ঢাকা ০৬:৫৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
প্রকাশ হলো এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল উদ্ধার হলো সাবেক বিমান বাহিনী কর্মকর্তার মৃত অবস্থায় পাওয়া ব্যক্তি জাপানি বিনিয়োগের জন্য পাঁচ খাত চিহ্নিত করলেন প্রধানমন্ত্রী ড্যাবের বিরুদ্ধে: কার্যালয়ে ঢুকে আইইডিসিআরের পরিচালককে মারধরের দেশে হাম ও উপসর্গে আরও সাত শিশুর মৃত্যু পায়রা বন্দরে গমের সাইলো নির্মাণে রাশিয়াকে প্রস্তাব খাদ্যমন্ত্রীর প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনা ভেস্তে দিতে ষড়যন্ত্র করছে গুপ্তরা: ডিএনসিসি প্রশাসক ডেঙ্গুতে একদিনে ১১ জনের মৃত্যু, শনাক্ত দুই হাজার ছাড়াল ক্রসফায়ার নিয়ে আইজিপির মন্তব্যে টিআইবি ও অধিকারের উদ্বেগ রূপপুরের জ্বালানি নিয়ে ঢাকায় পৌঁছাল রাশিয়ার কার্গো বিমান

বেতন বাড়বে কোথা থেকে: একই গলির তিন বাসা

ঢাকার যেকোনো একটি গলির পাশাপাশি তিনটি বাসার অর্থনৈতিক চিত্র খেয়াল করলে দেশের সার্বিক আয়ের বৈষম্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটি বাসায় থাকেন ২০তম গ্রেডের সরকারি কর্মচারী, দ্বিতীয়টিতে বসবাস করেন একজন পোশাকশ্রমিক এবং তৃতীয় বাসায় থাকেন বেসরকারি অফিসের কোনো হিসাবরক্ষক বা প্রকৌশলী। কিছুদিন আগেও প্রথম দুজন প্রায় একই টাকায় সংসার চালাতেন। কিন্তু শ্রমিকের মজুরি না বাড়লে নতুন পে স্কেল পুরো বাস্তবায়নের পর এই দুই প্রতিবেশীর বার্ষিক আয়ের ব্যবধান দাঁড়াবে প্রায় তিন গুণ। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর ন্যায্য বেতন নিয়ে কারো আপত্তি থাকার কথা নয়, তবে আসল প্রশ্নটা অন্য জায়গায়: বাকি দুই বাসার বেতন বাড়বে কোথা থেকে, যখন যে ব্যবসা তাঁদের বেতন দেয়, সে নিজেই মন্দা, ঘুষ আর চাঁদার চাপে দম ফেলতে পারছে না? ব্যবসা খারাপ হলে প্রথমে আটকায় তাঁদের ইনক্রিমেন্ট, কখনো চাকরিও। এই সরু মার্জিন থেকেই দুই পক্ষকে খুশি রাখতে হয়।

পে স্কেলের বৈষম্য ও আয়ের খাতসমূহ

  • সরকারি কর্মজীবী: ২০তম গ্রেডের নতুন মূল বেতন ও স্কেল অনুযায়ী সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
  • পোশাকশ্রমিক: ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে ন্যূনতম মোট মজুরি ১২,৫০০ টাকায় আটকে রয়েছে।
  • বেসরকারি চাকুরিজীবী: অফিস বা প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক আয়ের ওপর তাদের বেতন ও ভাতা নির্ভরশীল।

আগের স্কেলে ২০তম গ্রেডের সরকারি কর্মচারীর মূল বেতন ছিল ৮,২৫০ টাকা, যা বিভিন্ন ভাতা মিলিয়ে ঢাকার বাইরে প্রায় ১৫,৭০০ টাকায় পৌঁছাত। তবে নতুন পে স্কেল অনুযায়ী ১০ থেকে ২০তম গ্রেডে মূল বেতনের বর্ধিত অংশ পর্যায়ক্রমে দেওয়া হচ্ছে। চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫০ শতাংশ, ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত ৭৫ শতাংশ এবং ২০২৭ সালের জুলাই থেকে পুরো অংশ কার্যকর হবে। ফলে ২০তম গ্রেডে নতুন যোগ দেওয়া একজন কর্মচারীর মূল বেতন এখনই দাঁড়ায় ১৪,১২৫ টাকা, যা কোনো প্রকার ভাতা ছাড়াই একজন পোশাকশ্রমিকের সম্পূর্ণ মোট মজুরির চেয়ে বেশি। ব্যবসার জন্য সুদও চড়া: একটি ব্যাংকের ৩০ জুন থেকে কার্যকর হারেই বড় শিল্পের মেয়াদি ঋণ আর কর্মসূচির বাইরের কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ঋণের সুদ ১৪ দশমিক ৫০ শতাংশ।

