অাকাশ জাতীয় ডেস্ক:
রাজধানীতে সবচেয়ে বেশি বায়ুদূষণের মৌসুম হিসেবে চিহ্নিত করা হয় শুষ্ক মৌসুমকে।
সেই শুষ্ক মৌসুম এখনও পুরোপুরি শুরু হয়নি। তার আগেই রাজধানীতে প্রকট আকার ধারণ করেছে ধূলিদূষণ।
অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে ধূলিজনিত রোগব্যাধির প্রকোপ। বর্তমানে রাজাধানীর বিভিন্ন অংশে উন্নয়নের স্বার্থে ভবন ভাঙা কিংবা নির্মাণ, রাস্তা মেরামত, ফ্লাইওভার নির্মাণ ও মেট্রোরেলের কাজ চলমান রয়েছে।
এসব উন্নয়নমূলক নির্মাণকাজে পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি অনুসরণ না করায় তীব্র ধূলিদূষণে নাকাল রাজধানীবাসী। অন্যদিকে সড়কে মালামাল ও ময়লার স্তূপ আর যানবাহনের ছোটাছুটিতে বাতাসে ধূলিকণার আধিক্য হুমকির মুখে ফেলেছে জনস্বাস্থ্যকে।
রাস্তার পাশে দোকানের খাবার ধূলিতে বিষাক্ত হচ্ছে প্রতি মুহূর্তে। রোগজীবাণু ভরা ধূলি শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুসে প্রবেশ করে সর্দি, কাশিসহ নানা জটিল রোগের সৃষ্টি করছে। পরিবেশবীদদের মতে, ঢাকা মহানগরীর প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ ভয়াবহ ধূলিদূষণের শিকার।
ইন্টারন্যাশনাল গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিজ প্রজেক্টের এক প্রতিবেদনে বিশ্বে মানুষের মৃত্যুর ক্ষেত্রে বায়ুদূষণকে চার নম্বর ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে দেখানো হয়েছে। বলা হয়েছে, অপুষ্টি, মদ্যপান ও মাদকদ্রব্য গ্রহণ এমনকি অনিরাপদ যৌন সম্পর্কের চেয়েও বায়ুদূষণে মৃত্যুর হার বেশি।
প্রতি বছর বিশ্বে ৫৫ লাখের বেশি মানুষ মারা যায় বায়ুদূষণের কারণে। ২০১৩ সালে শুধু চীনে ১৬ লাখ এবং ভারতে ১৩ লাখ মানুষ মারা গেছে বাষুদূষণের কারণে।
গত বছর গ্লোবাল এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সের প্রতিবেদনে বায়ুদূষণের শহর হিসেবে এশিয়ায় ঢাকার অবস্থান ছিল দ্বিতীয়। একই বছর সিএনএন ট্রাভেল কর্তৃক প্রকাশিত বেশি মানসিক চাপ সৃষ্টিকারী ১০ শহরের তালিকায় ঢাকার অবস্থান সপ্তম।
শহর, দূষণ, অর্থ ও মানুষ এ চার প্রভাবকে বিবেচনায় নিয়ে ওই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছিল। অন্যদিকে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি নদী দূষণের শহরও ঢাকা।
দখলে দূষণে আর অনিয়মে কুলষিত এক নগরীর নাম এখন ঢাকা। যেখানকার জনগোষ্ঠী বসবাস করছে এক মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশের মধ্যে। বাসযোগ্য শহরের তালিকায় বিশ্বের ১৪০ শহরের মধ্যে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার অবস্থান ১৩৯তম।
সম্প্রতি ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের এ তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার চেয়ে ‘বাজে অবস্থা’ কেবল যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার শহর দামেস্কের।
২০১৬ সালে বিশ্বের বায়ুমণ্ডলে যে পরিমাণে কার্বন ডাই-অক্সাইড জমা হয়েছে, তা বিগত ৮ লাখ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ওই বছর যে পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়েছে, তা এর আগের ১০ বছরের গড়ের চেয়ে ৫০ শতাংশ বেশি।
বিশ্বের আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) এসব তথ্যের উল্লেখ করে বলছে, মানবসৃষ্ট দূষণ ও এল নিনোর মতো প্রাকৃতিক কারণে বিশ্বজুড়ে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ বেড়ে গেছে।
বিশ্বের ৫১টি দেশের গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে গত বছরের ৩০ অক্টোবর এ প্রতিবেদন দেয় ডব্লিউএমও। প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে সংস্থাটি জানায়, ২০১৬ সালে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস মেশানোর গড় হার ছিল ৪০৩ দশমিক ৩ পিপিএম (পার্টস পার মিলিয়ন)।
বায়ুদূষণের ফলে বিরূপ প্রভাব পড়ছে জলবায়ু ও আবহাওয়ার ওপর। ৮ অক্টোবর জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক জাতিসংঘের আন্তঃসরকার প্যানেল (আইপিসিসি) এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, কার্বন নিঃসরণের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ১২ বছরের মধ্যে পৃথিবীতে খরা, বন্যা আর ভয়াবহ তাপপ্রবাহের মতো মহাবিপর্যয় নেমে আসতে পারে।
২০১৭ সালে আন্তর্জাতিক সংস্থা জার্মান ওয়াচের দেয়া এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিগত ৩০ বছরে বাংলাদেশ ১৮৫ বার চরম বৈরী আবহাওয়ার কবলে পড়েছে, যা বিশ্বে তৃতীয় সর্বোচ্চ।
১৯৯৬ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বিশ্বে বিরূপ আবহাওয়ার জন্য সবচেয়ে বেশি আর্থিক ক্ষতির মুখে থাকা দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। আর বৈরী আবহাওয়ার কারণে মানুষের মৃত্যু হওয়ার দিক থেকে তৃতীয় দেশ হচ্ছে বাংলাদেশ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের চেয়ারপারসন অধ্যাপক ড. হাফিজা খাতুন যুগান্তরকে বলেন, প্রায় ২ কোটি মানুষের ঢাকা শহর ধুলা এবং ধোঁয়ায় বায়ুদূষণের ষোলকলা পূর্ণ করেছে।
শহরের ২ কোটি মানুষের বর্জ্য পড়ে থাকে সড়কের পাশে। সেখান থেকে নানা ধরনের দুর্গন্ধযুক্ত গ্যাস বেরিয়ে বাতাসে মিশে যাচ্ছে। গা ঘেঁষে তৈরি হচ্ছে বিশাল বিশাল ইটপাথরের ভবন। বাতাস প্রবাহের কোনো সুযোগ নেই এখানে।
ফলে একটু পরপর আমরা ঘামি। ব্যবহার করি এয়ার কন্ডিশনার, ফ্রিজ, ডিপ ফ্রিজ। এ ফ্রিজ থেকে নির্গত হয় ক্লোরো ফ্লোরো কার্বন, যা গ্রিন হাউস অ্যাফেক্ট বা পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়ার জন্য দায়ী।
তিনি বলেন, বায়ুদূষণ একেবারে রোধ করা সম্ভব নয়। তবে দূষণের হার বা মাত্রা কমানো সম্ভব। এজন্য কম কার্বন নিঃসরণ করে এমন উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে।
২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ নিজস্ব সম্পদ ব্যয় করে ৫ শতাংশ কার্বন নিঃসরণ কমানোর যে অঙ্গীকার করেছে আমরা তার বাস্তবায়ন চাই। আর ধূলিদূষণ রোধে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে দেশের অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্য চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 

























