ও যে ছয় মারছে, মনেই হয় না যে ছয় মারছে।

পেশাদার ফুটবলে সাফল্যের চূড়ায় ওঠার গল্পটাও বেশ রোমাঞ্চকর। ১৯৬৫ সালে পেশোয়ারে ট্রায়াল দিয়ে পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলের মূল দলে সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। সেই দলে জহির ভাইয়ের পাশাপাশি তিনিও বাঙালি প্রতিনিধি হিসেবে শ্রীলঙ্কায় ম্যাচ খেলেছিলেন। ঢাকায় ফিরে মায়ের সাথে দেখা হওয়ার সেই মুহূর্তটি এখনো তার কাছে পরম আনন্দের।

জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ সময়টি আসে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে। পাকিস্তান বাহিনী তার আরমানিটোলার বাড়িতে আগুন দিলে তিনি ও তার পরিবার পাশের প্রতিবেশী মুসলিম পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ২৪ জনের এক দল হিসেবে দেয়াল টপকে আর্মেনিয়ান চার্চে আশ্রয় নেন। সৌভাগ্যক্রমে কেউ হতাহত হননি। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সংগঠক ও সহ-অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দলের অধিনায়ক নির্বাচনের সভায় তিনি, পিন্টু ও ননী বসাক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।

স্বাধীনতার পর ১৯৭৮ সালে পাতিয়ালায় প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি হকির কোচ হন এবং ১৯৮৬ সালে দলের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রতাপ শঙ্কর মনে করেন, হকিতে ২২ জনের স্টিক প্রয়োজন হওয়ায় ফুটবল বা ক্রিকেটের চেয়ে এর ব্যয় বেশি, যা এখনকার সময়ে এই খেলার প্রসারের পথে অন্তরায়। তিনি স্কুলের মাঠ এবং গেম টিচারের অভাব নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

১৯৬৪ সালের দাঙ্গার পর ভারত চলে যাওয়ার পরামর্শ পেলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তার কাছে মাতৃভূমি ও জন্মভূমি দুটির গুরুত্বই অপরিসীম। তিনি বলেন, ‘আমি জন্ম মাকেও ছাড়ব না, জন্মভূমিও ছাড়ব না।’ নিজের ভেতর সবসময় এক ‘স্পোর্টসম্যান’ সত্তাকে ধারণ করা এই মানুষটি শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে থেকেই নিজের শিকড়কে আঁকড়ে ধরেছেন।

আপলোডকারীর তথ্য

মোহামেডান ও জন্মভূমির টানে প্রতাপ শঙ্কর হাজরার জীবনসংগ্রাম

আপডেট সময় ০১:৪৯:২৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬

প্রতাপ শঙ্কর হাজরা নিজেকে মোহামেডানের প্রতাপ হিসেবে পরিচিত করতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তাঁর ভাষ্যমতে, জীবনের প্রতিটি কঠিন সময়ে মোহামেডান ক্লাব তাঁর পাশে থেকেছে, যেমনটা দলটি চ্যাম্পিয়ন হওয়ার আনন্দও তাঁকে দিয়েছে। ১৯৬৩ সালে এই ক্লাবে যুক্ত হওয়ার পর থেকে তিনি আজও এর সাথেই রয়েছেন। তবে তাঁর পরিচয় কেবল ক্লাবের খেলোয়াড় হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসের এক অন্যতম সাক্ষী হিসেবেও। তিনি ফুটবল, হকি ও ক্রিকেট—তিনটি খেলাতেই সমান পারদর্শী ছিলেন। কারণটাও তিনি নিজেই বলেছেন, ‘আমার জীবনের প্রত্যেকটা কষ্টের সময়েই আমার পাশে দাঁড়িয়েছিল মোহামেডান। আর এই মোহামেডানই আবার যখন চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, একেক বছরের পর বছর, তখন আনন্দও দিছে আবার সাংঘাতিক।’। ১৯৬৩ সালে মোহামেডানে যোগ দিয়েছিলেন। তবে প্রতাপ শঙ্কর হাজরার পরিচয় শুধু মোহামেডানের খেলোয়াড় হিসেবে নয়। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে তিনি এক বিরল চরিত্র। ‘ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলো’ অনুষ্ঠানে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বুঝতে পারছিলাম, এই মানুষটির জীবনের গল্প আসলে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনেরও ইতিহাস। আমার প্রিয় শিক্ষক জামিলুর রেজা চৌধুরী। স্কুলটির ক্রীড়া-পরিবেশের কথা বলতে গিয়ে তিনি বললেন, ‘এই স্কুল আশির দশক পর্যন্ত কোনো সময়ই রানার্সআপ হয়নি। আমরা তো গায়ের জোর দিয়ে মারি, ও শুধু ব্যাটটা উঠিয়ে দিল, ছয় হয়ে গেল।