নতুন স্কেলে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অর্জিত সুযোগ-সুবিধা

  • ভাতা চালুর তারিখ: ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে নতুন হারের ভাতা চালু হবে।
  • ঢাকার বেতন কাঠামো: মূল বেতন ২০,০০০ টাকা, মূল বেতনের ৬০ শতাংশ বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা ৩,০০০ টাকা এবং টিফিন ভাতা ৫০০ টাকা।
  • মোট মাসিক প্রাপ্তি: শুধু এই চারটি উপাদান মিলিয়েই প্রতি মাসে ৩৫,৫০০ টাকা।
  • বার্ষিক সুবিধা: যোগদানের মাস থেকেই মূল বেতনের সমপরিমাণ দুটি উৎসব ভাতা ও নববর্ষের ভাতা অন্তর্ভুক্ত হয়ে বছরে প্রায় ৪ লাখ ৭০ হাজার টাকা দাঁড়ায়।
  • দীর্ঘমেয়াদি হিসাব: কোনো অতিরিক্ত ইনক্রিমেন্ট না ধরলেও ৩০ বছরের মোট চাকরি জীবনে প্রাপ্তি ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা ছাড়ায়, যার সাথে পেনশন ও আনুতোষিক যোগ হলে তা দেড় কোটি টাকায় রূপ নেয়।
  • পেনশনভোগীদের সুবিধা: বর্তমানে বিদ্যমান পেনশনভোগীদের পেনশনের হার ধাপভেদে ৫৫ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।

এই নতুন পে স্কেলের সার্বিক বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়াবে ১,০৫,৫৮০ কোটি টাকা, যার সরাসরি সুবিধা পাবেন প্রায় ২৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগী। প্রশ্ন ওঠে—নতুন পে স্কেল: র‍্যাঙ্ক এক পেনশন ভিন্ন, এমন অদ্ভুত ব্যবস্থা কেন রাখা হয়েছে? পে স্কেলের সুবিধা যেভাবে সরকারি কর্মচারীদের জীবনে নিশ্চয়তা আনছে, সেভাবে সাধারণ মানুষের দুর্নীতি ও ভোগান্তি কতটা দূর হবে তা নিয়ে এখনো সংশয় থেকে যায়। দ্বিতীয় বাসা: পুরোনো বাজারদরে আটকে। ওভারটাইম ছাড়া বছরে সর্বোচ্চ প্রায় ১ লাখ ৬৩ হাজার টাকা, ৩০ বছরে ৪৯ লাখ, যদি কারখানা টিকে থাকে। বিজিএমইএ সভাপতির হিসাবে বর্তমান সরকারের আমলে ৩১টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে চাকরি গেছে প্রায় ১৪ হাজার জনের; আট থেকে দশটি ইস্পাত কলও বন্ধ।

পোশাকশ্রমিক ও দ্বিতীয় বাসার বাস্তব অবস্থা

অন্যদিকে দ্বিতীয় বাসার অধিবাসী পোশাকশ্রমিকদের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন।

একজন নতুন শ্রমিকের মূল মজুরি নির্ধারণ করা রয়েছে ৬,৭০০ টাকা।

মূল মজুরির বেশি নয় এমন উৎসব ভাতা তারা পান টানা এক বছর চাকরির পর।

ওভারটাইম ব্যতীত নতুন বাজারে তাদের আর্থিক অগ্রগতি অত্যন্ত ধীর।

মিরপুরের এক পোশাকশ্রমিক জানিয়েছেন, প্রতিদিন টানা ওভারটাইম শেষে মাসে ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা হাতে পান। অথচ নিত্যপণ্যের দাম যেভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, তাতে এই আয় দিয়ে ঢাকা শহরে টিকে থাকা কষ্টকর। শতাংশের হিসাবে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের বেতন বাড়ার হার কাছাকাছি দেখা গেলেও প্রকৃত আয়ের ব্যবধান আকাশচুম্বী। সরকারি কর্মচারীদের মূল বেতন ১৪২ শতাংশ বাড়লেও ২০১৩ সালে শ্রমিকের ৫,৩০০ টাকা ন্যূনতম মজুরি থেকে ২০২৩ সালে তা হয়েছে ১২,৫০০ টাকা। বাজারদরের হিসাবে মূল্যস্ফীতির কারণে বর্তমানে ১২,৫০০ টাকার ক্রয়ক্ষমতা ২০২৩ সালের ১২ ডিসেম্বরের ১০ হাজার টাকার সমপরিমাণ। সরকারি মূল বেতন ১৪২ শতাংশ, শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি ২০১৩ সালের ৫,৩০০ টাকা থেকে ১৩৬ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ২০২২ সালের এপ্রিল থেকে মূল্যস্ফীতি টানা মজুরি বৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে; সেপ্টেম্বরেও মজুরি বেড়েছে প্রায় ৭ দশমিক ৯ শতাংশ, দাম ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। পরিমাণ কমেছে ৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ, প্রতি কেজির দাম ৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ; ভিয়েতনামের আয় উল্টো বেড়েছে ৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ। আগস্টেও তা ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ; বিশ্বব্যাংক বলছে, ৩৩ বছরে সর্বনিম্ন। অথচ একই আগস্টে সরকারি খাতে ঋণ বেড়েছে ৩২ দশমিক ৪৫ শতাংশ, প্রায় সাত গুণ গতিতে। অথচ এসএমই ফাউন্ডেশনের হিসাবে শিল্প খাতের প্রায় ৮৫ শতাংশ কর্মসংস্থান এই ছোট উদ্যোগগুলোতেই। জুলাই-মার্চে স্কয়ার টেক্সটাইলসের মুনাফা কমেছে প্রায় ৭০ শতাংশ, শাশা ডেনিমসের ৭২ শতাংশ।

