ঢাকা ০৪:১৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী ২০২৬, ৮ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

অনিশ্চয়তা কাটলে গতি ফিরবে বাণিজ্যে

অাকাশ জাতীয় ডেস্ক:

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর বেশিদিন বাকি নেই। নির্বাচনের তফসিল ঘোষিত হয়ে গেছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ২৩ ডিসেম্বর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ডিসেম্বর মানে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের ষষ্ঠ মাস। এ মাসেই চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসের শেষ। স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মনে প্রশ্ন শুধু নির্বাচন নিয়ে নয়, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতি নিয়েও।

আমদানি, রফতানি, রেমিটেন্স, বেচাকেনা ইত্যাদি সব ঠিকঠাক মতো চলছে তো? এসবের একটা বড় নির্দেশক বেসরকারি ঋণ- তার অবস্থা কী? জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার অব্যাহত থাকবে তো? নির্বাচনমুখী প্রচারণা, কাজকর্ম, রাজনৈতিক দলগুলোর তৎপরতা, সরকার ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে সংলাপ ইত্যাদির মাঝেও মানুষের মনে অর্থনীতি নিয়ে এসব প্রশ্ন উদয় হওয়া স্বাভাবিক। গত ৬ নভেম্বর এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন দেখলাম যুগান্তরে।

খবরটির শিরোনাম : ‘আসন্ন নির্বাচনের প্রভাব : বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ দারুণ মন্দা’। শিরোনামই যথেষ্ট দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থা বুঝতে। বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহে যদি মন্দাভাব থাকে, তাহলে অর্থনীতির অবস্থা ভালো থাকার কথা নয়।

শুধু যুগান্তর নয়, আরও কয়েকটি কাগজের খবরেও বর্তমান অর্থনীতির চালচিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ওইসবেও যে চিত্র ফুটে উঠেছে তা আশাপ্রদ কিছু নয়। দেখা যাচ্ছে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে গত মার্চ থেকেই মন্দা শুরু হয়েছে। ক্রমাগতভাবে ঋণের প্রবাহ হ্রাস পাচ্ছে। গত মার্চ মাসে যেখানে ঋণবৃদ্ধির পরিমাণ ছিল ১৭ দশমিক ৯৮ শতাংশ, সেখানে সেপ্টেম্বর মাসে তা হ্রাস পেয়ে হয়েছে ১৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ। একটি খবরে বলা হয়েছে, ঋণপ্রবাহের পরিমাণ বস্তুত ২০১৫ সালের ডিসেম্বরের পর এখনই সর্বনিু।

এর কারণ কী? এর প্রভাব কি আমদানি-রফতানি ব্যবসায় পড়েছে? যুগান্তরের খবরে দেখা যাচ্ছে, জুলাই-আগস্ট সময়ে আমদানি বেড়েছে মাত্র ৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ। অথচ গেল বছরের একই সময়ে আমদানি বৃদ্ধির পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৪ শতাংশ। এ সময়ে অবশ্য রফতানির পরিমাণ বেশ বেড়েছে। গেল বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বরের ৭ দশমিক ২৩ শতাংশের তুলনায় ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বরে রফতানির পরিমাণ বেড়েছে ১৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ।

আমদানি ও রফতানির যে চিত্র তথ্যে ফুটে উঠেছে, তার বাস্তব কতগুলো কারণ আছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে খাদ্যশস্য আমদানি, ভোগ্যপণ্য আমদানি হ্রাস পেয়েছে আলোচ্য সময়ে। এটা ভালো খবর। কিন্তু যে খবরটি খারাপ তা হচ্ছে, মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির পরিমাণ এ সময়ে আশানুরূপ বাড়েনি। এর সঙ্গেই বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের সরাসরি সম্পর্ক। এ সম্পর্কে আলোচনায় পরে আসছি। আগে বলে নিই রফতানি বৃদ্ধির কথা।

আলোচ্য সময়ে রফতানি বৃদ্ধির দুটি প্রধান কারণের কথা পোশাক রফতানিকারকরা বলছেন। আর তারাই রফতানি বৃদ্ধির মূল নায়ক। এখন শীতকাল। শীতকালে তৈরি পোশাকের চাহিদা বেশি থাকে। স্বাভাবিকভাবেই রফতানি বেশি হয়। এবার একটি কারণ যোগ হয়েছে। তা হচ্ছে নির্বাচন। নির্বাচনী তৎপরতার কারণে পোশাক রফতানি বিঘ্নিত হতে পারে এমন একটি আশঙ্কায় রফতানিকারকরা আগেভাগেই অর্ডার মোতাবেক রফতানির সর্বাত্মক চেষ্টা করে চলেছেন।

