অাকাশ স্পোর্টস ডেস্ক:
কোনো সমস্যায় পড়লেই শচীন টেন্ডুলকার ছুটে যেতেন তাঁর ছোটবেলার কোচ রামকান্ত আচরেকারের কাছে। তিনিই ছিলেন তাঁর ভরসা। স্পিনারদের বিপক্ষে খুব বেশি এলবি হচ্ছেন, চলে গেলেন আচরেকার স্যারের কাছে, অফস্টাম্পের বাইরের বলে পা ঠিকমতো যাচ্ছে না, আচরেকারই ভরসা। ছোটবেলা থেকে ক্রিকেট ক্যারিয়ার শেষ করার আগে পর্যন্ত আচরেকারই যেন ছিলেন লিটল মাস্টারের ‘গাইড ও গডফাদার’। আমাদের সাকিব আল হাসানেরও আছেন তেমনি একজন ‘গুরু’। মোহাম্মদ সালাউদ্দিন। টেন্ডুলকারের মতোই ‘খারাপ সময়ে’ সাকিবের মানসিক প্রশস্তি সালাউদ্দিনই।
তথ্যটা পুরোনো। গণমাধ্যমে সাকিবের ‘গুরু’ হিসেবে অনেকবারই এসেছে সালাউদ্দিনের নাম। কিন্তু নতুন তথ্যটা হলো, হালে দেশের অন্যতম সেরা ক্রিকেট কোচ সালাউদ্দিনের নাকি ক্রিকেটের ধারেকাছে আসারই কথা ছিল না। ১৯৮৬ সালে বিকেএসপিতে ছাত্র হিসেবে ভর্তি হতে চেয়েছিলেন ফুটবলে। কিন্তু দেশের ফুটবলে তখন রমরমা অবস্থা। সবাই ফুটবলার হতে চায়। সালাউদ্দিন সুযোগ পেলেন না ফুটবলে। খুব বেশি প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় ভর্তি হলেন ক্রিকেটে। ফুটবলার হওয়ার শখ থাকলেও ক্রিকেটার হিসেবেই শুরু করলেন বিকেএসপি-জীবন।
খুব বড় ক্রিকেটার সালাউদ্দিন হতে পারেননি। কিন্তু কোচ হিসেবে দেশের অন্যতম সেরা। অনেক ক্রিকেটার তৈরি করেছেন নিজের হাতে। আজকের সাকিব গড়ে উঠেছেন তাঁর হাতেই। কেবল সাকিব নন, নাসির হোসেন ও মুমিনুল হকও তাঁর সরাসরি শিষ্য। রসিকতা করেই অনেকে বলেন, সালাউদ্দিন ফুটবলার হলে সাকিবকে না-ও পেতে পারত বাংলাদেশ।
সাকিব নিজে কিন্তু তাঁর গুরুকে নিয়ে দারুণ উচ্ছ্বসিতই সব সময়। একবার বলেছিলেন, ‘ছেলেবেলার শিক্ষকের কাছ থেকে শেখা সব সময়ই স্বাচ্ছন্দ্যের। ক্যারিয়ারের শুরুর দিনগুলোতে, মানে অনূর্ধ্ব-১৩ পর্যায় থেকে সালাউদ্দিন স্যার আমাকে খুব ভালোমতো চেনেন, জানেন। তাই তাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্ক ভীষণ দৃঢ়।’
১১ বছর বিকেএসপিতে খণ্ডকালীন কোচ হিসেবে কাজ করেছেন সালাউদ্দিন। তবে ফুটবলার হতে না পারার দুঃখটা এখনো পোড়ায় তাঁকে, ‘জানেন, বিকেএসপিতে যখন ফুটবলার হিসেবে ভর্তি হতে পারলাম না, তখন খুব দুঃখ পেয়েছিলাম। ক্রিকেটে ভর্তি হয়েও আশা ছিল ফুটবলের হয়তো চলে যেতে পারব। কিন্তু পারলাম না। ফুটবলার হতে না পারার দুঃখটা আমার কখনোই যাবে না।’
২০০২ সালে সাকিবের প্রতিভা চিনেছিলেন সালাউদ্দিন। বিকেএসপির হোস্টেল থেকে বোলিং-ব্যাটিংয়ের যাবতীয় খুঁটিনাটি নিজের হাতে শিখিয়েছেন। মাঠে-নেটে দীর্ঘ সময় পার করতেন তাঁরা দুজন। প্রিয় শিষ্য সেই দিনগুলো কখনোই ভোলেনি। আজও অফ ফর্মে থাকলে ছুটে যান বিকেএসপিতে সালাউদ্দিনের বাড়িতে, নিজের সমস্যা অকপটে বলেন। পরামর্শ চান। ২০১৬ সালে আইপিএলে খুব বাজে করছিলেন। কলকাতা থেকে চট করে ছুটি নিয়ে দেশে এসে সালাউদ্দিনের সঙ্গে দেখা করেছিলেন—এটা একটা উদাহরণ।
এমন ঘটনা বহু আছে। কেবল সাকিব নন, সালাউদ্দিন ‘মেন্টর’ দেশের অনেক সেরা ক্রিকেটারেরই। তারকাখ্যাতি সেখানে গিয়ে বিনম্র শ্রদ্ধায় মাথা নত করে। তাঁর সঙ্গে নিজেদের সমস্যার কথা আলোচনা করে বর্তে যান তাঁরা।
কোচ হিসেবে কিন্তু সালাউদ্দিনের সাফল্যটা ঈর্ষণীয়। কোচিং ক্যারিয়ারের শুরুতে ২০০১-০২, ২০০২-০৩ মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগে ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাবকে চ্যাম্পিয়ন করেছিলেন। সর্বশেষ মৌসুমে তাঁর হাত ধরে গাজী গ্রুপ ক্রিকেটার্সও পেয়েছে প্রিমিয়ারে শিরোপার স্বাদ। এক মৌসুম আগে তাঁর অধীনে বিপিএলে শিরোপা জিতেছিল কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানস। কোচ হিসেবে দারুণ বায়োডাটা। কিন্তু সালাউদ্দিন নিজে মনে করেন, ফুটবল কোচ হলে তিনি নাকি আরও ভালো করতেন, ‘আমার দৃঢ় বিশ্বাস, ফুটবল কোচ হলে আমি ক্রিকেটের চেয়েও ভালো করতাম। ভবিষ্যৎটা আরও ভালো হতে পারত।’ বিকেএসপির ক্যাফেটেরিয়ায় বসে তিনি যখন এই কথাগুলো বলছেন, তাঁর হাতে তখন ফুটবল কোচিংবিষয়ক বই—‘নাইনটি মিনিটস ম্যানেজার’।
নিজের দুই ছেলের অন্তত একজনকে ফুটবলার বানাতে চান সালাউদ্দিন। হয়তো নিজে যা হতে পারেননি, ছেলের মাধ্যমে সেটিই পেতে চান। দেশকে উপহার দিয়েছেন সাকিব আল হাসানকে। তাঁর ছেলেও হয়তো কারও হাত ধরে হয়ে উঠবে দেশসেরা ফুটবলার—এমন স্বপ্ন মনের মধ্যে বয়ে বেড়ান সালাউদ্দিন।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 

