উৎপাদন ও অর্থনৈতিক মন্দার অভিঘাত

২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট সময়কালে ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আয় কমেছে ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ, যেখানে উক্ত সময়ে ইইউর মোট বৈশ্বিক আমদানি হ্রাসের হার ছিল ৩ শতাংশ। গাজীপুরের এক সুইং অপারেটর তাঁর কর্মস্থলের অভিজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, পূর্বে প্রতিদিন রাত ১০টা পর্যন্ত কারখানায় ওভারটাইম চলত, কিন্তু বর্তমানে বেশিরভাগ দিনই বিকেল ৫টায় ছুটি হয়ে যায়। কাজ না থাকায় ওভারটাইমের সুযোগ বন্ধ হয়ে আয় আরও সীমিত হয়ে গেছে। জানুয়ারি থেকে আগস্টে ইইউতে আমাদের পোশাক রপ্তানি আয় কমেছে ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ, যেখানে ইইউর মোট আমদানি কমেছে ৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ।

বেসরকারি খাত ও তৃতীয় বাসার অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা

বাংলাদেশের মোট কর্মজীবীদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বেসরকারি খাতে যুক্ত বলে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যে দেখা যায়। তবে অধিকাংশ সংস্থাতেই বেতন বৃদ্ধির নির্দিষ্ট নীতি বা নিরাপত্তা নেই। ২০১৫ সালের শ্রম আইন সংশোধনে কর্মচারীদের শ্রমিকের সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করা হলেও পরবর্তী সময়ে এপ্রিলে পাস হওয়া সংশোধনীতে তা বাদ দেওয়া হয়। ফলে তাদের চাকরির স্থায়িত্ব বা সুযোগ-সুবিধা আইনিভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট উচ্চশিক্ষিত তরুণদের একটি বিশাল অংশ কর্মহীন। চাকরির বাজারে এই অনিশ্চয়তা তরুণ সমাজকে গভীরভাবে দুশ্চিন্তায় ফেলছে। ২০২৫ সালের সংশোধনীতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শ্রমিকের সংজ্ঞায় আনা হয়েছিল; এপ্রিলে পাস হওয়া সংশোধিত শ্রম আইনে সেই বিধান বাদ গেছে, ফলে অনেকে গ্র্যাচুইটি ও প্রভিডেন্ট ফান্ড হারানোর ঝুঁকিতে।

বেসরকারি ব্যবসার বর্তমান আর্থিক চিত্র

  • ঋণ প্রবৃদ্ধি: মার্চে বেসরকারি খাতের ঋণের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি প্রথমবারের মতো ৫ শতাংশের নিচে নেমে আসে এবং জুনে তা ৪.৪৭ শতাংশে গিয়ে ঠেকে।
  • উচ্চ সুদের হার: বিভিন্ন ব্যাংকে ৩০ জুন থেকে কার্যকর নীতিমালায় বড় শিল্পের মেয়াদি ঋণের সুদের হার অত্যধিক বৃদ্ধি পেয়েছে।
  • জ্বালানি সংকট: ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে শিল্প খাতে গ্যাসের দাম ১৫০ থেকে ১৭৮ শতাংশ বাড়ানো হলেও শিল্পকারখানাগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নেই।
  • উৎপাদন ব্যাহত: মুন্সিগঞ্জের হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলে সিটি গ্রুপের ৫টি ইউনিট গ্যাসের তীব্র সংকটের কারণে চালু হতে পারছে না, যেখানে প্রায় ১৪ হাজার কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারত।
  • মুনাফায় ধস: চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ মেয়াদে স্কয়ার টেক্সটাইলসের মুনাফা প্রায় ৭০ শতাংশ কমেছে এবং শাশা ডেনিমসের প্রবৃদ্ধিতে বড় ধস নেমেছে।