এদিকে রেমিটেন্সের অবস্থাও ভালো দেখা যাচ্ছে। জুলাই-আগস্ট মাসে রেমিটেন্স বৃদ্ধির পর সেপ্টেম্বরে এতে একটু টান পড়েছিল। কিন্তু অক্টোবরে আবার রেমিটেন্স বেশ বেড়েছে। আমদানি, রফতানি, রেমিটেন্স ইত্যাদির মিশ্র চিত্রের মধ্যে যা দুশ্চিন্তার বিষয় তা হচ্ছে ঋণের অবস্থা। পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, বেসরকারি খাতের ঋণ হ্রাস পাচ্ছে। এর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের।

আমরা জানি, বেসরকারি বিনিয়োগ প্রায় স্থবির। তাও প্রায় এক দশক ধরে। সরকারি বিনিয়োগের ওপর আমরা নির্ভরশীল। বেসরকারি বিনিয়োগ যে হারে বাড়ছে তা বলা যায় হতাশাজনক। অথচ এ অবস্থার উন্নতি দরকার। এবং এর জন্য দরকার বেসরকারি খাতে যথাযথ পরিমাণের ঋণপ্রবাহ। ঋণপ্রবাহের দুটি দিক আছে। চাহিদার দিক এবং সরবরাহের দিক। অর্থাৎ ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের দিক এবং ব্যাংকের দিক। ব্যাংকের দিক এ কারণে যে, আমাদের দেশে শিল্পায়নের জন্য ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করার নীতি অনুসরণ করা হয়। অতএব, দুটি দিকই আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথমেই আসা যাক উদ্যোক্তাদের প্রশ্নে। এ মুহূর্তে দেখা যাচ্ছে, ব্যবসায়ীরা নতুন উদ্যোগের ব্যাপারে উৎসাহিত নন। কারণ হিসেবে নির্বাচনের কথাই বলা হচ্ছে। নির্বাচন নিয়ে আমাদের দেশে বরাবরই একটা অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। ২০১৪-এর নির্বাচনকালে তো একটা বড় রকমের অশান্তি সৃষ্টি হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সংবিধান রক্ষার খাতিরে একটা নির্বাচন হয়। এবারও দেখা যাচ্ছে অস্থিরতার আলামত।

এ প্রেক্ষাপটে ব্যবসায়ীরা নতুন উদ্যোগে যাচ্ছেন না। তারা আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে চান। বড় বড় ব্যবসায়ীর কথা বাদ দিই, ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের মধ্যেও একটা কালক্ষেপণের প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। কেউ টাকা বের করতে চাইছেন না। সবারই অপেক্ষা নির্বাচনের জন্য। ফলাফল কী হয় তা তারা দেখতে চান। এ অবস্থা দেশের অর্থনীতির জন্য ভালো নয়। আমাদের উচিত এমন একটা অবস্থা সৃষ্টি করা যাতে নির্বাচন নির্বিশেষে দেশে স্থায়ী ও স্থিতিশীল একটা অবস্থা বিরাজ করে। বড় ব্যবসায়ী এবং নতুন উদ্যোক্তা এগিয়ে না আসার কারণে প্রধানত মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে।

এমনকি ভোগ্যপণ্য আমদানির ঋণপত্রেও ভাটা পড়েছে বলে বোঝা যাচ্ছে। এমনিতে সাধারণভাবে বাজারেও একটা মন্দাভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরাও একই কথা বলছেন। তাদের বেচাকেনায়ও একটা মন্দাভাব তৈরি হয়েছে। নির্বাচনের কাজে লাগে এমন সব বেচাকেনায় একটা ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। আবার কাগজে দেখলাম চট্টগ্রাম অঞ্চলে যারা নির্বাচন করবেন তাদের অধিকাংশই ব্যবসায়ী, বড় বড় ব্যবসায়ী। স্বভাবতই তারা এখন মনোনয়ন নিয়ে ব্যস্ত। ব্যস্ত এলাকার রাজনীতি নিয়ে। অতএব, তাদের ব্যবসায়িক তৎপরতায় একটা মন্দা দেখা দিয়েছে।

