ঢাকা ০৩:১৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী ২০২৬, ৮ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

নওয়াজকন্যা মরিয়ম প্রধানমন্ত্রী হবেন, নাকি জেলে যাবেন

অাকাশ আর্ন্তজাতিক ডেস্ক:

ক’দিন আগেও মরিয়ম নওয়াজকে কেন্দ্র করে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিলো, তা হলো- তিনি কি পাকিস্তানের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হচ্ছেন? কিন্তু বর্তমানে সে প্রশ্ন ঘুরে দাঁড়িয়েছে, ‘তিনি কি জেলে যাচ্ছেন?’

পাকিস্তানের তিন বারের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের ৪৪ বছর বয়সী কন্যা মরিয়ম সাম্প্রতিক সময়ে ক্ষমতার মসনদ নিয়ে তার চাচা শেহবাজ শরিফসহ বেশ ক’জন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ আত্মীয়ের সাথে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়েছেন। তার চাচা শেহবাজকে নওয়াজ শরিফের পরবর্তী উত্তরসুরী হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। মরিয়মকে বেশ ক’বছর ধরে তার পিতার ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তিনি পিতার দল পাকিস্তান মুসলিম লিগের নেতৃত্বের বিষয়ে বিশেষ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন।

পানামা পেপার কেলেঙ্কারির ঘটনায় ফাঁস হওয়া দুর্নীতির মামলায় আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয়ে গত জুলাইয়ে নওয়াজ শরিফকে যখন ক্ষমতা থেকে পদত্যাগ করতে হয়, তখন থেকে পরিবারের পক্ষ থেকে তিনি হয়ে উঠেছেন জনমুখ। হয়ে উঠেন ক্ষমতার লড়াইয়ে একজন খেলোয়াড় এবং বিচার বিভাগ ও সামরিক বাহিনীর কঠোর সমালোচনাকারী। এরপর তার পিতার খালি হওয়া আসনে উপ-নির্বাচনে মা কুলসুম নওয়াজকে জিতিয়ে আনায় প্রধান সংগঠন হিসেবে কাজ করেছেন তিনি।

কিন্তু লন্ডনে অবৈধ সম্পত্তির যে মামলায় বাবা নওয়াজকে ক্ষমতা হারাতে হয়েছে, সেই একই মামলায় মরিয়মকেও যেতে হয়েছে আদালতে। একটি জবাবদিহিতামূলক আদালত এ মাসে তার বাবা, তিনি এবং তার স্বামীর বিরুদ্ধে অপরাধের তদন্ত শুরু করে।

কিন্তু মরিয়ম জোর দিয়ে বলেন যে, তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, সেগুলোর অস্তিত্ব নেই। এবং সেপ্টেম্বরের উপ-নির্বাচন এ সাক্ষ্য দেয় যে, জনগণ এখনো তার এবং তার দলের পক্ষে আছেন। অভিযোগ গঠনের পরেও তিনি জনসমাবেশ করে যাচ্ছেন, এমনকি উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডগুলোও দেখভাল করে যাচ্ছেন।

‘এ মামলা রাজনৈতিক কারণে করা হয়েছে এবং নিছক রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে চাপ সৃষ্টিরই একটি প্রচেষ্টা’, মার্কিন গণমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমসের সাথে সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে বলেন মরিয়ম। ‘জনগণ পাকিস্তান মুসলিম লিগের প্রতি তাদের সমর্থন অব্যাহত রেখেছে এবং আরো জোরদার করেছে।’

এটা ছিল মরিয়মের পক্ষ থেকে স্বভাবসুলভ দৃঢ়চেতা বক্তব্য। তিনি বলেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও পাকিস্তানের শক্তিশালী সেনাবাহিনীর কারণে তার পরিবারে অস্থিত্ব হুমকির মুখে রয়েছে।

লাহোরে শরিফ পরিবারের ৭০০ একরের স্থাপনায় দাঁড়িয়ে তিনি বর্ণনা করেন, ১৯৯৯ সালের অক্টোবরে দেশটির সেনাবাহিনী কীভাবে একটি কুখ্যাত অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তার বাবাকে অফিস থেকে টেনেহেঁচড়ে বের করে দেয়। যার ফলে তার পিতা ও পরিবারের আরো ২০ সদস্যকে অনেকগুলো বছর সৌদি আরবে নির্বাসন জীবন কাটাতে হয়।

