ঢাকা ১২:১৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৮ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :

ক্যান্সার চিকিৎসা খাতে বিনিয়োগ, খরচ নয় বরং মানবসম্পদে বিনিয়োগ

আকাশ জাতীয় ডেস্ক:

একটি পরিবারে যখন ‘ক্যান্সার’ শব্দটি প্রবেশ করে, তখন শুধু একজন মানুষ অসুস্থ হন না—অসুস্থ হয়ে পড়ে পুরো পরিবার। চাকরি, পড়াশোনা, সংসারের খরচ, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা—সবকিছু একসঙ্গে বিপর্যস্ত হয়ে যায়।

অনেক ক্ষেত্রে রোগ নির্ণয়ের পর চিকিৎসা শুরু করার আগেই পরিবারটি আর্থিকভাবে ভেঙে পড়ে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ সরকার দীর্ঘদিন ধরে ক্যান্সারসহ কিছু জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত দরিদ্র রোগীদের জন্য সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সমাজসেবা অধিদফতরের মাধ্যমে এককালীন ৫০ হাজার টাকা সহায়তা দিয়ে আসছে।

এই উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে প্রশ্ন হলো—আজকের বাস্তবতা কি আগের মতো আছে? ক্যান্সার চিকিৎসার ব্যয় কি আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে? বাস্তবতা হলো, চিকিৎসা ব্যয় বহুগুণ বেড়েছে, রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে চিকিৎসা পেতে বিলম্ব।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে বাংলাদেশে প্রায় ১ লাখ ৬৭ হাজার নতুন ক্যান্সার রোগী শনাক্ত হয়। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে কয়েকশ মানুষ নতুন করে এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। তাদের একটি বড় অংশের চিকিৎসায় রেডিওথেরাপি অপরিহার্য। স্তন, জরায়ুমুখ, হেড-নেক, প্রোস্টেট, লিম্ফোমাসহ বহু ক্যান্সারে রেডিওথেরাপি কোনো বিকল্প নয়, বরং চিকিৎসার মূল স্তম্ভ।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, সরকারি খাতে রেডিওথেরাপির সক্ষমতা সীমিত এবং রোগীর চাপ বিপুল। ফলে অনেক সরকারি কেন্দ্রে রেডিয়েশনের জন্য ৬ থেকে ১২ মাস, কোথাও তারও বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়। ক্যান্সারে ছয় মাস দেরি মানে অনেক ক্ষেত্রেই রোগের স্টেজ পরিবর্তন, আরোগ্যের সম্ভাবনা কমে যাওয়া এবং চিকিৎসা আরও জটিল হয়ে পড়া।

এই প্রেক্ষাপটে এককালীন ৫০ হাজার টাকা দরিদ্র রোগীর জন্য সহায়ক হলেও দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল চিকিৎসা সম্পন্ন করার জন্য তা মোটেও যথেষ্ট নয়। ফলে অনেক পরিবার ঋণের বোঝায় পড়ে, চিকিৎসা অসম্পূর্ণ থেকে যায় এবং শেষ পর্যন্ত রোগ ফিরে এসে খরচ আরও বাড়িয়ে দেয়। তাই এই সহায়তার পরিমাণ ৫০ হাজার থেকে বাড়িয়ে অন্তত ৭৫ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা করা জরুরি। তবে শুধু অঙ্ক বাড়ালেই হবে না, অর্থ ব্যবহারের পদ্ধতিতেও সংস্কার প্রয়োজন।

বর্তমানে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সহায়তার টাকা সরাসরি রোগীর হাতে দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, সেই অর্থ সবসময় চিকিৎসায় ব্যয় করা সম্ভব হয় না। সংসার চালানো, যাতায়াত খরচ, ঋণ পরিশোধ, প্রতারণা কিংবা মধ্যস্বত্বভোগীর কারণে টাকা বিভ্রান্ত পথে চলে যায়। আবার অনেক ক্ষেত্রে টাকা হাতে থাকলেও সরকারি হাসপাতালে রেডিওথেরাপির সিরিয়াল না পেয়ে চিকিৎসা বিলম্বিত হয়।

এই পরিস্থিতিতে সময় এসেছে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থার দিকে যাওয়ার—যা Public–Private Partnership বা PPP মডেল নামে পরিচিত। এই মডেলে সরকার নগদ অর্থ না দিয়ে রোগীকে চিকিৎসা ভাউচার বা অনুমোদন দেবে। সরকার অনুমোদিত বেসরকারি ক্যান্সার সেন্টারগুলো নির্ধারিত সাবসিডাইজড প্যাকেজে রেডিওথেরাপি প্রদান করবে। চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল ডিজিটালভাবে সরকারের কাছে ক্লেইম দাখিল করবে এবং যাচাই শেষে সরকার নির্দিষ্ট সময় অন্তর অর্থ পরিশোধ করবে। প্রতিটি ক্লেইমের সঙ্গে রোগ নির্ণয়, স্টেজিং, বোর্ড সিদ্ধান্ত ও চিকিৎসার বিস্তারিত তথ্য সংযুক্ত থাকবে।

