সাতক্ষীরার দেবহাটায় ওয়াহেদুজ্জামান সানা ওরফে শামীম নামের এক ব্যক্তি পিটিয়ে মৃত্যুর ঘটনায় তার পরিবারের দায়ের করা মামলায় ১০ জনকে এজাহারভুক্ত আসামি করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে শামীমের বড় ভাই আব্দুল জলিল বাদী হয়ে দেবহাটা থানায় এই মামলাটি করেন। এজাহারে প্রধান আসামি ফজলুল হক আমিনীসহ মোট ১০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং অজ্ঞাতনামা হিসেবে আরও ২৫০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। পুলিশ এ পর্যন্ত মামলার এজাহারভুক্ত দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে। বৃহস্পতিবার রাতে মোক্তার আলীকে এবং শুক্রবার সকালে আসাদুল ইসলাম মোল্লাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে মামলার প্রধান আসামি ফজলুল হক আমিনী এখনো ধরা পড়েননি। বৃহস্পতিবার সকালে স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি শামীমের হত্যার ঘটনা নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি না করতে তাদের হুমকি দিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর ফজলুল হক আমিনী ধর্মীয় বিষয়ে আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন।
নিহতের পরিবারের ভাষ্যমতে, দীর্ঘ ১০ থেকে ১২ বছর ধরে মানসিক ভারসাম্যহীনতায় ভুগছিলেন শামীম। মহানবীকে নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে তার একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর সোমবার সন্ধ্যায় তার বাড়িতে হামলা চালানো হয়। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, জামায়াত কার্যালয়ের সামনে থেকে ১০০ থেকে ১৫০ জনের একটি দল শামীমের বাড়ির গেট ভেঙে ভেতরে ঢুকে তাকে মারধর করে। একপর্যায়ে তিনি বিষপান করেন বলে অভিযোগে বলা হয়েছে। চিকিৎসার জন্য তাকে একটি ক্লিনিকে ভর্তি করা হলে সেখানেও পুনরায় হামলার অভিযোগ পাওয়া গেছে। মামলার এজাহার ও পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, দেবহাটার বড়শান্তা গ্রামের মৃত শামসুদ্দিন সানার ছেলে ওয়াহেদুজ্জামান সানা ওরফে শামীম ১০ থেকে ১২ বছর ধরে মানসিক রোগে ভুগছিলেন। পরে তাকে কুলিয়া বাজারের ডা. এম এ সবুরের ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, মঙ্গলবার বিকেলে ফজলুল হক আমিনীর নেতৃত্বে পারুলিয়া ইউনিয়ন জামায়াতের সেক্রেটারি সাদিকুল ইসলামসহ শতাধিক লোক ক্লিনিক ঘেরাও করেন এবং চিকিৎসককে চিকিৎসা বন্ধ করার নির্দেশ দেন। এরপর শামীমকে বাইরে বের করে এলোপাতাড়ি মারধর করা হয়। পরবর্তীতে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে সখীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। সেখানেও হামলাকারীরা হাসপাতালের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ওয়ার্ডে প্রবেশ করে এবং শামীমকে আবারও মারধর করে বলে এজাহারে উল্লেখ রয়েছে। গুরুতর অবস্থায় সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।
শামীমের ছোট ভাই তাহসিভ রহমান সাগরের দাবি, মামলা করার পর তাদের পরিবার বিভিন্নভাবে হুমকি পাচ্ছে। মামলার প্রধান আসামি আমিনীর বিরুদ্ধে অতীতেও বিভিন্ন হামলার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, গত বছর মে মাসে বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদুল ইসলামের বাড়িতেও তার নেতৃত্বে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়েছিল। এছাড়া আরও কয়েকজনের ওপর হামলার অভিযোগ রয়েছে, যদিও এসব ঘটনার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাদের দাবি, ২০২৫ সালের মে মাসে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে তার নেতৃত্বে দক্ষিণ পারুলিয়ার বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদুল ইসলামের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। একই ধরনের অভিযোগে কুলিয়ার সোহাগ ও দক্ষিণ পারুলিয়ার এক ইউপি সদস্যের ওপর হামলা এবং তাদের বাড়ির মালামাল লুটের অভিযোগও করেন ওই বাসিন্দারা।
অন্যদিকে, মামলার প্রধান অভিযুক্ত ফজলুল হক আমিনীর কর্মকাণ্ডের বিষয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে ফেসবুক লাইভ ও বিবস্ত্র ছবি প্রকাশের অভিযোগও আনা হয়েছে। তবে জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা আজিজুর রহমান এক ভিডিও বার্তায় দাবি করেছেন, এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর ঘটনার সঙ্গে তাদের কোনো নেতা-কর্মী জড়িত নন এবং রাজনৈতিকভাবে তাদের ভাবমূর্তি নষ্টের চেষ্টা করা হচ্ছে।
দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম শাহীন জানিয়েছেন, পুলিশ মামলার তদন্ত শুরু করেছে এবং গ্রেপ্তার দুই আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে রিমান্ড আবেদন করা হবে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। তবে আইন অনুযায়ী, আদালতে দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্তরা নির্দোষ বলে বিবেচিত হবেন।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 























