অাকাশ আর্ন্তজাতিক ডেস্ক:
বিজেপি ভারতকে মুসলিম মুক্ত করতে চায় এবং আরএসএস ভারত থেকে দলিত মুক্ত করতে চায় বলে মন্তব্য করেছেন মজলিশ-ই ইত্তেহাদুল মুসলেমিন (মিম) প্রধান ব্যারিস্টার আসাদউদ্দিন ওয়াইসি এমপি। গতকাল (সোমবার) বিজেপিশাসিত মহারাষ্ট্রের আওরঙ্গাবাদে এক জনসভায় ভাষণ দেয়ার সময় তিনি ওই মন্তব্য করেন।
দলিত ও মুসলিমদের উদ্দেশে ওয়াইসি বলেন, ‘মুসলিম ও দলিতদের এবার জেগে উঠতে হবে কারণ, বিজেপি এ দেশকে মুসলিম মুক্ত ভারত করতে চাচ্ছে একইভাবে আরএসএস দলিত মুক্ত ভারত চায়।’
তিনি বলেন, সংঘ পরিবারের মতাদর্শ ও তাদের গুরু গোলওয়ালকর, হেডগেওয়ার থেকে সাভারকার পর্যন্ত মতাদর্শ হল মুসলিমদের হিন্দু বানানো। এ রকম পরিস্থিতিতে এখন দলিত-মুসলিম সংঘকে এ ধরণের প্রয়াসের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে বলতে হবে তারা হিন্দুত্বকে গ্রহণ করবে না।’
সংঘ পরিবারের (আরএসএস) নির্যাতন ও বৈষম্য প্রতিরোধের জন্য দলিত-মুসলিম ঐক্য সময়ের দাবি বলেও আসাদউদ্দিন ওয়াইসি মন্তব্য করেন।
এ প্রসঙ্গে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মন্ত্রী ও কোলকাতার নব বালিগঞ্জ মহাবিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আব্দুস সাত্তার আজ (মঙ্গলবার) রেডিও তেহরানকে বলেন, “আরএসএসের মূলত তিনটে শত্রু, তা হল কম্যুনিস্ট, মুসলিম ও খ্রিস্টান। দীর্ঘকাল ধরে তারা তাদের তিন শত্রুর বিরুদ্ধে ‘জেহাদ’ ঘোষণা করেছে। ১৯২৫ সালে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএস যখন গঠিত হয় তার পর থেকে ওই কাজ তারা করছে।”
পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট বামপন্থি নেতা ড. আব্দুস সাত্তার বলেন, “দেশের উন্নয়ন অথবা স্বাধীনতা আন্দোলনে ওদের সেই অর্থে কোনো ভূমিকা ছিল না। একের পর এক আরএসএসের নেতারা ইংরেজদের কাছে মুচলেকা দিয়ে পরবর্তীকালে জনসংঘের নেতারাও মুচলেকা দিয়ে বেরিয়ে এসেছে। তারা স্বাধীনতা আন্দোলনে কোনো লড়াই করেনি। যখন দেশের প্রয়োজন ছিল তখন ওরা মুচলেকা দিয়ে ইংরেজদের সাহায্য করেছেন। আজ তারা মুসলিমদের কাছে দেশভক্তির প্রমাণ চাচ্ছেন!
দ্বিতীয়ত, সংসদীয় গণতন্ত্রে মুসলিমদের কণ্ঠহীন করার প্রয়াস আমরা ইতিমধ্যেই দেখেছি। স্বাধীনতার পর লোকসভায় এই প্রথম সবচেয়ে কম মুসলিম এমপি গেছে। তার অন্যতম কারণ হচ্ছে বিজেপি’র একক সরকার গঠন। পরবর্তীকালে আমরা যা দেখলাম উত্তর প্রদেশে ৮০টা লোকসভা আসনের মধ্যে একটিতেও বিজেপি মুসলিম প্রার্থী দেয়নি। একইভাবে বিধানসভা নির্বাচনে ৪২৫ আসনের একটিতেও তারা মুসলিম প্রার্থী দেয়নি। গুজরাট বিধানসভার ক্ষেত্রেও আমরা দেখলাম এখানেও তারা একজনও মুসলিম প্রার্থী দেয়নি। ফলে সংসদীয় গণতন্ত্রে মুসলিমদের কণ্ঠহীন করার যে প্রয়াস তা আরএসএস-বিজেপি করে চলেছে। ওদের লক্ষ্যই তাই।”
তিন বলেন, “দলিতদের ক্ষেত্রেও তাদের (আরএসএস-বিজেপি’র) যে মনোভাব তাও খুব কঠিন মনোভাব। এই মাত্র কয়েকদিন আগে বিজেপির এক নেতা দলিতদের কুকুরের চেয়েও অধম হিসেবে তুলনা করেছেন! রোহিত ভেমুলার ঘটনা, উনার ঘটনা এভাবে একের পর এক ঘটনা প্রমাণ করে তারা দলিতদেরও চায় না। মুসলিমদের তো চায়ই না, দলিতদেরও চায় না।