এ ছাড়া কাগজের খবর- চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা নানা সমস্যায় ভুগছেন। ব্যাংকগুলো সমানে মামলা করছে খেলাপিদের কাছ থেকে টাকা উদ্ধার করতে। ব্যাংকের মামলায় কয়েকদিন আগে একজন বড় ব্যবসায়ী গ্রেফতার হয়েছেন। এসব কারণে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের মধ্যে একটা ‘আতঙ্ক’ বিরাজ করছে বলে মনে হচ্ছে। এতে আমদানি ব্যবসায় একটা বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। কারণ চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা আমদানি ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন। তারা ব্যাংকের ঋণও নেন অনেক বেশি। এসব কারণেও নতুন নতুন উদ্যোক্তারা, ব্যবসায়ীরা নতুন শিল্প স্থাপনে একটু ধীরগতিতে এগোচ্ছেন বলে মনে হয়। বর্তমান সরকার নির্বাচনে জিতলে এক রকমের অবস্থা হবে, আবার ক্ষমতার পালাবদল হলে ভিন্ন পরিস্থিতির জন্ম হবে। এই অনিশ্চয়তার মধ্যে আছেন ব্যবসায়ীরা।

শুধু ব্যবসায়ীদের অনীহার কারণেই ঋণ সরবরাহ যথেষ্ট পরিমাণে বাড়ছে না, এ কথা বলা হবে অতিশয়োক্তি। ব্যাংকগুলোও ধীরে চলার পক্ষে বলে মনে হয়। তাদের সমস্যা কয়েকটি। এখনও অনেক ব্যাংক আমানত সংগ্রহে ততটা সফল নয়। তারা ‘ফান্ড’ সংকটের কারণে ঋণবৃদ্ধি করতে পারছে না। যাদের ‘ফান্ড’ আছে তাদের অনেকেই ৯ শতাংশ সুদে ঋণ দিতে রাজি নয়। সরকারের নিয়ম হচ্ছে নয়-ছয়। ছয় শতাংশ সুদে আমানত সংগ্রহ করতে হবে এবং ৯ শতাংশ সুদে ঋণ দিতে হবে। এ নিয়ম অনেক ব্যাংকের পক্ষে মানা সম্ভব নয়। তাদের খরচের প্রশ্ন আছে, লাভের প্রশ্ন আছে, কর্মচারীদের বেতন-ভাতার প্রশ্ন আছে।

কাগজে দেখলাম এক সময়ের ভালো একটি ব্যাংক কর্মীদের বেতন-ভাতা হ্রাস করেছে। অনেক ব্যাংক ছাঁটাই করছে। আবার কাগজেই দেখলাম ব্যাংকগুলোর মুনাফা হ্রাস পেয়েছে। অন্যদিকে ঋণখেলাপি সমস্যা ধীরে ধীরে তীব্র হচ্ছে। এ অবস্থায় প্রতিযোগিতা করে ঋণ দেয়ার প্রবণতা কমছে। বোঝাই যাচ্ছে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত সংখ্যক ব্যাংক দেশে। তারা ক্ষতিকর প্রতিযোগিতা করে ঋণ দেয়ার ফলে সবাই এখন ক্ষতিগ্রস্ত। মনে হচ্ছে ব্যাংকাররা একটু ‘দম’ নিচ্ছে। বড় উপলক্ষ অবশ্যই নির্বাচন। বড় বড় ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের অনেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।

ক্ষমতার পালাবদল হলে স্বাভাবিকভাবেই তারা নিরুৎসাহিত হতে পারেন বলে ব্যাংকাররা মনে করেন। অতএব, ব্যাংকাররা এখন নতুন ঋণ দিতে অনীহা দেখাচ্ছেন। নির্মাণ শিল্পে অনেক বড় বড় কাজ। কন্ট্রাক্টররা অনেক বড় বড় ঋণগ্রহীতা। তাদের ঋণ দিতে এখন ব্যাংকাররা একটু দ্বিধাগ্রস্ত। মনে হচ্ছে, এসব কারণে ঋণের চাহিদা ও সরবরাহ উভয় ক্ষেত্রেই একটা ভাটার টান চলছে। আশা করা যায় ভালো একটা নির্বাচনের পর এ অবস্থার অবসান হবে।

