ঢাকা ০৯:৫৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬, ৮ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
নির্বাচনে ১০ দলীয় জোট সরকার গঠন করবে: ডা. তাহের সারা দেশে বিদ্রোহীদের বহিষ্কার করল বিএনপি, তালিকায় যারা প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের ফল প্রকাশ, ৬৯ হাজারের বেশি উত্তীর্ণ আমার প্রতিদ্বন্দ্বী নির্বাচন করতে নয়, বানচাল করতে এসেছেন : নুর বিশ্বকাপে খেলতে হলে ভারতেই যেতে হবে, সিদ্ধান্ত আইসিসির এবারের নির্বাচন যেন ভবিষ্যতের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে: প্রধান উপদেষ্টা এবার ভোট গণনায় দেরি হতে পারে: প্রেস সচিব বিএনপিতে যোগ দিলেন সাবেক তথ্যমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সাইয়িদ মব সৃষ্টি করে জনমত প্রভাবিত করার দিন এখন আর নেই: জামায়াত আমির সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন হচ্ছে সর্বনিম্ন ২০,০০০ টাকা, সর্বোচ্চ ১,৬০,০০০ টাকা

ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রধান সমস্যা দুর্নীতি

অাকাশ জাতীয় ডেস্ক:

দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রধান সমস্যা দুর্নীতি। সহজে মূলধন পায় না ব্যবসায়ীরা। পাশাপাশি ঋণের উচ্চ সুদ, মাত্রাতিরিক্ত আয়কর এবং বিভিন্ন বিলের কারণে বাড়ছে ব্যবসার সামগ্রিক ব্যয়।

এছাড়া আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা নেই। বাড়ছে টাকা পাচার। ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা। সবকিছু মিলে বিশ্বের অন্য দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় এক ধাপ পিছিয়েছে বাংলাদেশ।

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ‘প্রতিযোগিতা সক্ষমতা রিপোর্ট-২০১৮’তে উঠে এসেছে এসব তথ্য। ব্যবসায়ীদের মতামতের ভিত্তিতে বুধবার বিশ্বের ১৪০টি দেশ থেকে একযোগে এটি প্রকাশ করা হয়।

এদিন ঢাকায় সিরডাপ মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে ডব্লিউইএফের পক্ষে এ রিপোর্ট প্রকাশ করেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা- সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। একই সঙ্গে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ব্যবসায়ীদের মতামত নিয়ে আরেকটি ত্বরিত মূল্যায়ন রিপোর্ট তৈরি করেছে সিপিডি।

ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, আগামী নির্বাচনের কারণে দেশের অর্থনীতিতে ৪টি খাতে প্রভাব পড়বে। এগুলো হল- পণ্য উৎপাদন, রফতানি, কর্মসংস্থান এবং রেমিটেন্স (প্রবাসী আয়)।

ডব্লিউইএফ ও সিপিডির রিপোর্ট আলাদাভাবে উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। এ সময় সংস্থাটির সম্মানিত ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান এবং নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

রিপোর্ট অনুসারে ১৪০টি দেশের মধ্যে ২০১৭ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৩তম। আগের বছর অর্থাৎ ২০১৬ সালে এই অবস্থান ছিল ১০২তম। ১২টি মৌলিক সূচকের মধ্যে বাজারের আয়তন, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও স্বাস্থ্য খাতে এগিয়েছে বাংলাদেশ।

তবে অবকাঠামো, আর্থিক খাতের ব্যবস্থাপনা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, ব্যবসায় গতিশীলতা, শ্রমবাজারের দক্ষতা, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তিগত প্রস্তুতির দিক থেকে পিছিয়ে বাংলাদেশ।

এক্ষেত্রে বরাবরের মতো এবারও প্রথম অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আর সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে আফ্রিকার দেশ চাঁদ। যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে প্রথম ১০টি দেশের মধ্যে ইউরোপের ৬টি এবং এশিয়ার ৩টি দেশ রয়েছে।

