ঢাকা ০২:১৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
‘ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীরা সংসদে গেলে স্বর্ণের দেশে পরিণত হবে’: রেজাউল করিম শেখ হাসিনা চাচ্ছে না বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচন হোক : মেজর হাফিজ ৫৪ বছরে ক্ষমতায় যারা ছিল, তাদের শ্বশুরবাড়ির সম্পদ হু হু করে বেড়েছে:শফিকুর রহমান ৫ দশমিক ৯ মাত্রায় ফের ভূমিকম্পে কাঁপল দেশ স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থানকারী দলের ইতিহাস বিকৃতিতে জাতি স্তব্ধ: মাহদী আমিন সাপ আর ভারতীয়র দেখা একসঙ্গে পেলে, আগে ভারতীয়কে মারা উচিত: এপস্টেইন নথি ‘আগামীতে এমনও শুনতে হবে জামায়াত দেশের স্বাধীনতার পক্ষে যুদ্ধ করেছিল’:সালাহউদ্দিন দায়িত্ব শেষে আমি নাগরিক সমাজের কাজে ফিরে যাবো : শিক্ষা উপদেষ্টা আমেরিকার সঙ্গে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে ভিয়েতনাম, গোপন নথি ফাঁস পাতানো নির্বাচনের স্বপ্ন দেখে লাভ নেই, অধিকার আদায়ে জনগণ জীবন দিতে প্রস্তুত: আসিফ মাহমুদ

পুলিশের দুঃসাহসী অভিযান

অাকাশ জাতীয় ডেস্ক:

সোর্সের মাধ্যমে খবর এল চাঁদপুরের রাজরাজেশ্বর ইউনিয়নের জনবিচ্ছিন্ন লগ্গিমারা চরে বিপুলসংখ্যক মা ইলিশ মজুদ করেছে এক আড়তদার। উল্লেখ করা প্রয়োজন এই সময়ে মা-ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ। কারণ একেকটি মা-ইলিশ প্রায় ১৩-২৩ লাখ ডিম ছাড়ে। ইলিশের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য এই সময়টা অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ।

চাঁদপুর মূল শহর থেকে বিচ্ছিন্ন এই চরের এক পাশ দিয়ে মেঘনা ও অন্য পাশ দিয়ে বয়ে গেছে পদ্মা। চরে নেই কোনো পাকা রাস্তা, পাকা দালান ও স্থাপনা। স্বাভাবিকভাবেই নেই বিদ্যুৎ সংযোগ, মোবাইল নেটওয়ার্ক অত্যন্ত দুর্বল। যাতায়াতের একমাত্র উপায় ট্রলার। অধিবাসীদের সিংহভাগই জেলে। অত্যন্ত দুর্গম হওয়ায় জেলা পুলিশ এখানে সাধারণত অভিযান পরিচালনা করে না।

গত বছর কোস্টগার্ড ও নৌপুলিশ অভিযানকালে এখানে জেলেদের সংঘবদ্ধ আক্রমণের স্বীকার হয়ে পিছু হঠে। যে কারণেই এবার মৎস্য কর্মকর্তা জেলা পুলিশের সহায়তা চাইলেন। পুলিশ সুপারের নির্দেশে অধিকসংখ্যক ফোর্স, সময় ও তথ্য নিয়ে অপারেশন প্ল্যান সাজালাম। ৪টি স্পিডবোট এবং ২টি ইঞ্জিনচালিত নৌকায় জেলা পুলিশ, নৌপুলিশ, কোস্টগার্ড, ম্যাজিস্ট্রেট ও মৎস্য কর্মকর্তাদের নিয়ে রওনা দিলাম দুর্গম লগ্গিমারা চরের উদ্দেশ্যে। টার্গেট দুর্গম চরের সেই আড়ত।

জেলা পুলিশ ও কোস্টগার্ডের বোট অত্যন্ত দ্রুতগতির হওয়ায় আমরা অন্যদের থেকে বেশ আগেই পৌঁছে যাই চরে। আমাদের ভয় ছিল এত অধিকসংখ্যক পুলিশের অভিযানে বের হওয়া তথ্য মোবাইলে আমাদের টার্গেটকে জানিয়ে দিতে পারে যে কেউ। তাই দ্রুততার সঙ্গে পৌঁছে টার্গেটে হিট করাটাই ছিল উদ্দেশ্য।