কিন্তু দলিতদের ক্ষেত্রে একটা সুবিধা আছে, কারণ সংরক্ষণ ব্যবস্থা (কোটা পদ্ধতি) থাকায় সংসদীয় গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে তাদের কণ্ঠহীন করার বিষয়টি কম। কিন্তু দলিতদের ওপরে নিপীড়ন, অত্যাচার ভয়ঙ্করভাবে বেড়েছে। মুসলিমদের ক্ষেত্রে তো বেড়েইছে কারণ আখলাক, জুনাইদ, আফরাজুল হত্যার মাধ্যেমে একের পর এক আমরা চোখের সামনে দেখছি তারা অত্যাচার নামিয়ে আনছে, জেহাদ নামিয়ে আনছে।”
‘ড. আব্দুস সাত্তার বলেন, “মুজাফফরনগর দাঙ্গায় যারা জড়িত তাদের মন্ত্রী করে দেয়া হয়েছে। ওই দাঙ্গায় যারা অভিযুক্ত তাদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যহারের প্রয়াস চলছে। মালেগাঁও বিস্ফোরণের ক্ষেত্রেও যারা যুক্ত ছিল তাদের বিরুদ্ধে মামলা সহজ করার প্রয়াস চলছে। ফলে দলিত ও মুসলিমরা বুঝতে পারছে আরএসএস হল ব্রাহ্মণ্যবাদী ভাবনা-চিন্তার সংগঠন।
সেই সংগঠনই আজকের সরকারকে পরিচালনা করছে। এবং আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত যা বলছেন, অসমেও দু’ তিন আগে যা তিনি বলেছেন তা ভয়ঙ্কর চিন্তার! তিনি বলছেন এদেশে যারা বাস করে তারা সকলেই হিন্দু। এই যে মানসিকতার প্রতিফলন, তারা ক্ষমতাসীন হওয়ার ফলে ভারতকে ‘হিন্দু পাকিস্তান’ বানাতে চাচ্ছে।”
তিনি বলেন, “গুজরাটে সংখ্যালঘুদের জন্য কিছু করা হয় না। কোনো দফতর নেই। সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয়স্তরে সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয় থাকার কথা বলা হলেও গুজরাটে তা নেই। গুজরাটে মুসলিমদের উন্নয়নের জন্য কোনো অর্থ বরাদ্দ থাকে না। ফলে একদিকে আরএসএস-বিজেপি যেভাবে তাদের এজেন্ডা রূপায়িত করতে চাচ্ছে, অন্যদিকে দলিত-মুসলিমরা এক ছাতার তলায় আসছে। কারণ, তারা বুঝতে পারছে এই ভয়ঙ্কর রাজনীতির মোকাবিলা করা না গেলে অত্যাচারের মাত্রা আরো ভয়ঙ্কর রূপ নেবে এবং এ দেশকে ওরা হিন্দুপাকিস্তান বানিয়ে ছাড়বে।”
গতকাল (সোমবার) মহারাষ্ট্রের আওরঙ্গাবাদে চল্লিশ হাজার মানুষের উপস্থিতিতে আসাদউদ্দিন ওয়াইসি কেন্দ্রীয় সরকারের তালাক বিলের তীব্র সমালোচনা ওই বিলকে মুসলিম নারীদের বিরোধী ও সমতার অধিকার বিরোধী বলে মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, এ ধরণের ত্রুটিপূর্ণ আইনের কোনো প্রয়োজন নেই। এ ধরণের আইন আসলে মুসলিম পুরুষদের কারাগারে নিক্ষেপ করা ও নারীদের সড়কে নামানোই আসল উদ্দেশ্য বলে ব্যারিস্টার আসাদউদ্দিন ওয়াইসি মন্তব্য করেন।
ওয়াইসি বলেন, “মুসলিম নারীদের ইনসাফ দেয়া আসলে বাহানা মাত্র, আসল উদ্দেশ্য শরীয়াকে টার্গেট করা। যদি মিস্টার মোদি সত্যিই সুবিচার করতে চান তাহলে আসন্ন বাজেটে দুই হাজার কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ করুন এবং বলুন তালাকপ্রাপ্তা নারীদের প্রত্যেক মাসে পনেরো হাজার টাকা করে দেয়া হবে।”
আকাশ নিউজ ডেস্ক 



