বাংলাদেশের অবস্থান : প্রতিযোগিতার সক্ষমতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মোট ১৬টি সমস্যা চিহ্নিত করা হয়েছে ডব্লিউইএফের রিপোর্টে। এর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে দুর্নীতি। জরিপে মতামত দেয়া ৮৩ জন ব্যবসায়ীর মধ্যে অধিকাংশই মনে করেন, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রধান সমস্যা দুর্নীতি।

ফলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক অঙ্গীকার থাকা উচিত, যা রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখ করা যেতে পারে। বাংলাদেশের দ্বিতীয় সমস্যা অবকাঠামো।

ব্যবসায়ীরা মনে করেন, বিচ্ছিন্নভাবে কিছু অবকাঠামো করছে সরকার। কিন্তু ব্যবসা করার জন্য একটি ‘ফুল প্যাকেজ’ দরকার। যেখানে থাকবে জমি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, শ্রমিক, স্বল্প সুদে ঋণ এবং বন্দরের সুবিধা। কিন্তু সেটি এখনও দেয়া সম্ভব হয়নি, যা বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

এছাড়া অবকাঠামো খাতে যে পরিমাণ বিনিয়োগ হচ্ছে, তার পুরো সুবিধা পাচ্ছে না ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, সরকারের প্রশাসন যন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন।

রিপোর্টে আরও উল্লেখ করা হয়, কৃষিনীতিতে দুর্বলতা রয়েছে। আর প্রথমবারের মতো সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ব্যবসায়ীরা। ৫৪ শতাংশ ব্যবসায়ী মনে করছে, দেশের সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সীমিত।

এর আগে বাংলাদেশের জন্য এই সূচকটি ইতিবাচকভাবে দেখা হতো। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে বলে মনে করছে সিপিডি। ব্যবসায়ীদের মতে, জনসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রেও দুর্নীতি রয়েছে। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে একটি বড় পরিবর্তন দরকার।

এছাড়া সমস্যার ক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমে রয়েছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। পুঁজির সহজলভ্যতার অভাব। ঘুষ ছাড়া সহজে ঋণ পাওয়া যায় না।

সংস্থাটির বিবেচনায় অন্য সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে- নীতিনির্ধারণে অস্থিতিশীলতা, প্রশিক্ষিত জনশক্তির অভাব, উচ্চ কর হার, করের বিভিন্ন আইনে জটিলতা, উদ্ভাবনী ক্ষমতার অভাব এবং বিভিন্ন আইনের সীমাবদ্ধতা। সামগ্রিকভাবে ব্যবসার ব্যয় বেড়েছে।

এছাড়া অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিদেশি ক্রেতারা বাজার নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। ফলে আগে যেভাবে মুনাফা হতো, বর্তমানে ব্যবসা করে ওই হারে মুনাফা করা যায় না। এসব কারণে ব্যবসায় ব্যয় কমাতে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে।

পাশাপাশি স্বচ্ছতা বাড়াতে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্টসহ অন্য আইনগুলো কার্যকর করতে হবে। ট্যাক্সের সুবিধাগুলো যাতে ব্যবসায়ীদের কাছে আরও সহজে পৌঁছানো যায়, সে লক্ষ্যে প্রযুক্তির মাধ্যমে সিস্টেমের উন্নয়ন করতে হবে।

মূল রিপোর্টে খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ২০১০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত এই ৭ বছরে বেশকিছু সূচকের ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। এছাড়া সরকারের দীর্ঘমেয়াদি ভিশনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ীরা।

তিনি বলেন, জরিপে অংশ নেয়া বেশির ভাগ ব্যবসায়ী মনে করেন, দেশের আর্থিক খাতের অবস্থা খারাপ হয়েছে। এক্ষেত্রে ব্যাংকের পাশাপাশি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাতেও রয়েছে সমস্যা। ৫৮ শতাংশ ব্যবসায়ী মনে করেন এ খাতের সুশাসন ভেঙে পড়েছে। এ খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো দরকার।