‘এরপর থেকে জেল, অযোগ্য ঘোষণা, মিথ্যা অভিযোগে বিচার, গৃহবন্দী, আদালতের মামলা – এগুলো চলছেই’, বলছিলেন তিনি। ‘আমি অবিচলিত না হয়ে অব্যাহতভাবে লড়েই যাচ্ছি’, হিরা ও নীলকান্তমনি খচিত প্রার্থনা করার একটি বস্তু চাপতে চাপতে বলেন তিনি। সম্প্রতি তিনি তার পরিবার থেকে তাদের দলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তিনি তার অনুগতদের নিয়ে একটি অগ্রগামী দল গঠন করছেন, যারা পাকিস্তান মুসলিম লিগে এবং সরকারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ইচ্ছা আছে কি-না এমন প্রশ্নের সরাসরি জবাব এড়িয়ে তিনি বলেন, পরিবারের সিদ্ধান্তে তিনি দলের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন। কিন্তু তার বাবার অন্তত দু’টি সহযোগী পক্ষ থেকে তাকে সহযোগিতা না করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে আছেন তার চাচা শেহবাজ শরিফ, যিনি একজন শক্তিশালী রাজনীতিবিদ এবং পাঞ্জাব প্রদেশের তিনবারের মুখ্যমন্ত্রী। তার সন্তানরাও মরিয়মকে সাহায্য করছেন না।

২০১২ সাল পর্যন্ত মরিয়ম তাদের পারিবারিক জনহিতৈষীমূলক সংস্থা শরিফ ট্রাস্টের দেখভালে ছিলেন। ২০১৩ সালে তার বাবার নির্বাচনী প্রচারণার মাধ্যমে রাজনীতিতে তার প্রাধান্য প্রকাশ পায়। এর পর থেকে তিনি তার চাচাতো ভাই হামজা শেহবাজের পাশে থেকে দলের মিছিল-সমাবেশ সামাল দিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু বর্তমানে হামজা এ কাজে অনুপস্থিত থাকছেন।

বর্তমানে মরিয়মের সাথে মতাদর্শে ভিন্ন হামজা শেহবাজ সম্প্রতি এক টিভি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে, তিনি আশা করছেন নওয়াজ শরিফকে তার মতাদর্শ বোঝাতে সক্ষম হবেন। গত সপ্তাহে নওয়াজ শরিফ দুর্নীতির অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের একজন রিয়াজ পিরজাদা এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, শেহবাজ শরিফ তার বড় ভাই নওয়াজ শরিফের অবর্তমানে দলের নেতৃত্ব নিতে পারেন।

অন্য আরেক সহযোগী চৌধুরী নিসার আলি খান বলেছেন, তিনি মরিয়ম শরিফকে দলের নেতা হিসেবে গ্রহণ করবেন না এবং তিনি কেবিনেটেও থাকছেন না। কিন্তু মরিয়ম বলছেন, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের গুজব অতিমাত্রায় প্রচারিত হচ্ছে। ‘এটা কোনো বিভক্ত বাড়ি নয়’, বলছিলেন মরিয়ম। ‘শরিফ পরিবার পারিবারিক মূল্যবোধ ও পরিবারতান্ত্রিকতা নিয়ে গর্ববোধ করে।’

তার চাচা শেহবাজ শরিফ সম্ভবত প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন জানিয়ে তিনি বলেন, তিনি খুবই উপযুক্ত ব্যক্তি। তিনি আমার নায়ক। আমি তাকে মৃত্যু পর্যন্ত ভালোবেসে যাব।’ এটা পরিষ্কার যে, আদালতের মামলাগুলো তার এবং তার পরিবারের মধ্যে একটা অন্তর্দ্বন্দ্বের ঝুঁকি তৈরি করেছে। এ সম্ভাবনাও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে যে, আদালত তাদের বিরুদ্ধে একটা নিষ্পত্তিমূলক রায় দিতে পারে। তিনি এবং তার বাবা যদি সামনের নির্বাচনে অংশ নিতে নাও পারেন, তারপরও তাদের দলের একটা শক্ত অবস্থান রয়েছে।

তার ব্যক্তিগত ভূমিকা নিয়ে মরিয়ম বলেন, রাজনৈতিক অধ্যায়টি তার জীবনে নতুন। তিনি এটাকে প্রথাগতভাবে লালন করেন উল্লেখ করে বলেন, দীর্ঘমেয়াদে তিনি তাকে রাজনীতিতে দেখতে চান না। তিনি উল্লেখ করেন, তিনি এমন পরিবারের সদস্য যে পরিবারের রাজনৈতিক নেতৃত্ব দীর্ঘ দিন ধরে পুরুষের হাতে রয়েছে।

