ঢাকা ১০:৪৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
চলতি অক্টোবরের শেষ দিকে জাপান সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাৎ করলেন চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন উদ্বোধনের আগেই কক্সবাজার বিমানবন্দরের নতুন টার্মিনালে যাত্রীসেবা শুরু সাইবার সুরক্ষা আইন যেন নিপীড়নমূলক না হয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অক্টোবর-নভেম্বরে তিন দেশ সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘের সন্ত্রাস দমন তহবিলে কাতারের ১৪১ মিলিয়ন ডলার অনুদান নিউইয়র্কে চার দিনে ৩০টি কর্মসূচিতে প্রধানমন্ত্রীর ব্যস্ত সফর জাতিসংঘে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি রোধে চার প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর অক্টোবরেই চালু হচ্ছে কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দেশে ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় আরও ৮ মৃত্যু, হাসপাতালে ১৭৮২

৪ বছরে দেশে নতুন করে ৮০ লাখ মানুষ দরিদ্র

বাংলাদেশে গত চার বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে দারিদ্র্যের হার বাড়ছে, যা দেশের আর্থসামাজিক পরিস্থিতির জন্য একটি উদ্বেগজনক চিত্র। বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এই চার বছরে নতুন করে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছেন। মূলত উচ্চ মূল্যস্ফীতি, প্রকৃত আয় হ্রাস এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাওয়ায় দরিদ্র মানুষের সংখ্যা এই হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। দারিদ্র্র্য হার কমার পরিবর্তে বাড়তে থাকে, যা আর্থসামাজিক পরিস্থিতিতে চাপ সৃস্টি করছে।

প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২২ সালে দেশের দারিদ্র্য হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ, যা পরবর্তী বছর অর্থাৎ ২০২৩ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ দশমিক ৯ শতাংশে। ওই বছর নতুন করে ৮ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের কবলে পড়েন। এরপর ২০২৪ সালে দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধি পেয়ে সাড়ে ২০ শতাংশে পৌঁছায়, যেখানে নতুন করে ৩৭ লাখ মানুষ দরিদ্র হন। সর্বশেষ ২০২৫ সালে দারিদ্র্য হার বেড়ে ২১ শতাংশ ছাড়িয়ে যায় এবং ওই বছর ১৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের নিচে নামেন। চলতি বছর এই হার আরও বেড়ে সাড়ে ২২ শতাংশে পৌঁছেছে, যার ফলে আরও ২১ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমায় নতুন করে যুক্ত হয়েছেন। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি অর্থবছর শেষে দারিদ্র্য হার বেড়ে ২২ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে। ফলে দারিদ্র্যের এই বৃদ্ধি শুধু সাময়িক সংকট নয়, বরং প্রবৃদ্ধির গুণগত দুর্বলতা ও শ্রমবাজারের গভীর সমস্যার প্রকাশ।

দারিদ্র্যের এই বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ বর্তমানে দারিদ্র্যসীমার ঠিক ওপরে বসবাস করছেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি কিংবা আকস্মিক অর্থনৈতিক ধাক্কার কারণে যেকোনো সময় এই বিপুলসংখ্যক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন।

বিবিএসের জনশুমারি ২০২২ সালের হিসাব অনুযায়ী, তখন দেশের জনসংখ্যা ছিল ১৬ কোটি ৯৮ লাখ এবং পরিবারের সংখ্যা ছিল ৪ কোটি ১০ লাখ। বিশ্বব্যাংকের বর্তমান পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে এখন দরিদ্র মানুষের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৫ কোটি। মূলত খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের মতো মৌলিক চাহিদা পূরণের ব্যয় এবং ক্যালরি গ্রহণের সক্ষমতা বিবেচনা করে দারিদ্র্য পরিমাপ করা হয়। যেখানে একজন ব্যক্তির দৈনিক ২ হাজার ১২২ ক্যালরি খাবারের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় খাদ্যবহির্ভূত খরচ মেটানোর আয় নিশ্চিত না থাকলে তাকে দরিদ্র হিসেবে গণ্য করা হয়। একজন মানুষের দৈনিক গড়ে ২ হাজার ১২২ ক্যালরি খাদ্যগুণসম্পন্ন খাবার কিনতে এবং খাদ্যবহির্ভূত খরচ মেটাতে যত টাকা প্রয়োজন হয়, ওই টাকা আয় করতে না পারলেই ওই ব্যক্তিকে দরিদ্র হিসেবে ধরা হয়।