পুরো দলের জন্য অপেক্ষা না করেই পুলিশের ৪ জন এবং কোস্টগার্ডের ৪ জন ফোর্স নিয়ে ঢুকে পড়লাম চরের ভেতর। দু’পাশে ধানক্ষেতের মাঝে পায়ে হাঁটা একটি ট্র্যাক ধরে এগোচ্ছি। প্রায় ১ কিলোমিটার পর একটি বাড়ি দেখতে পেলাম। আশপাশে নেই কেউ। ঢুকে পড়লাম বাড়িতে। খালি বাড়ি। তল্লাশি করে কিছু পেলাম না। উঠানের এক কোণে একটি গোয়ালঘর। ঢুকলাম সেখানে। কালো প্লাস্টিক আর চাটাই দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে বড়সড় কিছু। ঢেকে রাখা জিনিস পুরো গোয়ালঘর দখল করে রেখেছে। উচ্চতায় হবে প্রায় বুক সমান। সরানো হলে চাটাই আর কালো প্লাস্টিক।

জীবনে এই প্রথম এত ইলিশ একসঙ্গে দেখলাম। সে এক অসাধারণ দৃশ্য। থরে থরে সাজানো সারি সারি মা-ইলিশ।

অভিযানটা এখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু জায়গাটা রাজরাজেশ্বর, আর এই মজুদও কোনো সাধারণ জেলের নয়। বিশাল এই অবৈধ মজুদের পেছনে আছে এক সিন্ডিকেট, যাদের আছে প্রভাব-প্রতিপত্তি আর আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর সাহস।

প্রথমদিকে কোনো লোকজন দেখা না গেলেও হঠাৎ করে লক্ষ্য করলাম বাড়ির একপাশে কিছু লোকজন জড়ো হচ্ছে, কাছে আসছে না যদিও। পাত্তা দিলাম না, ভাবলাম উৎসুক জনতা।

যখন গোয়ালঘর থেকে মাছ জব্দ করার প্রক্রিয়া শুরু করব তখনি অতর্কিতে দু’পাশ থেকে বৃষ্টির মতো ইটপাটকেল আর লাঠি উড়ে আসতে থাকল আমাদের দিকে। আর সঙ্গে কয়েকশ লোকের রক্ত হিম করা চিৎকার।

চাকরিজীবনে এই প্রথম অসম্ভব ভয় পেলাম। প্রমাদ গুনলাম, তবে আতংকিত হলাম না মোটেও। কমান্ডার হিসেবে আমার মধ্যে আতংক দেখলে আমার ফোর্স বিনা যুদ্ধেই আত্মসমর্পণ করবে।

আকাশের দিকে তাকিয়ে উড়ে আসা লাঠি আর ইটের টুকরা থেকে নিজেকে রক্ষা করছি। দ্রুত হিসেব করছি স্পিডবোট/নদীতীর থেকে ঠিক কতদূরে আছি, যদি পেছাতে হয় তাহলে সবাইকে নিয়ে নিরাপদে নদীর পাড় পর্যন্ত যেতে পারব তো?

আক্রমণকারীরা চিৎকার করছে আর এগোচ্ছে, অনেকের কাছে লগি-বৈঠাও দেখলাম যা এক ভয়ঙ্কর অস্ত্র। ওরা বুঝে গেছে আমরা সংখ্যায় মাত্র ৮-৯ জন। দোয়া পড়লাম, মাথা ঠাণ্ডা রেখে সবাইকে গুলি লোড করতে বললাম। বডিগার্ড রাসেল ছিল পাশেই। ওর কাছ থেকে চেয়ে নিলাম ৭.৬২ পিস্তলটি। যেহেতু পেছানোর সুযোগ নেই, পাল্টা আক্রমণ করাটাই একমাত্র রাস্তা। সবাইকে নির্দেশ দেই ফায়ার করার। পুলিশের ৪টি শর্টগানে একসঙ্গে গুলিবর্ষণ শুরু করল।

