ঢাকা ০৪:১৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী ২০২৬, ৮ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

আয়কর মেলার উদ্দেশ্য অবশ্যই সফল হতে হবে

অাকাশ জাতীয় ডেস্ক:

নতুন অর্থবিধির আওতায় আনীত পরিবর্তন অনুযায়ী এবার নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে জাতীয়, বিভাগীয়, জেলা ও নির্বাচিত উপজেলা পর্যায়ে আয়কর মেলা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।

আয়কর মেলার একটি প্রাতিষ্ঠানিক তাৎপর্য লাভের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে এবং প্রত্যাশা এই যে, সুচিন্তিতভাবে আয়োজিত আয়কর মেলা থেকে ভৌত, তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক উপযোগিতা অর্জন করা যাবে। এবারের কর মেলা আয়োজনের এ প্রেক্ষাপটে এটা জানা প্রশান্তিদায়ক যে, কর রাজস্ব আহরণে অগ্রগতি বা প্রবাহ জোরদার হচ্ছে।

আয়কর প্রদানে উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি তথা করদাতাবান্ধব পরিবেশ সৃজনের পদ্ধতি প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনার প্রয়াসের ফসল থেকে এ সাফল্য আসছে। এ সাফল্য ধরে রাখতে হবে অর্থনীতিতে কর জিডিপির অনুপাত ন্যায্য পর্যায়ে না পৌঁছানো পর্যন্ত। বাঞ্ছিত পরিমাণ আয়কর আহরণ সরকারের রাজস্ব তহবিলের স্ফীতির জন্য শুধু নয়, সম্পদ বণ্টন ব্যবস্থা সুষমকরণের দ্বারা সামাজিক সুবিচার সুনিশ্চিতকরণের পাশাপাশি ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও অঞ্চলগত উন্নয়ন বৈষম্য দূরীকরণের জন্যও জরুরি।

২০০৭ সালে প্রথমবারের মতো বৃত্তাবদ্ধ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে কর রাজস্ব আহরণের সাফল্য লাভের পর আর পেছনে তাকাতে হয়নি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে। গত ১১ অর্থবছরে সার্বিক রাজস্ব প্রায় দুই শতভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে আর আয়কর ২০০৭-০৮ অর্থবছরে যেখানে অর্জিত হয়েছিল ১১,৭৪৫ কোটি টাকা; ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তা ৭৫ হাজার কোটির কাছাকাছি পৌঁছেছে।

এটা অবশ্য ঠিক যে, ২০০৭-০৮ অর্থবছরে বাস্তবায়িত এডিপির পরিমাণ ছিল মাত্র ১৮,৪৫৫ কোটি টাকা আর ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তা ৯৮ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয়। এডিপি বাস্তবায়নের হার বৃদ্ধির সঙ্গে স্থিরকৃত আয়কর অধিক পরিমাণে আহরণের একটা অবারিত সুযোগ ও সম্পর্ক আছে।

দেখা যাচ্ছে, সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে কোম্পানি ও কোম্পানি ব্যতীত করের অনুপাত ৫৯:৪১ থেকে ৫৩:৪৭-এ উন্নীত হয়েছে, আর সার্বিক কর রাজস্বে আয়করের হিস্যা দাঁড়িয়েছে ২৫ থেকে ৩৪-এর কাছাকাছি। বলে রাখা ভালো, আয়করকে যৌক্তিকভাবে মোড়লিপনায় আসতে হলে আরও জোরে চালাতে হবে পা, হতে হবে আরও গতিশীল; চাই অধিকতর সমন্বিত উদ্যোগ।

নতুন উদ্যোগ নেয়ার পাশাপাশি পুরনো উদ্যোগের সালতামামি বা ফলোআপ আবশ্যক হবে। ২০০৬-০৭ সালে জমকালো জরিপের মাধ্যমে যে লক্ষাধিক করদাতা শামিল হয়েছিলেন করদাতার মিছিলে, তারা কি আছেন? ২০০৭-০৮ কিংবা ২০০৮-০৯-এ যারা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে করদাতা হয়েছিলেন, তাদের খবর কী? দেশে যে প্রায় ছয় লক্ষাধিক ক্রেডিট কার্ডধারী আছেন, আছেন প্রায় সমসংখ্যক গাড়ি-বাড়ির মালিক; তাদের কাছে যাওয়ার সর্বশেষ অবস্থা কী?