১৯৪২ সালের ৩ এপ্রিল (১৩ চৈত্র ১৩৫০ বঙ্গাব্দ) প্রতাপ শঙ্কর হাজরা জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশব কেটেছে তৎকালীন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও পঞ্চাশের মন্বন্তরের অস্থির সময়ে। তাদের আদি নিবাস ফরিদপুরের শিবচরে হলেও নদীভাঙনের কারণে পরিবার মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগরের দোগাছিতে স্থায়ী হয়। তাঁর বাবা প্রিয় শঙ্কর হাজরা ছিলেন ঢাকা বারের আইনজীবী এবং মা অন্নপূর্ণা হাজরা বেনারসে পড়াশোনা করেছিলেন। পারিবারিক ঐতিহ্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়ার পাশাপাশি তাঁর বেড়ে ওঠায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ছিল আরমানিটোলা গভর্নমেন্ট স্কুলের। ১৯৫০ সালের দাঙ্গার কারণে কিছুদিন কলকাতা, কাশী ও রাঁচিতে কাটিয়ে ১৯৫২ সালে তিনি আরমানিটোলার ওই স্কুলে ভর্তি হন। জন্মের সময় দেশে পঞ্চাশের মন্বন্তর, পৃথিবীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। বাবাও শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু ঠাকুরমার ইচ্ছায় ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া ছেড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়েন। স্কুলে ছোটদের জন্য আলাদা মাঠ, বয়সভিত্তিক দল, আন্তস্কুল ও আন্তহাউস প্রতিযোগিতা—সবকিছুরই ব্যবস্থা ছিল। ছোটদের মধ্যে ভালো খেলোয়াড়দের বড় দলে নেওয়া যেত।

স্কুল জীবনের ক্রীড়া পরিবেশ তাকে খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে তোলে। তিনি জানান, সেই সময় স্কুলগুলোয় গেম টিচারের উপস্থিতি ও সুশৃঙ্খল প্রতিযোগিতার পরিবেশ ছিল চমৎকার। ফুটবল ও হকি মৌসুমে নিয়মিত চর্চার সুযোগ পেতেন শিক্ষার্থীরা। তার খেলোয়াড়ি জীবনের শুরুটা ছিল ১৩ বছর বয়সে ওয়ারী ক্লাবের হয়ে প্রথম বিভাগ হকি খেলার মধ্য দিয়ে। এরপর ১৯৬১ সালে ভিক্টোরিয়া ক্লাবের হয়ে ফুটবল এবং পরে পূর্ব পাকিস্তান দলের হয়ে হকি ও ফুটবলে প্রতিনিধিত্ব করেন। সেই ইতিহাসে আছে আরমানিটোলা স্কুলের মাঠ, পুরান ঢাকার ক্লাব, পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলে সুযোগ পাওয়ার আনন্দ, মুক্তিযুদ্ধের সময় বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা এবং সবকিছুর পরও বাংলাদেশে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত। বর্ষায় নদীভাঙনে সেই বাড়ি বারবার বিলীন হয়েছে। ফোনে স্ক্রল না করে যে ১১৮টি কাজ করা যায়। ফাইভ, সিক্স, সেভেনের জন্য এক দল, এইট, নাইন, টেনের জন্য আরেক দল। মাত্র ১৩ বছর বয়সে ওয়ারী ক্লাবের হয়ে প্রথম বিভাগ হকি খেলেছেন। ১৯৫৮ সালে প্রথম বিভাগে হকি, ১৯৬১ সালে ভিক্টোরিয়া ক্লাবের হয়ে প্রথম বিভাগ ফুটবল। ১৯৬২ সালে পূর্ব পাকিস্তান হকি দলে ডাক পান, পরের বছর ফুটবল দলে।

