আকাশ বিনোদন ডেস্ক:
শুধু দেশীয় সিনেমায় নয় ওপারে কলকাতার ছবির অবস্থাও তেমন একটা সুবিধার নয়। সেই দিক থেকে হয়তো ওপার বাংলার নায়ক আর নায়িকাদের বেশি ঝোঁক চলছে বাংলাদেশের ছবির প্রতি। নাকি বাংলাদেশে অনেক নায়ক আর নায়িকাদের ছবিতে নায়ক নায়িকাদের নিলে পড়তে হয় নানা রকম সিডিউলজনিত ঝামেলায়! যদিও কারণ দর্শনটি আজও পর্যন্ত কেউ খুজে বের করতে পারেননি।
অন্যদিকে দেখা যায় কলকাতার ছবির চেয়ে বাংলাদেশের ছবিতে দর্শক জনপ্রিয়তা অনেক বেশি। দেখা যায় যে, হলের মান খারাপ থাকলেও প্রতিটি শুক্রবারের মুক্তি পাওয়া ছবিতে দর্শকদের উচড়ে পড়া ভিড়। আবার অনেক দর্শকই বসে থাকে সোশ্যাল মিডিয়া ফেসবুকের কিছু রিভিউ দেখার জন্য। সেখানে যদি রিভিউ ভাল পায় তাহলে দ্বিতীয় সপ্তাহে হলে গিয়ে দেখে ফেলেন সেই ছবিগুলো। আর এখন পর্যন্ত দেশীয় ছবির জনপ্রিয়তা না থাকলে সিনেমাপ্রেমী ভক্তরা টিভিতে বিজ্ঞাপনসহ বসে বসে দেখতো না।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একজন পরিচালকের প্রতিটি ছবি তার কাছে সন্তানতুল্য। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত একটি ছবি প্রেক্ষাগৃহে চালাতে একজন পরিচালককে কি পরিমান খড়-কুটো পোড়াতে হয়, সেটা শুধু একজন পরিচালকই জানে। কিন্তু ইদানিং দেখা যায়, একটি ছবি চালাতে অনেকের সাথে সু-সম্পর্ক গড়ে তুলতে হয়। আবার অনেককের সাথে নিজের মত সম্পর্ক গড়ে না তুলতে পারলে, তখন সে নিজের ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে নিজের ইচ্ছে মত করে একটি রিভিউ তৈরি করে সোশ্যাল মিডিয়া ফেসবুকে ছেড়ে দেন। পরে সেই ছবির রিভিউ পরে দর্শক আর ছবিটি দেখতে হলে আর যায় না। কিন্তু তাতে করে পরিচালক আর প্রযোজক ব্যাবসায়িক আর্থিক ভাবে ক্ষতির মুখে পড়ে যায়।
এ রকম একটি ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে শাকিব খান অভিনীত ‘আমি নেতা হব’ ছবির রিভিউ লিখে ফেলেন মাছরাঙা টেলিভিশনের সাংবাদিক রুম্মান রশিদ খান। যদিও তিনি মাত্র দুইটি সিনেমার কাহিনীর ছাড়া চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট পাড়ার তেমন বড় কোন ব্যক্তি নন। আবার অন্যদিক পরিচালক সূত্রে জানা যায়, শুটিং চলাকালীন তার কাহিনী ও চিত্রনাট্য এর ৮০ ভাগ বাদ দিয়ে আবার নতুন করে চিত্রনাট্য এর কাজ করে পরিচালক নিজেই শুটিং করেন। আর তার কাহিনীর ‘পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনী’ দ্বিতীয় সিনেমাটিও মুখ থুবড়ে পড়েছিলো। তাহলে নিজের লেখা আর সিনেমাই যখন আশাব্যঞ্জক নয়। তাহলে সে কিভাবে অন্যের সিনেমার রিভিউ লিখেন। নিচে ‘আমি নেতা হব’ সিনেমাটি নিয়ে তার ফেসবুকে লেখা ছবির রিভিউটি হুবহু তুলে ধরা হলো;