২০-৩০ রাউন্ড গুলি করার পর পরিস্থিতি কিছুটা অনুকূলে আসে। আক্রমণকারীরা ক্ষণিকের জন্য পিছু হটে। আমরাও এই সুযোগে তাদের ধাওয়া করি কিছুটা। মনোবল ফিরে আসে অনেকটা। সবাইকে একত্র করে দ্রুত আবারও প্ল্যান করি এবং ছত্রভঙ্গ না হওয়ার নির্দেশ দেই। জানতাম আবারও আক্রমণ হবে, হলোও তাই। কিছু সময়ের মধ্যেই পুনরায় আক্রমণ, বৃষ্টির মতো ইটপাথর আর লাঠি উড়ে আসতে লাগল। এবার মনে হলো আক্রমণকারীরা সংখ্যায় আরও বেশি।

প্ল্যান অনুযায়ী, পুনরায় ৪টি শর্টগান থেকে একযোগে গুলিবর্ষণ হলো। কিন্ত এবার ওরা আরও বেপরোয়া, ঘরবাড়ি আর গাছের আড়াল নিয়ে তিন দিক থেকেই এগোচ্ছে। আমরাও গুলি করছি। এরমধ্যে একটি শর্টগান বিট্রে করল। বাকি ৩টি শর্টগান এই সংঘবদ্ধ আক্রমণ ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে। আমি পিস্তল তাক করে আছি সামনের দিকে। বড় বড় ইটের টুকরো এসে সামনে পেছনে পড়ছে, সতর্ক থাকায় লক্ষ্যভ্রষ্ট হচ্ছে শুধু। একটু একটু করে পেছাচ্ছি। সবাই দলবদ্ধ হয়ে অস্ত্র তাক করে ধীরে ধীরে পিছিয়ে ধানক্ষেতের মধ্যে নিরাপদ দূরত্বে চলে আসি।

আক্রমণকারী আর ধানক্ষেতের মধ্যে বাফার হিসেবে আছে একটি খোলা মাঠ। অপেক্ষা করছি মূল দলের জন্য। কপালগুনে মোবাইল নেটওয়ার্ক পেলাম, কল করলাম, আরও ১০ মিনিট লাগবে মূল দল পৌঁছতে। অস্ত্র তাক করে আছি আক্রমণকারীদের প্রতি, চারটি এসএমজি আর ৪টি শর্টগান। বাড়ি ঘরে আর গাছগাছালির আড়াল ভেদ করে খোলা জায়গায় এসে আক্রমণ করার সাহস করছে না আক্রমণকারীরা। এভাবে দুপক্ষই একে অপরকে সতর্কভাবে মাপতে লাগলাম। কিছু পরেই পাড়ে এসে মূল ফোর্সের নৌকাটি থামল। ধড়ে প্রাণ ফিরে পেলাম যেন!

এবার একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়লাম আক্রমণকারীদের ওপর। ছত্রভঙ্গ করে দিলাম মুহূর্তেই। পুরো জায়গা দখলে নিলাম। শুরু করলাম বাড়ি বাড়ি তল্লাশি। প্রথম বাড়ি ছাড়া আর কোথাও কিছু পাওয়া গেল না। ততক্ষণে গুলি প্রায় শেষ। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার স্যারকে জরুরিভিত্তিতে স্পিডবোট বোঝাই করে গুলি এবং আরও ফোর্স পাঠাতে অনুরোধ করলাম।

এরপর শুরু হলো বিশাল এই অবৈধ মজুদ জব্দ করার প্রক্রিয়া। সে আরেক মহাযজ্ঞ। গোয়ালঘরের দরজা দিয়ে ওই বিশাল মজুদ বের করতে হলে প্রায় সপ্তাহখানেক সময় লাগবে, সিদ্ধান্ত নিলাম গোয়াল ঘরের পেছনের টিনের বেড়া খুলে ফেলে মাছ বের করব। অভিযানে এত বড় মজুদ পেয়ে যাব সেটা কল্পনাও করিনি, তাই কোনো লেবারও সঙ্গে নেইনি। আর পুরো গ্রামের কেউই সহায়তা করছে না এই মাছ নৌকায় তুলতে।