ভুয়া টিআইএন ব্যবহারকারীদের সঠিক পথে আনার প্রতিবন্ধকতাগুলোর দিকে নজর দেয়ার সময় কখনও শেষ হওয়ার নয়। কর মেলায় মানুষের উপচে পড়া ভিড় প্রমাণ করে- করদাতাদের আগ্রহ বাড়ছে। অনেকেই ঝামেলামুক্ত উপায়ে বা পরিবেশে কর দিতে চান এবং তারা কর দেয়াকে দায়িত্ব মনে করছেন। তাদের এ আগ্রহ ধরে রাখতে হবে। তাদের উদ্বোধিত দায়িত্ববোধের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে; তাদের আগ্রহকে সমীহ করতে হবে।

করদাতাদের উদ্বুদ্ধকরণে প্রচার-প্রচারণার কাজে আগে তেমন কোনো বরাদ্দ ছিল না। কর আহরণের ব্যাপারে সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক থেকে অতীতে বর্তমানের মতো প্রযত্ন প্রদানের নজিরও ছিল না। এখন এসব সুযোগ যথাযথভাবে কাজে লাগানোর কোনো বিকল্প নেই। তবে সেই ১৯৯০ সাল থেকে এ পর্যন্ত ১২টি প্রকল্প (অধিকাংশই বিদেশি সাহায্যপুষ্ট, বিদেশি বিশেষজ্ঞের ভারে ন্যুব্জ) বাস্তবায়ন করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড শুধু অটোমেশন, অনলাইনিং, সিট্রমলাইনিং, স্ট্রেংদেনিংয়ের জন্য।

২৭ বছরে সেসব প্রকল্প বাস্তবায়নের দ্বারা অর্জিত অগ্রগতি দৃষ্টিগোচর না হোক, অন্তত অনুভব করা সম্ভব হবে- যদি দেখা যায়, সবার মাইন্ডসেট ও কর্মকুশলতায় গুণগত পরিবর্তন এসেছে। তবে বর্তমানে যে অব্যাহত অগ্রগতির পেছনে সেসব প্রয়াসের প্রচ্ছন্ন উপস্থিতি এবং তা নেপথ্য প্রেরণা হিসেবে কাজ করছে, তা অনস্বীকার্য। একই সঙ্গে সম্মানিত করদাতাদের সার্বিক সহযোগিতা, তাদের অভূতপূর্ব দায়িত্ববোধের উদ্বোধন, জটিল কর আইনগুলো সহজীকরণের প্রতি তাদের সামান্য প্রত্যাশাকে সাধুবাদ জানাই।

জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে আয়কর মেলা আয়োজনের মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে- কর প্রদানে মানুষকে সচেতন করা, কর বিভাগকে করদাতাদের কাছে নিয়ে যাওয়া এবং তাদের মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে আনা। মেলা আয়োজনের গুরুত্ব প্রচারে যে অর্থ খরচের প্রয়োজন পড়ে, এ ব্যয় সরকারের তহবিল থেকেই বহন করা উচিত। কোনো স্পন্সরের টাকায় মেলার আয়োজন, পোস্টার, ফেস্টুন ও ক্রোড়পত্র প্রকাশ শোভনীয় ও সমীচীন হবে না- এ উপলব্ধি জাগ্রত থাকতে হবে।

সার্বিকভাবে সেবাধর্মী মনোভাব নিয়েই আয়কর মেলার আয়োজন করতে হবে। কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে মেলা করা হলে সেবা ও সচেতনতা সৃষ্টির ফোকাসটা বাণিজ্যিক পর্যায়ে চলে যেতে পারে। মনে রাখা উচিত, আয়কর মেলা কোনো বাণিজ্যিক মেলা নয়। সেবা প্রদান, প্রক্রিয়া সহজীকরণ ও জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর মাধ্যমে করের আওতা বৃদ্ধি এবং কর ফাঁকি রোধ করা গেলেই দেশে কর জিডিপি অনুপাত বাড়বে।