আমি পাগল হবো
পরিচালনা: উত্তম আকাশ
অভিনয়ে: শাকিব খান, বিদ্যা সিনহা মীম, ওমর সানি, মৌসুমী, কাজী হায়াত, শিবা শানু, সাদেক বাচ্চু, ডিজে সোহেল, সেলিম খান, উত্তম আকাশ, কাবিলা, আমির সিরাজী, সিরাজ হায়দার, কমল পাটেকর
রেটিং: ১.৫/ ৫
শাকিব খান পর্দায় ফিরেছেন প্রায় ৫ মাস পর। বিদ্যা সিনহা মীম শাকিব খানের জুটি হয়ে ফিরেছেন প্রায় ৯ বছর পর। মৌসুমীকে বোন এবং ওমর সানিকে দুলাভাই হিসেবে শাকিব খান একসঙ্গে পেয়েছিলেন ২০০৯ সালে, সাহেব নামে গোলাম ছবিতে। সে ছবিটি মুক্তির ৯ বছর পর আবারো এক হলেন শাকিব খান-ওমর সানি-মৌসুমী। ছবির নাম ‘আমি নেতা হবো’। শুধুমাত্র এই তিনটি কারণই যথেষ্ট ছিল শাকিব খান ভক্তদের জন্য। বাড়তি পাওনা হিসেবে রয়েছে ব্যাংককে চিত্রায়িত গান। স্বাভাবিকভাবেই মুক্তির প্রথম দিন ‘আমি নেতা হবো’ দেখতে প্রেক্ষাগৃহে দর্শকের ঢল নামবে-এটা প্রত্যাশিতই ছিল। তবে দর্শকের প্রত্যাশা কতটা পূরণ করেছেন নির্মাতা উত্তম আকাশ এবার আমরা সেটিই আবিষ্কার করবো।
‘আমি নেতা হবো’ ছবিতে একটি সংলাপ আছে: রাজনীতি হলো সব বুদ্ধি ও প্যাচের খেলা। এই সংলাপকেই আদর্শ মেনে গল্প সাজিয়েছেন উত্তম আকাশ। বলা হয়েছে ‘আমি নেতা হবো’ রাজনৈতিক গল্পনির্ভর ছবি। তবে সত্যি বলতে, এ ছবিতে গল্পটা যে প্রকৃত অর্থে কি, আমি খুঁজে পাইনি। চাঁদপুরে এক নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে গড়ে উঠেছে ছবির গল্প, যে গল্পে কোনো চমক নেই, চিত্রনাট্যের কোনো বালাই নেই, সংলাপেও কোনো ধার নেই। আছে উচ্চকিত ফাঁকা বুলি। ২০১৮ সালে এসেও যদি ছবির শেষ দৃশ্যে পুলিশের সেই ‘আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন না’ দেখতে ও শুনতে হয়-এর চেয়ে বড় আফসোস বুঝি আর কিছুই হতে পারেনা।
মজার বিষয় হলো, শুধু আমরা দর্শকরাই কাহিনীর খেই হারিয়ে ফেলিনি, কাহিনীকার, চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক উত্তম আকাশও আমাদের দলে ছিলেন। নয়তো সাক্কু (শাকিব খান) হাজতে যাবার পর গল্প বোঝাবার জন্য পর্দায় লিখে কেন দর্শককে জানাতে হবে, ৩ বছরে সাক্কু ৭ বার জেলে গিয়েছে? হাজত থেকে বেরিয়ে সাক্কু যখন আক্কাস ব্যাপারীর (সাদেক বাচ্চু) নির্দেশে কমল পাটেকরকে গুলি করে হত্যার অভিনয় করেন, সে মুহূর্তে কমল বেঁচে আছে কি মরে গেছে-তা দেখারও বিন্দুমাত্র ইচ্ছে হয়নি আক্কাস ও তার দলের। কারণ তারা তখন ‘লাল লিপস্টিক’ নিয়ে ব্যস্ত। অবশ্য শুধু ‘লাল লিপস্টিক’ই বা কেন ‘বিলাই চিমটি’ ছিল ছবির গল্পের অন্যতম বিশেষ অনুষঙ্গ। কাহিনীকার ভুলে গিয়েছিলেন ২০১৮ সালের দর্শকরা এ ধরনের কমেডি দৃশ্যে এখন হাসেন না। একজন নিম্ন আয়ের দর্শকেরও যে রুচি বদল হয়েছে এটি আমরা প্রায়ই ভুলে যাচ্ছি। তাছাড়া দর্শকদের নির্মাতারা খুব বেশি বোকা ভেবে ফেলেন প্রায়শই। এ ছবিতেই দেখুন, শাকিব খান অভিনীত চরিত্রের নাম সাদেকুর রহমান সাক্কু। অথচ ছবির শেষ দিকে সাক্কুর জন্য পোস্টার ছাপা হয়, যেখানে লেখা সাকিব খান (সাক্কু) কে ভোট দিন। গল্পে সাকিব খান কে? এ নামে তো কোনো চরিত্র ছিলনা। বড় বড় হরফে লেখা পোস্টারগুলো সব দর্শকই খেয়াল করেছেন। অথচ নির্মাতারা খেয়াল করলেন না? নায়ক গুলি করার আগেই শব্দ বেরিয়ে আসা কিংবা খল চরিত্রের গায়ে হাত ওঠার আগেই রক্ত ঝরে পড়া-এসব দৃশ্য দেখে সংশোধন করার একজন মানুষও ছিলেন না ‘আমি নেতা হবো’ ইউনিটে? এ ছবিতে নির্বাচন কমিশনার বলে কেউ নেই।
সাংবাদিক নিজেই বলেন, নির্বাচনের ফল কিছু সময়ের জন্য মূলতবি ঘোষণা করা হলো। এ দায়িত্ব কি সাংবাদিকের? ছোট ভাই শিবা শানুর কাছে সাদেক বাচ্চু অনুমতি চায়, শিবা চাইলে শাকিব খানকে তার দলের হয়ে কাজ করার সুযোগ দেবেন। শিবা কিছু শর্তমাফিক সম্মতি দেন। কিন্তু একটা সময় পর শিবাই বলেন, তার ভাইকে তিনি আগেই নিষেধ করেছিলেন শাকিব খানকে দলে অন্তর্ভুক্ত না করবার জন্য। কাহিনীকার ভুলে গিয়েছিলেন শিবাই তার ভাইকে অনুমতি দিয়েছিলেন। কাহিনীকার ও নির্মাতা অবশ্য আরো বেশ কিছু অদ্ভুত ক্যারিশমা দেখিয়েছেন ছবিতে। দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক অফিসে বসে রোদচশমা পড়ে কথা বলেন। নায়ক নায়িকার সাথে বিএফডিসি’র শিল্পী সমিতির সামনে দাঁড়িয়ে প্রেম করেন। বিএফডিসি’র অলি-গলি, খাল-বিলে শুটিং করা যেতেই পারে। তাই বলে পেছনে শিল্পী সমিতির সাইনবোর্ড ঝুলছে, স্টাডি রুম দেখা যাচ্ছে আর নায়ক-নায়িকা দেদারসে প্রেমের সংলাপ দিয়ে যাচ্ছে, বিষয়টা একটু কৃত্রিম ও হাস্যকর হয়ে গেল না? অবশ্য এ ছবির শুরু থেকে শেষ এরকম আরো অসংখ্য অসঙ্গতি হজম করতে হয়েছে কোমলমতি দর্শকদের। এ কারণেই ছবির শেষ দৃশ্যে যখন বলা হয়, খল চরিত্র তার পাপের শাস্তি পেয়ে গেছে। তখন দর্শকরা আমার পাশ থেকে চিৎকার করে বলেন, আক্কাস ব্যাপারী নয়, আমরা আমাদের পাপের শাস্তি পেয়ে গেছি। ‘আমি নেতা হবো’ দেখে আমি/ আমরা পাগল হবো। জীবন থেকে আড়াই ঘন্টা ছিনিয়ে নেয়ার অপরাধে টিকেটের পয়সা ফিরিয়ে দেয়া হোক।
