ঢাকা ১১:২৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
জাতিসংঘে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি রোধে চার প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর অক্টোবরেই চালু হচ্ছে কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দেশে ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় আরও ৮ মৃত্যু, হাসপাতালে ১৭৮২ সচিবালয়, গ্যাস-বিদ্যুত অফিসে অবস্থান ৬ আগস্ট, আগামী মাসে লংমার্চ নতুন দলের আত্মপ্রকাশ, নেতৃত্বে যারা ইরানের সামনে এখন কেবল দুই পথ—চুক্তি অথবা আত্মসমর্পণ: ট্রাম্প পাঁচ দফা দাবিতে সরকারি কর্মচারীদের অবস্থান কর্মসূচি সরকার দমনে ব্যস্ত, দ্রব্যমূল্য-গ্যাস নিয়ে মাথাব্যথা নেই: গোলাম পরওয়ার দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে আশা বাণিজ্যমন্ত্রীর সম্পত্তি দানের পরও আজীবন ভোগদখলের সুযোগ, মন্ত্রিসভায় খসড়া পাশ

জাতিসংঘে প্রথম ভাষণ দিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান: গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের ঐতিহাসিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার (২৫ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাত ৪টা ১৮ মিনিটের দিকে তিনি মাতৃভাষা বাংলায় তাঁর এই বক্তব্য শুরু করেন। দেশের সরকারপ্রধান হিসেবে এটি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে তাঁর প্রথম ভাষণ। এই ভাষণের মাধ্যমে একই পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে বিশ্বমঞ্চে বক্তব্য দেওয়ার এক অনন্য ও গৌরবময় ইতিহাস সৃষ্টি করলেন তিনি। এর আগে তাঁর পিতা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক ও সাবেক রাষ্ট্রপতি এবং তাঁর মাতা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর জাতিসংঘের ৪৮তম অধিবেশনে দেশের প্রতিনিধিত্ব করে ভাষণ দিয়েছিলেন। মায়ের ভাষণের দীর্ঘ তেরো বছর পর তাঁর এই প্রথম ভাষণটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের নতুন গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার পরিচয় বহন করে।

গণতান্ত্রিক রূপান্তর ও গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা

ভাষণের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ স্মরণ করেন। তিনি বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা চরম স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে যে বীর ছাত্র-জনতা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করেছেন, তাঁদের অবদান চিরস্মরণীয়। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগঠিত এই গণআন্দোলনে যারা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন এবং যারা আহত হয়েছেন, তাঁদের সবার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও সমবেদনা জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বিশ্ববাসীকে অবহিত করেন যে, চলতি বছরের ১২ই ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে একটি সম্পূর্ণ অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই নির্বাচনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়ে দেশের অধিকারবঞ্চিত জনগণ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার এক মহান দায়িত্ব অর্পণ করেছে। স্বৈরাচারী শক্তির দীর্ঘ শোষণ পেরিয়ে আজ বাংলাদেশ একটি মুক্ত ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে পেয়েছে।

বিশ্বমঞ্চে আবেগ ও স্মৃতিরোমন্থন

জাতিসংঘের এই বিশাল আন্তর্জাতিক মঞ্চে কথা বলার সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কিছুটা আবেগাপ্লুত ও স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন। তিনি স্মরণ করেন তাঁর পিতা সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান বীর উত্তম এবং তাঁর মাতা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কথা, যাঁরা অতীতে এই একই পবিত্র মঞ্চে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের মানুষের অধিকারের কথা তুলে ধরেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ বাংলাদেশে নতুন করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে এবং মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষা হচ্ছে। জনগণের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল একটি রাষ্ট্রকে শক্তিশালী ও স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তোলা সম্ভব। নাগরিকদের অধিকার খর্ব করে কোনো শাসনকাঠামোই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না এবং বাংলাদেশ আজ বিশ্বের দরবারে তার উজ্জ্বল উদাহরণ তৈরি করেছে।

রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানের তাগিদ

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া লাখ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী তাঁর গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ বিগত নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রায় ১২ লাখেরও বেশি বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে সম্পূর্ণ মানবিক কারণে আশ্রয় দিয়ে আসছে। এই বিশাল সংখ্যক শরণার্থীর কারণে আমাদের সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদ, স্থানীয় পরিবেশ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সামাজিক ভারসাম্য রক্ষায় তীব্র সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ মনে করে যে, এই মানবিক বিপর্যয়ের মূল উৎস মিয়ানমারের অভ্যন্তরেই নিহিত এবং এর টেকসই সমাধানও তাদেরকেই করতে হবে। রোহিঙ্গাদের সম্মানজনক ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্য জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক সমাজকে আরও জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রত্যাবাসন নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গা শিবিরে জীবন রক্ষাকারী মানবিক সাহায্য সহযোগিতা অব্যাহত রাখার জন্য তিনি বৈশ্বিক অংশীদারদের আহ্বান জানান।