নভেম্বর মাসে আয়কর মেলার আয়োজন, সেরা করদাতাদের পুরস্কৃত করা এবং রিটার্ন দাখিলের শেষ তারিখ ৩০ নভেম্বরকে কর দিবস নির্ধারণের ধ্যান-ধারণা নিয়ে পালন ও মেলার আয়োজন চলবে, তাতে উদ্দেশ্য কতটা পূরণ করা যাবে এবং এর মৌল লক্ষ্য কতটা রক্ষা হবে, সেটা দেখার বিষয় হয়ে থাকবে। কেননা এসব কর্মসূচিকে অবশ্যই লক্ষ্যভেদী হতে হয়।

রাজস্ব আয় বৃদ্ধি ও কর জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর আবশ্যকতাকে এ মুহূর্তে অন্যতম জরুরি বিষয় বলে ভাববার অবকাশ রয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে প্রকৃত অর্থে বোঝা যাচ্ছে না করদাতা সত্যিই বাড়ছে কিনা। সার্বিকভাবে উৎসে কর ও কোম্পানির করের ওপরই আয়কর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এটি বাড়ছে, কিন্তু তা কাঙ্ক্ষিত বা যথেষ্ট নয়। দেখতে হবে, করের প্রকৃত পরিধি বাড়ছে কিনা। করদাতার সংখ্যা বাড়ছে কিনা এবং সেই হারে করের পরিমাণ বাড়ছে কিনা।

আবার এর সঙ্গে কর ফাঁকি রোধ করতেও সর্বোচ্চ উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে কর্পোরেট কর যারা দিচ্ছেন, তারা সবাই সঠিক পরিমাণে দিচ্ছেন কিনা সেটিও শক্তভাবে এবং দায়িত্বশীলতার সঙ্গে দেখার দরকার রয়েছে। কারণ প্রায়শ বলা হয় বা দেখা যায়- অমুক প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির এত কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি। পাবলিক মানি রিয়েলাইজেশনের প্রশ্ন- এটি তো ছেলেখেলার বিষয় নয়। এখানে কর আহরণকারী প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কারণ সেখানে কর্তৃপক্ষের মনিটরিংয়ের, প্রয়াসের, দক্ষতার, সততার ও দায়িত্বশীলতার ঘাটতির প্রতিই ইঙ্গিত করে। এনবিআর এ দুর্বলতা কাটিয়ে কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে।

গত কয়েক বছরে রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় এনবিআরের বেশ কিছু সংস্কার, জনবল ও কাঠামোয় ব্যাপক সম্প্রসারণ হয়েছে। সক্ষমতা অনেক বেড়েছে। রাজস্ব আদায়ও বেড়েছে। এটি অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে ভেবে দেখতে হবে- যে হারে সংস্কার ও সম্প্রসারণ হয়েছে, সে হারে কর বা করদাতা বাড়ছে কিনা কিংবা যারা যুক্ত হচ্ছে, তারা পরে থাকতে পারছে কিনা? বিদ্যমান কর ব্যবস্থায় কিছু সীমাবদ্ধতা এবং ক্ষেত্রবিশেষে কর বিভাগের অপারগ পরিস্থিতির কারণে নিয়মিত ও ন্যায্য করদাতারা যেন হয়রানির শিকার না হন, সেদিকে নজরদারি বাড়াতে হবে।

করের আওতা বাড়ানোর জন্য কর প্রদানে নিরুৎসাহিতকরণের মতো পরিস্থিতি এড়িয়ে চলাও জরুরি। আর অধ্যাদেশ থেকে আয়কর আইনটি যুগোপযোগী করতে নতুন মলাটে প্রকাশে আরও বিলম্ব করা বাঞ্ছনীয় নয় কোনোমতেই।

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ : সাবেক সচিব; জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের সাবেক চেয়ারম্যান