তিনি বলেন, তার শৈশব কেটেছে গান গেয়ে, পিয়ানো বাজিয়ে। তিনি লাহোরে শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। মেডিক্যাল স্কুল থেকে সরে গিয়ে তিনি মাস্টার্স ডিগ্রি নিয়েছেন সাহিত্য বিষয়ে, পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তিনি ১৯ বছর বয়সে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন। তার স্বামী মুহাম্মদ সফদার নওয়াজ শরিফের প্রথম ক্ষমতারোহণের সময় সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। তাদের পরিবারে ৩ সন্তান রয়েছে।

‘আমি আমার সমস্ত সময় আমার সন্তানদের বেড়ে উঠার পেছনে ব্যয় করেছি। এখন আমি স্বাধীন। এখন নিজের জন্য, নিজের কাজের জন্য অনেক সময় পাচ্ছি,’ বলছিলেন মরিয়ম। নানা ধরনের ডিজাইন করা হ্যান্ড ব্যাগ, দামি জুয়েলারির প্রতিও তার ঝুঁক রয়েছে। ‘আমি একজন নারী, আমি একজন মানুষ’, বলছিলেন তিনি।

তিনি জানান, তার দাদাই প্রথম তার প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সম্ভাবনা আবিষ্কার করেন। এবং তিনিই তাকে প্রথম পারিবারিক গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে আসেন। দাদার পর তার বাবা তার সামর্থকে মূল্যায়ন করেন। তিনি বলেন, আজ তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা হলো তিনি তার বাবার উপদেশ গ্রহণ ও সমালোচনা করতে পারেন।

যদি তিনি ভবিষ্যতে প্রধানমন্ত্রী হয়ে যান তাহলে তার ভূমিকার ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলো তিনি বলেন, ‘আমার আশপাশের লোকজন আমাকে একটি বিশেষ ভূমিকায় দেখতে চায়।’ তিনি বললেন, ‘আমি জানি না আগামীকাল কি অপেক্ষা করছে। কিন্তু আমি মনে করি, আমি মানুষের কাছে ঋণী। আমার তাদের কাছে পৌঁছানো দরকার।’ মরিয়ম তার গাড়িতে চড়ে বসলেন। সমর্থকরা পথে তাকে স্বাগত জানালো। তিনিও হাত নেড়ে তাদের প্রতিউত্তর দিলেন।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

নওয়াজকন্যা মরিয়ম প্রধানমন্ত্রী হবেন, নাকি জেলে যাবেন

আপডেট সময় ০৯:১৫:০৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৯ অক্টোবর ২০১৭

অাকাশ আর্ন্তজাতিক ডেস্ক:

ক’দিন আগেও মরিয়ম নওয়াজকে কেন্দ্র করে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিলো, তা হলো- তিনি কি পাকিস্তানের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হচ্ছেন? কিন্তু বর্তমানে সে প্রশ্ন ঘুরে দাঁড়িয়েছে, ‘তিনি কি জেলে যাচ্ছেন?’

পাকিস্তানের তিন বারের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের ৪৪ বছর বয়সী কন্যা মরিয়ম সাম্প্রতিক সময়ে ক্ষমতার মসনদ নিয়ে তার চাচা শেহবাজ শরিফসহ বেশ ক’জন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ আত্মীয়ের সাথে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়েছেন। তার চাচা শেহবাজকে নওয়াজ শরিফের পরবর্তী উত্তরসুরী হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। মরিয়মকে বেশ ক’বছর ধরে তার পিতার ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তিনি পিতার দল পাকিস্তান মুসলিম লিগের নেতৃত্বের বিষয়ে বিশেষ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন।

পানামা পেপার কেলেঙ্কারির ঘটনায় ফাঁস হওয়া দুর্নীতির মামলায় আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয়ে গত জুলাইয়ে নওয়াজ শরিফকে যখন ক্ষমতা থেকে পদত্যাগ করতে হয়, তখন থেকে পরিবারের পক্ষ থেকে তিনি হয়ে উঠেছেন জনমুখ। হয়ে উঠেন ক্ষমতার লড়াইয়ে একজন খেলোয়াড় এবং বিচার বিভাগ ও সামরিক বাহিনীর কঠোর সমালোচনাকারী। এরপর তার পিতার খালি হওয়া আসনে উপ-নির্বাচনে মা কুলসুম নওয়াজকে জিতিয়ে আনায় প্রধান সংগঠন হিসেবে কাজ করেছেন তিনি।

