ঢাকা ১০:৪০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারী ২০২৬, ১৭ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সামরিক হামলা এড়াতে ইরানকে ট্রাম্পের দুই শর্ত

আকাশ আন্তর্জাতিক ডেস্ক : 

উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি জোরদারের মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, সামরিক হামলা এড়াতে ইরানকে অবশ্যই দুটি শর্ত মানতে হবে। তিনি স্পষ্ট করে জানান, প্রথমত ইরানের কোনো পারমাণবিক কর্মসূচি থাকতে পারবে না এবং দ্বিতীয়ত দেশটিকে বিক্ষোভকারীদের হত্যা বন্ধ করতে হবে।

স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) এক অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, ‘প্রথম—কোনো পারমাণবিক কর্মসূচি নয়। দ্বিতীয়—বিক্ষোভকারীদের হত্যা বন্ধ করতে হবে। তারা হাজারে হাজারে মানুষকে হত্যা করছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমাদের অনেক বড় ও অত্যন্ত শক্তিশালী জাহাজ ইরানের দিকে এগোচ্ছে। আমরা যদি এগুলো ব্যবহার না করেই পরিস্থিতি সামাল দিতে পারি, তাহলে সেটাই সবচেয়ে ভালো হবে।’

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে তেহরানের ওপর চাপ বাড়িয়ে আসছে ওয়াশিংটন। সেই প্রেক্ষাপটেই ট্রাম্পের এই মন্তব্য এসেছে।

এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যেকোনো আগ্রাসনের জবাবে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী ‘তাৎক্ষণিক ও শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া’ জানাতে প্রস্তুত। তার ভাষায়, বাহিনী ‘ট্রিগারে আঙুল রেখে’ অপেক্ষায় রয়েছে।

শুক্রবার আরাগচি তুরস্কের ইস্তাম্বুলে পৌঁছান। সেখানে মার্কিন সামরিক হামলার সম্ভাব্য হুমকি এড়ানো এবং আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। এর পরই তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে ফোনালাপে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে উত্তেজনা ‘হ্রাসে’ সহায়তা করতে আঙ্কারা আগ্রহী বলে জানান।

ট্রাম্প এসব মন্তব্য করেন তার স্ত্রী মেলানিয়াকে নিয়ে নির্মিত একটি তথ্যচিত্রের প্রিমিয়ারে। এর আগে চলতি সপ্তাহে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লিখেছিলেন, ‘আশা করি ইরান দ্রুত আলোচনার টেবিলে আসবে এবং একটি ন্যায্য ও সামঞ্জস্যপূর্ণ চুক্তিতে পৌঁছাবে—যেখানে কোনো পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে না।’ একই পোস্টে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘একটি বিশাল নৌবহর ইরানের দিকে যাচ্ছে’,যা প্রয়োজনে দ্রুত ও কঠোরভাবে অভিযান চালাতে সক্ষম।

এর জবাবে আরাগচি বলেন, ইরান সবসময়ই পারস্পরিক লাভজনক ও ন্যায্য একটি পারমাণবিক চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে—যা হবে সমমর্যাদার ভিত্তিতে, ভয়ভীতি ও হুমকিমুক্ত। তিনি বলেন, এমন চুক্তি শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তিতে ইরানের অধিকার নিশ্চিত করবে এবং পারমাণবিক অস্ত্র না থাকার নিশ্চয়তা দেবে। তার দাবি, ‘পারমাণবিক অস্ত্র আমাদের নিরাপত্তা কৌশলের অংশ নয় এবং আমরা কখনোই তা অর্জনের চেষ্টা করিনি।’

ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি জানিয়েছেন, কিছু বার্তা আদান–প্রদান হলেও বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা চলছে না।

চলতি মাসের শুরুতে ট্রাম্প বলেছিলেন, কর্তৃপক্ষ যদি বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা চালায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের “উদ্ধার” করতে এগিয়ে আসবে। গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ দিকে ইরানি মুদ্রার বড় ধরনের পতনের পর দেশটিতে বিক্ষোভ শুরু হয়, যা দ্রুত ধর্মীয় নেতৃত্বের বৈধতা নিয়ে সংকটে রূপ নেয়।

তেহরানের বাসিন্দারা বিবিসিকে জানিয়েছেন, বিক্ষোভকারীদের ওপর এবারের দমনপীড়ন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি কঠোর। যদিও ট্রাম্প পরে দাবি করেন, নির্ভরযোগ্য সূত্রে তিনি জেনেছেন যে বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা বন্ধ হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হরানা জানিয়েছে, অস্থিরতা শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ছয় হাজার ৪৭৯ জনের মৃত্যুর তথ্য তারা নিশ্চিত করেছে। এর মধ্যে ছয় হাজার ৯২ জন বিক্ষোভকারী, ১১৮ জন শিশু এবং ২১৪ জন সরকারি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি রয়েছেন। সংস্থাটি আরও প্রায় ১৭ হাজার মৃত্যুর খবর তদন্ত করছে।

অন্যদিকে ইরানি কর্তৃপক্ষের দাবি, এ পর্যন্ত তিন হাজার ১০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, যাদের বেশিরভাগই নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য বা ‘দাঙ্গাকারীদের’ হামলায় নিহত পথচারী।

এ পরিস্থিতির মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইরানের ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ডসকে (আইআরজিসি) তাদের সন্ত্রাসী তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং ইরানের ছয়টি প্রতিষ্ঠান ও ১৫ জন ব্যক্তির ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