ড. আর এম দেবনাথ : অর্থনীতি বিশ্লেষক; সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

rmdebnath@yahoo.com

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

অনিশ্চয়তা কাটলে গতি ফিরবে বাণিজ্যে

আপডেট সময় ১২:৩৫:৪২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১১ নভেম্বর ২০১৮

অাকাশ জাতীয় ডেস্ক:

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর বেশিদিন বাকি নেই। নির্বাচনের তফসিল ঘোষিত হয়ে গেছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ২৩ ডিসেম্বর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ডিসেম্বর মানে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের ষষ্ঠ মাস। এ মাসেই চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসের শেষ। স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মনে প্রশ্ন শুধু নির্বাচন নিয়ে নয়, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতি নিয়েও।

আমদানি, রফতানি, রেমিটেন্স, বেচাকেনা ইত্যাদি সব ঠিকঠাক মতো চলছে তো? এসবের একটা বড় নির্দেশক বেসরকারি ঋণ- তার অবস্থা কী? জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার অব্যাহত থাকবে তো? নির্বাচনমুখী প্রচারণা, কাজকর্ম, রাজনৈতিক দলগুলোর তৎপরতা, সরকার ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে সংলাপ ইত্যাদির মাঝেও মানুষের মনে অর্থনীতি নিয়ে এসব প্রশ্ন উদয় হওয়া স্বাভাবিক। গত ৬ নভেম্বর এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন দেখলাম যুগান্তরে।

খবরটির শিরোনাম : ‘আসন্ন নির্বাচনের প্রভাব : বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ দারুণ মন্দা’। শিরোনামই যথেষ্ট দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থা বুঝতে। বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহে যদি মন্দাভাব থাকে, তাহলে অর্থনীতির অবস্থা ভালো থাকার কথা নয়।

শুধু যুগান্তর নয়, আরও কয়েকটি কাগজের খবরেও বর্তমান অর্থনীতির চালচিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ওইসবেও যে চিত্র ফুটে উঠেছে তা আশাপ্রদ কিছু নয়। দেখা যাচ্ছে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে গত মার্চ থেকেই মন্দা শুরু হয়েছে। ক্রমাগতভাবে ঋণের প্রবাহ হ্রাস পাচ্ছে। গত মার্চ মাসে যেখানে ঋণবৃদ্ধির পরিমাণ ছিল ১৭ দশমিক ৯৮ শতাংশ, সেখানে সেপ্টেম্বর মাসে তা হ্রাস পেয়ে হয়েছে ১৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ। একটি খবরে বলা হয়েছে, ঋণপ্রবাহের পরিমাণ বস্তুত ২০১৫ সালের ডিসেম্বরের পর এখনই সর্বনিু।

এর কারণ কী? এর প্রভাব কি আমদানি-রফতানি ব্যবসায় পড়েছে? যুগান্তরের খবরে দেখা যাচ্ছে, জুলাই-আগস্ট সময়ে আমদানি বেড়েছে মাত্র ৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ। অথচ গেল বছরের একই সময়ে আমদানি বৃদ্ধির পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৪ শতাংশ। এ সময়ে অবশ্য রফতানির পরিমাণ বেশ বেড়েছে। গেল বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বরের ৭ দশমিক ২৩ শতাংশের তুলনায় ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বরে রফতানির পরিমাণ বেড়েছে ১৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ।

আমদানি ও রফতানির যে চিত্র তথ্যে ফুটে উঠেছে, তার বাস্তব কতগুলো কারণ আছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে খাদ্যশস্য আমদানি, ভোগ্যপণ্য আমদানি হ্রাস পেয়েছে আলোচ্য সময়ে। এটা ভালো খবর। কিন্তু যে খবরটি খারাপ তা হচ্ছে, মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির পরিমাণ এ সময়ে আশানুরূপ বাড়েনি। এর সঙ্গেই বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের সরাসরি সম্পর্ক। এ সম্পর্কে আলোচনায় পরে আসছি। আগে বলে নিই রফতানি বৃদ্ধির কথা।

আলোচ্য সময়ে রফতানি বৃদ্ধির দুটি প্রধান কারণের কথা পোশাক রফতানিকারকরা বলছেন। আর তারাই রফতানি বৃদ্ধির মূল নায়ক। এখন শীতকাল। শীতকালে তৈরি পোশাকের চাহিদা বেশি থাকে। স্বাভাবিকভাবেই রফতানি বেশি হয়। এবার একটি কারণ যোগ হয়েছে। তা হচ্ছে নির্বাচন। নির্বাচনী তৎপরতার কারণে পোশাক রফতানি বিঘ্নিত হতে পারে এমন একটি আশঙ্কায় রফতানিকারকরা আগেভাগেই অর্ডার মোতাবেক রফতানির সর্বাত্মক চেষ্টা করে চলেছেন।

