মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে চলমান পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভের মুখে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সংস্থাটি শ্রমিকদের ওপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ থেকে বিরত থাকতে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে বিক্ষোভ চলাকালীন সহিংসতায় জড়িতদের খুঁজে বের করে যথাযথ জবাবদিহিতার আওতায় আনার তাগিদ দেয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বেতন বাড়ানোর দাবিতে হাজারো পোশাক কর্মীর রাজপথে নেমে আসা বিক্ষোভ দমনে পুলিশ লাঠিপেটা ও কাঁদানে গ্যাসের মতো কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের প্রতি এসব আহ্বান জানায় এইচআরডব্লিউ। এইচআরডব্লিউ বলেছে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষকে নিশ্চিত করতে হবে, পুলিশ কেবল প্রয়োজন হলেই বলপ্রয়োগ করবে এবং সেই বলপ্রয়োগ কোনোভাবেই প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত হবে না। সংস্থাটির ওয়েবসাইটে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে।
বিক্ষোভের অস্থিরতাকে কেন্দ্র করে অগ্নিসংযোগ, কারখানায় ভাঙচুর এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলার মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনায় রাজনৈতিক দল এবং কারখানার মালিকপক্ষের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে ৩ নভেম্বর ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) জানিয়েছে যে, নাশকতার অভিযোগে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের ৩৩ জন সমর্থককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আবার ক্ষমতাসীন বিএনপির যুব সংগঠনের কর্মীরাও শ্রমিকদের বিরুদ্ধে মিছিল করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আন্দোলনের জেরে ৩ নভেম্বর আশুলিয়ায় তিন শ্রমিক নেতাকে আটক করে উসকানির অভিযোগ আনা হয়েছে এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা হয়েছে হাজারো অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা। এমন এক পরিস্থিতির শিকার এক কর্মীর ২৮ বছর বয়সী স্ত্রী এইচআরডব্লিউকে জানান, তার স্বামীকে কেবল অল্প সময়ের জন্য বিক্ষোভে অংশ নেয়ার অপরাধে তুলে নেয়া হয়েছে, যদিও সে কোনো সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল না। এ ছাড়া ৩ নভেম্বর আশুলিয়ায় তিনজন শ্রমিকনেতাকে আটক করার খবর পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদনে ৩ নভেম্বর তৌফিক হোসেন নামক এক পোশাক কর্মীর মৃত্যুর করুণ ঘটনাটিও তুলে ধরা হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শী সহকর্মীদের ভাষ্যমতে, দুপুরের খাবার খেয়ে ফেরার পথে তিনি বিক্ষোভরত শ্রমিক এবং কারখানা থেকে ভাড়া করে আনা ব্যক্তিদের মধ্যে পড়ে যান এবং সেখানেই তাকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। বর্তমানে আন্দোলনরত শ্রমিকদের দাবি, তাদের মাসিক ন্যূনতম মজুরি বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করা হোক। ২০২৩ সালে এই মজুরি ছিল ১২ হাজার ৫০০ টাকা। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার গত ১ নভেম্বর একটি মজুরি বোর্ড গঠন করেছে, যা নতুন কাঠামো অনুযায়ী ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হবে। সেলাই মেশিন অপারেটর হিসেবে কাজ করা এক শ্রমিক জানান, মাসে ১৩ হাজার ৫০০ টাকা বেতনে বাসাভাড়া ৬ হাজার এবং রান্নার গ্যাসের দাম ২ হাজার ৩০০ টাকা দেয়ার পর সন্তানদের পড়াশোনা ও সংসারের খরচ চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। একজন ৩১ বছর বয়সী সেলাই মেশিন অপারেটর নিজের আর্থিক সংকটের কথা তুলে ধরে বলেন, ‘আমার বাসাভাড়া ৬ হাজার টাকা। পেছনে ফিরে দেখি, তৌফিক মাটিতে পড়ে আছেন। বলুন তো, খাবারের জন্য আর কত টাকা থাকে।
এইচআরডব্লিউর মতে, শ্রমিকদের বেঁচে থাকার জন্য যৌক্তিক দাবির বদলে রাজনৈতিক বিরোধীদের দায়ী করা হচ্ছে, যা পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাবে না। তারা মনে করিয়ে দেয় যে, গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে বিএনপি মূল্যস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এছাড়া এপ্রিলে গৃহীত শ্রম আইনের সংশোধনীতে প্রতি তিন বছর অন্তর মজুরি পর্যালোচনার সুযোগ এবং ট্রেড ইউনিয়ন কর্মীদের কালো তালিকাভুক্ত করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সংস্থাটি কেবল বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ নয়, আন্তর্জাতিক পোশাক ব্র্যান্ডগুলোর প্রতিও আহ্বান জানিয়েছে যেন তারা সরবরাহকারী কারখানার সঙ্গে এমন চুক্তি না করে যা শ্রমিকদের ওপর নির্যাতনে উৎসাহ দেয় বা মানসম্মত মজুরি প্রাপ্তিতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। মজুরি নিয়ে দর-কষাকষিকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া সহিংসতা ও দায়মুক্তির এই চক্র ভেঙে ফেলা এখন সময়ের দাবি।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 
