একটি দল টাকা দিয়ে ভোট কিনছে : সেলিমা রহমান

সামরিক হামলা এড়াতে ইরানকে ট্রাম্পের দুই শর্ত

আপডেট সময় ০৯:৩৩:২৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারী ২০২৬

আকাশ আন্তর্জাতিক ডেস্ক : 

উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি জোরদারের মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, সামরিক হামলা এড়াতে ইরানকে অবশ্যই দুটি শর্ত মানতে হবে। তিনি স্পষ্ট করে জানান, প্রথমত ইরানের কোনো পারমাণবিক কর্মসূচি থাকতে পারবে না এবং দ্বিতীয়ত দেশটিকে বিক্ষোভকারীদের হত্যা বন্ধ করতে হবে।

স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) এক অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, ‘প্রথম—কোনো পারমাণবিক কর্মসূচি নয়। দ্বিতীয়—বিক্ষোভকারীদের হত্যা বন্ধ করতে হবে। তারা হাজারে হাজারে মানুষকে হত্যা করছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমাদের অনেক বড় ও অত্যন্ত শক্তিশালী জাহাজ ইরানের দিকে এগোচ্ছে। আমরা যদি এগুলো ব্যবহার না করেই পরিস্থিতি সামাল দিতে পারি, তাহলে সেটাই সবচেয়ে ভালো হবে।’

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে তেহরানের ওপর চাপ বাড়িয়ে আসছে ওয়াশিংটন। সেই প্রেক্ষাপটেই ট্রাম্পের এই মন্তব্য এসেছে।

এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যেকোনো আগ্রাসনের জবাবে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী ‘তাৎক্ষণিক ও শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া’ জানাতে প্রস্তুত। তার ভাষায়, বাহিনী ‘ট্রিগারে আঙুল রেখে’ অপেক্ষায় রয়েছে।

শুক্রবার আরাগচি তুরস্কের ইস্তাম্বুলে পৌঁছান। সেখানে মার্কিন সামরিক হামলার সম্ভাব্য হুমকি এড়ানো এবং আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। এর পরই তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে ফোনালাপে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে উত্তেজনা ‘হ্রাসে’ সহায়তা করতে আঙ্কারা আগ্রহী বলে জানান।

ট্রাম্প এসব মন্তব্য করেন তার স্ত্রী মেলানিয়াকে নিয়ে নির্মিত একটি তথ্যচিত্রের প্রিমিয়ারে। এর আগে চলতি সপ্তাহে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লিখেছিলেন, ‘আশা করি ইরান দ্রুত আলোচনার টেবিলে আসবে এবং একটি ন্যায্য ও সামঞ্জস্যপূর্ণ চুক্তিতে পৌঁছাবে—যেখানে কোনো পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে না।’ একই পোস্টে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘একটি বিশাল নৌবহর ইরানের দিকে যাচ্ছে’,যা প্রয়োজনে দ্রুত ও কঠোরভাবে অভিযান চালাতে সক্ষম।

এর জবাবে আরাগচি বলেন, ইরান সবসময়ই পারস্পরিক লাভজনক ও ন্যায্য একটি পারমাণবিক চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে—যা হবে সমমর্যাদার ভিত্তিতে, ভয়ভীতি ও হুমকিমুক্ত। তিনি বলেন, এমন চুক্তি শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তিতে ইরানের অধিকার নিশ্চিত করবে এবং পারমাণবিক অস্ত্র না থাকার নিশ্চয়তা দেবে। তার দাবি, ‘পারমাণবিক অস্ত্র আমাদের নিরাপত্তা কৌশলের অংশ নয় এবং আমরা কখনোই তা অর্জনের চেষ্টা করিনি।’

ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি জানিয়েছেন, কিছু বার্তা আদান–প্রদান হলেও বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা চলছে না।

চলতি মাসের শুরুতে ট্রাম্প বলেছিলেন, কর্তৃপক্ষ যদি বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা চালায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের “উদ্ধার” করতে এগিয়ে আসবে। গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ দিকে ইরানি মুদ্রার বড় ধরনের পতনের পর দেশটিতে বিক্ষোভ শুরু হয়, যা দ্রুত ধর্মীয় নেতৃত্বের বৈধতা নিয়ে সংকটে রূপ নেয়।

তেহরানের বাসিন্দারা বিবিসিকে জানিয়েছেন, বিক্ষোভকারীদের ওপর এবারের দমনপীড়ন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি কঠোর। যদিও ট্রাম্প পরে দাবি করেন, নির্ভরযোগ্য সূত্রে তিনি জেনেছেন যে বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা বন্ধ হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হরানা জানিয়েছে, অস্থিরতা শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ছয় হাজার ৪৭৯ জনের মৃত্যুর তথ্য তারা নিশ্চিত করেছে। এর মধ্যে ছয় হাজার ৯২ জন বিক্ষোভকারী, ১১৮ জন শিশু এবং ২১৪ জন সরকারি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি রয়েছেন। সংস্থাটি আরও প্রায় ১৭ হাজার মৃত্যুর খবর তদন্ত করছে।

অন্যদিকে ইরানি কর্তৃপক্ষের দাবি, এ পর্যন্ত তিন হাজার ১০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, যাদের বেশিরভাগই নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য বা ‘দাঙ্গাকারীদের’ হামলায় নিহত পথচারী।

এ পরিস্থিতির মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইরানের ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ডসকে (আইআরজিসি) তাদের সন্ত্রাসী তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং ইরানের ছয়টি প্রতিষ্ঠান ও ১৫ জন ব্যক্তির ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।