আকাশ জাতীয় ডেস্ক :
‘আমি ছেলে ও স্ত্রীর সঙ্গে এক ঘরে ঘুমিয়েছিলাম। অন্য ঘরে ছিল আমার মেয়ে রোদেলা। সকালে সে এসে আমাকে বলে, বাবা ওঠো, বিল্ডিংয়ে আগুন লাগছে। তখন ঘরের মধ্যেও অনেক ধোঁয়া ঢুকে পড়েছে। নিঃশ্বাস নিতে সমস্যা হচ্ছিল। আমি দ্রুত ছেলে ও স্ত্রীকে নিয়ে বারান্দায় চলে যাই। আর রোদেলা ওর চাচা ও চাচাতো ভাইকে নিয়ে ছাদে ওঠার উদ্দেশ্যে যায়। কিন্তু ছাদে যাওয়ার দরজায় তালা থাকায় তারা ফিরে আসে। কালো ধোঁয়ায় ঘর অন্ধকার হয়ে পড়ায় কাউকে ঠিকমতো দেখতে পারছিলাম না। একপর্যায়ে ফায়ার সার্ভিসের লোকজন এসে আমাদের উদ্ধার করে।’
এভাবে গতকাল শুক্রবার রাজধানীর উত্তরা-১১ নম্বর সেক্টরের ১৮ নম্বর সড়কের ৩৪ নম্বর বাসায় আগুন লাগার ঘটনার বর্ণনা দেন ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম। সৌভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে গেলেও তাঁকে ঘুম থেকে জাগিয়ে দেওয়া রোদেলাকে (১৪) বাঁচানো যায়নি। ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে সে, তার চাচা হারিছ উদ্দিন (৫২) ও চাচাতো ভাই হিসান উদ্দিন রাহাব (১৭) মারা গেছে। একই ঘটনায় মারা গেছে আরেক পরিবারের তিন সদস্য। তারা হলেন এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের উপব্যবস্থাপক ফজলে রাব্বী রিজভী (৩৮), তাঁর স্ত্রী স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ আফরোজা আক্তার (৩৭) ও তাদের দুই বছর বয়সী ছেলে কাজী ফাইয়াজ রিশান। দুটি পরিবারই ভবনের পঞ্চম তলায় থাকত।
মৃতদের স্বজন ও প্রতিবেশীরা বলছেন, দোতলায় আগুন লাগলেও ধোঁয়ার কারণে মারা গেছেন পঞ্চম তলার বাসিন্দা। ওই সময় ছাদের দরজায় তালা না থাকলে তাদের এমন করুণ পরিণতি হতো না।
আগুন লাগার কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তাদের ধারণা, রান্নাঘরে গ্যাসের লিকেজ বা শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়।
ফায়ার সার্ভিস মিডিয়া সেলের কর্মকর্তা তালহা বিন জসীম বলেন, সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে ওই ভবনের দোতলায় আগুন লাগার খবর পাওয়া যায়। এরপর ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট সেখানে গিয়ে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করে। সকাল ৮টা ২৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। পুরোপুরি নেভাতে সকাল ১০টা বেজে যায়। এর মধ্যে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ওই ভবন থেকে ১৩ জনকে উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে নিয়ে যান। তাদের মধ্যে ছয়জনকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক।
ভবন মালিকের ডুপ্লেক্সে আগুন
গতকাল দুপুরে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, ভবনের দোতলা ও তৃতীয় তলা আগুনে পুড়ে গেছে। ধোঁয়ায় কালো হয়ে গেছে আরও কয়েকটি ফ্ল্যাট। সব ফ্ল্যাটের বাসিন্দা আগেই বের হয়ে গেছেন। কেউ কেউ পরে এসে বাসার জিনিসপত্র ঠিকঠাক করে তালা দিয়ে যাচ্ছেন। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ক্রাইমসিন ইউনিট ভবনের সামনে ‘ডু নট ক্রস’ লেখা ফিতা দিয়ে ঘিরে রেখেছে।
ভবনের দোতলার বাসিন্দা এপিক গ্রুপের মার্চেন্ডাইজার জাহিদুল ইসলাম বলেন, সকাল আনুমানিক সাড়ে ৭টার দিকে কাচ ভেঙে পড়ার মতো আওয়াজ পাই। দরজা খুলে দেখি সামনে ধোঁয়ায় ভরে গেছে। এরপর বুঝতে পারি সামনের ফ্ল্যাটে আগুন লেগেছে। তখন আমি দুই সন্তান, স্ত্রী ও শাশুড়িকে নিয়ে নিচে নেমে যাই।
তিনি জানান, ভবনের দোতলার একাংশ ও তিনতলা মিলে ‘ডুপ্লেক্স’। সেখানে কাঠের সিঁড়ি আছে। এ কারণে দোতলায় লাগা আগুন সহজে তিনতলায় পৌঁছে যায়। ডুপ্লেক্সে ভবন মালিক জুয়েল মোল্লা থাকেন।
ধোঁয়া বের হওয়ার পথ ছিল না