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

আয়কর মেলার উদ্দেশ্য অবশ্যই সফল হতে হবে

আপডেট সময় ০৯:৪৮:২৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৮

অাকাশ জাতীয় ডেস্ক:

নতুন অর্থবিধির আওতায় আনীত পরিবর্তন অনুযায়ী এবার নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে জাতীয়, বিভাগীয়, জেলা ও নির্বাচিত উপজেলা পর্যায়ে আয়কর মেলা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।

আয়কর মেলার একটি প্রাতিষ্ঠানিক তাৎপর্য লাভের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে এবং প্রত্যাশা এই যে, সুচিন্তিতভাবে আয়োজিত আয়কর মেলা থেকে ভৌত, তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক উপযোগিতা অর্জন করা যাবে। এবারের কর মেলা আয়োজনের এ প্রেক্ষাপটে এটা জানা প্রশান্তিদায়ক যে, কর রাজস্ব আহরণে অগ্রগতি বা প্রবাহ জোরদার হচ্ছে।

আয়কর প্রদানে উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি তথা করদাতাবান্ধব পরিবেশ সৃজনের পদ্ধতি প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনার প্রয়াসের ফসল থেকে এ সাফল্য আসছে। এ সাফল্য ধরে রাখতে হবে অর্থনীতিতে কর জিডিপির অনুপাত ন্যায্য পর্যায়ে না পৌঁছানো পর্যন্ত। বাঞ্ছিত পরিমাণ আয়কর আহরণ সরকারের রাজস্ব তহবিলের স্ফীতির জন্য শুধু নয়, সম্পদ বণ্টন ব্যবস্থা সুষমকরণের দ্বারা সামাজিক সুবিচার সুনিশ্চিতকরণের পাশাপাশি ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও অঞ্চলগত উন্নয়ন বৈষম্য দূরীকরণের জন্যও জরুরি।

২০০৭ সালে প্রথমবারের মতো বৃত্তাবদ্ধ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে কর রাজস্ব আহরণের সাফল্য লাভের পর আর পেছনে তাকাতে হয়নি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে। গত ১১ অর্থবছরে সার্বিক রাজস্ব প্রায় দুই শতভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে আর আয়কর ২০০৭-০৮ অর্থবছরে যেখানে অর্জিত হয়েছিল ১১,৭৪৫ কোটি টাকা; ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তা ৭৫ হাজার কোটির কাছাকাছি পৌঁছেছে।

এটা অবশ্য ঠিক যে, ২০০৭-০৮ অর্থবছরে বাস্তবায়িত এডিপির পরিমাণ ছিল মাত্র ১৮,৪৫৫ কোটি টাকা আর ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তা ৯৮ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয়। এডিপি বাস্তবায়নের হার বৃদ্ধির সঙ্গে স্থিরকৃত আয়কর অধিক পরিমাণে আহরণের একটা অবারিত সুযোগ ও সম্পর্ক আছে।

দেখা যাচ্ছে, সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে কোম্পানি ও কোম্পানি ব্যতীত করের অনুপাত ৫৯:৪১ থেকে ৫৩:৪৭-এ উন্নীত হয়েছে, আর সার্বিক কর রাজস্বে আয়করের হিস্যা দাঁড়িয়েছে ২৫ থেকে ৩৪-এর কাছাকাছি। বলে রাখা ভালো, আয়করকে যৌক্তিকভাবে মোড়লিপনায় আসতে হলে আরও জোরে চালাতে হবে পা, হতে হবে আরও গতিশীল; চাই অধিকতর সমন্বিত উদ্যোগ।

নতুন উদ্যোগ নেয়ার পাশাপাশি পুরনো উদ্যোগের সালতামামি বা ফলোআপ আবশ্যক হবে। ২০০৬-০৭ সালে জমকালো জরিপের মাধ্যমে যে লক্ষাধিক করদাতা শামিল হয়েছিলেন করদাতার মিছিলে, তারা কি আছেন? ২০০৭-০৮ কিংবা ২০০৮-০৯-এ যারা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে করদাতা হয়েছিলেন, তাদের খবর কী? দেশে যে প্রায় ছয় লক্ষাধিক ক্রেডিট কার্ডধারী আছেন, আছেন প্রায় সমসংখ্যক গাড়ি-বাড়ির মালিক; তাদের কাছে যাওয়ার সর্বশেষ অবস্থা কী?