বেসরকারি কারখানার মালিক ও ব্যবসা পরিচালনাকারীরাও চতুর্মুখী চাপে জর্জরিত। ১২ জুন বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেছিলেন যে, সরকারি কর্মকর্তাদের আয় বাড়লে আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতি হ্রাস পাবে। অথচ নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের ঠিক তিন বছর আগে, ২০২৩ সালের ১ নভেম্বর মজুরি আন্দোলনের সময় বিজিএমইএর জরুরি সভায় শিল্প মালিকরা স্পষ্টভাবে বলেছিলেন—সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা ঘুষ নেওয়া বন্ধ করলে তারা শ্রমিকদের বেতন বাড়াতে সক্ষম হবেন। একদিকে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট, অন্যদিকে সড়ক ও প্রশাসনিক পর্যায়ে তোলা চাঁদা ব্যবসাকে দমবন্ধ পরিস্থিতিতে ফেলে দিয়েছে। রাষ্ট্র-নিশ্চিত পেনশন নেই, আর ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ৪০০-এর বেশি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে। সরকারি বেতন ঠিক হলো আজকের বাজারদরে, শ্রমিকেরটা ২০২৩ সালের দরে। অথচ বেশির ভাগ বেসরকারি অফিসে বেতন ঠিক করার কমিশন বা বোর্ড নেই, দাবি তোলার সংগঠনও কার্যত নেই; তাঁদের বেতন কতটা ক্ষয়ে গেল, তার নিয়মিত সরকারি হিসাবও নেই। ব্রিটিশ কাউন্সিলের ২০২৪ সালের জরিপে ৫৫ শতাংশ তরুণ পড়াশোনা বা কাজের জন্য বিদেশে যেতে আগ্রহী, আর বেকারত্বের প্রধান কারণ হিসেবে সবচেয়ে বেশি, ৩৭ শতাংশ, বলেছেন দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি। শ্রমিক অন্তত রাস্তায় দাঁড়াতে পারেন; তাঁরা সেটুকুও পারেন না, কারণ মুখ খুললে চাকরি যায়। পুলিশ সদর দপ্তরের তালিকায় সারা দেশে চাঁদাবাজ ৩,৮৪৯ জন; ঢাকা মহানগর পুলিশের তালিকায় শুধু রাজধানীতেই ১,২৮০ জন, তাঁদের ১৪৮ জন সশস্ত্র, আর আশ্রয়দাতা ৩১৪ জন।

করকাঠামো ও ঋণের অসম প্রতিযোগিতা

  • এনবিআরের রাজস্ব আদায়: গত অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মোট আদায়ের প্রায় ৬৫ শতাংশ এসেছে পরোক্ষ কর (ভ্যাট ও শুল্ক) থেকে, যা নিম্ন আয়ের শ্রমিকেরাও নিত্যপণ্য কেনার সময় প্রদান করেন।
  • করদাতার স্বল্প সংখ্যা: চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত জমা হওয়া ৪০ লাখ কর রিটার্নের মধ্যে ২২ লাখই ছিল করযোগ্য সীমার নিচে। ১৭ কোটি মানুষের দেশে মাত্র ১৮ লাখ মানুষ করযোগ্য আয় প্রদর্শন করেছেন।
  • ধীরগতির রাজস্ব: চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ১.২৩ শতাংশ, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা কম।
  • সরকারি ব্যাংক ঋণ: আগস্ট শেষে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণ এক বছরের ব্যবধানে ৩৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

অর্থনীতির এই বিশাল ধারের ভার শেষ পর্যন্ত বেসরকারি খাতের ওপরই গিয়ে পড়ছে। চলতি অর্থবছরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা গত বছরের অর্জনের চেয়ে ৪৫ শতাংশের বেশি নির্ধারণ করা হয়েছে। ঋণের বাজারে সরকারের মাত্রাতিরিক্ত উপস্থিতির কারণে বেসরকারি খাত ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় ঋণ পাচ্ছে না। ফলে ব্যাংকের ঋণের সুদের উচ্চ হার, সরকারি পে স্কেলের সাথে বেতন সামঞ্জস্য করার চাপ এবং সার্বিক অর্থনৈতিক মন্দা মিলে বেসরকারি খাতের ব্যবসায়ীদের টিকে থাকা দায় হয়ে পড়েছে। যদি এই খাতের ব্যবসা না বাঁচে, তবে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখা এবং সর্বস্তরের চাকুরিজীবী ও শ্রমিকের আয় নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে উঠবে। অথচ বেসরকারি সার্ভিস রুলস তৈরিতে সরকারের গড়া কমিটির প্রধানই বলেছেন, প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের সুবিধামতো ছাঁটাই করছে, অনেকে সার্ভিস বেনিফিট পাচ্ছেন না।