প্রযোজক শাপলা মিডিয়া ‘আমি নেতা হবো’ নির্মাণ করতে গিয়ে বাজেটের কোনো কমতি রাখেনি। বহু তারকার সমাবেশ থেকে দেশের বাইরে চিত্রায়িত গান-সবকিছুতেই অর্থ বিনিয়োগ হয়েছে। তবে পরিচালক উত্তম আকাশের কারণে সব পরিকল্পনাই ভেস্তে গিয়েছে। স্থূল গল্প, দুর্বল চিত্রনাট্য, সেকেলে পরিচালনা দর্শককে একটি মনে রাখার মত ছবি উপহার দিতে পারেনি। জলের মত অর্থ খরচ হয়েছে, তবে কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
প্রত্যেক অভিনয়শিল্পীর অপব্যবহার হয়েছে এ ছবিতে। এটা ঠিক, শাকিব খানকে ঘিরেই এ ছবির গল্প আবর্তিত হয়েছে। তবে শাকিব খানের সাক্কু চরিত্রটিরও সঠিক চিত্রায়ণ হয়নি। শাকিব খানের এন্ট্রি থেকে শুরু করে বোনকে খল চরিত্রের হাত থেকে উদ্ধার করার দৃশ্য, এমনকি শেষ ক্লাইমেক্সে দর্শক মুহুর্মুহু তালি দিয়েছেন ঠিক। তবে এই তালি শুধুমাত্র শাকিব খানকে ভালোবেসে দিয়েছেন দর্শক। ছবিকে ভালোবেসে নয়। শাকিব খান মেধাবী অভিনেতা, তাতে সন্দেহ নেই। তবে শিকারী, নবাব ছবিতে শাকিব খান নিজেকে ছাড়িয়ে যেতে পারলে রংবাজ, অহংকার এবং সর্বশেষ আমি নেতা হবো ছবিতে তিনি তার নামের প্রতি সুবিচার করতে কেন পারছেন না-ভাববার বিষয়। দায়টা আসলে কার? শাকিব খানের নাকি বাংলাদেশি নির্মাতাদের? আমি বলবো, বাংলাদেশের অনেক নির্মাতা শিল্পীকে তার সঠিক মূল্যায়নটাই করতে পারছেন না। নইলে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেত্রী মৌসুমী ও বিদ্যা সিনহা মীমের চরিত্রের প্রতি এত অবহেলা কেন? মৌসুমী কিছু দৃশ্যে অভিনয়ের সুযোগ পেলেও তার চরিত্রের কোনো ধারাবাহিকতা ছিলনা। গভীরতা ছিলনা। বিদ্যা সিনহা মীমকে তো এ ছবির ‘ক্ষণিকের অতিথি’। গান গাইবার আগের দৃশ্যে হাজিরা দেন, নেচে গেয়ে আবার হারিয়ে যান। সামান্য একজন নর্তকী হয়েও মীম বার বার ব্যাংককে ছুটে যান গান করতে। অধিকাংশ পোষাকে তাকে নর্তকীও মনে হয়নি। ‘সুন্দরী’ চরিত্রে নতুন যে কেউ অভিনয় করতে পারতেন। কেন মীমকে প্রস্তাব করা হলো, মীমও বা কেন এ চরিত্রে অভিনয় করতে সম্মতি জানিয়েছেন-বিস্মিত হয়েছি। শাকিব খান-বিদ্যা সিনহা মীম জুটি ৯ বছর পর ফিরে এসে পর্দায় কোনো রসায়নই সৃষ্টি করার সুযোগ পাননি। যেমনটি পাননি ওমর সানি-মৌসুমী জুটি। যে সময়ে বক্স অফিসে এ জুটি ঝড় তুলতেন সে সময় এখন আর নেই, এটা যেমন সত্যি। ঠিক তেমনি সে সময়ে বলিউডে ঝড় তোলা শাহরুখ খান-কাজল জুটি যদি এখনো দিলওয়ালে’র মত ছবিতে অভিনয় করতে পারেন, আমরা কেন আমাদের অভিনেতাদের বয়স উপযোগী চরিত্রে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারছি না?