এদিকে রেমিটেন্সের অবস্থাও ভালো দেখা যাচ্ছে। জুলাই-আগস্ট মাসে রেমিটেন্স বৃদ্ধির পর সেপ্টেম্বরে এতে একটু টান পড়েছিল। কিন্তু অক্টোবরে আবার রেমিটেন্স বেশ বেড়েছে। আমদানি, রফতানি, রেমিটেন্স ইত্যাদির মিশ্র চিত্রের মধ্যে যা দুশ্চিন্তার বিষয় তা হচ্ছে ঋণের অবস্থা। পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, বেসরকারি খাতের ঋণ হ্রাস পাচ্ছে। এর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের।

আমরা জানি, বেসরকারি বিনিয়োগ প্রায় স্থবির। তাও প্রায় এক দশক ধরে। সরকারি বিনিয়োগের ওপর আমরা নির্ভরশীল। বেসরকারি বিনিয়োগ যে হারে বাড়ছে তা বলা যায় হতাশাজনক। অথচ এ অবস্থার উন্নতি দরকার। এবং এর জন্য দরকার বেসরকারি খাতে যথাযথ পরিমাণের ঋণপ্রবাহ। ঋণপ্রবাহের দুটি দিক আছে। চাহিদার দিক এবং সরবরাহের দিক। অর্থাৎ ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের দিক এবং ব্যাংকের দিক। ব্যাংকের দিক এ কারণে যে, আমাদের দেশে শিল্পায়নের জন্য ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করার নীতি অনুসরণ করা হয়। অতএব, দুটি দিকই আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথমেই আসা যাক উদ্যোক্তাদের প্রশ্নে। এ মুহূর্তে দেখা যাচ্ছে, ব্যবসায়ীরা নতুন উদ্যোগের ব্যাপারে উৎসাহিত নন। কারণ হিসেবে নির্বাচনের কথাই বলা হচ্ছে। নির্বাচন নিয়ে আমাদের দেশে বরাবরই একটা অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। ২০১৪-এর নির্বাচনকালে তো একটা বড় রকমের অশান্তি সৃষ্টি হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সংবিধান রক্ষার খাতিরে একটা নির্বাচন হয়। এবারও দেখা যাচ্ছে অস্থিরতার আলামত।

এ প্রেক্ষাপটে ব্যবসায়ীরা নতুন উদ্যোগে যাচ্ছেন না। তারা আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে চান। বড় বড় ব্যবসায়ীর কথা বাদ দিই, ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের মধ্যেও একটা কালক্ষেপণের প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। কেউ টাকা বের করতে চাইছেন না। সবারই অপেক্ষা নির্বাচনের জন্য। ফলাফল কী হয় তা তারা দেখতে চান। এ অবস্থা দেশের অর্থনীতির জন্য ভালো নয়। আমাদের উচিত এমন একটা অবস্থা সৃষ্টি করা যাতে নির্বাচন নির্বিশেষে দেশে স্থায়ী ও স্থিতিশীল একটা অবস্থা বিরাজ করে। বড় ব্যবসায়ী এবং নতুন উদ্যোক্তা এগিয়ে না আসার কারণে প্রধানত মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে।

এমনকি ভোগ্যপণ্য আমদানির ঋণপত্রেও ভাটা পড়েছে বলে বোঝা যাচ্ছে। এমনিতে সাধারণভাবে বাজারেও একটা মন্দাভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরাও একই কথা বলছেন। তাদের বেচাকেনায়ও একটা মন্দাভাব তৈরি হয়েছে। নির্বাচনের কাজে লাগে এমন সব বেচাকেনায় একটা ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। আবার কাগজে দেখলাম চট্টগ্রাম অঞ্চলে যারা নির্বাচন করবেন তাদের অধিকাংশই ব্যবসায়ী, বড় বড় ব্যবসায়ী। স্বভাবতই তারা এখন মনোনয়ন নিয়ে ব্যস্ত। ব্যস্ত এলাকার রাজনীতি নিয়ে। অতএব, তাদের ব্যবসায়িক তৎপরতায় একটা মন্দা দেখা দিয়েছে।

