আকাশ জাতীয় ডেস্ক:
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডির প্রধান ব্যারিস্টার মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, পরীমনিকাণ্ডে কয়েকজনের নাম আসায় তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত আটটি মামলায় মোট ছয়টি গাড়ি জব্দ করেছে সিআইডি। এছাড়া মাদক মামলার পাশাপাশি আসামিদের সম্পত্তির খোঁজও নেওয়া হচ্ছে।
মঙ্গলবার বিকালে মালিবাগ সিআইডি সদরদপ্তরে সাংবাদিকের এক প্রশ্নের জবাবে সিআইডি প্রধান এসব কথা বলেন।
মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘সম্প্রতি কয়েকটি ঘটনায় মোট মামলা হয়েছে ১৫টি। এরমধ্যে আটটি মামলা তদন্ত করছে সিআইডি। যার মধ্যে আটটি মামলা তদন্ত করছে সিআইডি। এসব মামলায় ১০ আসামির মধ্যে আটজন সিআইডির কাছে রিমান্ডে রয়েছে। বাকি দুজন অন্য মামলায় ডিএমপির হেফাজতে রয়েছেন।’
গত ২৯ জুলাই আওয়ামী লীগের উপকমিটির সদস্য পদ হারানো এফবিসিসিআইয়ের পরিচালক হেলেনা জাহাঙ্গীরের রাজধানীর গুলশানের বাসায় অভিযান চালিয়ে বিপুল মাদক উদ্ধার করে র্যাব। এসব মাদকের মধ্যে রয়েছে ১৭ বোতল বিদেশি মদ, বিপুল ইয়াবা, হরিণের চামড়া, ক্যাসিনো সরঞ্জাম, ওয়াকিটকি। এছাড়া মিরপুরে হেলেনার জয়যাত্রা টেলিভিশনে অভিযান চালানো হয়। পরে হেলেনাকে আটক করে তার বিরুদ্ধে র্যা ব বাদী হয়ে তিনটি মামলা করে।
গত ৩ আগস্ট রাতে রাজধানীর বারিধারা ও মোহাম্মদপুরে অভিযান চালিয়ে মডেল পিয়াসা ও তার সহযোগী মৌ আক্তারকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ। পরে তাদের প্রধান সমন্বয়ক মিশু ও তার সহযোগী জিসানকে অস্ত্র, ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করে এলিট ফোর্স র্যা ব। তাদের বিরুদ্ধে র্যাব বাদী হয়ে মোট চারটি মামলা করে। পরদিন রাজধানীর বনানীতে অভিযান চালিয়ে চলচ্চিত্র নায়িকা পরীমনি ও তার সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এসময় তাদের কাছ থেকে মদ, ভয়ংকর মাদক এলএসডি ও আইস উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনায় র্যাব বাদী হয়ে বনানী থানায় একটি মামলা করে।
একইদিন বনানীতে অভিযান চালিয়ে বিদেশি মদ, বিকৃত যৌনাচার সরঞ্জামসহ প্রযোজক নজরুল ইসলাম রাজ ও তার সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়। রাজের বিরুদ্ধেও দুটি মামলা করেছে র্যাব।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সিআইডি প্রধান বলেন, ‘আটটি মামলায় আসামিরা আমাদের কাছে রিমান্ড ছিল, কিন্তু আরও কিছু জিজ্ঞাসাবাদ থাকায় আজ তাদের আদালতে পাঠিয়ে রিমান্ড আবেদন করলে তা মঞ্জুর হয়। এই নতুন রিমান্ডে আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে, তাদের কাছে থেকে বিভিন্ন পয়েন্ট ও বেশ কিছু প্রশ্ন আমাদের জানার আছে। সেসব বিষয় আমরা জিজ্ঞাসাবাদে পরিষ্কার হয়ে নেব আসামিদের কাছ থেকে।’
‘এ ঘটনায় আমরা বিভিন্ন জায়গায় অভিযান ও সার্চ করেছি। এসব অভিযানে তিনটি জিপ, একটি ফেরারি কার, একটি বিএমডব্লিউ কার ও আর একটি গাড়িসহ মোট ছয়টি গাড়ি আমরা জব্দ করেছি। এছাড়া বেশ কিছু মোবাইল, ল্যাপটপ ও ইলেকট্রনিকস ডিভাইসসহ নানা রকম নথি জব্দ করেছি।’
ব্যারিস্টার মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আমরা জব্দ হওয়া ডিভাইসগুলোর ফরেনসিক পরীক্ষা শুরু করেছি। যেসব লিকার (মদ) পাওয়া গেছে সেগুলোর রাসায়নিক পরীক্ষা চলছে। রিমান্ড যারা এতদিন ছিল তাদের আমরা ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। বিভিন্ন রকম তথ্য আমরা পেয়েছি। আমরা আশা করছি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করে ফেলতে পারব। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই মামলাগুলো শেষ করতে হবে।’
মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘এরমধ্যেই আমরা বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেখেছি বিভিন্নজনের নাম আসছে। কারা কারা জড়িত আছে তদন্তে শেষে আমরা এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাব। তবে এভাবে যদি খণ্ডচিত্র আসে তাহলে অনেকের সম্মানহানি হবে ও বিব্রত হবেন।’