সাদেক বাচ্চু, কাজী হায়াত, শিবা শানু, কাবিলাসহ চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় অনেক শিল্পীও এ ছবিতে আছেন। তবে কারো চরিত্রের প্রতিই যথার্থ ধ্যান দেয়া হয়নি। বিশেষ করে অন্যান্য ছবির মত ডি জে সোহেলের কিছু সংলাপ বুঝেছি, কিছু বুঝতে পারিনি। তার উচ্চারণ স্পষ্ট নয়। কাবিলার কণ্ঠস্বরও ছিল তার সম্পদ। দর্শক আনন্দ পেতেন। তবে এখন কাবিলার ডাবিং ভালো হচ্ছে না। পরিচালক উত্তম আকাশ, প্রযোজক সেলিম খান, এমনকি সহকারী পরিচালক সবাই এ ছবিতে অভিনয় করেছেন। কিন্তু কাজী হায়াতের মত তারাও ইস্পাত কঠিন পাথরের মত সংলাপ প্রক্ষেপণ করেছেন।
তবে অনেক খারাপের মাঝে এ ছবির অন্যতম ভালো দিক ছবির গানগুলো। বিশেষ করে ‘লাল লিপস্টিক’ ও ‘চুম্মা’ আমজনতা দু হাত ভরে গ্রহণ করেছেন। শিস, তালি, আনন্দোল্লাসের শব্দে আমি প্রেক্ষাগৃহে গানগুলো শুনতেই পারিনি। এটি অবশ্য ভালো দিক। শাকিব খান-বিদ্যা সিনহা মীম দুজনকে দেখতে ভালো লেগেছে, নেচেছেনও ভালো। শুধুমাত্র ‘চুম্মা’ গানে ‘টাইগার জিন্দা হ্যায়’ এর ক্যাটরিনার নাচের মুদ্রা নকল না করলেও পারতেন নৃত্য পরিচালক বাবা যাদভ। ‘ঘুরছি আজো পথে পথে’ গানটির দরকার ছিল না ছবিতে। তবে এ ছবির আরেকটি হাস্যকর দিক হলো শিরোনাম গানের চিত্রায়ণ। পর্যাপ্ত ফুটেজ না থাকলে নির্মাতা গানটিই ব্যবহার না করতে পারতেন কিংবা এ ছবির ফুটেজ ব্যবহার করতে পারতেন। কিন্তু পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনি ২, সত্তা, রাজা ৪২০ সহ শাকিব খানের অন্য ছবির অংশ বিশেষ ব্যবহার করার কারণে পুরো গানটিই হাসির খোরাক যুগিয়েছে। এ ছবির আবহ সংগীত যিনি করেছেন, তিনিও সস্তার মধ্যে দিল তো পাগল হ্যায় সহ হিন্দি ও ইংরেজি গানের বহুল ব্যবহৃত গানের সুর ব্যবহার করেছেন। তার মানে ‘আমি নেতা হবো’ ছবিতে কাজের প্রতি মায়া, সততা, আন্তরিকতা, দর্শকের প্রতি দায়বদ্ধতা পরিচালকের তো ছিলই না, কলাকুশলীদের অনেকে একই পথ অনুসরণ করেছেন। বিষয়টি হতাশার, ভেবে দেখবার। প্রশ্ন জাগে মনে, এভাবে আর কতদিন?
অন্যদিকে ভোরের কাগজের বিনোদন সাংবাদিক মাহফুজুর রহমান রিভিউ লিখেন ফেলেন পূজা চেরী অভিনীত ‘নূরজাহান’ সিনেমার রিভিউ। সে ব্যক্তিগত ভাবে চলচ্চিত্রের প্রতি ঝোঁক থাকলেও ইদানিং তার সকল লেখা দিয়ে বুঝা যায়, কিছুই হচ্ছে না দেশীয় সিনেমায়। তার ফেসবুকে লেখা ছবির রিভিউটি হুবহু তুলে ধরা হলো; ২১ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ৬টার শোতে দেখলাম ‘নূরজাহান’। প্রথমেই বলে নেই- ফ্রি টিকেট পেলে ছবিটি দেখতে পারেন, পকেটের পয়সা খরচ করতে হলে ‘নূরজাহান’ থেকে দূরেই থাকুন। ভারতীয় বাংলা ছবি বলে দর্শকদের নিরুৎসাহিত করছি না। মান বিচারে ‘নূরজাহান’ সুবিধার নয় বলেই বলছি- ছবিটি না দেখলে আপনার জাত যাবে না। আর যদি দিল্লিকা লাড্ডু খেয়ে পস্তানোর সাধ জাগে, তবে দেখুন আশেপাশে কোন সিনেমা হল পান কিনা! আমি গরমে সেদ্ধ হয়ে টিকাটুলির অভিসারে ২ ঘন্টা ১৭ মিনিট বলতে গেলে নরকযন্ত্রণা ভোগ করেছি।