  • পে স্কেল বনাম দুর্নীতি: মকছেদ সাহেবের দেখা সেই সকালটি আসলে কার গল্প।
  • শ্রমিকের বেতন বোনাসের বেলায় কি পুরোনো বন্দোবস্তই চলবে।
  • সুবাইল বিন আলম, প্রকৌশলী-অর্থনীতিবিদ, টেকসই উন্নয়নবিষয়ক কলামিস্ট। ই–মেইল: [email protected] * মতামত লেখকের নিজস্ব।
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

মানহীন মেডিকেল কলেজ অনুমোদন দেওয়া হবে না: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী

বেতন বাড়বে কোথা থেকে: একই গলির তিন বাসা

আপডেট সময় ০৫:১২:১৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬

ঢাকার যেকোনো একটি গলির পাশাপাশি তিনটি বাসার অর্থনৈতিক চিত্র খেয়াল করলে দেশের সার্বিক আয়ের বৈষম্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটি বাসায় থাকেন ২০তম গ্রেডের সরকারি কর্মচারী, দ্বিতীয়টিতে বসবাস করেন একজন পোশাকশ্রমিক এবং তৃতীয় বাসায় থাকেন বেসরকারি অফিসের কোনো হিসাবরক্ষক বা প্রকৌশলী। কিছুদিন আগেও প্রথম দুজন প্রায় একই টাকায় সংসার চালাতেন। কিন্তু শ্রমিকের মজুরি না বাড়লে নতুন পে স্কেল পুরো বাস্তবায়নের পর এই দুই প্রতিবেশীর বার্ষিক আয়ের ব্যবধান দাঁড়াবে প্রায় তিন গুণ। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর ন্যায্য বেতন নিয়ে কারো আপত্তি থাকার কথা নয়, তবে আসল প্রশ্নটা অন্য জায়গায়: বাকি দুই বাসার বেতন বাড়বে কোথা থেকে, যখন যে ব্যবসা তাঁদের বেতন দেয়, সে নিজেই মন্দা, ঘুষ আর চাঁদার চাপে দম ফেলতে পারছে না? ব্যবসা খারাপ হলে প্রথমে আটকায় তাঁদের ইনক্রিমেন্ট, কখনো চাকরিও। এই সরু মার্জিন থেকেই দুই পক্ষকে খুশি রাখতে হয়।

পে স্কেলের বৈষম্য ও আয়ের খাতসমূহ

  • সরকারি কর্মজীবী: ২০তম গ্রেডের নতুন মূল বেতন ও স্কেল অনুযায়ী সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
  • পোশাকশ্রমিক: ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে ন্যূনতম মোট মজুরি ১২,৫০০ টাকায় আটকে রয়েছে।
  • বেসরকারি চাকুরিজীবী: অফিস বা প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক আয়ের ওপর তাদের বেতন ও ভাতা নির্ভরশীল।

আগের স্কেলে ২০তম গ্রেডের সরকারি কর্মচারীর মূল বেতন ছিল ৮,২৫০ টাকা, যা বিভিন্ন ভাতা মিলিয়ে ঢাকার বাইরে প্রায় ১৫,৭০০ টাকায় পৌঁছাত। তবে নতুন পে স্কেল অনুযায়ী ১০ থেকে ২০তম গ্রেডে মূল বেতনের বর্ধিত অংশ পর্যায়ক্রমে দেওয়া হচ্ছে। চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫০ শতাংশ, ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত ৭৫ শতাংশ এবং ২০২৭ সালের জুলাই থেকে পুরো অংশ কার্যকর হবে। ফলে ২০তম গ্রেডে নতুন যোগ দেওয়া একজন কর্মচারীর মূল বেতন এখনই দাঁড়ায় ১৪,১২৫ টাকা, যা কোনো প্রকার ভাতা ছাড়াই একজন পোশাকশ্রমিকের সম্পূর্ণ মোট মজুরির চেয়ে বেশি। ব্যবসার জন্য সুদও চড়া: একটি ব্যাংকের ৩০ জুন থেকে কার্যকর হারেই বড় শিল্পের মেয়াদি ঋণ আর কর্মসূচির বাইরের কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ঋণের সুদ ১৪ দশমিক ৫০ শতাংশ।

নতুন স্কেলে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অর্জিত সুযোগ-সুবিধা