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি ও পরিবেশ রক্ষা কর্মসূচি

বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে নগণ্য ভূমিকা রাখা সত্ত্বেও বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাবে অন্যতম শীর্ষ ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে ধুঁকছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিশ্বমঞ্চে এই ঐতিহাসিক অন্যায়ের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, পরিবেশের এই বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে আন্তর্জাতিক মহলকে তাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলা করতে বাংলাদেশ সরকার নিজস্ব অর্থায়নে ও পরিকল্পনায় ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এর অংশ হিসেবে জলবায়ু সহনশীলতা গড়ে তুলতে এবং সবুজায়ন নিশ্চিত করতে আগামী ৫ বছরে দেশজুড়ে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের এক বিশাল ও মহতী উদ্যোগ শুরু হয়েছে। এছাড়াও এশিয়ার অনন্য প্রাকৃতিক সম্পদ ও বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনে মিঠা পানির প্রাকৃতিক প্রবাহ বৃদ্ধি এবং দেশের অন্যান্য বৃহৎ জলাধারে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে সরকার তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে।

অর্থনৈতিক গণতন্ত্র ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার রক্ষা

দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ নয়, বরং অর্থনীতির সমতা বিধান অত্যন্ত জরুরি বলে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে স্বল্পোন্নত দেশের কাতার থেকে উত্তরণের একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রয়েছে। দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করতে এবং গ্রামীণ ও শহরের ব্যবধান কমাতে তাঁর সরকার বদ্ধপরিকর। নির্বাচনের আগে জনগণের সামনে যে ৩১ দফা সামাজিক রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছিল, বর্তমান সরকার তা অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বাস্তবায়নে নিয়োজিত রয়েছে। এই উন্নয়নের মূল লক্ষ্য হলো দেশের প্রতিটি নাগরিক যেন অর্থনৈতিক সুবিধার অংশীদার হতে পারেন। দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি নারী হওয়ায় নারীদেরকে সমাজের মূল স্রোতধারায় নিয়ে আসতে কাজ করছে তাঁর সরকার। প্রান্তিক নারীদের আর্থিক সক্ষমতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রতিটি পরিবারের নারী প্রধানের নামে বিশেষ ফ্যামিলি কার্ড ইস্যু করা হচ্ছে, যা তাদের আত্মমর্যাদা বৃদ্ধির এক বলিষ্ঠ হাতিয়ার। সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিটি সেক্টরের সাহায্য ও সুবিধাসমূহকে একত্রিত করে একটি সর্বজনীন ইউনিভার্সাল কার্ড চালু করার, যার ফলে জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি আরও গতিশীল হবে।

বৈশ্বিক সহযোগিতা ও প্রযুক্তি ব্যবহারের যুগোপযোগী আহ্বান

বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্য “রিস্টোরিং ট্রাস্ট, ম্যানেজিং ট্রান্সফরমেশন: এ ইউনাইটেড নেশনস দ্যাট ডেলিভারস ফর অল” অত্যন্ত অর্থবহ এবং সময়োপযোগী বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিশ্বব্যাপী বিরাজমান সংঘাত, আস্থা সংকট এবং বৈষম্য দূর করতে জাতিসংঘকে আরও জোরালো ভূমিকা পালনের পরামর্শ দেন তিনি। বিশ্বের বিভিন্ন গোলযোগপূর্ণ অঞ্চলে কঠিন প্রতিকূলতা জয় করে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে নিয়োজিত থাকা বাংলাদেশের সশস্ত্র ও পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের কথা তিনি উল্লেখ করেন। বিশেষ করে শান্তিরক্ষী বাহিনীতে বাংলাদেশের নারী সদস্যদের সাহসী অংশগ্রহণ ‘নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা’ বিষয়ক জাতিসংঘের বৈশ্বিক এজেন্ডাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতির এই যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার যেন কোনো দেশের সার্বভৌমত্ব বা সামাজিক বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে না পারে, সেজন্য জাতিসংঘের নেতৃত্বে একটি সুনির্দিষ্ট এবং শক্তিশালী বৈশ্বিক নীতিমালা প্রণয়নের জোর দাবি জানান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তিনি ১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট সাধারণ পরিষদের ১১তম বিশেষ অধিবেশনে ভাষণ দিয়েছিলেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এর ১৩ বছর পর ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৪৮তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মা ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ভাষণ দেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মাননীয় সভাপতি, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ায় আপনাকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: একইসঙ্গে আমি বিদায়ী সভাপতি ম্যাডাম এনালেনা বেয়ারবক-কেও তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বের জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জুলাই-আগষ্টে বীর ছাত্র জনতার গণ অভুত্থানে সকল শহীদ এবং আহতদের প্রতিও আমি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা জানাই।