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, বাংলাদেশের দারিদ্র্যের এই ক্রমবর্ধমান চিত্রটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। খাদ্যপণ্যের উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং প্রকৃত মজুরির ক্ষয় নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে দিচ্ছে। যেহেতু অধিকাংশ কর্মসংস্থান অনানুষ্ঠানিক খাতে, তাই অসুস্থতা বা নতুন করে পণ্যের দাম বাড়লে একটিমাত্র ধাক্কাতেই অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে।

কর্মসংস্থানের সুযোগ নিয়ে বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, আগামী অর্থবছরে প্রায় ৬ লাখ ৩০ হাজার নিট কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে, যা দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য যথেষ্ট নয়। সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হানের মতে, সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা এখনো দারিদ্র্য পরবর্তী সহায়তা প্রদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকে সুরক্ষা দেওয়ার মতো শক্তিশালী বিমা বা আয়-ঝুঁকি মোকাবিলা ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। তাই কেবল জিডিপি প্রবৃদ্ধি নয়, প্রবৃদ্ধির মান, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রকৃত আয় বৃদ্ধিই এখন নীতিনির্ধারকদের প্রধান বিবেচ্য হওয়া উচিত।

দীর্ঘ দুই দশকের ধারাবাহিক সাফল্যের পর ২০২২ সালের পর থেকে বাংলাদেশের দারিদ্র্য বিমোচনের গতিপথ বদলে যেতে শুরু করেছে। ২০০১ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪৮ দশমিক ৯ শতাংশ, যা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে ২০২২ সালে তা ১৮ শতাংশে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোর অর্থনৈতিক সংকট সেই ধারা ব্যাহত করেছে এবং দারিদ্র্য হার ক্রমেই ওপরের দিকে বাড়ছে। পরের দুই দশকে দারিদ্র্য বিমোচনে বেশ সফল ছিল বাংলাদেশ।

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

৪ বছরে দেশে নতুন করে ৮০ লাখ মানুষ দরিদ্র

আপডেট সময় ০৮:৫২:৩৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬

বাংলাদেশে গত চার বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে দারিদ্র্যের হার বাড়ছে, যা দেশের আর্থসামাজিক পরিস্থিতির জন্য একটি উদ্বেগজনক চিত্র। বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এই চার বছরে নতুন করে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছেন। মূলত উচ্চ মূল্যস্ফীতি, প্রকৃত আয় হ্রাস এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাওয়ায় দরিদ্র মানুষের সংখ্যা এই হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। দারিদ্র্র্য হার কমার পরিবর্তে বাড়তে থাকে, যা আর্থসামাজিক পরিস্থিতিতে চাপ সৃস্টি করছে।

প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২২ সালে দেশের দারিদ্র্য হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ, যা পরবর্তী বছর অর্থাৎ ২০২৩ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ দশমিক ৯ শতাংশে। ওই বছর নতুন করে ৮ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের কবলে পড়েন। এরপর ২০২৪ সালে দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধি পেয়ে সাড়ে ২০ শতাংশে পৌঁছায়, যেখানে নতুন করে ৩৭ লাখ মানুষ দরিদ্র হন। সর্বশেষ ২০২৫ সালে দারিদ্র্য হার বেড়ে ২১ শতাংশ ছাড়িয়ে যায় এবং ওই বছর ১৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের নিচে নামেন। চলতি বছর এই হার আরও বেড়ে সাড়ে ২২ শতাংশে পৌঁছেছে, যার ফলে আরও ২১ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমায় নতুন করে যুক্ত হয়েছেন। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি অর্থবছর শেষে দারিদ্র্য হার বেড়ে ২২ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে। ফলে দারিদ্র্যের এই বৃদ্ধি শুধু সাময়িক সংকট নয়, বরং প্রবৃদ্ধির গুণগত দুর্বলতা ও শ্রমবাজারের গভীর সমস্যার প্রকাশ।