  • ভাতা চালুর তারিখ: ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে নতুন হারের ভাতা চালু হবে।
  • ঢাকার বেতন কাঠামো: মূল বেতন ২০,০০০ টাকা, মূল বেতনের ৬০ শতাংশ বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা ৩,০০০ টাকা এবং টিফিন ভাতা ৫০০ টাকা।
  • মোট মাসিক প্রাপ্তি: শুধু এই চারটি উপাদান মিলিয়েই প্রতি মাসে ৩৫,৫০০ টাকা।
  • বার্ষিক সুবিধা: যোগদানের মাস থেকেই মূল বেতনের সমপরিমাণ দুটি উৎসব ভাতা ও নববর্ষের ভাতা অন্তর্ভুক্ত হয়ে বছরে প্রায় ৪ লাখ ৭০ হাজার টাকা দাঁড়ায়।
  • দীর্ঘমেয়াদি হিসাব: কোনো অতিরিক্ত ইনক্রিমেন্ট না ধরলেও ৩০ বছরের মোট চাকরি জীবনে প্রাপ্তি ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা ছাড়ায়, যার সাথে পেনশন ও আনুতোষিক যোগ হলে তা দেড় কোটি টাকায় রূপ নেয়।
  • পেনশনভোগীদের সুবিধা: বর্তমানে বিদ্যমান পেনশনভোগীদের পেনশনের হার ধাপভেদে ৫৫ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।

এই নতুন পে স্কেলের সার্বিক বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়াবে ১,০৫,৫৮০ কোটি টাকা, যার সরাসরি সুবিধা পাবেন প্রায় ২৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগী। প্রশ্ন ওঠে—নতুন পে স্কেল: র‍্যাঙ্ক এক পেনশন ভিন্ন, এমন অদ্ভুত ব্যবস্থা কেন রাখা হয়েছে? পে স্কেলের সুবিধা যেভাবে সরকারি কর্মচারীদের জীবনে নিশ্চয়তা আনছে, সেভাবে সাধারণ মানুষের দুর্নীতি ও ভোগান্তি কতটা দূর হবে তা নিয়ে এখনো সংশয় থেকে যায়। দ্বিতীয় বাসা: পুরোনো বাজারদরে আটকে। ওভারটাইম ছাড়া বছরে সর্বোচ্চ প্রায় ১ লাখ ৬৩ হাজার টাকা, ৩০ বছরে ৪৯ লাখ, যদি কারখানা টিকে থাকে। বিজিএমইএ সভাপতির হিসাবে বর্তমান সরকারের আমলে ৩১টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে চাকরি গেছে প্রায় ১৪ হাজার জনের; আট থেকে দশটি ইস্পাত কলও বন্ধ।

পোশাকশ্রমিক ও দ্বিতীয় বাসার বাস্তব অবস্থা

অন্যদিকে দ্বিতীয় বাসার অধিবাসী পোশাকশ্রমিকদের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন।

একজন নতুন শ্রমিকের মূল মজুরি নির্ধারণ করা রয়েছে ৬,৭০০ টাকা।

মূল মজুরির বেশি নয় এমন উৎসব ভাতা তারা পান টানা এক বছর চাকরির পর।

ওভারটাইম ব্যতীত নতুন বাজারে তাদের আর্থিক অগ্রগতি অত্যন্ত ধীর।

মিরপুরের এক পোশাকশ্রমিক জানিয়েছেন, প্রতিদিন টানা ওভারটাইম শেষে মাসে ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা হাতে পান। অথচ নিত্যপণ্যের দাম যেভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, তাতে এই আয় দিয়ে ঢাকা শহরে টিকে থাকা কষ্টকর। শতাংশের হিসাবে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের বেতন বাড়ার হার কাছাকাছি দেখা গেলেও প্রকৃত আয়ের ব্যবধান আকাশচুম্বী। সরকারি কর্মচারীদের মূল বেতন ১৪২ শতাংশ বাড়লেও ২০১৩ সালে শ্রমিকের ৫,৩০০ টাকা ন্যূনতম মজুরি থেকে ২০২৩ সালে তা হয়েছে ১২,৫০০ টাকা। বাজারদরের হিসাবে মূল্যস্ফীতির কারণে বর্তমানে ১২,৫০০ টাকার ক্রয়ক্ষমতা ২০২৩ সালের ১২ ডিসেম্বরের ১০ হাজার টাকার সমপরিমাণ। সরকারি মূল বেতন ১৪২ শতাংশ, শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি ২০১৩ সালের ৫,৩০০ টাকা থেকে ১৩৬ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ২০২২ সালের এপ্রিল থেকে মূল্যস্ফীতি টানা মজুরি বৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে; সেপ্টেম্বরেও মজুরি বেড়েছে প্রায় ৭ দশমিক ৯ শতাংশ, দাম ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। পরিমাণ কমেছে ৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ, প্রতি কেজির দাম ৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ; ভিয়েতনামের আয় উল্টো বেড়েছে ৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ। আগস্টেও তা ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ; বিশ্বব্যাংক বলছে, ৩৩ বছরে সর্বনিম্ন। অথচ একই আগস্টে সরকারি খাতে ঋণ বেড়েছে ৩২ দশমিক ৪৫ শতাংশ, প্রায় সাত গুণ গতিতে। অথচ এসএমই ফাউন্ডেশনের হিসাবে শিল্প খাতের প্রায় ৮৫ শতাংশ কর্মসংস্থান এই ছোট উদ্যোগগুলোতেই। জুলাই-মার্চে স্কয়ার টেক্সটাইলসের মুনাফা কমেছে প্রায় ৭০ শতাংশ, শাশা ডেনিমসের ৭২ শতাংশ।