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

নিউইয়র্কে বিশ্বনেতাদের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে যোগ দিলেন কাতারের আমীর

জাতিসংঘে প্রথম ভাষণ দিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান: গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার

আপডেট সময় ০৯:৫৩:০৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের ঐতিহাসিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার (২৫ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাত ৪টা ১৮ মিনিটের দিকে তিনি মাতৃভাষা বাংলায় তাঁর এই বক্তব্য শুরু করেন। দেশের সরকারপ্রধান হিসেবে এটি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে তাঁর প্রথম ভাষণ। এই ভাষণের মাধ্যমে একই পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে বিশ্বমঞ্চে বক্তব্য দেওয়ার এক অনন্য ও গৌরবময় ইতিহাস সৃষ্টি করলেন তিনি। এর আগে তাঁর পিতা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক ও সাবেক রাষ্ট্রপতি এবং তাঁর মাতা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর জাতিসংঘের ৪৮তম অধিবেশনে দেশের প্রতিনিধিত্ব করে ভাষণ দিয়েছিলেন। মায়ের ভাষণের দীর্ঘ তেরো বছর পর তাঁর এই প্রথম ভাষণটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের নতুন গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার পরিচয় বহন করে।

গণতান্ত্রিক রূপান্তর ও গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা

ভাষণের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ স্মরণ করেন। তিনি বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা চরম স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে যে বীর ছাত্র-জনতা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করেছেন, তাঁদের অবদান চিরস্মরণীয়। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগঠিত এই গণআন্দোলনে যারা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন এবং যারা আহত হয়েছেন, তাঁদের সবার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও সমবেদনা জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বিশ্ববাসীকে অবহিত করেন যে, চলতি বছরের ১২ই ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে একটি সম্পূর্ণ অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই নির্বাচনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়ে দেশের অধিকারবঞ্চিত জনগণ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার এক মহান দায়িত্ব অর্পণ করেছে। স্বৈরাচারী শক্তির দীর্ঘ শোষণ পেরিয়ে আজ বাংলাদেশ একটি মুক্ত ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে পেয়েছে।

বিশ্বমঞ্চে আবেগ ও স্মৃতিরোমন্থন

জাতিসংঘের এই বিশাল আন্তর্জাতিক মঞ্চে কথা বলার সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কিছুটা আবেগাপ্লুত ও স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন। তিনি স্মরণ করেন তাঁর পিতা সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান বীর উত্তম এবং তাঁর মাতা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কথা, যাঁরা অতীতে এই একই পবিত্র মঞ্চে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের মানুষের অধিকারের কথা তুলে ধরেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ বাংলাদেশে নতুন করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে এবং মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষা হচ্ছে। জনগণের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল একটি রাষ্ট্রকে শক্তিশালী ও স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তোলা সম্ভব। নাগরিকদের অধিকার খর্ব করে কোনো শাসনকাঠামোই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না এবং বাংলাদেশ আজ বিশ্বের দরবারে তার উজ্জ্বল উদাহরণ তৈরি করেছে।

রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানের তাগিদ

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া লাখ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী তাঁর গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ বিগত নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রায় ১২ লাখেরও বেশি বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে সম্পূর্ণ মানবিক কারণে আশ্রয় দিয়ে আসছে। এই বিশাল সংখ্যক শরণার্থীর কারণে আমাদের সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদ, স্থানীয় পরিবেশ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সামাজিক ভারসাম্য রক্ষায় তীব্র সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ মনে করে যে, এই মানবিক বিপর্যয়ের মূল উৎস মিয়ানমারের অভ্যন্তরেই নিহিত এবং এর টেকসই সমাধানও তাদেরকেই করতে হবে। রোহিঙ্গাদের সম্মানজনক ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্য জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক সমাজকে আরও জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রত্যাবাসন নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গা শিবিরে জীবন রক্ষাকারী মানবিক সাহায্য সহযোগিতা অব্যাহত রাখার জন্য তিনি বৈশ্বিক অংশীদারদের আহ্বান জানান।