ফলে বিষয়টি মূল্যায়নের জন্য দীর্ঘদিন থেকে সিপিডির পক্ষ থেকে একটি সংস্কার কমিশন গঠনের কথা বলা হয়েছিল। অর্থমন্ত্রী কমিশন গঠনের কথাও বলেছিলেন। তাই দ্রুত এই কমিশন গঠন করে এ খাতের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

এছাড়া ৬১ শতাংশ ব্যবসায়ী মনে করেন, দেশ থেকে অর্থ পাচার বেড়েছে। এক্ষেত্রে আগের ইতিবাচক অবস্থা থেকে বাংলাদেশ নিচে নেমে এসেছে।

খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, আগামী অর্থবছর থেকে নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর করার কথা বলছে সরকার। কিন্তু ব্যবসায়ীরা মনে করেন, এটি সম্ভব নাও হতে পারে। অন্যদিকে টাকার আরও অবমূল্যায়ন হবে। ২০১৮ সালের মধ্যে ডলারের বিপরীতে অস্থিতিশীলতা বাড়বে। এছাড়া তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ব্যাপারে মতামত দিয়েছেন উদ্যোক্তারা। তারা মনে করেন, ব্যবসায়ীদের চাহিদামতো দামে এই গ্যাস সরবরাহ করতে পারবে না সরকার।

এ বছর মোট ১২টি মূল্যায়ন পিলারের মাধ্যমে এই রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে। এতে মোট ১০০ নম্বরের মধ্যে বাংলাদেশের স্কোর ৫২ দশমিক ১।

এর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতায় পণ্যবাজারের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১২৩, ব্যবসা গতিশীলতায় ১২০, স্কিল ডেভেলপমেন্টে ১১৬, শ্রমবাজারে ১১৫, অবকাঠামোয় ১০৯, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতায় ১০৮, আর্থিক খাতে ১০৩, উদ্ভাবনী দক্ষতায় ১০২, তথ্যপ্রযুক্তি অংশ ১০২, স্বাস্থ্য খাতে ৯৬ এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় ৮৮তম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।

তবে বাংলাদেশ ভালো অবস্থানে রয়েছে বাজারের সূচকে। এ খাতে বাংলাদেশের অবস্থান ৩৬তম। এর অর্থ হচ্ছে- দেশে অভ্যন্তরীণভাবে বড় একটি বাজার রয়েছে। তবে প্রাথমিক শিক্ষায় কিছুটা উন্নতি হলেও মাধ্যমিক এবং উচ্চশিক্ষায় পিছিয়েছে।

রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, শেয়ারবাজারের কিছুটা উন্নতি হয়েছে। প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, নির্বাচন অর্থনীতিতে কিভাবে প্রভাব ফেলবে- এ ধরনের একটি প্রশ্ন ছিল ব্যবসায়ীদের কাছে।

এক্ষেত্রে ৪৬ শতাংশ ব্যবসায়ী মনে করছে, নির্বাচনের কারণে বিনিয়োগে প্রভাব পড়বে না। কিন্তু ৪৩ শতাংশ ব্যবসায়ীর মত হল, নির্বাচনের কারণে পণ্য উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ৪০ শতাংশ ব্যবসায়ীর মত হল, নির্বাচনী বছরে রফতানি আয় কমবে।

এছাড়া কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা করছে ৪৪ শতাংশ ব্যবসায়ী। ৩৮ শতাংশ ব্যবসায়ীর মত হল নির্বাচনী বছরে রেমিটেন্স কমবে। কিভাবে রাজনৈতিক সংঘাত এড়ানো যায়, সে ব্যাপারে সরকারকে পদক্ষেপ নেয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