কিন্তু লন্ডনে অবৈধ সম্পত্তির যে মামলায় বাবা নওয়াজকে ক্ষমতা হারাতে হয়েছে, সেই একই মামলায় মরিয়মকেও যেতে হয়েছে আদালতে। একটি জবাবদিহিতামূলক আদালত এ মাসে তার বাবা, তিনি এবং তার স্বামীর বিরুদ্ধে অপরাধের তদন্ত শুরু করে।

কিন্তু মরিয়ম জোর দিয়ে বলেন যে, তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, সেগুলোর অস্তিত্ব নেই। এবং সেপ্টেম্বরের উপ-নির্বাচন এ সাক্ষ্য দেয় যে, জনগণ এখনো তার এবং তার দলের পক্ষে আছেন। অভিযোগ গঠনের পরেও তিনি জনসমাবেশ করে যাচ্ছেন, এমনকি উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডগুলোও দেখভাল করে যাচ্ছেন।

‘এ মামলা রাজনৈতিক কারণে করা হয়েছে এবং নিছক রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে চাপ সৃষ্টিরই একটি প্রচেষ্টা’, মার্কিন গণমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমসের সাথে সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে বলেন মরিয়ম। ‘জনগণ পাকিস্তান মুসলিম লিগের প্রতি তাদের সমর্থন অব্যাহত রেখেছে এবং আরো জোরদার করেছে।’

এটা ছিল মরিয়মের পক্ষ থেকে স্বভাবসুলভ দৃঢ়চেতা বক্তব্য। তিনি বলেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও পাকিস্তানের শক্তিশালী সেনাবাহিনীর কারণে তার পরিবারে অস্থিত্ব হুমকির মুখে রয়েছে।

লাহোরে শরিফ পরিবারের ৭০০ একরের স্থাপনায় দাঁড়িয়ে তিনি বর্ণনা করেন, ১৯৯৯ সালের অক্টোবরে দেশটির সেনাবাহিনী কীভাবে একটি কুখ্যাত অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তার বাবাকে অফিস থেকে টেনেহেঁচড়ে বের করে দেয়। যার ফলে তার পিতা ও পরিবারের আরো ২০ সদস্যকে অনেকগুলো বছর সৌদি আরবে নির্বাসন জীবন কাটাতে হয়।

‘এরপর থেকে জেল, অযোগ্য ঘোষণা, মিথ্যা অভিযোগে বিচার, গৃহবন্দী, আদালতের মামলা – এগুলো চলছেই’, বলছিলেন তিনি। ‘আমি অবিচলিত না হয়ে অব্যাহতভাবে লড়েই যাচ্ছি’, হিরা ও নীলকান্তমনি খচিত প্রার্থনা করার একটি বস্তু চাপতে চাপতে বলেন তিনি। সম্প্রতি তিনি তার পরিবার থেকে তাদের দলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তিনি তার অনুগতদের নিয়ে একটি অগ্রগামী দল গঠন করছেন, যারা পাকিস্তান মুসলিম লিগে এবং সরকারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ইচ্ছা আছে কি-না এমন প্রশ্নের সরাসরি জবাব এড়িয়ে তিনি বলেন, পরিবারের সিদ্ধান্তে তিনি দলের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন। কিন্তু তার বাবার অন্তত দু’টি সহযোগী পক্ষ থেকে তাকে সহযোগিতা না করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে আছেন তার চাচা শেহবাজ শরিফ, যিনি একজন শক্তিশালী রাজনীতিবিদ এবং পাঞ্জাব প্রদেশের তিনবারের মুখ্যমন্ত্রী। তার সন্তানরাও মরিয়মকে সাহায্য করছেন না।

২০১২ সাল পর্যন্ত মরিয়ম তাদের পারিবারিক জনহিতৈষীমূলক সংস্থা শরিফ ট্রাস্টের দেখভালে ছিলেন। ২০১৩ সালে তার বাবার নির্বাচনী প্রচারণার মাধ্যমে রাজনীতিতে তার প্রাধান্য প্রকাশ পায়। এর পর থেকে তিনি তার চাচাতো ভাই হামজা শেহবাজের পাশে থেকে দলের মিছিল-সমাবেশ সামাল দিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু বর্তমানে হামজা এ কাজে অনুপস্থিত থাকছেন।

বর্তমানে মরিয়মের সাথে মতাদর্শে ভিন্ন হামজা শেহবাজ সম্প্রতি এক টিভি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে, তিনি আশা করছেন নওয়াজ শরিফকে তার মতাদর্শ বোঝাতে সক্ষম হবেন। গত সপ্তাহে নওয়াজ শরিফ দুর্নীতির অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের একজন রিয়াজ পিরজাদা এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, শেহবাজ শরিফ তার বড় ভাই নওয়াজ শরিফের অবর্তমানে দলের নেতৃত্ব নিতে পারেন।