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি ও পরিবেশ রক্ষা কর্মসূচি

বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে নগণ্য ভূমিকা রাখা সত্ত্বেও বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাবে অন্যতম শীর্ষ ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে ধুঁকছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিশ্বমঞ্চে এই ঐতিহাসিক অন্যায়ের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, পরিবেশের এই বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে আন্তর্জাতিক মহলকে তাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলা করতে বাংলাদেশ সরকার নিজস্ব অর্থায়নে ও পরিকল্পনায় ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এর অংশ হিসেবে জলবায়ু সহনশীলতা গড়ে তুলতে এবং সবুজায়ন নিশ্চিত করতে আগামী ৫ বছরে দেশজুড়ে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের এক বিশাল ও মহতী উদ্যোগ শুরু হয়েছে। এছাড়াও এশিয়ার অনন্য প্রাকৃতিক সম্পদ ও বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনে মিঠা পানির প্রাকৃতিক প্রবাহ বৃদ্ধি এবং দেশের অন্যান্য বৃহৎ জলাধারে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে সরকার তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে।

অর্থনৈতিক গণতন্ত্র ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার রক্ষা

দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ নয়, বরং অর্থনীতির সমতা বিধান অত্যন্ত জরুরি বলে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে স্বল্পোন্নত দেশের কাতার থেকে উত্তরণের একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রয়েছে। দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করতে এবং গ্রামীণ ও শহরের ব্যবধান কমাতে তাঁর সরকার বদ্ধপরিকর। নির্বাচনের আগে জনগণের সামনে যে ৩১ দফা সামাজিক রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছিল, বর্তমান সরকার তা অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বাস্তবায়নে নিয়োজিত রয়েছে। এই উন্নয়নের মূল লক্ষ্য হলো দেশের প্রতিটি নাগরিক যেন অর্থনৈতিক সুবিধার অংশীদার হতে পারেন। দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি নারী হওয়ায় নারীদেরকে সমাজের মূল স্রোতধারায় নিয়ে আসতে কাজ করছে তাঁর সরকার। প্রান্তিক নারীদের আর্থিক সক্ষমতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রতিটি পরিবারের নারী প্রধানের নামে বিশেষ ফ্যামিলি কার্ড ইস্যু করা হচ্ছে, যা তাদের আত্মমর্যাদা বৃদ্ধির এক বলিষ্ঠ হাতিয়ার। সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিটি সেক্টরের সাহায্য ও সুবিধাসমূহকে একত্রিত করে একটি সর্বজনীন ইউনিভার্সাল কার্ড চালু করার, যার ফলে জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি আরও গতিশীল হবে।

বৈশ্বিক সহযোগিতা ও প্রযুক্তি ব্যবহারের যুগোপযোগী আহ্বান

বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্য “রিস্টোরিং ট্রাস্ট, ম্যানেজিং ট্রান্সফরমেশন: এ ইউনাইটেড নেশনস দ্যাট ডেলিভারস ফর অল” অত্যন্ত অর্থবহ এবং সময়োপযোগী বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিশ্বব্যাপী বিরাজমান সংঘাত, আস্থা সংকট এবং বৈষম্য দূর করতে জাতিসংঘকে আরও জোরালো ভূমিকা পালনের পরামর্শ দেন তিনি। বিশ্বের বিভিন্ন গোলযোগপূর্ণ অঞ্চলে কঠিন প্রতিকূলতা জয় করে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে নিয়োজিত থাকা বাংলাদেশের সশস্ত্র ও পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের কথা তিনি উল্লেখ করেন। বিশেষ করে শান্তিরক্ষী বাহিনীতে বাংলাদেশের নারী সদস্যদের সাহসী অংশগ্রহণ ‘নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা’ বিষয়ক জাতিসংঘের বৈশ্বিক এজেন্ডাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতির এই যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার যেন কোনো দেশের সার্বভৌমত্ব বা সামাজিক বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে না পারে, সেজন্য জাতিসংঘের নেতৃত্বে একটি সুনির্দিষ্ট এবং শক্তিশালী বৈশ্বিক নীতিমালা প্রণয়নের জোর দাবি জানান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তিনি ১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট সাধারণ পরিষদের ১১তম বিশেষ অধিবেশনে ভাষণ দিয়েছিলেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এর ১৩ বছর পর ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৪৮তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মা ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ভাষণ দেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মাননীয় সভাপতি, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ায় আপনাকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: একইসঙ্গে আমি বিদায়ী সভাপতি ম্যাডাম এনালেনা বেয়ারবক-কেও তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বের জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জুলাই-আগষ্টে বীর ছাত্র জনতার গণ অভুত্থানে সকল শহীদ এবং আহতদের প্রতিও আমি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা জানাই।