মাদকসংক্রান্ত অভিযোগ ছাড়া পরীমনিসহ বাকি আসামিদের বিরুদ্ধে অন্য কোনো অভিযোগ আছে কি না জানতে চাইলে সিআইডি প্রধান বলেন, ‘তদন্তের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু নীতিমালা আছে আমরা সেই বিষয়গুলো সামনে রেখেই এগোচ্ছি। আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে, জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আমরা বুঝতে পারব মামলা কোন দিকে যাবে। আমাদের তদন্ত একদম পরিষ্কারভাবে চলছে, আগে থেকে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়কে মাথায় রেখে আমরা তদন্ত করেনি। যেহেতু আসামিদের কাছ থেকে নানা রকম মালামাল জব্দ করা হয়েছে, সেগুলো কোথায় থেকে এসেছে, কারা টাকা দিয়েছে এবং উৎস কোথায় তা আমরা খোঁজে দেখছি।’
আসামিদের সম্পত্তির বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমরা তদন্ত করেছি। এ সংক্রান্ত নানা রকম তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। ‘
জব্দ হওয়া গাড়িগুলো কার কার জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ পর্যন্ত যে ছয়টি গাড়ি জব্দ করা হয়েছে, সেগুলোর কার কার নামে আছে তার তথ্য জানতে আমরা বিআরটিএ তে যোগাযোগ করেছি। এছাড়া গাড়িগুলো কোথায় থেকে এসেছে এবং দেশে এগুলো সঠিকভাবে আনা হয়েছে কি না তাও আমরা তদন্ত করে দেখছি। তবে পরীমনির বাসা থেকে আমরা একটি গাড়ি জব্দ করেছি।’
মাদকের ছাড়া পরীমনির বিরুদ্ধে প্রতারণার কোনো অভিযোগ আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ সংক্রান্ত বিষয়ে আমরা বেশ কিছু তথ্য পেয়েছি। তবে আমাদের আরও কিছু তথ্য দরকার সেই জন্য আমরা তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করব। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই চলছে। যাচাই-বাছাই শেষে এ বিষয়ে আমরা সিদ্ধান্ত নেব।’
পরীমনিসহ বাকিদের বিষয়ে মামলার তদন্ত মাদক পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকবে নাকি অন্য কোনো দিকেও যেতে পারে প্রশ্ন করা হলে সিআইডি প্রধান বলেন, ‘তদন্ত কোনো দিন একদিকে সীমাবদ্ধ থাকে না। আমরা যখন তদন্ত করতে যায়, তখন এর পারিপার্শ্বিক সব বিষয়কে সামনে রেখে তদন্ত করতে হয়। আদালতে যখন আমরা রিপোর্ট জমা দেব তখন আমাদের পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট জামা দিতে হবে।’
কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি অভিযোগ করছে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া অভিযানের ইস্যুকে কেন্দ্র করে তাদের হয়রানি করা হচ্ছে, তাই তারা এ বিষয়ে পুলিশের অন্যান্য ইউনিটের কাছে অভিযোগ করেছে। এতে করে মামলার তদন্ত বাধাগ্রস্ত হবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যদি কেউ মনে করে তাদের সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে তাহলে তারা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। আমরা যদি তদন্তের স্বার্থে কাউকে না ডাকি তাহলে আপনি মনে করবেন এই মুহূর্তে আপনি ওয়ান্টেড নয়। যদি আপনাকে আমাদের প্রয়োজন হয় এবং আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ থেকে থাকে তাহলে আমরা আপনাকে ডাকবো। কেউ যদি মিথ্য বলে ডাকে তাহলে আমাদের কাছে এসে বললে আমরা আইনি পদক্ষেপ নেব।’
এই মামলায় আসামিদের ছাড়া অন্য কাউকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে কি না এবং আসামিদের বিরুদ্ধে কেউ প্রতারণা করেছে কি না জানতে চাইলে সিআইডি প্রধান বলেন, ‘প্রতারণা কিছু তথ্য আমরা পেয়েছি, তবে তা অভিযোগ আকারে নয়। আমরা তথ্য পেয়েছি আসামিরা অনেকের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। এছাড়া মামলার তদন্তের স্বার্থে অনেককে আমরা ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। এই মুহূর্তে তাদের নাম বলতে চাচ্ছি না তদন্তের স্বার্থে।’
এখন পর্যন্ত কতজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা তদন্তে শেষে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানাব। কারণ আমাদের তদন্ত এখনো চলমান রয়েছে। এছাড়া প্রয়োজন ভেদে আমরা অনেককে ডাকতে পারি।’
এই মামলা সংক্রান্ত কারও বিরুদ্ধে বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রয়োজন পড়লে বিদেশযাত্রার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্ত আমরা নিতে পারি। অফিসিয়ালি কারো বিরুদ্ধে আমরা নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়নি। তবে কয়েকজনকে এ বিষয়ে নজরদারি রাখা হয়েছে। তথ্য যাচাই-বাছাই ছাড়া এ বিষয়ে আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারি না।’
কোনো ধরনের তালিকা তৈরি হচ্ছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আইন অনুযায়ী তালিকা তৈরি করার সুযোগ নেই।’
আকাশ নিউজ ডেস্ক 



















