আকাশ জাতীয় ডেস্ক:
সুনামগঞ্জের ছাতকের টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে ২০০৫ সালের বিস্ফারণের জন্য কানাডার কোম্পানি নাইকো দায়ী করে এর জন্য ক্ষতিপূরণ দাবির মামলায় বাংলাদেশ জিতে গেছে। অনুমান করা হচ্ছে ক্ষতিপূরণ হিসেবে বাংলাদেশ আট হাজার কোটি টাকা পেতে পারে। গত রোববারের এই ঘটনা জানার পরে বাংলাদেশের বহু মানুষ তাঁদের আনন্দ আর খুশি প্রকাশ করলেও বাংলাদেশের সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে তেমন উল্লেখযোগ্য কোন প্রতিক্রিয়ার খবর মিডিয়ায় পাওয়া যায়নি। এর কারণ কী? টাকা না অন্য কিছু?
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরে শেখ হাসিনার সরকার ১৯৯৬-২০০১ সালে নাইকোর সঙ্গে দরকষাকষি করলেও শেষ পর্যন্ত চুক্তি করেনি। কারণ নাইকোর একটি শর্ত বাংলাদেশের স্বার্থের বিপক্ষে ছিল। কিন্তু বিএনপি ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসার পরেই বাংলাদেশ বিরোধী শর্ত মেনে নিয়েই চুক্তি সই করে ফেলে। ২০০৩ সালের ১৬ অক্টোবর নাইকো-বাপেক্স জেভিএ সই হয়। এই চুক্তি স্বাক্ষরের পিছনে ছিল বিরাট অংকের দুর্নীতি যা পরবর্তী সময়ে কানাডার আদালতে প্রমাণিত হয় যে নাইকো বাংলাদেশে খালেদা জিয়ার আমলে পদে পদে ঘুষ দিয়ে কাজ পায়। বলা হয় হাওয়া ভবনের গিয়াস উদ্দিন আল মামুন ঘুষ নেন এবং খালেদা জিয়ার তৎকালীন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী এ কে এম মোশাররফ হোসেনকে ১ লাখ ৯০ হাজার কানাডীয় ডলার দামের একটি গাড়ি ও বিদেশ সফরের জন্য পাঁচ হাজার ডলার ঘুষ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে নাইকোর বিরুদ্ধে। দুর্নীতির মাধ্যমে নাইকোর সঙ্গে বাপেক্সের চুক্তি সম্পাদন প্রক্রিয়ায় জড়িত হিসেবে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদসহ ২৬ জনের নাম আন্তর্জাতিক আদালতে (ইকসিড) উপস্থাপন করা হয়েছে।
নাইকো ২০১০ সালে ছাতক গ্যাসক্ষেত্র বিস্ফোরণের ঘটনায় তারা দায়ী নয় মর্মে ঘোষণা চেয়ে ব্রিটেনের লন্ডনে বিনিয়োগ বিরোধ নিষ্পত্তিসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সালিসি আদালত (ইকসিড) এ একটি সালিসি মোকদ্দমা দায়ের করে। এর প্রেক্ষিতে শেখ হাসিনার সরকার বাপেক্স আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের দিয়ে গঠিত একটি কমিটির মাধ্যমে একটি সমীক্ষা পরিচালনা করেন। এতে নাইকোর কাছে বাপেক্স ১১৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং বাংলাদেশ সরকার ৮৯৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়ে ইকসিডে নালিশ করা হয়।
যা হোক এটা নিয়ে অনেক ঘটনা ঘটে যার ফিরিস্তি না দিয়েই বলা যায় যে, শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় এসে দেখেন যে এই মামলায় বাপেক্সের আইনজীবী ছিলেন ব্যারিস্টার ড. কামাল হোসেন। চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য আর তাঁর অতীত কর্মকাণ্ড বিবেচনা করে ড. কামাল হোসেনকে এই মামলায় বাপেক্সর আইনজীবী থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। পরে এই মামলার আইনজীবী হিসেবে নিয়োগ পান আইনজীবী তৌফিক নেওয়াজ পরে তাঁকেও অব্যাহতি দিয়ে তরুণ আইনজীবী মইন গনিকে মামলার আইনজীবী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এ ছাড়াও মামলায় নিয়োগ করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ফলি হক ফার্মকে। অপরদিকে নাইকোর পক্ষে আইনজীবী ছিলেন রোকনউদ্দিন মাহমুদ। ২০১৫ সালের পর থেকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে নতুন করে তথ্যউপাত্ত উপস্থাপন শুরু হয়।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে খালেদা জিয়া গ্রেপ্তার হওয়ার পর ২০০৭ সালের ৯ ডিসেম্বর তেজগাঁও থানায় এ নাইকো দুর্নীতি মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ২০০৮ সালের ৫ মে খালেদা জিয়াসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে এ মামলায় অভিযোগপত্র দেয় দুদক। মামলায় অভিযোগ করা হয়, ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনটি গ্যাসক্ষেত্র পরিত্যক্ত দেখিয়ে কানাডীয় কোম্পানি নাইকোর হাতে `তুলে দেওয়ার` মাধ্যমে আসামিরা রাষ্ট্রের প্রায় ১৩ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকার ক্ষতি করেছেন।