ভবন মালিককে ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি। তবে তিনি একটি প্রতিষ্ঠিত বেকারি পণ্য প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক অংশীদার বলে জানালেন স্থানীয়রা। উত্তরা ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন অফিসার মোহা. আলম হোসেন বলেন, এ ঘটনায় মালিকের গাফিলতি আছে। ভবনে আগুন নেভানোর কোনো সরঞ্জাম নেই। আগুন লাগার পর তিনিসহ পরিবারের সদস্যরা বেরিয়ে গেছেন। তারা যদি ওই সময় অন্যান্য ফ্ল্যাটের বাসিন্দাদের সতর্ক করতেন, তাহলে হয়তো প্রাণহানি হতো না। সেই সঙ্গে তিনি ছাদের দরজা তালাবদ্ধ না রাখলেও মানুষগুলো বাঁচতে পারত। দোতলা-তিনতলায় আগুন লাগলেও ধোঁয়া ওপরে ওঠে। ছাদের দরজা বন্ধ থাকায় ধোঁয়া বের হওয়ার সুযোগ ছিল না। এ কারণে পঞ্চম ও ষষ্ঠতলায় বেশি ধোঁয়া জমে ছিল। সেখানে যারা ফ্ল্যাটের দরজা খুলেছে, তাদের বাসাতেই ঢুকে পড়েছে ধোঁয়া। এতেই বাসিন্দারা অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাদের ফ্ল্যাটের ভেতর থেকে উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিস। এর মধ্যে কয়েকজন অচেতন ও সংকটাপন্ন অবস্থায় ছিলেন।
ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত। তদন্তে এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে। ঘটনাস্থলে প্রচুর আসবাব থাকায় আগুন দ্রুত ভয়াবহ আকার ধারণ করে।
উত্তরা পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী রফিক আহমেদ বলেন, থানা থেকে কয়েকটি ভবন পরেই আগুন লাগার ঘটনাস্থল। তাই আমরা দ্রুত খবর পেয়ে সেখানে যাই। আমরাই ফায়ার সার্ভিসকে বিষয়টি জানাই। প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে, বৈদ্যুতিক গোলযোগ বা গ্যাসের লিকেজ থেকে আগুন লেগেছে।
বারান্দায় যাওয়ায় বেঁচে যান শহিদুল
মৃত হারিছের ভায়রা শেখ তাহের রহমান বলেন, হারিছ ফল আমদানির ব্যবসা করতেন। সেই সঙ্গে সম্প্রতি লাইভ বেকারি চালু করেছিলেন। বৃহস্পতিবার রাতে তাঁর স্ত্রী রিনা ছোট ছেলেকে নিয়ে মিরপুর-১০ নম্বরে বোনের বাসায় বেড়াতে যান। বাসায় ছিলেন হারিছ, তাঁর বড় ছেলে রাহাব, ভাই শহিদুল, তাঁর স্ত্রী শিউলী আক্তার ও চার বছর বয়সী ছেলে উমর। শহিদুল স্ত্রী ও ছেলেকে নিয়ে বারান্দায় যাওয়ায় ধোঁয়া থেকে বাঁচতে পারেন। কিন্তু বাকি তিনজন ঘরের ভেতর ধোঁয়ার মধ্যে থেকে অসুস্থ হয়ে মারা যান।
আগুন লাগা ভবনটির সামনের সড়কে অঝোরে কাঁদছিলেন হারিছের খালাতো বোন রিফাত নাজনীন। তিনি জানান, আগুনের খবর পেয়ে ছুটে আসেন। এসে জানতে পারেন ভাই ও ভাতিজা-ভাতিজি আর নেই।
মৃত আফরোজার বোন আফরিন জাহান সাংবাদিকদের বলেন, আমার বোন ও ভগ্নিপতি কর্মজীবী হওয়ায় তাদের ছেলেকে উত্তরায় নানির বাসায় রাখতেন। শুক্রবার সাপ্তাহিক বন্ধের দিন হওয়ায় আগের রাতে ছেলে রিশানকে এই বাসায় নিয়ে আসেন। সকালে আগুনের ঘটনা শুনে ছুটে এসে জানতে পারি, ভগ্নিপতি ও ভাগনে কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে মারা গেছে। আর আমার বোনকে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নেওয়া হয়। সেখানে তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক। আমাদের বাড়ি কুমিল্লা সদরের নানুয়া দিঘিরপাড় এলাকায়।
বার্ন ইনস্টিটিউটের আবাসিক সার্জন সহকারী অধ্যাপক শাওন বিন রহমান জানান, আফরোজাকে মৃত অবস্থায় এখানে আনা হয়। তাঁর শরীরে কোনো পোড়া ক্ষত নেই। ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে তিনি মারা যান বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এলাকাবাসীর ক্ষোভ
ছয়জনের মৃত্যুতে ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্থানীয় অনেক বাসিন্দা। মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক সাফায়েত হোসেন বলেন, ছাদের দরজা তালাবদ্ধ থাকবে কেন? শুধু দরজা খোলা থাকলে ছয়টি প্রাণ বেঁচে যেত। এ ব্যাপারে সরকারের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
পাশাপাশি তিনটি কবর
ঈশ্বরগঞ্জ (ময়মনসিংহ) সংবাদদাতা জানান, হারিছসহ পরিবারের তিন সদস্যের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে তাদের গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জের দড়িপাঁচাশি এলাকায়। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, একসঙ্গে তিনজনের দাফনের প্রস্তুতি চলছে। পাশাপাশি খোঁড়া হয়েছে তিনটি কবর। স্বজনরা কাঁদছেন।
জিগাতলায় আরেক ভবনে আগুন
রাজধানীর জিগাতলার আরেক বাড়িতে গতকাল দুপুরে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, জিগাতলা নতুন রাস্তায় চারতলা একটি বাড়ির তৃতীয় তলায় দুপুর ২টা ৩৬ মিনিটে আগুন লাগার খবর পাওয়া যায়। ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট গিয়ে বিকেল ৩টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 





