এদিকে দিনের আলোও দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। রাতের অন্ধকারে আমাদের ওপর যে পুনরায় আক্রমণ হবে সে ব্যাপারে অনেকটা নিশ্চিত ছিলাম। তাই কোনোভাবেই সন্ধ্যার পর বিদ্যুৎহীন অন্ধকার ওই চরে ফোর্সসহ সবার নিরাপত্তার সঙ্গে আপোষ করে অবস্থান করব না বলে সিদ্ধান্ত নেই।

পুলিশ সুপার মহোদয়ও সে রকম নির্দেশ দেন। তাই পুরো মজুদের এক ক্ষুদ্র অংশ নিয়েই ওই দিনের মতো অভিযান স্থগিত রাখি, বাবি অংশ সিলগালা করে চাঁদপুর শহরে ফিরে আসি।

পরের দিন ভোরে পুনরায় ওই চরে যাই এবং বাকি মজুদ জব্দ করি। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তার জিম্মায় এই মাছ কোল্ড স্টোরেজে জমা করেন। অভিযান শেষে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জামান ভাইকে এ ঘটনায় মৎস্য আইনে নিয়মিত মামলা দায়ের করব জানালে উনি আর মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেননি। তাছাড়া মূল অপরাধী পলাতক থাকায় মোবাইল কোর্ট করেও খুবএকটা ফল পাওয়া যেত না। তাই এই সিন্ডিকেটের মূল উৎপাটন করার জন্য এসপি মহোদয়ের নির্দেশে নিয়মিত ফৌজদারি মামলা দায়ের করি।

চাঁদপুর জেলার ইতিহাসে মা ইলিশ রক্ষায় এটিই সবচেয়ে বড় অভিযান! হিসাব করে দেখলাম জব্দকৃত ওই মজুদের মূল্য প্রায় কোটি টাকা। সিন্ডিকেটটি একটি গোয়াল ঘরেই কোটি টাকা মূল্যের ইলিশ মাছ মজুদ করেছে এই ২২ দিনে। এ যেন সোনার খনি! এই বিপুল পরিমাণ মা-ইলিশের অর্ধেকও যদি ১৩-২৩ লাখ করে ডিম ছাড়ত তাহলে কত শত কোটি ইলিশ পেত এই দেশ সেই অঙ্ক কষার ভারটি রইল আপনাদের ওপর।

পেটের দায়ে আইন অমান্য করা জেলের অপরাধ আর সিন্ডিকেট তৈরি করে মা-ইলিশ মজুদকারীর অপরাধের মধ্যে আছে ব্যাপক পার্থক্য। এসব সিন্ডিকেটই দেশের আসল শক্র। অনেকদিন ধরেই অপেক্ষা করছিলাম এরকম কিছু সিন্ডিকেটকে আইনের আওতায় আনার। এবার সম্ভব হলো। কোনো বড়সড় ক্যাজুয়ালটি ছাড়াই অভিযানটি সফলভাবে শেষ করেছি। এজন্য সৃষ্টিকর্তার প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা।

আমার কিছু নবীন পুলিশ সদস্য এ রকম পরিস্থিতিতে অসীম সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছে, তাদের প্রতি ভালোবাসা। স্থলভাগের অভিযানে অভিজ্ঞতা কম থাকা সত্ত্বেও কোস্টগার্ড ও নৌপুলিশ অনেক সহযোগিতা করেছে। মোবাইল কোর্ট করা যাবে না জেনেও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সার্বক্ষণিক সঙ্গেই ছিলেন। আর এই পুরো অভিযানটি সম্ভব হয়েছে মৎস্য অধিদফতরের নিরলসভাবে কাজ করে যাওয়া দেশপ্রেমিক কিছু কর্মকর্তার কারণে। তাদের প্রতি অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা।