দারিদ্র্যের এই বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ বর্তমানে দারিদ্র্যসীমার ঠিক ওপরে বসবাস করছেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি কিংবা আকস্মিক অর্থনৈতিক ধাক্কার কারণে যেকোনো সময় এই বিপুলসংখ্যক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন।

বিবিএসের জনশুমারি ২০২২ সালের হিসাব অনুযায়ী, তখন দেশের জনসংখ্যা ছিল ১৬ কোটি ৯৮ লাখ এবং পরিবারের সংখ্যা ছিল ৪ কোটি ১০ লাখ। বিশ্বব্যাংকের বর্তমান পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে এখন দরিদ্র মানুষের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৫ কোটি। মূলত খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের মতো মৌলিক চাহিদা পূরণের ব্যয় এবং ক্যালরি গ্রহণের সক্ষমতা বিবেচনা করে দারিদ্র্য পরিমাপ করা হয়। যেখানে একজন ব্যক্তির দৈনিক ২ হাজার ১২২ ক্যালরি খাবারের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় খাদ্যবহির্ভূত খরচ মেটানোর আয় নিশ্চিত না থাকলে তাকে দরিদ্র হিসেবে গণ্য করা হয়। একজন মানুষের দৈনিক গড়ে ২ হাজার ১২২ ক্যালরি খাদ্যগুণসম্পন্ন খাবার কিনতে এবং খাদ্যবহির্ভূত খরচ মেটাতে যত টাকা প্রয়োজন হয়, ওই টাকা আয় করতে না পারলেই ওই ব্যক্তিকে দরিদ্র হিসেবে ধরা হয়।

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, বাংলাদেশের দারিদ্র্যের এই ক্রমবর্ধমান চিত্রটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। খাদ্যপণ্যের উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং প্রকৃত মজুরির ক্ষয় নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে দিচ্ছে। যেহেতু অধিকাংশ কর্মসংস্থান অনানুষ্ঠানিক খাতে, তাই অসুস্থতা বা নতুন করে পণ্যের দাম বাড়লে একটিমাত্র ধাক্কাতেই অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে।

কর্মসংস্থানের সুযোগ নিয়ে বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, আগামী অর্থবছরে প্রায় ৬ লাখ ৩০ হাজার নিট কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে, যা দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য যথেষ্ট নয়। সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হানের মতে, সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা এখনো দারিদ্র্য পরবর্তী সহায়তা প্রদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকে সুরক্ষা দেওয়ার মতো শক্তিশালী বিমা বা আয়-ঝুঁকি মোকাবিলা ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। তাই কেবল জিডিপি প্রবৃদ্ধি নয়, প্রবৃদ্ধির মান, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রকৃত আয় বৃদ্ধিই এখন নীতিনির্ধারকদের প্রধান বিবেচ্য হওয়া উচিত।

দীর্ঘ দুই দশকের ধারাবাহিক সাফল্যের পর ২০২২ সালের পর থেকে বাংলাদেশের দারিদ্র্য বিমোচনের গতিপথ বদলে যেতে শুরু করেছে। ২০০১ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪৮ দশমিক ৯ শতাংশ, যা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে ২০২২ সালে তা ১৮ শতাংশে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোর অর্থনৈতিক সংকট সেই ধারা ব্যাহত করেছে এবং দারিদ্র্য হার ক্রমেই ওপরের দিকে বাড়ছে। পরের দুই দশকে দারিদ্র্য বিমোচনে বেশ সফল ছিল বাংলাদেশ।