শীর্ষ ১০ দেশ : এবারের রিপোর্টে শীর্ষ দশটি দেশের মধ্যে প্রথমে আছে- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, দ্বিতীয় সিঙ্গাপুর, তৃতীয় জার্মানি, চতুর্থ সুইজারল্যান্ড, পঞ্চম জাপান, ষষ্ঠ নেদারল্যান্ডস, সপ্তম হংকং, অষ্টম যুক্তরাজ্য, নবম সুইডেন এবং দশম অবস্থানে রয়েছে ডেনমার্ক।

এশিয়ার অবস্থান : বিশ্বের শীর্ষ দশে থাকা এশিয়ার তিন দেশ- জাপান, সিঙ্গাপুর ও হংকংয়ের পরই রয়েছে তাইওয়ান। এ বছর দেশটি ১৩তম অবস্থানে চলে এসেছে। এছাড়া বরাবরের মতো মালয়েশিয়ার অবস্থান ২৬তম। এরপর চীন ২৮, থাইল্যান্ড ৩৮, ইন্দোনেশিয়া ৪৫, ফিলিপাইন ৫৬, ৫ ধাপ এগিয়ে ভারতের অবস্থান ৫৮, ভিয়েতনাম ৭৭, শ্রীলংকা ৮৫, পাকিস্তান ধাপ বেড়ে ১০৭, নেপাল ১০৯ এবং কম্বোডিয়া ১১০তম অবস্থানে রয়েছে।

যেভাবে রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে : ১৯৭৯ সাল থেকে ডব্লিউইএফ এ রিপোর্ট প্রকাশ করলেও সেখানে ২০০১ সাল থেকে অন্তর্ভুক্ত হয় বাংলাদেশ। ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়কালের তথ্যের ওপর সদস্য দেশগুলোর মোট ১২ হাজার ২৭৪ জন শীর্ষ উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের মতামতের ভিত্তিতে ২০১৮ সালের রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে।

তবে ব্যবসায়ীরা ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত সময়ের মধ্যে মতামত দিয়েছেন। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের মোট ৮৩ জন ব্যবসায়ীর মতামত নেয়া হয়েছে। আগের বছর এই সংখ্যা ছিল ৮৫ জন।

এসব ব্যবসায়ীর মালিকানাধীন প্রতিটি কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন ১০ কোটি টাকার ওপরে। এদের সুনির্দিষ্ট একটি ফরমেটে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর নেয়া হয়েছে।

এর ভিত্তিতেই যাচাই করে তিনটি সূচকের ওপর প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। সূচকগুলো হল মৌলিক সূচক, দক্ষতা এবং উদ্ভাবন ক্ষমতা। এছাড়া আরও ১২টি উপখাতের সূচক বিবেচনায় নেয়া হয়েছে।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রধান সমস্যা দুর্নীতি

আপডেট সময় ০৯:০৬:৪৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৮

অাকাশ জাতীয় ডেস্ক:

দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রধান সমস্যা দুর্নীতি। সহজে মূলধন পায় না ব্যবসায়ীরা। পাশাপাশি ঋণের উচ্চ সুদ, মাত্রাতিরিক্ত আয়কর এবং বিভিন্ন বিলের কারণে বাড়ছে ব্যবসার সামগ্রিক ব্যয়।

এছাড়া আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা নেই। বাড়ছে টাকা পাচার। ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা। সবকিছু মিলে বিশ্বের অন্য দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় এক ধাপ পিছিয়েছে বাংলাদেশ।

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ‘প্রতিযোগিতা সক্ষমতা রিপোর্ট-২০১৮’তে উঠে এসেছে এসব তথ্য। ব্যবসায়ীদের মতামতের ভিত্তিতে বুধবার বিশ্বের ১৪০টি দেশ থেকে একযোগে এটি প্রকাশ করা হয়।

এদিন ঢাকায় সিরডাপ মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে ডব্লিউইএফের পক্ষে এ রিপোর্ট প্রকাশ করেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা- সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। একই সঙ্গে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ব্যবসায়ীদের মতামত নিয়ে আরেকটি ত্বরিত মূল্যায়ন রিপোর্ট তৈরি করেছে সিপিডি।

ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, আগামী নির্বাচনের কারণে দেশের অর্থনীতিতে ৪টি খাতে প্রভাব পড়বে। এগুলো হল- পণ্য উৎপাদন, রফতানি, কর্মসংস্থান এবং রেমিটেন্স (প্রবাসী আয়)।

ডব্লিউইএফ ও সিপিডির রিপোর্ট আলাদাভাবে উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। এ সময় সংস্থাটির সম্মানিত ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান এবং নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

রিপোর্ট অনুসারে ১৪০টি দেশের মধ্যে ২০১৭ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৩তম। আগের বছর অর্থাৎ ২০১৬ সালে এই অবস্থান ছিল ১০২তম। ১২টি মৌলিক সূচকের মধ্যে বাজারের আয়তন, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও স্বাস্থ্য খাতে এগিয়েছে বাংলাদেশ।

তবে অবকাঠামো, আর্থিক খাতের ব্যবস্থাপনা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, ব্যবসায় গতিশীলতা, শ্রমবাজারের দক্ষতা, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তিগত প্রস্তুতির দিক থেকে পিছিয়ে বাংলাদেশ।

এক্ষেত্রে বরাবরের মতো এবারও প্রথম অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আর সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে আফ্রিকার দেশ চাঁদ। যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে প্রথম ১০টি দেশের মধ্যে ইউরোপের ৬টি এবং এশিয়ার ৩টি দেশ রয়েছে।

বাংলাদেশের অবস্থান : প্রতিযোগিতার সক্ষমতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মোট ১৬টি সমস্যা চিহ্নিত করা হয়েছে ডব্লিউইএফের রিপোর্টে। এর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে দুর্নীতি। জরিপে মতামত দেয়া ৮৩ জন ব্যবসায়ীর মধ্যে অধিকাংশই মনে করেন, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রধান সমস্যা দুর্নীতি।

ফলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক অঙ্গীকার থাকা উচিত, যা রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখ করা যেতে পারে। বাংলাদেশের দ্বিতীয় সমস্যা অবকাঠামো।

ব্যবসায়ীরা মনে করেন, বিচ্ছিন্নভাবে কিছু অবকাঠামো করছে সরকার। কিন্তু ব্যবসা করার জন্য একটি ‘ফুল প্যাকেজ’ দরকার। যেখানে থাকবে জমি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, শ্রমিক, স্বল্প সুদে ঋণ এবং বন্দরের সুবিধা। কিন্তু সেটি এখনও দেয়া সম্ভব হয়নি, যা বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

এছাড়া অবকাঠামো খাতে যে পরিমাণ বিনিয়োগ হচ্ছে, তার পুরো সুবিধা পাচ্ছে না ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, সরকারের প্রশাসন যন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন।

রিপোর্টে আরও উল্লেখ করা হয়, কৃষিনীতিতে দুর্বলতা রয়েছে। আর প্রথমবারের মতো সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ব্যবসায়ীরা। ৫৪ শতাংশ ব্যবসায়ী মনে করছে, দেশের সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সীমিত।

এর আগে বাংলাদেশের জন্য এই সূচকটি ইতিবাচকভাবে দেখা হতো। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে বলে মনে করছে সিপিডি। ব্যবসায়ীদের মতে, জনসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রেও দুর্নীতি রয়েছে। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে একটি বড় পরিবর্তন দরকার।

এছাড়া সমস্যার ক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমে রয়েছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। পুঁজির সহজলভ্যতার অভাব। ঘুষ ছাড়া সহজে ঋণ পাওয়া যায় না।

সংস্থাটির বিবেচনায় অন্য সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে- নীতিনির্ধারণে অস্থিতিশীলতা, প্রশিক্ষিত জনশক্তির অভাব, উচ্চ কর হার, করের বিভিন্ন আইনে জটিলতা, উদ্ভাবনী ক্ষমতার অভাব এবং বিভিন্ন আইনের সীমাবদ্ধতা। সামগ্রিকভাবে ব্যবসার ব্যয় বেড়েছে।