সর্বোপরি এই দু’দিনে পরিবারের কাউকে সময় দেইনি। ৪৮ ঘণ্টায় ঘুমিয়েছি মাত্র পাঁচ ঘণ্টা। মায়ের ফোনও ধরিনি। তাদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। সারাক্ষণ আমাকে নিয়ে টেনশনে থাকা আমার স্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা তার স্যাক্রিফাইসিং মানসিকতার জন্য। তার সহযোগিতা না পেলে এ রকম ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান কখনোই করা হতো না আমার। পুলিশ সদস্যদের সহধর্মীনীরা কীভাবে যেন এই গুণটি রপ্ত করে ফেলেন। তাদের সহযোগিতা ছাড়া আমরা কখনোই এ ধরণের ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানগুলো করতে পারতাম না।

লেখক: জাহেদ পারভেজ চৌধুরী, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, সদর সার্কেল, চাঁদপুর।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

‘ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীরা সংসদে গেলে স্বর্ণের দেশে পরিণত হবে’: রেজাউল করিম

পুলিশের দুঃসাহসী অভিযান

আপডেট সময় ১০:১১:২০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ অক্টোবর ২০১৮

অাকাশ জাতীয় ডেস্ক:

সোর্সের মাধ্যমে খবর এল চাঁদপুরের রাজরাজেশ্বর ইউনিয়নের জনবিচ্ছিন্ন লগ্গিমারা চরে বিপুলসংখ্যক মা ইলিশ মজুদ করেছে এক আড়তদার। উল্লেখ করা প্রয়োজন এই সময়ে মা-ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ। কারণ একেকটি মা-ইলিশ প্রায় ১৩-২৩ লাখ ডিম ছাড়ে। ইলিশের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য এই সময়টা অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ।

চাঁদপুর মূল শহর থেকে বিচ্ছিন্ন এই চরের এক পাশ দিয়ে মেঘনা ও অন্য পাশ দিয়ে বয়ে গেছে পদ্মা। চরে নেই কোনো পাকা রাস্তা, পাকা দালান ও স্থাপনা। স্বাভাবিকভাবেই নেই বিদ্যুৎ সংযোগ, মোবাইল নেটওয়ার্ক অত্যন্ত দুর্বল। যাতায়াতের একমাত্র উপায় ট্রলার। অধিবাসীদের সিংহভাগই জেলে। অত্যন্ত দুর্গম হওয়ায় জেলা পুলিশ এখানে সাধারণত অভিযান পরিচালনা করে না।

গত বছর কোস্টগার্ড ও নৌপুলিশ অভিযানকালে এখানে জেলেদের সংঘবদ্ধ আক্রমণের স্বীকার হয়ে পিছু হঠে। যে কারণেই এবার মৎস্য কর্মকর্তা জেলা পুলিশের সহায়তা চাইলেন। পুলিশ সুপারের নির্দেশে অধিকসংখ্যক ফোর্স, সময় ও তথ্য নিয়ে অপারেশন প্ল্যান সাজালাম। ৪টি স্পিডবোট এবং ২টি ইঞ্জিনচালিত নৌকায় জেলা পুলিশ, নৌপুলিশ, কোস্টগার্ড, ম্যাজিস্ট্রেট ও মৎস্য কর্মকর্তাদের নিয়ে রওনা দিলাম দুর্গম লগ্গিমারা চরের উদ্দেশ্যে। টার্গেট দুর্গম চরের সেই আড়ত।

জেলা পুলিশ ও কোস্টগার্ডের বোট অত্যন্ত দ্রুতগতির হওয়ায় আমরা অন্যদের থেকে বেশ আগেই পৌঁছে যাই চরে। আমাদের ভয় ছিল এত অধিকসংখ্যক পুলিশের অভিযানে বের হওয়া তথ্য মোবাইলে আমাদের টার্গেটকে জানিয়ে দিতে পারে যে কেউ। তাই দ্রুততার সঙ্গে পৌঁছে টার্গেটে হিট করাটাই ছিল উদ্দেশ্য।

