অাকাশ জাতীয় ডেস্ক:
বেগম খালেদা জিয়াকে হাইকোর্ট যদি ভুল করে জামিন দেয়, তাহলেও সেটি বহাল রাখার দাবি জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের একজন আইনজীবী।
তবে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর আরও চারজন আইনজীবী বলেছেন, হাইকোর্ট যে জামিন দিয়েছে, সেটাই যৌক্তিক। ওই আদেশের বিরুদ্ধে দুদক এবং রাষ্ট্রপক্ষের আপিল করাই ঠিক হয়নি।
বুধবার খালেদা জিয়াকে হাইকোর্টে দেয়া জামিনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ এবং দুদকের আপিলের শুনানির দ্বিতীয় দিন বিএনপি নেত্রীর আইনজীবীরা আদালতে এসব কথা বলেন।
গত ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়া পাঁচ বছরের দণ্ড নিয়ে কারাগারে যাওয়ার পর ১২ মার্চ তাকে চার মাসের জামিন দেয় হাইকোর্ট। আর এর বিরুদ্ধে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ এবং দুদক।
এই আবেদনের ওপর শুনানি শুরু হয় মঙ্গলবার। প্রথম দিন প্রধানত দুদকের আইনজীবী খুরশিদ আলম খান এবং রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে বক্তব্য দেন। তার তাদের যুক্তি খণ্ডন করেন খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা।
দ্বিতীয় দিন প্রধানত যুক্তি দেন খালেদা জিয়ার পাঁচ আইনজীবী। আর তা খণ্ডান দুদকের আইনজীবী এবং রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল।
প্রথম দিনের মতো দ্বিতীয় দিনের শুনানিতেও তুমুল হট্টগোল হয় আদালতে। বরং প্রথম দিনের তুলনায় দ্বিতীয় দিন হট্টগোল ছিল বেশি।
এ জে মোহাম্মদ আলীর যুক্তি
সকাল ৯টা ২০ মিনিটে দ্বিতীয় দিনের শুনানির শুরুতে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য মশিউর রহমান ও বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের জামিনের উদাহরণ টেনে এ জে মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘শতকরা ৯৯.৯৯ ভাগ মামলায় আমাদের বিচার ব্যবস্থায় হাইকোর্ট জামিন দিলে আপিল বিভাগ হস্তক্ষেপ করেনি।’
এ সময় বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী বলেন, ‘২৫ বছর পলাতক ছিল। পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। পরের দিন হাইকোর্ট তাকে জামিন দিয়েছে। সেই নজিরও তো রয়েছে। এ মামলাটি এখন চেম্বারে এসেছে।’
মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘ব্যতিক্রম সিদ্ধান্ত আইন হতে পারে না।’
খালেদা জিয়াকে সাজা দেয়া রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেও অভিযোগ করেন তার আই্নজীবী।
খন্দকার মাহবুব যা বললেন
এই আইনজীবী বলেন, ‘আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলছি, তারা একটি মামলাও দেখাতে পারবে না যে, হাইকোর্ট জামিন দেওয়ার পর আপিল বিভাগ হস্তক্ষেপ করেছে।’
সারা দেশে ৩৩ লাখ, হাইকোর্টে চার লাখ ৭৬ হাজারের বেশি আর আপিল বিভাগে ১৬ হাজার মামলা থাকলেও খালেদা জিয়ার মামলা দ্রুততার সঙ্গে শুনানির চেষ্টা কেন- জানতে চান মাহবুব হোসেন।
জয়নুল-প্রধান বিচারপতি কথোপকথন
এরপর জয়নুল আবেদিন প্রশ্ন রাখেন অ্যাটর্নি জেনারেল কোন কর্তৃত্ব বলে এই মামলায় বক্তব্য দিচ্ছেন।
প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘তাহলে আপনারা কেন রাষ্ট্রকে পক্ষ করলেন?’
জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘এটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। করতে হয় তাই করেছি।’
প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘খালেদা জিয়া তো রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে রয়েছেন।’
জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘বিশেষ আইনের মামলা বিশেষভাবেই দেখতে হবে। সরকার ভিন্ন একটা উদ্দেশ্য নিয়ে এই আপিল করেছে।’
প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘ভুল হোক আর শুদ্ধ হোক, আমরা সরকারকে আপিল করার অনুমতি দিয়েছি।’
জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘তাহলে ভুল হোক আর শুদ্ধ হোক হাইকোর্ট তাকে (খালেদা জিয়া) জামিন দিয়েছে, তা বহাল রাখা হোক। আপনারা তাতে হস্তক্ষেপ করবেন না।’
‘দুদক এবং সরকার যখন এক হয়ে আপিল করেছে, তখন আমাদের মাঝে আতঙ্ক এসেছে ন্যায়বিচার নিয়ে।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মামলা হাইকোর্ট বাতিল করার পর দুদক ও রাষ্ট্রপক্ষের আপিল না করার বিষয়টিও তুলে ধরেন জয়নুল। বলেন, ‘এক দেশে দুই রকম আইন হয় না। দুই রকম অ্যাকশনও হয় না। সরকার দলের ক্ষেত্রে একরকম আর বিরোধীদের ক্ষেত্রে আরেক রকম আচরণ করা হচ্ছে।’
খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা তুলে ধরে জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘তাকে জামিন দেয়া হলে আজ তার শারীরিক অবস্থার এতো অবনতি হতো না।’
‘সরকার নিজেই স্বীকার করেছে খালেদা জিয়া অসুস্থ। এ কারণে তাকে পাঁচবার নিম্ন আদালতে হাজির করেনি। কারাগার থেকে প্রতিবেদন দিয়ে বলা হয়েছে, তাকে আদালতে হাজির করার উপযুক্ত নয়।’
মোহাম্মদ নাসিম ও মহিউদ্দিন খান আলমগীরের মামলার উদাহরণ টেনে জয়নুল বলেন, ‘তাদেরকে স্বাস্থ্যগত দিক বিবেচনা করে জামিন দিয়েছে। ওই জামিনের বিরুদ্ধে আপিলও করেনি দুদক ও রাষ্ট্র। এক্ষেত্রে খালেদা জিয়ার বয়স ও অসুস্থতার বিষয় বিবেচনা করে জামিন বহাল রাখা হোক।’
অ্যাটর্নি জেনারেলের আগের দিনের যুক্তি ছিল এই মামলার পেপারবুক তৈরি হয়ে গেছে। তাই শুনানি শুরু হোক। আর এতে খালেদা জিয়া খালাস পেলে তাদের আপত্তি থাকবে না।
বুধবারের শুনানির এক পর্যায়ে প্রধান বিচারপদি বলেন, ‘হাইকোর্টে পেপারবুক তো তৈরি হয়েছে।’
জয়নুল আবেদিন বলেন, ‘তাহলে জামিন বহাল থাক। আপিলের শুনানি করব। জামিন আটকে রেখে এভাবে ভোগান্তি করা হবে তা ঠিক নয়।’
মওদুদের যুক্তি
মওদুদ আহমেদ বলেন, ‘খালেদা জিয়া বিএনপির চেয়ারপারস না হলে মামলাটা এ পর্যায়ে আসত না। বিরোধী দলকে বাদ দেওয়ার জন্যই এই মামলা।’
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের টাকার বিষয়ে এই আইনজীবী বলেন, ‘এই টাকা সরকারি টাকা না। এ টাকা বেসরকারি ট্রাস্টের টাকা। এছাড়াও এর সঙ্গে খালেদা জিয়া নিজে যুক্ত নন।’
‘সাজা দিতে হবে, সেজন্যই সাজা দিয়েছে। দেশে কোটি কোটি টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে, অথচ এটা তো দুই কোটি টাকার ব্যাপার। অথচ সরকারের কাছে এটা বড় হয়ে যাচ্ছে।’
খালেদা জিয়ার কারাগারে কিছু হয়ে গেলে এর দায় আদালতের ওপর পড়বে বলেও সতর্ক করেন মওদুদ। বলেন, ‘আমাদের একজন এম ইউ আহমেদ। তাকে আপনারা জামিন দেননি। এরপর সে হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছে। আজ যদি খালেদা জিয়াকে জামিন না দেন, উনার যদি কিছু হয়, তার দায় সরকার আপনাদের ওপর চাপিয়ে দিতে চাচ্ছে। সরকার তো বলবেই সে সুস্থ।’
দুদকের আইনজীবীর খণ্ডন
খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের বক্তব্য শেষ হলে দুদকের আইনজীবী কথা শুরু করেন। তিনি জানান, বিএনপি নেতা মশিউর রহমানের মামলায় হাইকোর্ট আলাদাভাবে কোনো যুক্তি না দেখানোয় আপিল বিভাগও কোনো যুক্তি দেখায়নি।
প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘মশিউর রহমানের মামলায় যদি কোনো যুক্তি না দেখানো হয়, তাহলে আপনারা কেন রিভিউ করেননি।’
জবাবে খুরশিদ বলেন, ‘যুক্তি নাই বলে রিভিউ করিনি।’
‘দুদক কোনো পক্ষপাতিত্ব করছে না। সরকারদলীয় সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদির ক্ষেত্রেও আপিল করেছে। নাজমুল হুদার মামলায় ৯০ দিনের মধ্যে আপিল নিষ্পত্তি না হওয়ায় তাকে জামিন দিয়েছে।’
‘খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা যেসব মামলার উদাহরণ দিয়েছে, প্রত্যেকটির ক্ষেত্রেই দেড় থেকে দুই বছর কারাভোগ করেছেন। এ কারণেই আদালত জামিন দিয়েছে।’
প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আপনার বন্ধু (খন্দকার মাহবুব হোসেন) চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন যে হাইকোর্ট জামিন দিয়েছেন আর আপিল বিভাগ তাতে হস্তক্ষেপ করেছে-এমন নজির দেখান।’
তখন দুদকের আইনজীবী নজির দেখাতে না পারায় আইনজীবীদের মধ্য থেকে গুঞ্জন শুরু হয়।
প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘এমনও অনেক মামলা আছে যেখানে কোনো যুক্তি নেই তারপরও রিভিউ নিয়ে আসেন। কিন্তু এখানে কেন আনেননি?’
খুরশিদ বলেন, ‘মশিউর রহমানের মামলা আর খালেদা জিয়ার মামলা এক নয়। দুটির বিষয়বস্তু ভিন্ন।’
প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আপনি বলতে চাচ্ছেন কী? এ রায় কোনো রায় নয়?’
খুরশিদ বলেন, ‘তা বলছি না, অবশ্যই এটা রায়। কিন্তু নজির না হলে আমরা সেটা রেফার করি না।’
প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘তাই যদি হয়, এ মামলায় নিম্ন আদালতের বিরুদ্ধে কেন রিভিশন আবেদন করেছেন।’
খুরশিদ বলেন, ‘সাজা বাড়াতে।’
প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আপনি বার বার মুখে বলছেন, এখন পর্যন্ত কোনো নজির দেখাতে পারেননি। আপনারা একটা বেঞ্চ নির্ধারণ করে দেন। সেখানে মূল আপিলের নিষ্পত্তি হোক। তা না হলে মামলার নথি নষ্ট হয়ে যেতে পারে।’
আকাশ নিউজ ডেস্ক 



















