ষাট পেরিয়ে বাষট্টির পথে পা রাখা শাহরুখ খান কেবল অভিনয়ের জাদুতে নন, বরং তার জীবনের কঠিন সংগ্রামের গল্প দিয়েও কোটি ভক্তের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন। দিল্লির এক সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে বলিউড জয় করার এই যাত্রা ছিল না খুব একটা সহজ। অত্যন্ত অল্প বয়সে বাবা-মাকে হারানোর শোক কাটিয়ে তিনি নিজেকে তৈরি করেছেন কঠোর পরিশ্রম ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে। একষট্টি পূর্ণ করে বাষট্টিতে পা দিতে যাচ্ছেন শাহরুখ খান। বয়সকে সংখ্যায় বন্দি করে অভিনয় গুণে এখনো কোটি কোটি ভক্তের হৃদয়ে দোলা দিয়ে যাছেন এই তারকা। কঠোর পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস, দৃঢ় সংকল্পের মাধ্যমে ভারতীয় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে অন্যতম সফল ক্যারিয়ার গড়েছেন। এর মধ্য দিয়ে শুধু চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম বড় তারকা হিসেবেই নন, প্রভাবশালী একজন ব্যবসায়ী হিসেবেও নিজের অবস্থান আরো সুদৃঢ় করেন।
শাহরুখের সাফল্যের এই সিঁড়ির শুরুর দিকের পারিশ্রমিক ছিল খুবই সামান্য। কয়েক বছর আগে মুম্বাই মিররের সাথে আলাপচারিতায় তিনি নিজের প্রথম উপার্জনের কথা তুলে ধরেছিলেন। শাহরুখ জানান, দিল্লির পঙ্কজ উদাসের একটি গজল অনুষ্ঠানে দর্শকদের আসন দেখানোর কাজ করে তিনি প্রথম ৫০ রুপি পারিশ্রমিক পেয়েছিলেন। সেই আয়ের টাকা দিয়ে তিনি ট্রেনে আগ্রা গিয়ে তাজমহল দেখেছিলেন, যা তার জীবনের এক অবিস্মরণীয় স্মৃতি হয়ে আছে। কিন্তু সেই কষ্টকে শক্তিতে পরিণত করেন তিনি। আমার মনে আছে, সেখানে আমরা তুলসীর বীজ মেশানো গোলাপি রঙের লাচ্চি খেয়েছিলাম।
মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা শাহরুখ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার অবস্থানের আমূল পরিবর্তন করেছেন। গত ৫ মার্চ প্রকাশিত হুরুন গ্লোবাল রিচ লিস্ট অনুযায়ী, শাহরুখ খানের মোট সম্পদের পরিমাণ ১.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ১০ হাজার ৮০০ কোটি রুপি। এই বিপুল অর্জনের মাধ্যমে তিনি বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী অভিনেতা হিসেবে নিজের নাম লিখিয়েছেন।
১৯৬৫ সালের ২ নভেম্বর দিল্লির এক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন শাহরুখ। তার দাদা ইফতিখার আহমেদ ছিলেন স্থানীয় পোর্টের প্রধান প্রকৌশলী, যার সুবাদে শাহরুখের শৈশবের একাংশ কেটেছে ম্যাঙ্গালুরুতে। বাবার নাম তাজ মোহাম্মদ খান ও মায়ের নাম লতিফ ফাতিমা। দিল্লির হংসরাজ কলেজে স্নাতক সম্পন্ন করার পর তিনি জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়াতে গণযোগাযোগ বিষয়ে স্নাতকোত্তর করতে ভর্তি হন, তবে অভিনয় জীবনের ব্যস্ততায় তা সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া তিনি দিল্লির ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামাতেও অভিনয় শেখার চেষ্টা করেছিলেন। তারপর জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়াতে গণযোগাযোগ বিষয়ে মাস্টার্সে ভর্তি হন।
১৯৯২ সালে ‘দিওয়ানা’ সিনেমার মাধ্যমে রুপালি পর্দায় অভিষেক ঘটে তার। নিজের সহজাত রোমান্টিক ধাঁচের অভিনয়ে তিনি দ্রুত নজর কাড়েন এবং ফিল্মফেয়ারে সেরা নবাগত অভিনেতার খেতাব পান। এরপর ‘ডর’, ‘বাজিগর’ ও ‘রাজু বান গেয়া জেন্টলম্যান’-এর মতো একের পর এক সফল সিনেমা তাকে খ্যাতির চূড়ায় নিয়ে যায়।
২০২৪ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতে অনুষ্ঠিত ‘গ্লোবাল ফ্রেইট সামিট’-এ নিজের ক্যারিয়ার ও জীবন দর্শন নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন তিনি। শাহরুখ স্পষ্টভাবে জানান, তার সাফল্যের পেছনে অসংখ্য মানুষের সহযোগিতা রয়েছে। তিনি বলেন, “আমি দরিদ্র, নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে এসেছি। যা কিছু পেয়েছি, তার সবটাই আমার একার অবদান নয়। আমার এই সাফল্য ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনের অনেকের অংশগ্রহণ ও সহযোগিতার ফসল।”
অভিনয় জীবনে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০২ সালে ভারত সরকার তাকে ‘পদ্মশ্রী’ পুরস্কারে ভূষিত করে। নিজের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি পনেরোবার ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পেয়েছেন, যার মধ্যে আটবারই সেরা অভিনেতা হিসেবে। এছাড়া বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাঁচবার সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেছেন। গত বছর তিনি ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও নিজের ঝুলিতে ভরেছেন।
নিজের সংগ্রামের কথা স্মরণ করে শাহরুখ আরও বলেন, “দিল্লিতে আসার সময় আমার পকেটে কোনো টাকা ছিল না। আজ আমি অন্যদের সেই সুযোগগুলো দিতে চাই, যা আমাকে কেউ কেউ দিয়েছিল। যদি সহযোগিতা করার মাধ্যমে কারো জীবন বদলে দেওয়া যায়, তবে সেটিই আমার জন্য সবচেয়ে বড় অর্জন।”
আকাশ নিউজ ডেস্ক 






