পুরো দলের জন্য অপেক্ষা না করেই পুলিশের ৪ জন এবং কোস্টগার্ডের ৪ জন ফোর্স নিয়ে ঢুকে পড়লাম চরের ভেতর। দু’পাশে ধানক্ষেতের মাঝে পায়ে হাঁটা একটি ট্র্যাক ধরে এগোচ্ছি। প্রায় ১ কিলোমিটার পর একটি বাড়ি দেখতে পেলাম। আশপাশে নেই কেউ। ঢুকে পড়লাম বাড়িতে। খালি বাড়ি। তল্লাশি করে কিছু পেলাম না। উঠানের এক কোণে একটি গোয়ালঘর। ঢুকলাম সেখানে। কালো প্লাস্টিক আর চাটাই দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে বড়সড় কিছু। ঢেকে রাখা জিনিস পুরো গোয়ালঘর দখল করে রেখেছে। উচ্চতায় হবে প্রায় বুক সমান। সরানো হলে চাটাই আর কালো প্লাস্টিক।

জীবনে এই প্রথম এত ইলিশ একসঙ্গে দেখলাম। সে এক অসাধারণ দৃশ্য। থরে থরে সাজানো সারি সারি মা-ইলিশ।

অভিযানটা এখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু জায়গাটা রাজরাজেশ্বর, আর এই মজুদও কোনো সাধারণ জেলের নয়। বিশাল এই অবৈধ মজুদের পেছনে আছে এক সিন্ডিকেট, যাদের আছে প্রভাব-প্রতিপত্তি আর আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর সাহস।

প্রথমদিকে কোনো লোকজন দেখা না গেলেও হঠাৎ করে লক্ষ্য করলাম বাড়ির একপাশে কিছু লোকজন জড়ো হচ্ছে, কাছে আসছে না যদিও। পাত্তা দিলাম না, ভাবলাম উৎসুক জনতা।

যখন গোয়ালঘর থেকে মাছ জব্দ করার প্রক্রিয়া শুরু করব তখনি অতর্কিতে দু’পাশ থেকে বৃষ্টির মতো ইটপাটকেল আর লাঠি উড়ে আসতে থাকল আমাদের দিকে। আর সঙ্গে কয়েকশ লোকের রক্ত হিম করা চিৎকার।

চাকরিজীবনে এই প্রথম অসম্ভব ভয় পেলাম। প্রমাদ গুনলাম, তবে আতংকিত হলাম না মোটেও। কমান্ডার হিসেবে আমার মধ্যে আতংক দেখলে আমার ফোর্স বিনা যুদ্ধেই আত্মসমর্পণ করবে।

আকাশের দিকে তাকিয়ে উড়ে আসা লাঠি আর ইটের টুকরা থেকে নিজেকে রক্ষা করছি। দ্রুত হিসেব করছি স্পিডবোট/নদীতীর থেকে ঠিক কতদূরে আছি, যদি পেছাতে হয় তাহলে সবাইকে নিয়ে নিরাপদে নদীর পাড় পর্যন্ত যেতে পারব তো?

আক্রমণকারীরা চিৎকার করছে আর এগোচ্ছে, অনেকের কাছে লগি-বৈঠাও দেখলাম যা এক ভয়ঙ্কর অস্ত্র। ওরা বুঝে গেছে আমরা সংখ্যায় মাত্র ৮-৯ জন। দোয়া পড়লাম, মাথা ঠাণ্ডা রেখে সবাইকে গুলি লোড করতে বললাম। বডিগার্ড রাসেল ছিল পাশেই। ওর কাছ থেকে চেয়ে নিলাম ৭.৬২ পিস্তলটি। যেহেতু পেছানোর সুযোগ নেই, পাল্টা আক্রমণ করাটাই একমাত্র রাস্তা। সবাইকে নির্দেশ দেই ফায়ার করার। পুলিশের ৪টি শর্টগানে একসঙ্গে গুলিবর্ষণ শুরু করল।

২০-৩০ রাউন্ড গুলি করার পর পরিস্থিতি কিছুটা অনুকূলে আসে। আক্রমণকারীরা ক্ষণিকের জন্য পিছু হটে। আমরাও এই সুযোগে তাদের ধাওয়া করি কিছুটা। মনোবল ফিরে আসে অনেকটা। সবাইকে একত্র করে দ্রুত আবারও প্ল্যান করি এবং ছত্রভঙ্গ না হওয়ার নির্দেশ দেই। জানতাম আবারও আক্রমণ হবে, হলোও তাই। কিছু সময়ের মধ্যেই পুনরায় আক্রমণ, বৃষ্টির মতো ইটপাথর আর লাঠি উড়ে আসতে লাগল। এবার মনে হলো আক্রমণকারীরা সংখ্যায় আরও বেশি।

