অাকাশ জাতীয় ডেস্ক:
বরিশাল উদয়ন স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়া অবস্থাতেই শুরু হয় রাজীবের আশ্রয় সন্ধানের যুদ্ধ। কখনও দাদাবাড়ি কখনও নানাবাড়ি, আবার কখনওবা ভাড়া মেসের খুপড়িঘরে আশ্রয়ের সন্ধানে নিরন্তর ছুটে চলা রাজীবের শেষ আশ্রয় জুটল তার মায়ের কবরের পাশে ছোট্ট এক টুকরো জমিতে।
আর দশটা সাধারণ পরিবারের মতো বাবা-মা আর ভাইদের নিয়ে রাজীবের ছিল ছোট্ট সুখের সংসার। বরিশালে ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান অপসোনিনের কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন রাজীবের বাবা হায়দার আলী খাঁ। সেই সুবাধে পরিবারের সবাই বরিশালে থাকতেন। ২০০৫ সালে আকস্মিক ছোট্ট একটি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান রাজীবের মা নাসিমা বেগম। এর পর থেকেই শুরু হয় রাজীবের আশ্রয় সন্ধান।
ছোট দুই ভাই মেহেদী হাসান বাপ্পি আর আবদুল্লাহকে নিয়ে রাজীবের তখন ঠাঁই হয় বাউফলের দাশপাড়া গ্রামে নানা লাল মিয়ার বাড়িতে। নানা লাল মিয়ার অভাব-অনটনের সংসারে ছোট দুই ভাই থাকলেও খুব বেশিদিন থাকতে পারেননি রাজীব। এর পর রাজীবের আশ্রয় জোটে নিজ বাড়ি সূর্যমনি ইউনিয়নের ইন্দ্রকূল গ্রামে বাবা হায়দার আলীর এক চাচার কাছে। এই আশ্রয়ও খুব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।
এর পর রাজীবের আশ্রয় জোটে বাউফলের কালিশুরি ইউনিয়নের পোনাহুড়া গ্রামে রাজীবের এক দাদির (রাজীবের বাবা হায়দার আলীর ফুপু) কাছে। আশ্রয় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে স্কুলেরও পরিবর্তন হয় তার। বরিশাল উদয়ন স্কুল থেকে ইন্দ্রকূল ছোনখলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ছোনখলা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে পোনাহুরা সিনিয়র মাদ্রাসায়। কথায় আছে- অভাগা যেদিকে তাকায় নদীর জলও শুকিয়ে যায়। রাজীবের ক্ষেত্রেও বোধহয় এ কথাটি প্রযোজ্য।
দাদির কাছে এই আশ্রয়ও খুব বেশিদিন টেকেনি তার। বছর না ঘুরতেই মারা যান তার ওই দাদি। এর পর তার আশ্রয় জোটে বাউফলের কালাইয়ায় বাবার এক চাচার বাসায়। কালাইয়ায় এসে রাজীব ভর্তি হয় কালাইয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়।
এদিকে রাজীবের বাবাও হঠাৎ নিরুদ্দেশ হয়ে যান। পিতামাতাবিহীন রাজীবের দায়িত্ব আর কেউ নিতে চাইছিল না। এর কিছু দিন পর রাজীবের বাবার মৃত্যু সংবাদ আসে। সব কিছু মিলিয়ে পুরোপুরি বিধ্বস্ত ছিল রাজীব ও তার ছোট দুই ভাইয়ের জীবন। এর পর রাজীবের বড় খালা জাহানারা বেগম রাজীব ও তার ছোট দুই ভাইকে ঢাকায় তার কাছে নিয়ে যান।
রাজীবকে ভর্তি করে দেন মতিঝিল টিঅ্যান্ডটি কলোনি স্কুলে আর রাজীবের দুই ছোট ভাইকে ভর্তি করে দেন একটি বেসরকারি এতিমখানা হাফেজি মাদ্রাসায়। ওই খালার বাসায় থেকেই এসএসসি ও এইচএসসি পাস করেন রাজীব। এরপর তিতুমীর কলেজে ডিগ্রি পাস কোর্সে ভর্তি হন। কিন্তু অনার্স পড়ার অদম্য ইচ্ছে ছিল তার।
পরের বছর বরিশালের হাতেম আলী কলেজে ইংরেজিতে অনার্স ভর্তি হন রাজীব। দুই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই একসঙ্গে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন রাজীব। আর এর ফাঁকে ঢাকায় একটি কম্পিউটারের দোকোনে পার্টটাইম কাজ করে নিজের পড়াশোনার খরচ নিজেই নির্বাহ করতেন।
রাজীবের ছোট মামা মিরাজ তার কথা স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, প্রচণ্ড আত্মঅভিমানী ছিল রাজীব। বাড়ি আসার কথা উঠলেই নানা বাহানায় এড়িয়ে যেত সে। জীবনে মানুষের মতো মানুষ হতে পারলে তবেই বাড়ি ফিরবে সে। আর এক কারণে গত সাত বছরে একবারের জন্যও বাড়ি আসেনি অভিমানী রাজীব।
কিন্তু মানুষের মত মানুষ হয়ে আর বাড়ি ফেরা হল না তার। ভাগ্যের নির্মম পরিণতির কাছে আত্মসমর্পণ করা রাজীব তার ছোট দুই ভাইয়ের দায়িত্ব তার কাঁধে তুলে নিতে পারল না। এমন আফসোস নিয়েই মায়ের কবরের কাছে অন্তিম শায়নে শায়িত হলেন জীবনসংগ্রামে সাহসী এক সংগ্রামী যোদ্ধা।
মঙ্গলবার রাত ২টার দিকে বাউফলের দাশপাড়ায় রাজীবের নানাবাড়িতে তার লাশ পৌঁছে। বুধবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রাজীবের দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় উপস্থিত ছিলেন চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ, জেলা প্রশাসক ড. মো. মাসুমুর রহমান, জেলা পুলিশ সুপার মঈনুল হাচান, বাউফল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবদুল্লাহ আল মাহমুদ জামান, বাউফল থানার ওসি মনিরুল ইসলামসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ।
চিপ হুইপ আ স ম ফিরোজ জানাজা সময় বলেন, প্রধানমন্ত্রী বিদেশে আছেন দেশে এলে তিনি অবশ্যই রাজীবের পরিবারকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সহযোগিতার উদ্যোগ নেবেন। জেলা প্রশাসক মাসুমুর রহমান সরকারের পক্ষে রাজীবের পরিবারকে নগদ ৪৫ হাজার টাকা দেন এবং সমাজসেবা অধিদফতর থেকে আরও এক লাখ টাকা অনুদান দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
এর পর নানাবাড়িতে রাজীবের তৃতীয় জানাজা শেষে তার মা নাসিমা বেগমের কবরের পাশে রাজীবকে সমাহিত করা হয়।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 