ভুয়া টিআইএন ব্যবহারকারীদের সঠিক পথে আনার প্রতিবন্ধকতাগুলোর দিকে নজর দেয়ার সময় কখনও শেষ হওয়ার নয়। কর মেলায় মানুষের উপচে পড়া ভিড় প্রমাণ করে- করদাতাদের আগ্রহ বাড়ছে। অনেকেই ঝামেলামুক্ত উপায়ে বা পরিবেশে কর দিতে চান এবং তারা কর দেয়াকে দায়িত্ব মনে করছেন। তাদের এ আগ্রহ ধরে রাখতে হবে। তাদের উদ্বোধিত দায়িত্ববোধের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে; তাদের আগ্রহকে সমীহ করতে হবে।

করদাতাদের উদ্বুদ্ধকরণে প্রচার-প্রচারণার কাজে আগে তেমন কোনো বরাদ্দ ছিল না। কর আহরণের ব্যাপারে সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক থেকে অতীতে বর্তমানের মতো প্রযত্ন প্রদানের নজিরও ছিল না। এখন এসব সুযোগ যথাযথভাবে কাজে লাগানোর কোনো বিকল্প নেই। তবে সেই ১৯৯০ সাল থেকে এ পর্যন্ত ১২টি প্রকল্প (অধিকাংশই বিদেশি সাহায্যপুষ্ট, বিদেশি বিশেষজ্ঞের ভারে ন্যুব্জ) বাস্তবায়ন করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড শুধু অটোমেশন, অনলাইনিং, সিট্রমলাইনিং, স্ট্রেংদেনিংয়ের জন্য।

২৭ বছরে সেসব প্রকল্প বাস্তবায়নের দ্বারা অর্জিত অগ্রগতি দৃষ্টিগোচর না হোক, অন্তত অনুভব করা সম্ভব হবে- যদি দেখা যায়, সবার মাইন্ডসেট ও কর্মকুশলতায় গুণগত পরিবর্তন এসেছে। তবে বর্তমানে যে অব্যাহত অগ্রগতির পেছনে সেসব প্রয়াসের প্রচ্ছন্ন উপস্থিতি এবং তা নেপথ্য প্রেরণা হিসেবে কাজ করছে, তা অনস্বীকার্য। একই সঙ্গে সম্মানিত করদাতাদের সার্বিক সহযোগিতা, তাদের অভূতপূর্ব দায়িত্ববোধের উদ্বোধন, জটিল কর আইনগুলো সহজীকরণের প্রতি তাদের সামান্য প্রত্যাশাকে সাধুবাদ জানাই।

জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে আয়কর মেলা আয়োজনের মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে- কর প্রদানে মানুষকে সচেতন করা, কর বিভাগকে করদাতাদের কাছে নিয়ে যাওয়া এবং তাদের মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে আনা। মেলা আয়োজনের গুরুত্ব প্রচারে যে অর্থ খরচের প্রয়োজন পড়ে, এ ব্যয় সরকারের তহবিল থেকেই বহন করা উচিত। কোনো স্পন্সরের টাকায় মেলার আয়োজন, পোস্টার, ফেস্টুন ও ক্রোড়পত্র প্রকাশ শোভনীয় ও সমীচীন হবে না- এ উপলব্ধি জাগ্রত থাকতে হবে।

সার্বিকভাবে সেবাধর্মী মনোভাব নিয়েই আয়কর মেলার আয়োজন করতে হবে। কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে মেলা করা হলে সেবা ও সচেতনতা সৃষ্টির ফোকাসটা বাণিজ্যিক পর্যায়ে চলে যেতে পারে। মনে রাখা উচিত, আয়কর মেলা কোনো বাণিজ্যিক মেলা নয়। সেবা প্রদান, প্রক্রিয়া সহজীকরণ ও জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর মাধ্যমে করের আওতা বৃদ্ধি এবং কর ফাঁকি রোধ করা গেলেই দেশে কর জিডিপি অনুপাত বাড়বে।