প্ল্যান অনুযায়ী, পুনরায় ৪টি শর্টগান থেকে একযোগে গুলিবর্ষণ হলো। কিন্ত এবার ওরা আরও বেপরোয়া, ঘরবাড়ি আর গাছের আড়াল নিয়ে তিন দিক থেকেই এগোচ্ছে। আমরাও গুলি করছি। এরমধ্যে একটি শর্টগান বিট্রে করল। বাকি ৩টি শর্টগান এই সংঘবদ্ধ আক্রমণ ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে। আমি পিস্তল তাক করে আছি সামনের দিকে। বড় বড় ইটের টুকরো এসে সামনে পেছনে পড়ছে, সতর্ক থাকায় লক্ষ্যভ্রষ্ট হচ্ছে শুধু। একটু একটু করে পেছাচ্ছি। সবাই দলবদ্ধ হয়ে অস্ত্র তাক করে ধীরে ধীরে পিছিয়ে ধানক্ষেতের মধ্যে নিরাপদ দূরত্বে চলে আসি।

আক্রমণকারী আর ধানক্ষেতের মধ্যে বাফার হিসেবে আছে একটি খোলা মাঠ। অপেক্ষা করছি মূল দলের জন্য। কপালগুনে মোবাইল নেটওয়ার্ক পেলাম, কল করলাম, আরও ১০ মিনিট লাগবে মূল দল পৌঁছতে। অস্ত্র তাক করে আছি আক্রমণকারীদের প্রতি, চারটি এসএমজি আর ৪টি শর্টগান। বাড়ি ঘরে আর গাছগাছালির আড়াল ভেদ করে খোলা জায়গায় এসে আক্রমণ করার সাহস করছে না আক্রমণকারীরা। এভাবে দুপক্ষই একে অপরকে সতর্কভাবে মাপতে লাগলাম। কিছু পরেই পাড়ে এসে মূল ফোর্সের নৌকাটি থামল। ধড়ে প্রাণ ফিরে পেলাম যেন!

এবার একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়লাম আক্রমণকারীদের ওপর। ছত্রভঙ্গ করে দিলাম মুহূর্তেই। পুরো জায়গা দখলে নিলাম। শুরু করলাম বাড়ি বাড়ি তল্লাশি। প্রথম বাড়ি ছাড়া আর কোথাও কিছু পাওয়া গেল না। ততক্ষণে গুলি প্রায় শেষ। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার স্যারকে জরুরিভিত্তিতে স্পিডবোট বোঝাই করে গুলি এবং আরও ফোর্স পাঠাতে অনুরোধ করলাম।

এরপর শুরু হলো বিশাল এই অবৈধ মজুদ জব্দ করার প্রক্রিয়া। সে আরেক মহাযজ্ঞ। গোয়ালঘরের দরজা দিয়ে ওই বিশাল মজুদ বের করতে হলে প্রায় সপ্তাহখানেক সময় লাগবে, সিদ্ধান্ত নিলাম গোয়াল ঘরের পেছনের টিনের বেড়া খুলে ফেলে মাছ বের করব। অভিযানে এত বড় মজুদ পেয়ে যাব সেটা কল্পনাও করিনি, তাই কোনো লেবারও সঙ্গে নেইনি। আর পুরো গ্রামের কেউই সহায়তা করছে না এই মাছ নৌকায় তুলতে।

এদিকে দিনের আলোও দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। রাতের অন্ধকারে আমাদের ওপর যে পুনরায় আক্রমণ হবে সে ব্যাপারে অনেকটা নিশ্চিত ছিলাম। তাই কোনোভাবেই সন্ধ্যার পর বিদ্যুৎহীন অন্ধকার ওই চরে ফোর্সসহ সবার নিরাপত্তার সঙ্গে আপোষ করে অবস্থান করব না বলে সিদ্ধান্ত নেই।