উৎপাদন ও অর্থনৈতিক মন্দার অভিঘাত

২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট সময়কালে ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আয় কমেছে ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ, যেখানে উক্ত সময়ে ইইউর মোট বৈশ্বিক আমদানি হ্রাসের হার ছিল ৩ শতাংশ। গাজীপুরের এক সুইং অপারেটর তাঁর কর্মস্থলের অভিজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, পূর্বে প্রতিদিন রাত ১০টা পর্যন্ত কারখানায় ওভারটাইম চলত, কিন্তু বর্তমানে বেশিরভাগ দিনই বিকেল ৫টায় ছুটি হয়ে যায়। কাজ না থাকায় ওভারটাইমের সুযোগ বন্ধ হয়ে আয় আরও সীমিত হয়ে গেছে। জানুয়ারি থেকে আগস্টে ইইউতে আমাদের পোশাক রপ্তানি আয় কমেছে ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ, যেখানে ইইউর মোট আমদানি কমেছে ৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ।

বেসরকারি খাত ও তৃতীয় বাসার অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা

বাংলাদেশের মোট কর্মজীবীদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বেসরকারি খাতে যুক্ত বলে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যে দেখা যায়। তবে অধিকাংশ সংস্থাতেই বেতন বৃদ্ধির নির্দিষ্ট নীতি বা নিরাপত্তা নেই। ২০১৫ সালের শ্রম আইন সংশোধনে কর্মচারীদের শ্রমিকের সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করা হলেও পরবর্তী সময়ে এপ্রিলে পাস হওয়া সংশোধনীতে তা বাদ দেওয়া হয়। ফলে তাদের চাকরির স্থায়িত্ব বা সুযোগ-সুবিধা আইনিভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট উচ্চশিক্ষিত তরুণদের একটি বিশাল অংশ কর্মহীন। চাকরির বাজারে এই অনিশ্চয়তা তরুণ সমাজকে গভীরভাবে দুশ্চিন্তায় ফেলছে। ২০২৫ সালের সংশোধনীতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শ্রমিকের সংজ্ঞায় আনা হয়েছিল; এপ্রিলে পাস হওয়া সংশোধিত শ্রম আইনে সেই বিধান বাদ গেছে, ফলে অনেকে গ্র্যাচুইটি ও প্রভিডেন্ট ফান্ড হারানোর ঝুঁকিতে।

বেসরকারি ব্যবসার বর্তমান আর্থিক চিত্র

  • ঋণ প্রবৃদ্ধি: মার্চে বেসরকারি খাতের ঋণের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি প্রথমবারের মতো ৫ শতাংশের নিচে নেমে আসে এবং জুনে তা ৪.৪৭ শতাংশে গিয়ে ঠেকে।
  • উচ্চ সুদের হার: বিভিন্ন ব্যাংকে ৩০ জুন থেকে কার্যকর নীতিমালায় বড় শিল্পের মেয়াদি ঋণের সুদের হার অত্যধিক বৃদ্ধি পেয়েছে।
  • জ্বালানি সংকট: ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে শিল্প খাতে গ্যাসের দাম ১৫০ থেকে ১৭৮ শতাংশ বাড়ানো হলেও শিল্পকারখানাগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নেই।
  • উৎপাদন ব্যাহত: মুন্সিগঞ্জের হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলে সিটি গ্রুপের ৫টি ইউনিট গ্যাসের তীব্র সংকটের কারণে চালু হতে পারছে না, যেখানে প্রায় ১৪ হাজার কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারত।
  • মুনাফায় ধস: চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ মেয়াদে স্কয়ার টেক্সটাইলসের মুনাফা প্রায় ৭০ শতাংশ কমেছে এবং শাশা ডেনিমসের প্রবৃদ্ধিতে বড় ধস নেমেছে।

