আকাশ জাতীয় ডেস্ক :
শাবান মাস রমজানের মাহাত্ম্য অর্জনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করার শ্রেষ্ঠ সময়। এ মাসে মুমিন হৃদয়ে বইতে থাকে রমজানের সুবাস। আমরা অনেক সময় রমজানের অপেক্ষায় থাকি, কিন্তু তার আগের এই বরকতময় মাসটিকে অবহেলায় কাটিয়ে দিই। অথচ রসুল (সা.) এই মাসে পুরোদমে রমজানের প্রস্তুতি নিতেন। বেশি বেশি নফল রোজা রাখতেন। আয়েশা (রা.) বলেন, রসুল (সা.)-কে রমজান ব্যতীত অন্য কোনো মাসে শাবানের মতো এত বেশি রোজা রাখতে দেখিনি। সামান্য কয়েকটা দিন ব্যতীত শাবানের প্রায় পুরো মাসই তিনি নফল রোজা রাখতেন (বুখারি, ১৮৬৮)।
নবীজির (সা.) জীবনে নফল রোজার সবচেয়ে আধিক্য দেখা যায় শাবান মাসে। এর অন্যতম কারণ হলো- শাবান মাস রমজানের প্রস্তুতিমূলক মাস। তাই রমজানের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে তিনি এ মাসে সবচেয়ে বেশি রোজা রাখতেন। উসামা বিন জায়েদ (রা.) একবার নবীজিকে প্রশ্ন করেছিলেন, ইয়া রসুল (সা.), আপনাকে শাবান মাসে যত রোজা রাখতে দেখি, অন্য কোনো মাসে তো তেমনটি দেখি না। উত্তরে নবীজি (সা.) বলেছিলেন, এটি এমন এক মাস, যা রজব ও রমজানের মাঝখানে অবস্থিত এবং মানুষ এ মাসটি সম্পর্কে উদাসীন থাকে। আর এটি এমন এক মাস যাতে আল্লাহর কাছে আমলনামা পেশ করা হয়। আমি চাই আমার আমলনামা যখন পেশ করা হবে, তখন যেন আমি রোজা অবস্থায় থাকি (নাসাঈ, ২৩৫৭)।
তা ছাড়া যারা শাবান মাসজুড়ে নফল রোজার মাধ্যমে নিজেদের প্রস্তুত করেন, তাদের জন্য রমজানের রোজা পালন করা অনেক সহজ ও আনন্দদায়ক হয়। অন্যথায় হঠাৎ করে রমজান শুরু হলে শরীর কিছুটা ক্লান্ত হয়ে পড়তে পারে, যা রমজানের ইবাদতে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। নবী (সা.)-এর আমল থেকে আমরা বুঝতে পারি, শাবান মাসে অধিক পরিমাণে রোজা রাখার মূল উদ্দেশ্য হলো রমজানের প্রস্তুতিমূলক অনুশীলন। আর যেকোনো কাজের সফলতা নির্ভর করে মূলত সেই কাজের পূর্বপ্রস্তুতির ওপর।
রমজান যেহেতু মুমিন জীবনের খুবই তাৎপর্যপূর্ণ মাস, তাই একে সার্থক করতেও যথাযথ প্রস্তুতির বিকল্প নেই। একজন কৃষক যেমন ফসল কাটার আগে জমি চাষ করেন, বীজ বপন করে পরিচর্যা করেন, মুমিন মুসলমানের জন্য শাবান মাসটি হলো ঠিক তেমনি ইবাদতের জমিন প্রস্তুত করার সময়। কোরআনেও মহান আল্লাহ প্রস্তুতির ব্যাপারটা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন। তাবুক যুদ্ধে কিছু লোক যখন অলসতা ও নানা অজুহাতে যুদ্ধে অংশগ্রহণ থেকে বিরত ছিল, তখন আল্লাহ তাদের সদিচ্ছার অভাবকে চিহ্নিত করে বলেছিলেন- যদি সত্যিই তাদের যুদ্ধে বের হওয়ার সংকল্প থাকত, তবে তারা অবশ্যই আগে থেকে প্রস্তুতি গ্রহণ করত (সুরা তাওবা, ৪৬)। রমজানের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে শাবানে প্রধান করণীয় হলো সাধ্য অনুযায়ী বেশি বেশি নফল রোজা রাখা। যদি পুরো মাস সম্ভব না হয়, তবে অন্তত প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবারের নফল রোজাগুলো এবং প্রতি চান্দ্র মাসের তেরো, চৌদ্দ ও পনেরো তারিখ অর্থাৎ ‘আইয়ামে বিজ’-এর তিনটি রোজা রাখা উচিত। এর পাশাপাশি তাওবা-ইস্তিগফারের মাধ্যমে অন্তরকে পরিচ্ছন্ন করতে হবে।
একই সঙ্গে বিগত রমজানগুলোতে কেন আমাদের আমল বাধাগ্রস্ত হয়েছিল, সেই কারণগুলো খুঁজে বের করতে হবে। যদি মোবাইল ফোন বা সোশ্যাল মিডিয়ার আসক্তি আমাদের ইবাদত থেকে দূরে সরিয়ে রাখে, তবে তা বর্জন করার মানসিক প্রস্তুতি নিতে হবে। ইবাদতের সঠিক পদ্ধতি ও মাসায়েল এখন থেকে শিখে নিতে হবে, যেন ভুলত্রুটিমুক্ত হয়ে আমরা রোজা, তারাবি ও অন্যান্য আমল আদায় করতে পারি। জামাতে নামাজ আদায় ও কোরআন তেলাওয়াতে এখন থেকেই অভ্যস্ত হতে হবে। এতে রমজান শুরু হলে আমাদের জন্য দীর্ঘ সময় ইবাদত করা সহজ হবে। সুনির্দিষ্ট রুটিন বা পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। দিনের কোনো সময় কোরআন পড়ব, কখন জিকির করব আর কখন দোয়ার জন্য নিভৃত সময় কাটাব- যাতে হেলায়খেলায় সময় নষ্ট না হয়ে যায়।
রমজান মাস মুসলমানদের বহুবিধ অর্জনের মাস। বদর যুদ্ধ, মক্কা বিজয়সহ ইসলামের ইতিহাসের বহু বড় বড় বিজয় এ মাসেই অর্জিত হয়েছে। তাই ব্যক্তিগত ইবাদতের পাশাপাশি দীনের প্রতিটি বিধানের ওপর অটল থাকার শপথ নিতে হবে। আসুন, আমরা এবারের রমজানকে কেবল একটি ক্যালেন্ডারের মাস হিসেবে নয়, বরং জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার শ্রেষ্ঠ সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করি। হতে পারে এটাই আমার জীবনের শেষ রমজান- এই চেতনা নিয়ে প্রতিটি মুহূর্তকে ইবাদতে রাঙিয়ে তোলার প্রস্তুতি এখনই সম্পন্ন করি।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 



