পুলিশ সুপার মহোদয়ও সে রকম নির্দেশ দেন। তাই পুরো মজুদের এক ক্ষুদ্র অংশ নিয়েই ওই দিনের মতো অভিযান স্থগিত রাখি, বাবি অংশ সিলগালা করে চাঁদপুর শহরে ফিরে আসি।

পরের দিন ভোরে পুনরায় ওই চরে যাই এবং বাকি মজুদ জব্দ করি। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তার জিম্মায় এই মাছ কোল্ড স্টোরেজে জমা করেন। অভিযান শেষে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জামান ভাইকে এ ঘটনায় মৎস্য আইনে নিয়মিত মামলা দায়ের করব জানালে উনি আর মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেননি। তাছাড়া মূল অপরাধী পলাতক থাকায় মোবাইল কোর্ট করেও খুবএকটা ফল পাওয়া যেত না। তাই এই সিন্ডিকেটের মূল উৎপাটন করার জন্য এসপি মহোদয়ের নির্দেশে নিয়মিত ফৌজদারি মামলা দায়ের করি।

চাঁদপুর জেলার ইতিহাসে মা ইলিশ রক্ষায় এটিই সবচেয়ে বড় অভিযান! হিসাব করে দেখলাম জব্দকৃত ওই মজুদের মূল্য প্রায় কোটি টাকা। সিন্ডিকেটটি একটি গোয়াল ঘরেই কোটি টাকা মূল্যের ইলিশ মাছ মজুদ করেছে এই ২২ দিনে। এ যেন সোনার খনি! এই বিপুল পরিমাণ মা-ইলিশের অর্ধেকও যদি ১৩-২৩ লাখ করে ডিম ছাড়ত তাহলে কত শত কোটি ইলিশ পেত এই দেশ সেই অঙ্ক কষার ভারটি রইল আপনাদের ওপর।

পেটের দায়ে আইন অমান্য করা জেলের অপরাধ আর সিন্ডিকেট তৈরি করে মা-ইলিশ মজুদকারীর অপরাধের মধ্যে আছে ব্যাপক পার্থক্য। এসব সিন্ডিকেটই দেশের আসল শক্র। অনেকদিন ধরেই অপেক্ষা করছিলাম এরকম কিছু সিন্ডিকেটকে আইনের আওতায় আনার। এবার সম্ভব হলো। কোনো বড়সড় ক্যাজুয়ালটি ছাড়াই অভিযানটি সফলভাবে শেষ করেছি। এজন্য সৃষ্টিকর্তার প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা।

আমার কিছু নবীন পুলিশ সদস্য এ রকম পরিস্থিতিতে অসীম সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছে, তাদের প্রতি ভালোবাসা। স্থলভাগের অভিযানে অভিজ্ঞতা কম থাকা সত্ত্বেও কোস্টগার্ড ও নৌপুলিশ অনেক সহযোগিতা করেছে। মোবাইল কোর্ট করা যাবে না জেনেও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সার্বক্ষণিক সঙ্গেই ছিলেন। আর এই পুরো অভিযানটি সম্ভব হয়েছে মৎস্য অধিদফতরের নিরলসভাবে কাজ করে যাওয়া দেশপ্রেমিক কিছু কর্মকর্তার কারণে। তাদের প্রতি অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা।

সর্বোপরি এই দু’দিনে পরিবারের কাউকে সময় দেইনি। ৪৮ ঘণ্টায় ঘুমিয়েছি মাত্র পাঁচ ঘণ্টা। মায়ের ফোনও ধরিনি। তাদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। সারাক্ষণ আমাকে নিয়ে টেনশনে থাকা আমার স্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা তার স্যাক্রিফাইসিং মানসিকতার জন্য। তার সহযোগিতা না পেলে এ রকম ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান কখনোই করা হতো না আমার। পুলিশ সদস্যদের সহধর্মীনীরা কীভাবে যেন এই গুণটি রপ্ত করে ফেলেন। তাদের সহযোগিতা ছাড়া আমরা কখনোই এ ধরণের ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানগুলো করতে পারতাম না।

লেখক: জাহেদ পারভেজ চৌধুরী, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, সদর সার্কেল, চাঁদপুর।