বেসরকারি কারখানার মালিক ও ব্যবসা পরিচালনাকারীরাও চতুর্মুখী চাপে জর্জরিত। ১২ জুন বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেছিলেন যে, সরকারি কর্মকর্তাদের আয় বাড়লে আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতি হ্রাস পাবে। অথচ নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের ঠিক তিন বছর আগে, ২০২৩ সালের ১ নভেম্বর মজুরি আন্দোলনের সময় বিজিএমইএর জরুরি সভায় শিল্প মালিকরা স্পষ্টভাবে বলেছিলেন—সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা ঘুষ নেওয়া বন্ধ করলে তারা শ্রমিকদের বেতন বাড়াতে সক্ষম হবেন। একদিকে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট, অন্যদিকে সড়ক ও প্রশাসনিক পর্যায়ে তোলা চাঁদা ব্যবসাকে দমবন্ধ পরিস্থিতিতে ফেলে দিয়েছে। রাষ্ট্র-নিশ্চিত পেনশন নেই, আর ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ৪০০-এর বেশি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে। সরকারি বেতন ঠিক হলো আজকের বাজারদরে, শ্রমিকেরটা ২০২৩ সালের দরে। অথচ বেশির ভাগ বেসরকারি অফিসে বেতন ঠিক করার কমিশন বা বোর্ড নেই, দাবি তোলার সংগঠনও কার্যত নেই; তাঁদের বেতন কতটা ক্ষয়ে গেল, তার নিয়মিত সরকারি হিসাবও নেই। ব্রিটিশ কাউন্সিলের ২০২৪ সালের জরিপে ৫৫ শতাংশ তরুণ পড়াশোনা বা কাজের জন্য বিদেশে যেতে আগ্রহী, আর বেকারত্বের প্রধান কারণ হিসেবে সবচেয়ে বেশি, ৩৭ শতাংশ, বলেছেন দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি। শ্রমিক অন্তত রাস্তায় দাঁড়াতে পারেন; তাঁরা সেটুকুও পারেন না, কারণ মুখ খুললে চাকরি যায়। পুলিশ সদর দপ্তরের তালিকায় সারা দেশে চাঁদাবাজ ৩,৮৪৯ জন; ঢাকা মহানগর পুলিশের তালিকায় শুধু রাজধানীতেই ১,২৮০ জন, তাঁদের ১৪৮ জন সশস্ত্র, আর আশ্রয়দাতা ৩১৪ জন।

করকাঠামো ও ঋণের অসম প্রতিযোগিতা

  • এনবিআরের রাজস্ব আদায়: গত অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মোট আদায়ের প্রায় ৬৫ শতাংশ এসেছে পরোক্ষ কর (ভ্যাট ও শুল্ক) থেকে, যা নিম্ন আয়ের শ্রমিকেরাও নিত্যপণ্য কেনার সময় প্রদান করেন।
  • করদাতার স্বল্প সংখ্যা: চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত জমা হওয়া ৪০ লাখ কর রিটার্নের মধ্যে ২২ লাখই ছিল করযোগ্য সীমার নিচে। ১৭ কোটি মানুষের দেশে মাত্র ১৮ লাখ মানুষ করযোগ্য আয় প্রদর্শন করেছেন।
  • ধীরগতির রাজস্ব: চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ১.২৩ শতাংশ, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা কম।
  • সরকারি ব্যাংক ঋণ: আগস্ট শেষে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণ এক বছরের ব্যবধানে ৩৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

অর্থনীতির এই বিশাল ধারের ভার শেষ পর্যন্ত বেসরকারি খাতের ওপরই গিয়ে পড়ছে। চলতি অর্থবছরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা গত বছরের অর্জনের চেয়ে ৪৫ শতাংশের বেশি নির্ধারণ করা হয়েছে। ঋণের বাজারে সরকারের মাত্রাতিরিক্ত উপস্থিতির কারণে বেসরকারি খাত ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় ঋণ পাচ্ছে না। ফলে ব্যাংকের ঋণের সুদের উচ্চ হার, সরকারি পে স্কেলের সাথে বেতন সামঞ্জস্য করার চাপ এবং সার্বিক অর্থনৈতিক মন্দা মিলে বেসরকারি খাতের ব্যবসায়ীদের টিকে থাকা দায় হয়ে পড়েছে। যদি এই খাতের ব্যবসা না বাঁচে, তবে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখা এবং সর্বস্তরের চাকুরিজীবী ও শ্রমিকের আয় নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে উঠবে। অথচ বেসরকারি সার্ভিস রুলস তৈরিতে সরকারের গড়া কমিটির প্রধানই বলেছেন, প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের সুবিধামতো ছাঁটাই করছে, অনেকে সার্ভিস বেনিফিট পাচ্ছেন না।

  • পে স্কেল বনাম দুর্নীতি: মকছেদ সাহেবের দেখা সেই সকালটি আসলে কার গল্প।
  • শ্রমিকের বেতন বোনাসের বেলায় কি পুরোনো বন্দোবস্তই চলবে।
  • সুবাইল বিন আলম, প্রকৌশলী-অর্থনীতিবিদ, টেকসই উন্নয়নবিষয়ক কলামিস্ট। ই–মেইল: [email protected] * মতামত লেখকের নিজস্ব।