১৯৬৬ সালে টম গ্রেভনির ব্যাটিং দেখার পর তিনি ক্রিকেট থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নেন। তার মতে, গ্রেভনির অসামান্য সাবলীল ব্যাটিং দেখার পর মনে হয়েছিল তারা ক্রিকেট খেলার নামে বরং খেলার সাথে অন্যায় করছিলেন। তবে ১৯৭৩ সালে খেলোয়াড় সংকটের সময় তিনি কিছুদিনের জন্য আবারও ক্রিকেটে ফিরেছিলেন। গ্রেভনির ব্যাটিং দেখে তাঁর মনে হয়েছিল, ক্রিকেট খেলার সঙ্গে তাঁরা যেন অন্যায় করছেন। তাঁর ভাষায়, ‘ও যে ছয় মারছে, মনেই হয় না যে ছয় মারছে।

পেশাদার ফুটবলে সাফল্যের চূড়ায় ওঠার গল্পটাও বেশ রোমাঞ্চকর। ১৯৬৫ সালে পেশোয়ারে ট্রায়াল দিয়ে পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলের মূল দলে সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। সেই দলে জহির ভাইয়ের পাশাপাশি তিনিও বাঙালি প্রতিনিধি হিসেবে শ্রীলঙ্কায় ম্যাচ খেলেছিলেন। ঢাকায় ফিরে মায়ের সাথে দেখা হওয়ার সেই মুহূর্তটি এখনো তার কাছে পরম আনন্দের।

জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ সময়টি আসে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে। পাকিস্তান বাহিনী তার আরমানিটোলার বাড়িতে আগুন দিলে তিনি ও তার পরিবার পাশের প্রতিবেশী মুসলিম পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ২৪ জনের এক দল হিসেবে দেয়াল টপকে আর্মেনিয়ান চার্চে আশ্রয় নেন। সৌভাগ্যক্রমে কেউ হতাহত হননি। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সংগঠক ও সহ-অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দলের অধিনায়ক নির্বাচনের সভায় তিনি, পিন্টু ও ননী বসাক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।

স্বাধীনতার পর ১৯৭৮ সালে পাতিয়ালায় প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি হকির কোচ হন এবং ১৯৮৬ সালে দলের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রতাপ শঙ্কর মনে করেন, হকিতে ২২ জনের স্টিক প্রয়োজন হওয়ায় ফুটবল বা ক্রিকেটের চেয়ে এর ব্যয় বেশি, যা এখনকার সময়ে এই খেলার প্রসারের পথে অন্তরায়। তিনি স্কুলের মাঠ এবং গেম টিচারের অভাব নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

১৯৬৪ সালের দাঙ্গার পর ভারত চলে যাওয়ার পরামর্শ পেলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তার কাছে মাতৃভূমি ও জন্মভূমি দুটির গুরুত্বই অপরিসীম। তিনি বলেন, ‘আমি জন্ম মাকেও ছাড়ব না, জন্মভূমিও ছাড়ব না।’ নিজের ভেতর সবসময় এক ‘স্পোর্টসম্যান’ সত্তাকে ধারণ করা এই মানুষটি শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে থেকেই নিজের শিকড়কে আঁকড়ে ধরেছেন।