রাজ চক্রবর্তী ’নূরজাহানে’র প্রযোজক। তার পরিচালনার প্রথম ছবি ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’ ছিল এক প্রভাবশালী পরিবারের তরুণী আর এক গ্যারেজ মেকানিক তরুণের পালিয়ে বিয়ে করার গল্প। রাজ চক্রবর্তী আবার সেই একই গল্প তুলে দিলেন পরিচালক অভিমন্যু মুখার্জির হাতে তার প্রথম ছবির জন্য। গরীব মায়ের কলেজছাত্র আর প্রভাবশালী মায়ের কলেজছাত্রীর পালিয়ে বিয়ের গল্প ‘নূরজাহান’।
‘চিরদিনই তুমি যে আমার’ ছিল তামিল ছবি ‘কাধাল’ এর ফ্রেম টু ফ্রেম কপি। ‘নূরজাহান’ আবার মারাঠি ব্লকবাষ্টার ‘সাইরাতে’র অনুপ্রেরণায় নির্মিত। ঠিকই পড়েছেন, রিমেক নয়, নকল নয়, অনুপ্রেরণাই নিয়েছেন রাজ চক্রবর্তী। রিমেক করলেই বোধ হয় ভালো করতেন। টুকরো টুকরো দৃশ্য কপি করার চেয়ে পুরো গল্প নিলে অন্তত স্ক্রিপ্ট রাইটার এমন নাকানিচুবানি খেয়ে অজ্ঞান হতেন না।
মফস্বলের কলেজ ছাত্রসংসদের নির্বাচনে পূজা চেরিকে দাঁড় করিয়ে দিলেন তার মা অপরাজিত্য আঢ্য। পূজা নিজের নির্বাচন বাদ দিয়ে ক্লাসের ফার্স্টবয় মানে ক্লাস রিপ্রেজেন্টিটিভ আদৃতকে ভোটে দাঁড়ানোর জন্য উৎসাহিত করতে লাগলেন। আদৃত ভোটে দাঁড়ালেন এবং পাসও করলেন। পূজা রাজনীতিবিদ মায়ের মেয়ে হয়েও হেরে ক্ষান্ত হলেন না, আদৃতের প্রেমে হাবুডুবু খেতে লাগলেন। ক্ষমতাশালী মা শিগগিরই বাধা হয়ে দাঁড়ালেন। দুই তরুণ এলাকা ছাড়তে বাধ্য হলেন। শহরে এসে তারা হিমশিম খেলেন। কুলিমজদুরি, চোরাকারবারি করেও নিজেদের অস্তিত্ব বাঁচাতে পারলেন না। মাফিয়াদের হাতে প্রাণ দিলেন পূজা। আদৃত মরলেন পূজার মায়ের লোকেদের হাতে বেদম মার খেয়ে।
শ্রীভেঙ্কটেশ, রাজ প্রডাকশন আর জাজ মিডিয়া তিন প্রযোজক মিলে ছবি বানিয়েছেন। অথচ ছবিতে বাজেটের বিশাল ঘাটতি। মনে হয়েছে কাকরাইলের কোন তলাবিহীন প্রযোজক খেয়ে না খেয়ে ছবি করেছেন। ছাত্রসংসদের নির্বাচনের মিছিল হয় ১৫ জন ছাত্র নিয়ে, ভাবতে পারেন? ভোটের সময় ছাত্রদের সমাবেশ দেখা যায় না। ৫/৬ জন ছাত্র এদিকে সেদিকে ঘোরাঘুরি করে। ভোট দিতে দেখা যায় না ছাত্র-ছাত্রীদের। ভিখারীদের নির্বাচনেও আজকাল ন্যূনতম জাকজমক থাকে। নির্বাচনের ঘটনার ভেতর দিয়ে পূজা-আদৃতের কাছে আসা। সেই নির্বাচন এমন দায়সারাভাবে চিত্রনাট্যে এসেছে, যা দেখে মেজাজ খারাপ হয়ে গেছে।