এ ছাড়া কাগজের খবর- চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা নানা সমস্যায় ভুগছেন। ব্যাংকগুলো সমানে মামলা করছে খেলাপিদের কাছ থেকে টাকা উদ্ধার করতে। ব্যাংকের মামলায় কয়েকদিন আগে একজন বড় ব্যবসায়ী গ্রেফতার হয়েছেন। এসব কারণে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের মধ্যে একটা ‘আতঙ্ক’ বিরাজ করছে বলে মনে হচ্ছে। এতে আমদানি ব্যবসায় একটা বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। কারণ চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা আমদানি ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন। তারা ব্যাংকের ঋণও নেন অনেক বেশি। এসব কারণেও নতুন নতুন উদ্যোক্তারা, ব্যবসায়ীরা নতুন শিল্প স্থাপনে একটু ধীরগতিতে এগোচ্ছেন বলে মনে হয়। বর্তমান সরকার নির্বাচনে জিতলে এক রকমের অবস্থা হবে, আবার ক্ষমতার পালাবদল হলে ভিন্ন পরিস্থিতির জন্ম হবে। এই অনিশ্চয়তার মধ্যে আছেন ব্যবসায়ীরা।

শুধু ব্যবসায়ীদের অনীহার কারণেই ঋণ সরবরাহ যথেষ্ট পরিমাণে বাড়ছে না, এ কথা বলা হবে অতিশয়োক্তি। ব্যাংকগুলোও ধীরে চলার পক্ষে বলে মনে হয়। তাদের সমস্যা কয়েকটি। এখনও অনেক ব্যাংক আমানত সংগ্রহে ততটা সফল নয়। তারা ‘ফান্ড’ সংকটের কারণে ঋণবৃদ্ধি করতে পারছে না। যাদের ‘ফান্ড’ আছে তাদের অনেকেই ৯ শতাংশ সুদে ঋণ দিতে রাজি নয়। সরকারের নিয়ম হচ্ছে নয়-ছয়। ছয় শতাংশ সুদে আমানত সংগ্রহ করতে হবে এবং ৯ শতাংশ সুদে ঋণ দিতে হবে। এ নিয়ম অনেক ব্যাংকের পক্ষে মানা সম্ভব নয়। তাদের খরচের প্রশ্ন আছে, লাভের প্রশ্ন আছে, কর্মচারীদের বেতন-ভাতার প্রশ্ন আছে।

কাগজে দেখলাম এক সময়ের ভালো একটি ব্যাংক কর্মীদের বেতন-ভাতা হ্রাস করেছে। অনেক ব্যাংক ছাঁটাই করছে। আবার কাগজেই দেখলাম ব্যাংকগুলোর মুনাফা হ্রাস পেয়েছে। অন্যদিকে ঋণখেলাপি সমস্যা ধীরে ধীরে তীব্র হচ্ছে। এ অবস্থায় প্রতিযোগিতা করে ঋণ দেয়ার প্রবণতা কমছে। বোঝাই যাচ্ছে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত সংখ্যক ব্যাংক দেশে। তারা ক্ষতিকর প্রতিযোগিতা করে ঋণ দেয়ার ফলে সবাই এখন ক্ষতিগ্রস্ত। মনে হচ্ছে ব্যাংকাররা একটু ‘দম’ নিচ্ছে। বড় উপলক্ষ অবশ্যই নির্বাচন। বড় বড় ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের অনেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।

ক্ষমতার পালাবদল হলে স্বাভাবিকভাবেই তারা নিরুৎসাহিত হতে পারেন বলে ব্যাংকাররা মনে করেন। অতএব, ব্যাংকাররা এখন নতুন ঋণ দিতে অনীহা দেখাচ্ছেন। নির্মাণ শিল্পে অনেক বড় বড় কাজ। কন্ট্রাক্টররা অনেক বড় বড় ঋণগ্রহীতা। তাদের ঋণ দিতে এখন ব্যাংকাররা একটু দ্বিধাগ্রস্ত। মনে হচ্ছে, এসব কারণে ঋণের চাহিদা ও সরবরাহ উভয় ক্ষেত্রেই একটা ভাটার টান চলছে। আশা করা যায় ভালো একটা নির্বাচনের পর এ অবস্থার অবসান হবে।

ড. আর এম দেবনাথ : অর্থনীতি বিশ্লেষক; সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

rmdebnath@yahoo.com