অন্য আরেক সহযোগী চৌধুরী নিসার আলি খান বলেছেন, তিনি মরিয়ম শরিফকে দলের নেতা হিসেবে গ্রহণ করবেন না এবং তিনি কেবিনেটেও থাকছেন না। কিন্তু মরিয়ম বলছেন, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের গুজব অতিমাত্রায় প্রচারিত হচ্ছে। ‘এটা কোনো বিভক্ত বাড়ি নয়’, বলছিলেন মরিয়ম। ‘শরিফ পরিবার পারিবারিক মূল্যবোধ ও পরিবারতান্ত্রিকতা নিয়ে গর্ববোধ করে।’

তার চাচা শেহবাজ শরিফ সম্ভবত প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন জানিয়ে তিনি বলেন, তিনি খুবই উপযুক্ত ব্যক্তি। তিনি আমার নায়ক। আমি তাকে মৃত্যু পর্যন্ত ভালোবেসে যাব।’ এটা পরিষ্কার যে, আদালতের মামলাগুলো তার এবং তার পরিবারের মধ্যে একটা অন্তর্দ্বন্দ্বের ঝুঁকি তৈরি করেছে। এ সম্ভাবনাও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে যে, আদালত তাদের বিরুদ্ধে একটা নিষ্পত্তিমূলক রায় দিতে পারে। তিনি এবং তার বাবা যদি সামনের নির্বাচনে অংশ নিতে নাও পারেন, তারপরও তাদের দলের একটা শক্ত অবস্থান রয়েছে।

তার ব্যক্তিগত ভূমিকা নিয়ে মরিয়ম বলেন, রাজনৈতিক অধ্যায়টি তার জীবনে নতুন। তিনি এটাকে প্রথাগতভাবে লালন করেন উল্লেখ করে বলেন, দীর্ঘমেয়াদে তিনি তাকে রাজনীতিতে দেখতে চান না। তিনি উল্লেখ করেন, তিনি এমন পরিবারের সদস্য যে পরিবারের রাজনৈতিক নেতৃত্ব দীর্ঘ দিন ধরে পুরুষের হাতে রয়েছে।

তিনি বলেন, তার শৈশব কেটেছে গান গেয়ে, পিয়ানো বাজিয়ে। তিনি লাহোরে শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। মেডিক্যাল স্কুল থেকে সরে গিয়ে তিনি মাস্টার্স ডিগ্রি নিয়েছেন সাহিত্য বিষয়ে, পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তিনি ১৯ বছর বয়সে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন। তার স্বামী মুহাম্মদ সফদার নওয়াজ শরিফের প্রথম ক্ষমতারোহণের সময় সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। তাদের পরিবারে ৩ সন্তান রয়েছে।

‘আমি আমার সমস্ত সময় আমার সন্তানদের বেড়ে উঠার পেছনে ব্যয় করেছি। এখন আমি স্বাধীন। এখন নিজের জন্য, নিজের কাজের জন্য অনেক সময় পাচ্ছি,’ বলছিলেন মরিয়ম। নানা ধরনের ডিজাইন করা হ্যান্ড ব্যাগ, দামি জুয়েলারির প্রতিও তার ঝুঁক রয়েছে। ‘আমি একজন নারী, আমি একজন মানুষ’, বলছিলেন তিনি।

তিনি জানান, তার দাদাই প্রথম তার প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সম্ভাবনা আবিষ্কার করেন। এবং তিনিই তাকে প্রথম পারিবারিক গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে আসেন। দাদার পর তার বাবা তার সামর্থকে মূল্যায়ন করেন। তিনি বলেন, আজ তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা হলো তিনি তার বাবার উপদেশ গ্রহণ ও সমালোচনা করতে পারেন।

যদি তিনি ভবিষ্যতে প্রধানমন্ত্রী হয়ে যান তাহলে তার ভূমিকার ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলো তিনি বলেন, ‘আমার আশপাশের লোকজন আমাকে একটি বিশেষ ভূমিকায় দেখতে চায়।’ তিনি বললেন, ‘আমি জানি না আগামীকাল কি অপেক্ষা করছে। কিন্তু আমি মনে করি, আমি মানুষের কাছে ঋণী। আমার তাদের কাছে পৌঁছানো দরকার।’ মরিয়ম তার গাড়িতে চড়ে বসলেন। সমর্থকরা পথে তাকে স্বাগত জানালো। তিনিও হাত নেড়ে তাদের প্রতিউত্তর দিলেন।