চরিত্রহীন আচরণ ছবিজুড়েই করে গেছেন ছবির চরিত্ররা। যার শুরু নির্বাচন থেকেই। আদৃত গোবেচারা কিসিমের মেধাবী ছাত্র। সে যে মেধাবী গল্পে তার প্রমাণ কই? সে পড়েও না, নড়েও না। র্যাগিং হলে নিজে প্রতিবাদ করতে পারে না, প্রতিবাদ করে পূজা। সেই ছেলে ছাত্রসংসদের ভিপি হয়ে যায় ৩০ সেকেন্ডের এক ভাষণ দিয়ে। তাকে ভাষণ দিতে দেখা যায়, যারা শুনলো তাদের দেখা যায় না। যারা ভোট দিলো তাদেরও দেখা মেলে না। পয়সার টানাটানি! ভিপি হয়েও আদৃত পোড়ো বাড়িতে ২/৩ জন বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা দেয়। ভিপির সঙ্গে কখনোই ছাত্রদের বহর দেখা যায় না। ভিপি আদৃত ক্লাসমেট পূজার বাইকে চড়তে ইতস্তত করে। কথা বলতে কাচুমাচু করে। এমনকি সাতারও জানে না। শুধু কাধে একখানা ঝোলা নিয়ে একলাটি পথ হাটে। ৪/৫ জন মিলে তাকে পেদিয়ে (জ্বী, এসব কলকাতার শব্দে ভরপুর ছবিটি) যায়। সে মরার মতো পড়ে থাকে। তাকে পূজা প্রেম প্রস্তাব করলে, বিনা কারণে প্রেম স্বীকার করে নেয়।
ছবির কোনো এক জায়গায় এই নায়ক চরিত্রটি নায়কোচিত আচরণ করতে পারে না। আদৃতের চরিত্র এতোটাই দুর্বল যে, দর্শকের ক্রোধ উৎপন্ন করে। বিপরীতে পূজা বেশ সবল। শুরুতেই সে করতালি পায়। কিন্তু গল্প তাকে সহযোগিতা করে না। জায়গায় জায়গায় চরিত্রটির বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। পূজা তার বাবলীল অভিনয় দিয়ে বেরিয়ে গেছে। পূজাই ছবির একমাত্র স্বস্তি। নতুবা সোয়া দুই ঘন্টা ধরে ’নূরজাহান’ সহ্য করা মুশকিল ছিল।
যাই হোক, পূজায় মত্ত না থেকে গল্পে ঢুকি। গল্পে ঢুকলেই আদৃতের আজগুবি আচরণ। সে দুখিনী মায়ের ছেলে। যে মা আবার এক লাইনে ছেলেক উৎসাহিত করে রাজনীতিতে নামিয়ে দেয়। সেই ছেলে মায়ের ফোন অবদি ধরে না শহরে গিয়ে। মায়ের জন্য তার মন পোড়ায়ও না। আজব চরিত্র মাইরি!
শহরের কথা বলছিলাম, ভাবছেন কলকাতা? না গো! এ ঢাকা, হাতিরঝিলে এসে পড়ে কপোত কপোতি। সেখানে সমকামী ঠিকাদার লুটে নিতে চায় আদৃতের ইজ্জত! পুরো ছবিতে আদৃত নায়িকার ভূমিকাই পালন করেছে। পূজাই ছিল নায়ক। সে শহরে এসেও প্রতিবাদী চরিত্র হারায় না। আর আদৃত ন্যায্য মজুরি না পেয়ে প্রতিবাদটুকুও করতে পারে না।
পুলিশের এক কথায় সে ইনফরমার বনে যায়। কথা কথায় নায়িকার বুকে মাথা দিয়ে ছিচকাঁদুনে নায়কের নাম নূর। এই নূর চরিত্রটিই ‘নূরজাহান’কে ডুবিয়েছে। ‘নূরজাহানে’র চিত্রনাট্য অসম্ভব ধীরগতির। ছবির গল্প বানরের তৈলাক্ত বাঁশে আরোহণের মতো। যতখানি এগোয় তারচেয়ে পিছোয়। ২ ঘন্টা পেরিয়েও ছবির কোন তল-কিনারা হয় না। আচমকা শেষ দৃশ্যে নায়ক-নায়িকার মৃত্যুু ছবির যবনিকাপাত ঘটায়। এবং দর্শকদের চরম ধৈর্যপরীক্ষা শেষ হয়।
