অাকাশ জাতীয় ডেস্ক:
অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের ওপর হামলাকারী ফয়জুর রহমান ফয়জুলের বাড়িতে অভিযান শেষ করেছেন আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা। শনিবার দিবাগত রাত পৌনে দুইটার দিকে পুলিশ ও এর ২০ মিনিট আগে র্যাব অভিযান শেষে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। এসময় তারা হামলাকারী ফয়জুলের মামা ফজলুল রহমানকে আটক করে নিয়ে যায়। একইসঙ্গে হামলাকারীর বাবা মাওলানা আতিকুর রহমানের বাড়ি থেকে বইপত্র ও সিডি নিয়ে যায় আইন-শঙ্খলা বাহিনী।
শনিবার দিবাগত রাত দুইটায় ঘটনাস্থল সিলেট জেলার টুকেরবাজার শেখপাড়া ওয়ার্ডের মেম্বার গিয়াস উদ্দিন এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, ‘আইনশঙ্খলা বাহিনী হামলাকারী ফয়জুলের পাশের বাড়ি থেকে তার মামা ফজলুল রহমানকে আটক করেছে। তার বয়স আনুমানিক বিয়াল্লিশ-পয়তাল্লিশ।’
এদিন বিকালে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ত্রিপল-ই বিভাগের ফেস্টিভ্যালে ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালকে ছুরিকাঘাত করে ফয়জুর রহমান ফয়জুল। পরে শিক্ষার্থীদের হাতে ধরা পড়ে সে এখন আইনশঙ্খলা বাহিনীর তত্ত্বাবধানে আছে।
পুলিশ হামলাকারীর মামা ফজলুলের ঘর থেকে একটি ল্যাপটপ জব্দ করেছে। আটকের পর ফজলুল পুলিশকে জানান, হামলাকারী ফয়জুলের একটি মোবাইলের দোকান আছে। দোকানটি সিলেট বন্দরবাজার করিম উল্লাহ মার্কেটে অবস্থিত।’
ফজলুল রহমান পুলিশকে আরও জানিয়েছেন, তার ভাই লন্ডনে আছেন। আর তার স্ত্রীর আত্মীয়স্বজন সবাই প্রবাসী।
এর আগে রাত আটটার দিকে ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের ওপর হামলাকারী ফয়জুর রহমান ফয়জুলের পিতা মাওলানা আতিকুর রহমানের বাড়িতে তল্লাশি শুরু করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। সিলেট-সুনামগঞ্জ রোডের টুকেরবাজার শেখপাড়ায় বসবাস করেন ফয়জুলের আটটা থেকে দেড়টা পর্যন্ত সিলেট র্যাব-৯ এর একটি দল ও সিলেট মহানগর পুলিশের (উত্তর) জোনের অতিরিক্ত উপ পুলিশ কমিশনার বিভূতি ভূষণের নেতৃত্বে পুলিশ ফয়জুলের ওই বাড়িতে অভিযান চালান। এসময় তারা বাড়ির দেয়াল টপকে প্রথম দফায়ই বাড়ির চারদিক তল্লাশি করেন। এরপর তারা গেটের তালা ভেঙে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে ব্যাপকভাবে তল্লাশি অভিযান চালান।
র্যাব ও পুলিশ সদস্যরা বাড়ি ভেতরে প্রবেশ করে প্রতিটি কক্ষে তল্লাশি অভিযান চালান। এসময় চারটি কক্ষ থেকে কয়েকজনের জাতীয় পরিচয়পত্র, জিহাদি বই, একটি ছোরাসহ বিভিন্ন ধরনের আলামত সংগ্রহ করেন। কয়েকটি মোবাইল নম্বর পাওয়া গেছে।তবে ওই বাড়িতে কারও ছবি পাওয়া যায়নি।
টুকেরবাজার ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শহীদ আহমদ জানান, রাত একটার দিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ফয়জুলদের ঘরে তল্লাশি চালিয়ে মাদ্রাসার বইসহ বিভিন্ন বই ও সিডি উদ্ধার করেছেন। এগুলো যাচাই-বাছাই করা হবে বলেও তারা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘মাওলানা আতিকুর রহমানের তিন ছেলে- আবুল, হাসান ও ফয়জুল। ফয়জুল সবার ছোট। হামলাকারীর পিতা টুকেরবাজারে মুখলেসিয়া মহিলা মাদ্রাসায় চাকরি করেন।’