বিগত আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন দুটি সরকারের আমলেই এ কাজ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলে। আর ওই সময় জ্বালানি সচিব ছিলেন বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী। চুক্তি সম্পাদনে শেখ হাসিনার ভূমিকা না থাকায় আদালত (ইকসিড) এ মামলায় থেকে তাঁকে অব্যাহতি দিয়েছে।
নাইকো ইকসিডের আদালতে স্বীকার করেছে যে, ছাতক গ্যাসক্ষেত্র পেতে তারা গিয়াস আল মামুন, কাশেম শরীফ ও সেলিম ভূঁইয়াকে অর্থ দিয়েছে। ছাতক গ্যাসক্ষেত্রটিকে একটি পুরানো গ্যাসক্ষেত্র বা প্রান্তিক গ্যাসক্ষেত্র হিসাবে দেখানোর দাবি করে নাইকো। অথচ এ গ্যাসক্ষেত্রটিতে কখনো গ্যাস উত্তোলনই করা হয়নি। এদেশের প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ, আমলা ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নাইকো যোগাযোগ করে। এ পরিপেক্ষিতে নাইকোর সঙ্গে স্থানীয় এজেন্ট হিসেবে তারা কাশেম শরীফ ও ঢাকা ক্লাবের তৎকালীন চেয়ারম্যান সেলিম ভূঁইয়ার নেতৃত্বাধীন `স্টার্টাম` নামের একটি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি সই করে। এ কোম্পানিটি সুইজারল্যান্ডে নিবন্ধিত। চুক্তি হয় ৪ মিলিয়ন ডলার দেওয়া হবে যদি তারা ছাতককে প্রান্তিক গ্যাসক্ষেত্র হিসেবে দেখিয়ে বাপেক্সের সঙ্গে যৌথ অংশিদারিত্ব চুক্তি সই করিয়ে দিতে পারে।
নাইকোর দেওয়া অর্থে গিয়াস আল মামুন ঢাকায় একটি বিদেশি ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খোলেন। সেই অ্যাকাউন্ট থেকে দুটি কার্ড (ডুয়েল কার্ড) নেন। একটি নিজের ব্যবহার করেন। অন্যটি ব্যবহার করতেন তারেক রহমান। এ কার্ডের মাধ্যমে তারেক রহমান সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড সহ বহু দেশে কেনাকাটা ও বিভিন্ন ব্যয়ে খরচ করেছেন বলে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই ও কানাডার পুলিশের তদন্তে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ঢাকার একটি আদালতে দুদকের করা নাইকো দুর্নীতির মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
বাপেক্সের সঙ্গে নাইকোর চুক্তি সম্পাদনে বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার সম্পর্ক রয়েছে। তবে এটি ফৌজদারি অপরাধ হওয়ায় ইকসিডের এখতিয়ার নেই এ বিষয়ে কোনো আদেশ দেওয়া। খালেদা জিয়ার দেশের আদালতে নাইকো দুর্নীতি মামলা চলবে। দেশের আদালতে নাইকো দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের বিচার হবে বলেও তিনি জানান। খালেদা জিয়া দেশ-বিরোধী চুক্তি করেছিলেন দুর্নীতির মাধ্যমে কাজেই খালেদা জিয়া এবার শুধু দেশে নয়, আন্তর্জাতিকভাবেও ফেঁসে গেলেন।
এই ঘটনায় বামতি আর জামতি বুদ্ধিজীবীগণ টাস্কি খেয়ে গেছেন। এতে তাঁদের শেষ ভরসা, খালেদা জিয়া বা তারেক জিয়া কেউ আর সম্ভাবনার তালিকায় থাকতে পারছেন না। কারণ দেশের আদালতে নাইকো দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের বিচার হবে। তাই কেউ টাকা ছাড়ছেন না। ফলে টাকার বিনিময়ে বিবৃতি-বাজ বামাতি জামাই বুদ্ধিজীবীদের মুখে তাই কুলুপ। কোন রা নেই, শুধু এপাশ ওপাশ করছেন।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 



