এছাড়া অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিদেশি ক্রেতারা বাজার নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। ফলে আগে যেভাবে মুনাফা হতো, বর্তমানে ব্যবসা করে ওই হারে মুনাফা করা যায় না। এসব কারণে ব্যবসায় ব্যয় কমাতে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে।

পাশাপাশি স্বচ্ছতা বাড়াতে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্টসহ অন্য আইনগুলো কার্যকর করতে হবে। ট্যাক্সের সুবিধাগুলো যাতে ব্যবসায়ীদের কাছে আরও সহজে পৌঁছানো যায়, সে লক্ষ্যে প্রযুক্তির মাধ্যমে সিস্টেমের উন্নয়ন করতে হবে।

মূল রিপোর্টে খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ২০১০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত এই ৭ বছরে বেশকিছু সূচকের ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। এছাড়া সরকারের দীর্ঘমেয়াদি ভিশনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ীরা।

তিনি বলেন, জরিপে অংশ নেয়া বেশির ভাগ ব্যবসায়ী মনে করেন, দেশের আর্থিক খাতের অবস্থা খারাপ হয়েছে। এক্ষেত্রে ব্যাংকের পাশাপাশি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাতেও রয়েছে সমস্যা। ৫৮ শতাংশ ব্যবসায়ী মনে করেন এ খাতের সুশাসন ভেঙে পড়েছে। এ খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো দরকার।

ফলে বিষয়টি মূল্যায়নের জন্য দীর্ঘদিন থেকে সিপিডির পক্ষ থেকে একটি সংস্কার কমিশন গঠনের কথা বলা হয়েছিল। অর্থমন্ত্রী কমিশন গঠনের কথাও বলেছিলেন। তাই দ্রুত এই কমিশন গঠন করে এ খাতের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

এছাড়া ৬১ শতাংশ ব্যবসায়ী মনে করেন, দেশ থেকে অর্থ পাচার বেড়েছে। এক্ষেত্রে আগের ইতিবাচক অবস্থা থেকে বাংলাদেশ নিচে নেমে এসেছে।

খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, আগামী অর্থবছর থেকে নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর করার কথা বলছে সরকার। কিন্তু ব্যবসায়ীরা মনে করেন, এটি সম্ভব নাও হতে পারে। অন্যদিকে টাকার আরও অবমূল্যায়ন হবে। ২০১৮ সালের মধ্যে ডলারের বিপরীতে অস্থিতিশীলতা বাড়বে। এছাড়া তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ব্যাপারে মতামত দিয়েছেন উদ্যোক্তারা। তারা মনে করেন, ব্যবসায়ীদের চাহিদামতো দামে এই গ্যাস সরবরাহ করতে পারবে না সরকার।

এ বছর মোট ১২টি মূল্যায়ন পিলারের মাধ্যমে এই রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে। এতে মোট ১০০ নম্বরের মধ্যে বাংলাদেশের স্কোর ৫২ দশমিক ১।

এর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতায় পণ্যবাজারের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১২৩, ব্যবসা গতিশীলতায় ১২০, স্কিল ডেভেলপমেন্টে ১১৬, শ্রমবাজারে ১১৫, অবকাঠামোয় ১০৯, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতায় ১০৮, আর্থিক খাতে ১০৩, উদ্ভাবনী দক্ষতায় ১০২, তথ্যপ্রযুক্তি অংশ ১০২, স্বাস্থ্য খাতে ৯৬ এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় ৮৮তম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।

তবে বাংলাদেশ ভালো অবস্থানে রয়েছে বাজারের সূচকে। এ খাতে বাংলাদেশের অবস্থান ৩৬তম। এর অর্থ হচ্ছে- দেশে অভ্যন্তরীণভাবে বড় একটি বাজার রয়েছে। তবে প্রাথমিক শিক্ষায় কিছুটা উন্নতি হলেও মাধ্যমিক এবং উচ্চশিক্ষায় পিছিয়েছে।

রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, শেয়ারবাজারের কিছুটা উন্নতি হয়েছে। প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, নির্বাচন অর্থনীতিতে কিভাবে প্রভাব ফেলবে- এ ধরনের একটি প্রশ্ন ছিল ব্যবসায়ীদের কাছে।

এক্ষেত্রে ৪৬ শতাংশ ব্যবসায়ী মনে করছে, নির্বাচনের কারণে বিনিয়োগে প্রভাব পড়বে না। কিন্তু ৪৩ শতাংশ ব্যবসায়ীর মত হল, নির্বাচনের কারণে পণ্য উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ৪০ শতাংশ ব্যবসায়ীর মত হল, নির্বাচনী বছরে রফতানি আয় কমবে।

এছাড়া কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা করছে ৪৪ শতাংশ ব্যবসায়ী। ৩৮ শতাংশ ব্যবসায়ীর মত হল নির্বাচনী বছরে রেমিটেন্স কমবে। কিভাবে রাজনৈতিক সংঘাত এড়ানো যায়, সে ব্যাপারে সরকারকে পদক্ষেপ নেয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

শীর্ষ ১০ দেশ : এবারের রিপোর্টে শীর্ষ দশটি দেশের মধ্যে প্রথমে আছে- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, দ্বিতীয় সিঙ্গাপুর, তৃতীয় জার্মানি, চতুর্থ সুইজারল্যান্ড, পঞ্চম জাপান, ষষ্ঠ নেদারল্যান্ডস, সপ্তম হংকং, অষ্টম যুক্তরাজ্য, নবম সুইডেন এবং দশম অবস্থানে রয়েছে ডেনমার্ক।

এশিয়ার অবস্থান : বিশ্বের শীর্ষ দশে থাকা এশিয়ার তিন দেশ- জাপান, সিঙ্গাপুর ও হংকংয়ের পরই রয়েছে তাইওয়ান। এ বছর দেশটি ১৩তম অবস্থানে চলে এসেছে। এছাড়া বরাবরের মতো মালয়েশিয়ার অবস্থান ২৬তম। এরপর চীন ২৮, থাইল্যান্ড ৩৮, ইন্দোনেশিয়া ৪৫, ফিলিপাইন ৫৬, ৫ ধাপ এগিয়ে ভারতের অবস্থান ৫৮, ভিয়েতনাম ৭৭, শ্রীলংকা ৮৫, পাকিস্তান ধাপ বেড়ে ১০৭, নেপাল ১০৯ এবং কম্বোডিয়া ১১০তম অবস্থানে রয়েছে।

যেভাবে রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে : ১৯৭৯ সাল থেকে ডব্লিউইএফ এ রিপোর্ট প্রকাশ করলেও সেখানে ২০০১ সাল থেকে অন্তর্ভুক্ত হয় বাংলাদেশ। ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়কালের তথ্যের ওপর সদস্য দেশগুলোর মোট ১২ হাজার ২৭৪ জন শীর্ষ উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের মতামতের ভিত্তিতে ২০১৮ সালের রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে।

তবে ব্যবসায়ীরা ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত সময়ের মধ্যে মতামত দিয়েছেন। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের মোট ৮৩ জন ব্যবসায়ীর মতামত নেয়া হয়েছে। আগের বছর এই সংখ্যা ছিল ৮৫ জন।

এসব ব্যবসায়ীর মালিকানাধীন প্রতিটি কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন ১০ কোটি টাকার ওপরে। এদের সুনির্দিষ্ট একটি ফরমেটে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর নেয়া হয়েছে।

এর ভিত্তিতেই যাচাই করে তিনটি সূচকের ওপর প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। সূচকগুলো হল মৌলিক সূচক, দক্ষতা এবং উদ্ভাবন ক্ষমতা। এছাড়া আরও ১২টি উপখাতের সূচক বিবেচনায় নেয়া হয়েছে।