এর আগে রাত বারোটার দিকে ওই বাড়িতে তল্লাশি চলার কথা নিশ্চিত করেন শেখপাড়া ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য গিয়াস উদ্দিন। তিনি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গেই ছিলেন। গিয়াস উদ্দিন জানান, ‘ফয়জুলের পিতা মাওলানা আতিকুর রহমানের ঘরটা বাইরের দিক থেকে তালা মারা। বাড়িটা ঘিরে রাখছে পুলিশ। বাড়ির ভেতরে কেউ নাই্।’
তিনি বলেন, ‘তারা বছর দেড়েক আগে টুকেরবাজার শেখপাড়ায় আসে। হামলাকারী ফয়জুলের বাবা মাওলানা আতিকুর রহমান তার পরিবার নিয়ে এখানে বসবাস শুরু করেন।’
সিলেট সদর উপজেলার কুমারগাঁওয়ের শেখপাড়ায় প্রায় তিন বছর থেকে বাবা-মা ও ভাইয়ের সঙ্গে বসবাস করে আসছে হামলাকারী ফয়জুল। শাবি ক্যাম্পাস থেকে ফয়জুলদের বাড়ি দেড় কিলোমিটার দূরে ছয় নম্বর টুকেরবারজার ইউনিয়নের একনম্বর ওয়ার্ডে।
স্থানীয়দের কাছে এই বাড়িটি ‘মোল্লা’ বাড়ি নামে পরিচিত। বাড়িটির কোনও নম্বর না থাকলেও সামনের দেয়ালে ঠিকানাসহ একটি নেম প্লেট লাগানো রয়েছে। এতে লেখা আছে— আব্দুল মুতালিব ও কাচা মঞ্জিল। মালিকের নাম হাফিজ আতিকুর রহমান।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়—সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার কালিয়াপন গ্রামের হাফিজ আতিকুর রহমান তার স্ত্রী, ছেলে হাসান, আবুল ও ফয়জুলকে নিয়ে শেখ পাড়ার ওই বাড়িতেই থাকেন। তারা দুই বছর আগে প্রায় পাঁচ ডিসিমেল জায়গা টিনশেডের একটি বাড়ি তৈরি করেন। হাফিজ আতিকুর রহমান সদর উপজেলার টুকেরবাজারের জামেয়া শাহ খুররম মুখলেসিয়া খাতুনে জান্নাত মহিলা টাইটেল মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করে আসছেন। এলাকার মানুষের সঙ্গে তাদের একবারেই যোগাযোগ নেই। এমনকি বাড়ির ভেতরে যাতে কেউ প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য বিশাল আকারের একটি গেটও লাগানো হয়। আর গেটের সঙ্গে লাগানো হয় আলাদা কাপড়। এমনকি দিনের বেলায় বাড়িটির বেশির ভাগ জানালা বন্ধ থাকে।
স্থানীয়রা আরও জানান—ফয়জুল মাদ্রাসা শিক্ষার্থী বলে এলাকায় পরিচয় দিতো। তবে কোন মাদ্রাসায় পড়ে, সে বিষয়ে এলাকার কেউ জানাতে পারেননি। ফয়জুল শেখপাড়া এলাকার মসজিদকে হানাফি মাজহাবের মসজিদ দাবি করে নিজে এই মসজিদে নামাজ পড়া থেকে বিরত থাকে।
শেখপাড়া এলাকার ব্যবসায়ী রুবেল মিয়া জানান- ফয়জুলসহ তার পরিবারের সঙ্গে এলাকার কারও যোগাযোগ ছিল না। তারা এলাকার দোকান থেকে কোনও সময় বাজার করতো না। যতটুকু জানি, এই বাড়িতে তারা তিন ভাই ও মা-বাবা বসবাস করে। তাদের পিতা হাফিজ আতিকুর রহমান টুকেরবাজারের জামেয়া শাহ খুররম মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেন।
সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ পুলিশ কমিশনার আব্দুল ওয়াহাব (গণমাধ্যম) জানান- হামলাকারী ফয়জুলের পরিবারের সন্ধানে পুলিশ ও র্যাব কাজ করে যাচ্ছে। তাদের বাড়িতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযানও চালিয়েছে। অভিযানের আগেই তারা বাড়িতে তালা লাগিয়ে পালিয়ে গেছে।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 






