এর সুফল স্পষ্ট। রোগী দ্রুত চিকিৎসা শুরু করতে পারবেন, সরকারি হাসপাতালের দীর্ঘ অপেক্ষার চাপ কমবে, অর্থ অপব্যবহারের সুযোগ হ্রাস পাবে এবং একই বাজেটে আরও কার্যকর ফল পাওয়া যাবে।

তবে সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নির্ধারণও জরুরি। যেসব ক্যান্সারে সময়মতো রেডিওথেরাপি দিলে আরোগ্যের সম্ভাবনা বেশি, সেসব রোগীকে বিশেষভাবে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। এটি কঠিন সিদ্ধান্ত হলেও স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়নে এই বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

সময়মতো চিকিৎসা মানে একজন মানুষ আবার কর্মক্ষম হয়ে ওঠার সুযোগ, একটি পরিবার দারিদ্র্য থেকে রক্ষা পাওয়া এবং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ব্যয় হ্রাস। এই দৃষ্টিকোণ থেকে ক্যান্সার চিকিৎসায় রাষ্ট্রের ব্যয় আসলে খরচ নয়, এটি মানবসম্পদে বিনিয়োগ।

তাই সময়োপযোগী সংস্কার হিসেবে দরিদ্র ক্যান্সার রোগীদের সহায়তা ৭৫ হাজার থেকে ১ লাখ টাকায় উন্নীত করে নগদ নয়, চিকিৎসা সেবার বিপরীতে অর্থ প্রদান নিশ্চিত করাই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান। কারণ ক্যান্সারে দেরি মানেই ক্ষতি, আর সময়মতো বিনিয়োগ মানেই পরিবার ও দেশের শক্ত ভিত গড়ে তোলা।

ডা. আরমান রেজা চৌধুরী

ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ, এভারকেয়ার হাসপাতাল, ঢাকা

ই-মেইল: rezadrarman@gmail.com

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

ক্যান্সার চিকিৎসা খাতে বিনিয়োগ, খরচ নয় বরং মানবসম্পদে বিনিয়োগ

আপডেট সময় ০৯:৫৩:৪৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

আকাশ জাতীয় ডেস্ক:

একটি পরিবারে যখন ‘ক্যান্সার’ শব্দটি প্রবেশ করে, তখন শুধু একজন মানুষ অসুস্থ হন না—অসুস্থ হয়ে পড়ে পুরো পরিবার। চাকরি, পড়াশোনা, সংসারের খরচ, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা—সবকিছু একসঙ্গে বিপর্যস্ত হয়ে যায়।

অনেক ক্ষেত্রে রোগ নির্ণয়ের পর চিকিৎসা শুরু করার আগেই পরিবারটি আর্থিকভাবে ভেঙে পড়ে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ সরকার দীর্ঘদিন ধরে ক্যান্সারসহ কিছু জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত দরিদ্র রোগীদের জন্য সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সমাজসেবা অধিদফতরের মাধ্যমে এককালীন ৫০ হাজার টাকা সহায়তা দিয়ে আসছে।

এই উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে প্রশ্ন হলো—আজকের বাস্তবতা কি আগের মতো আছে? ক্যান্সার চিকিৎসার ব্যয় কি আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে? বাস্তবতা হলো, চিকিৎসা ব্যয় বহুগুণ বেড়েছে, রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে চিকিৎসা পেতে বিলম্ব।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে বাংলাদেশে প্রায় ১ লাখ ৬৭ হাজার নতুন ক্যান্সার রোগী শনাক্ত হয়। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে কয়েকশ মানুষ নতুন করে এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। তাদের একটি বড় অংশের চিকিৎসায় রেডিওথেরাপি অপরিহার্য। স্তন, জরায়ুমুখ, হেড-নেক, প্রোস্টেট, লিম্ফোমাসহ বহু ক্যান্সারে রেডিওথেরাপি কোনো বিকল্প নয়, বরং চিকিৎসার মূল স্তম্ভ।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, সরকারি খাতে রেডিওথেরাপির সক্ষমতা সীমিত এবং রোগীর চাপ বিপুল। ফলে অনেক সরকারি কেন্দ্রে রেডিয়েশনের জন্য ৬ থেকে ১২ মাস, কোথাও তারও বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়। ক্যান্সারে ছয় মাস দেরি মানে অনেক ক্ষেত্রেই রোগের স্টেজ পরিবর্তন, আরোগ্যের সম্ভাবনা কমে যাওয়া এবং চিকিৎসা আরও জটিল হয়ে পড়া।