নভেম্বর মাসে আয়কর মেলার আয়োজন, সেরা করদাতাদের পুরস্কৃত করা এবং রিটার্ন দাখিলের শেষ তারিখ ৩০ নভেম্বরকে কর দিবস নির্ধারণের ধ্যান-ধারণা নিয়ে পালন ও মেলার আয়োজন চলবে, তাতে উদ্দেশ্য কতটা পূরণ করা যাবে এবং এর মৌল লক্ষ্য কতটা রক্ষা হবে, সেটা দেখার বিষয় হয়ে থাকবে। কেননা এসব কর্মসূচিকে অবশ্যই লক্ষ্যভেদী হতে হয়।

রাজস্ব আয় বৃদ্ধি ও কর জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর আবশ্যকতাকে এ মুহূর্তে অন্যতম জরুরি বিষয় বলে ভাববার অবকাশ রয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে প্রকৃত অর্থে বোঝা যাচ্ছে না করদাতা সত্যিই বাড়ছে কিনা। সার্বিকভাবে উৎসে কর ও কোম্পানির করের ওপরই আয়কর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এটি বাড়ছে, কিন্তু তা কাঙ্ক্ষিত বা যথেষ্ট নয়। দেখতে হবে, করের প্রকৃত পরিধি বাড়ছে কিনা। করদাতার সংখ্যা বাড়ছে কিনা এবং সেই হারে করের পরিমাণ বাড়ছে কিনা।

আবার এর সঙ্গে কর ফাঁকি রোধ করতেও সর্বোচ্চ উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে কর্পোরেট কর যারা দিচ্ছেন, তারা সবাই সঠিক পরিমাণে দিচ্ছেন কিনা সেটিও শক্তভাবে এবং দায়িত্বশীলতার সঙ্গে দেখার দরকার রয়েছে। কারণ প্রায়শ বলা হয় বা দেখা যায়- অমুক প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির এত কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি। পাবলিক মানি রিয়েলাইজেশনের প্রশ্ন- এটি তো ছেলেখেলার বিষয় নয়। এখানে কর আহরণকারী প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কারণ সেখানে কর্তৃপক্ষের মনিটরিংয়ের, প্রয়াসের, দক্ষতার, সততার ও দায়িত্বশীলতার ঘাটতির প্রতিই ইঙ্গিত করে। এনবিআর এ দুর্বলতা কাটিয়ে কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে।

গত কয়েক বছরে রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় এনবিআরের বেশ কিছু সংস্কার, জনবল ও কাঠামোয় ব্যাপক সম্প্রসারণ হয়েছে। সক্ষমতা অনেক বেড়েছে। রাজস্ব আদায়ও বেড়েছে। এটি অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে ভেবে দেখতে হবে- যে হারে সংস্কার ও সম্প্রসারণ হয়েছে, সে হারে কর বা করদাতা বাড়ছে কিনা কিংবা যারা যুক্ত হচ্ছে, তারা পরে থাকতে পারছে কিনা? বিদ্যমান কর ব্যবস্থায় কিছু সীমাবদ্ধতা এবং ক্ষেত্রবিশেষে কর বিভাগের অপারগ পরিস্থিতির কারণে নিয়মিত ও ন্যায্য করদাতারা যেন হয়রানির শিকার না হন, সেদিকে নজরদারি বাড়াতে হবে।

করের আওতা বাড়ানোর জন্য কর প্রদানে নিরুৎসাহিতকরণের মতো পরিস্থিতি এড়িয়ে চলাও জরুরি। আর অধ্যাদেশ থেকে আয়কর আইনটি যুগোপযোগী করতে নতুন মলাটে প্রকাশে আরও বিলম্ব করা বাঞ্ছনীয় নয় কোনোমতেই।

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ : সাবেক সচিব; জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের সাবেক চেয়ারম্যান