আকাশ জাতীয় ডেস্ক:
রপ্তানির আড়ালে বিপুল অঙ্কের অর্থপাচারের অভিযোগ উঠেছে রপ্তানিকারক সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে। তিনি এস ইসলাম হোম অ্যান্ড ফ্যাশন লিমিটেডের কর্ণধার। আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রাথমিক পরিদর্শন প্রতিবেদনে এ সংক্রান্ত চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে প্রায় ৫৮ লাখ ২২ হাজার মার্কিন ডলার থেকে ৭ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার পর্যন্ত অর্থপাচারের আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৭০ কোটি থেকে ৮৭৬ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ১২০ টাকা হিসেবে)।
বিএফআইইউর প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৩ সাল থেকে ২২৭টি ইএক্সপি বা রপ্তানি চালানের মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মালয়েশিয়ায় ৭৫ লাখ ৭৮ হাজার মার্কিন ডলারের পোশাক রপ্তানি দেখিয়েছে এস ইসলাম হোম অ্যান্ড ফ্যাশন লিমিটেড। তবে পণ্যের এইচএস কোডভিত্তিক তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, রপ্তানিকৃত পণ্যের ইউনিট মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারদরের তুলনায় ১ দশমিক ৭৮ গুণ থেকে ১০ দশমিক ৬৪ গুণ পর্যন্ত কম দেখানো হয়েছে।
এতে ধারণা করা হচ্ছে, প্রকৃত রপ্তানি মূল্য ১ কোটি ৩৪ লাখ ডলার থেকে ৮ কোটি ৬ লাখ ডলার পর্যন্ত হতে পারে। অর্থাৎ রপ্তানির প্রকৃত মূল্য গোপন করে বিপুল অঙ্কের অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে থাকতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, প্রতি পিস টি-শার্ট, প্যান্ট বা ট্রাউজারের মূল্য ১ থেকে ১ দশমিক ৫০ মার্কিন ডলার দেখানো হয়েছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৩০ থেকে ২০০ টাকা। গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, এ ধরনের পোশাকের আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য সাধারণত এর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। এছাড়া একই গন্তব্যে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে একাধিক ইনভয়েস ইস্যুর মাধ্যমে বড় চালানকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করার ঘটনাও শনাক্ত হয়েছে, যা শুল্ক নজরদারি এড়ানোর কৌশল হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
বিএফআইইউর পর্যবেক্ষণে আরও দেখা গেছে, রপ্তানির অর্থ ব্যাংক হিসাবে জমা হওয়ার পরপরই তা নগদে তুলে নেওয়া হয়েছে। ২০২০ সালের আগস্টে হিসাব খোলার পর থেকে চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ৪৮ কোটি ৯৪ লাখ টাকা জমা হয়েছে এবং প্রায় সমপরিমাণ অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। ফরেন বিল পারচেজ ও নগদ জমার অর্থ একই দিনে বা অল্প সময়ের ব্যবধানে উত্তোলনের একাধিক দৃষ্টান্ত পাওয়া গেছে। তদন্তকারীদের মতে, এ ধরনের লেনদেন অর্থের প্রকৃত উৎস ও গন্তব্য আড়াল করার চেষ্টা হতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের মালিক সিরাজুল ইসলাম সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে নিবন্ধিত ‘মোহাম্মদ সিরাজুল গার্মেন্টস ট্রেডিং এলএলসি’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানেরও মালিক। রপ্তানি চালানের বড় অংশ ওই প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে দেখানো হয়েছে। তবে বিদেশে বিনিয়োগ বা কোম্পানি গঠনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনের কোনো তথ্য ব্যাংক নথিতে পাওয়া যায়নি। একই ব্যক্তির মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আমদানি-রপ্তানি দেখিয়ে অর্থ স্থানান্তরের বিষয়টি ট্রেড-বেজড মানি লন্ডারিংয়ের ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া জাহাজীকরণের চার মাস পার হলেও ৭৪টি রপ্তানি বিলের বিপরীতে ৩৫ লাখ ২৯ হাজার মার্কিন ডলার দেশে ফেরত আসেনি। দেশীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৪২ কোটি ৩৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা। এটি বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন সংক্রান্ত নির্দেশনা লঙ্ঘনের পাশাপাশি মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের আওতায় অপরাধের শামিল হতে পারে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
গোয়েন্দা ইউনিটের পর্যবেক্ষণে আরও উঠে এসেছে, দুবাইভিত্তিক আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের ‘নোটিফাই পার্টি’ হিসেবে মালয়েশিয়ার একটি তৃতীয় প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে। এতে আশঙ্কা করা হচ্ছে, মালয়েশিয়ায় কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের রেমিট্যান্স অর্থ রপ্তানি মূল্য প্রত্যাবাসনের নামে দেশে পাঠানো হয়েছে কিনা, অথবা অবৈধ হুন্ডি বা হাওলা পদ্ধতির কোনো সংশ্লেষ আছে কিনা—তা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
সার্বিক বিবেচনায় আন্ডার ইনভয়েসিং, সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে লেনদেন, রপ্তানি মূল্য দেশে ফেরত না আসা এবং অস্বাভাবিক নগদ লেনদেনের মতো বিষয়গুলো গভীর তদন্তের দাবি রাখে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থার কাছে পাঠানো হয়েছে এবং প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 



