এই প্রেক্ষাপটে এককালীন ৫০ হাজার টাকা দরিদ্র রোগীর জন্য সহায়ক হলেও দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল চিকিৎসা সম্পন্ন করার জন্য তা মোটেও যথেষ্ট নয়। ফলে অনেক পরিবার ঋণের বোঝায় পড়ে, চিকিৎসা অসম্পূর্ণ থেকে যায় এবং শেষ পর্যন্ত রোগ ফিরে এসে খরচ আরও বাড়িয়ে দেয়। তাই এই সহায়তার পরিমাণ ৫০ হাজার থেকে বাড়িয়ে অন্তত ৭৫ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা করা জরুরি। তবে শুধু অঙ্ক বাড়ালেই হবে না, অর্থ ব্যবহারের পদ্ধতিতেও সংস্কার প্রয়োজন।

বর্তমানে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সহায়তার টাকা সরাসরি রোগীর হাতে দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, সেই অর্থ সবসময় চিকিৎসায় ব্যয় করা সম্ভব হয় না। সংসার চালানো, যাতায়াত খরচ, ঋণ পরিশোধ, প্রতারণা কিংবা মধ্যস্বত্বভোগীর কারণে টাকা বিভ্রান্ত পথে চলে যায়। আবার অনেক ক্ষেত্রে টাকা হাতে থাকলেও সরকারি হাসপাতালে রেডিওথেরাপির সিরিয়াল না পেয়ে চিকিৎসা বিলম্বিত হয়।

এই পরিস্থিতিতে সময় এসেছে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থার দিকে যাওয়ার—যা Public–Private Partnership বা PPP মডেল নামে পরিচিত। এই মডেলে সরকার নগদ অর্থ না দিয়ে রোগীকে চিকিৎসা ভাউচার বা অনুমোদন দেবে। সরকার অনুমোদিত বেসরকারি ক্যান্সার সেন্টারগুলো নির্ধারিত সাবসিডাইজড প্যাকেজে রেডিওথেরাপি প্রদান করবে। চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল ডিজিটালভাবে সরকারের কাছে ক্লেইম দাখিল করবে এবং যাচাই শেষে সরকার নির্দিষ্ট সময় অন্তর অর্থ পরিশোধ করবে। প্রতিটি ক্লেইমের সঙ্গে রোগ নির্ণয়, স্টেজিং, বোর্ড সিদ্ধান্ত ও চিকিৎসার বিস্তারিত তথ্য সংযুক্ত থাকবে।

এর সুফল স্পষ্ট। রোগী দ্রুত চিকিৎসা শুরু করতে পারবেন, সরকারি হাসপাতালের দীর্ঘ অপেক্ষার চাপ কমবে, অর্থ অপব্যবহারের সুযোগ হ্রাস পাবে এবং একই বাজেটে আরও কার্যকর ফল পাওয়া যাবে।

তবে সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নির্ধারণও জরুরি। যেসব ক্যান্সারে সময়মতো রেডিওথেরাপি দিলে আরোগ্যের সম্ভাবনা বেশি, সেসব রোগীকে বিশেষভাবে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। এটি কঠিন সিদ্ধান্ত হলেও স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়নে এই বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

সময়মতো চিকিৎসা মানে একজন মানুষ আবার কর্মক্ষম হয়ে ওঠার সুযোগ, একটি পরিবার দারিদ্র্য থেকে রক্ষা পাওয়া এবং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ব্যয় হ্রাস। এই দৃষ্টিকোণ থেকে ক্যান্সার চিকিৎসায় রাষ্ট্রের ব্যয় আসলে খরচ নয়, এটি মানবসম্পদে বিনিয়োগ।

তাই সময়োপযোগী সংস্কার হিসেবে দরিদ্র ক্যান্সার রোগীদের সহায়তা ৭৫ হাজার থেকে ১ লাখ টাকায় উন্নীত করে নগদ নয়, চিকিৎসা সেবার বিপরীতে অর্থ প্রদান নিশ্চিত করাই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান। কারণ ক্যান্সারে দেরি মানেই ক্ষতি, আর সময়মতো বিনিয়োগ মানেই পরিবার ও দেশের শক্ত ভিত গড়ে তোলা।

ডা. আরমান রেজা চৌধুরী

ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ, এভারকেয়ার হাসপাতাল, ঢাকা

ই-মেইল: rezadrarman@gmail.com