আহারে ছাত্রসংসাদ নির্বাচন! আহারে কেয়ামত সে কেয়ামত তক! আহারে রোমিও জুলিয়েট! ভাবছেন পাগলের প্রলাপ বকছি? ‘নূরজাহান’র প্রত্যেকটি চরিত্র এমন পাগলের মতোই আচরণ করে। কখনো কলকাতার টানে বাংলা বলে, কখনো পূর্ববঙ্গের আঞ্চলিক শব্দ ঢুকে যায়। কখনো কেরানির মতো দেখতে স্যারকে ‘নমস্কার’ বলে ছাত্র। কখনো সন্তান মাকে বলে ‘আম্মি’। মা নয়, আম্মা নয়, কলকাতার বিশুদ্ধ মুসলমানের মতো ‘আম্মি’।
গল্পটা কিন্তু হাতিরঝিলের! অথচ ছবির ৫% সংলাপ হিন্দি। যার আবার সাবটাইটেল দেয়া হয়েছে স্ক্রিনের নিচে, প্রায় পড়াই যায় না এতো ক্ষুদ্রাকৃতি। গানের মধ্যে ‘ধারকান’ শব্দটিও পেয়েছি। যার কোন সাবটাইটেল ছিল না। (ধারকান মানে হৃদস্পন্দন, ডিকশনারি খুলে জানতে পারলাম)। ছবির একটা সংলাপও মনে ধরেনি। বরং বারবার বিরক্ত হয়েছি পুলিশ অফিসারের মুখে বরিশালের আঞ্চলিক ভাষায়। ক্ষুব্ধ হয়েছি অপরাজিতার ‘খাইছি’ মার্কা শব্দপ্রয়োগে।
সংক্ষেপে বলতে গেলে ’নূরজাহানে’র গল্প অহেতুক ঘুরপাক খেয়ে খেয়ে দর্শকমনে বিতৃষ্ণা তৈরি করে। চিত্রনাট্য অগোছালো এবং দুর্বল। কোথাও এতোটুকু যত্নের ছাপ নেই। আনাড়ি হাতে কোনরকম একটা চিত্রনাট্য দাঁড় করানো হয়েছে। আর তার এক্সিকিউশন করতে গিয়ে পরিচালকের আনাড়িপনাও বেরিয়ে এসেছে। রোমান্টিক ছবিতে মাত্র তিনটি গান রিলিফ দিতে পেরেছে। বাকি সময়টুকু (প্রায় ২ ঘন্টা) পরিচালক যেন ত্যানা প্যাঁচাতে প্যাঁচাতেই ব্যয় করেছেন। সেই নূর মানে সেই প্রদীপ আর জ্বলেনি। নায়িকার অপমৃত্যু শেষ পর্যন্ত দর্শকের পয়সাও উসুল করতে দেয় না।
সম্পাদক কেটেছেঁটে ছবিটিকে ‘মানুষ’ করতে পারতেন। তিনিও যেন গা এলিয়ে দিয়ে বসেছিলেন। চিত্রগ্রাহক অখাদ্য-কুখাদ্য যাই শুট করে এনেছেন, ছবিতে জোড়াতালি মেরে তিনি শুয়ে পড়েছেন। ছবিতে ভিলেন নেই, তাই ব্যাকগ্রাউন্ড কম্পোজার ভিলেনের ভূমিকায়। কোথাও তার কোন তৎপরতা নেই। একঘেয়ে সুরে তিনি ছবিকে বেঁধেছেন। সবমিলিয়ে মনে হয়েছে, ওপারের সিনেমার ওপারের দর্শকদের খাওয়ানোই শ্রেয়।
অন্যথায় এ রকম চলতে থাকলে সরকারি ভাবে বিদেশী সিনেমা আমাদের দেশে আসতে থাকবে। আর তখনই আমাদের দেশীয় সিনেমা হারিয়ে যাবে। দেশীয় সিনেমার বাজার টিকিয়ে রাখা আর দেশীয় সিনেমা আরো উপরের দিকে তুলতে আমাদের সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। আপনার একার জন্য একটি ছবি আর্থিকভাবে ক্ষতি করার অধিকার তো আপনাদের নেই। সবার নিজ দায়িত্ব থেকে আর্থিক ক্ষতির মুখ থেকে প্রতিটি ছবি আরো উপরের দিকে তুলে প্রমাণ করুন বাংলাদেশের মানুষ এখন ভালো কিছু পারে। অন্যথায় কারো বিয়ে দিয়ে আবার সেই বিয়েতে ক্লিক লাগিয়ে বিয়ে আর সংসার ভাঙ্গার মত ব্যাপার গুলো হয়ে দাঁড়াবে।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 

























