আকাশ স্পোর্টস ডেস্ক:
নিষেধাজ্ঞা অবধারিতই ছিল, জানা বাকি ছিল শুধু মেয়াদটা। গতকাল জোহানেসবার্গে সংবাদ সম্মেলন ডেকে সেটি জানিয়েছেন ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার প্রধান নির্বাহী জেমস সাদারল্যান্ড। স্টিভেন স্মিথ ও ডেভিড ওয়ার্নার এক বছর আর ক্যামেরন ব্যানক্রফট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট এবং অস্ট্রেলিয়ার রাজ্য দলের হয়ে খেলতে পারবেন না পরবর্তী ৯ মাস। রায় শুনে গতকালই দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে দেশে ফেরার ফ্লাইট ধরেছেন এই তিন অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটার। পেছনে রেখে গেছেন প্রতারণা আর মিথ্যার কালো ছায়া।
কেপ টাউন টেস্টের তৃতীয় দিন চা-বিরতির সামান্য আগে টিভি ক্যামেরায় বল নিয়ে ব্যানক্রফটের যে কারিকুরি ধরা পড়েছে, তা নির্ভেজাল প্রতারণা। প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানকে বিপাকে ফেলতে আঠালো প্লাস্টিক টেপ দিয়ে ঘষে রিভার্স সুইং উপযোগী করে তোলার গোপন চেষ্টা প্রতারণারই শামিল। কিন্তু ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার তদন্ত প্রতিবেদনে মিলেছে, মিথ্যারও আশ্রয় নিয়েছিলেন স্মিথ থেকে শুরু করে ব্যানক্রফট। শনিবার টিভি ক্যামেরায় হাতেনাতে ধরা পড়ার পর সংবাদ সম্মেলনে স্মিথের স্বীকারোক্তির পর ব্যানক্রফট পুরো পরিকল্পনা বিস্তারিত জানিয়েছিলেন। সেদিন জানিয়েছিলেন যে, প্লাস্টিক টেপে মাটি মিশিয়ে বলে ঘষেছিলেন। যদিও অভিযুক্ত থেকে শুরু করে অস্ট্রেলিয়া দলের প্রতিটি সদস্যের সাক্ষ্য নেওয়ার পর ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া নিশ্চিত টেপ নয়, শিরিশ কাগজ দিয়ে বলের একটা পাশ রুক্ষ করার অপচেষ্টা চালিয়েছিলেন ব্যানক্রফট। শিরিশ সব ব্যাটসম্যানের ক্রিকেট কফিনেই থাকে। ব্যাটের মসৃণতা রক্ষার জন্যই সেটি তাঁরা ব্যবহারও করেন।
মিথ্যাচারে অবশ্য আর সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন ডেভিড ওয়ার্নার—ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার তদন্ত সেরকমই ইঙ্গিত দিচ্ছে। যেমন, ম্যাচ রেফারির সামনে নাকি এ ব্যাপারে নিজের সামান্যতম সংশ্লিষ্টতাও স্বীকার করেননি ওয়ার্নার। উল্টো পুরো বিষয়টিতে নিজের অজ্ঞতার কথা জানিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ার সহ-অধিনায়ক। যদিও তদন্তদল জেনেছে ওয়ার্নারের মস্তিষ্ক থেকেই বল টেম্পারিংয়ের কুবুদ্ধির উদ্ভব। শুধু তা-ই নয়, বলের ঔজ্জ্বল্য কিভাবে নষ্ট করতে হয়, সেটিও ব্যানক্রফটকে নাকি সেদিন মধ্যাহ্ন বিরতির সময় হাতে ধরে শিখিয়েছিলেন ওয়ার্নার! তাই স্মিথের জন্য দুই বছর পর জাতীয় দলের অধিনায়কত্বের পথ খোলা রাখলেও ওয়ার্নার আর কখনোই অস্ট্রেলিয়ার নেতৃত্বে আসতে পারবেন না, সহ-অধিনায়ক হিসেবেও নয়।
তো, পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর আর দেরি করেননি জেমস সাদারল্যান্ড, ‘ওই তিনজন চলে যাওয়ার আগে আমি সবার সঙ্গে কথা বলেছি। পুরো ঘটনার জন্য তারা দুঃখিত, হতাশ এবং অনুতপ্ত।’ সাজাপ্রাপ্তদের আগাম রায় শুনিয়ে মিডিয়ার সামনে বিস্তারিত জানিয়েছেন ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার প্রধান নির্বাহী।
তবে এই শাস্তি প্রদানকে ঘিরে সমালোচনার স্রোতও বইছে। বিশেষ করে, ড্রেসিংরুমে বল টেম্পারিংয়ের পরিকল্পনা হয়েছে অথচ তিনজনের বাইরে কেউ জানতে পারেনি—এটা ঠিক বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না মাইকেল ভন থেকে শুরু করে কেভিন পিটারসেনের মতো সাবেকদের। রিভার্স সুইংয়ের উপযোগী করে বল বানানোই হয় পেসারদের সুবিধার কথা ভেবে। কিন্তু কেপ টাউন টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার একাদশে থাকা কোনো পেসারই নাকি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ছিলেন না! সমালোচকরা আরো চাঁচাছোলা ড্যারেন লেহম্যানের নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ায়। স্বীকারোক্তিকালে স্মিথ বলেছিলেন, ‘আমাদের লিডারশিপ গ্রুপ জানে বিষয়টি।’ যেকোনো দলের লিডারশিপ গ্রুপে কোচের থাকাটা অবধারিত। তার ওপর মাঠের জায়ান্ট স্ক্রিনে ব্যানক্রফটের কাণ্ড বারবার প্রচারিত হওয়ার পরপরই দ্বাদশ খেলোয়াড় হিসেবে পিটার হ্যান্ডসকম্বের সঙ্গে ওয়াকিটকিতে কথা বলতে দেখা গেছে লেহম্যানকে। পরের ফ্রেমে দেখা গেছে, ব্যানক্রফটের সঙ্গে কথা বলছেন হ্যান্ডসকম্ব। তাতে অপকর্মটির সঙ্গে কোচের সম্পৃক্ততার পক্ষে সাক্ষ্য-প্রমাণ হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন অনেকে। যদিও অনুসন্ধানের পর সাদারল্যান্ড জেনেছেন, “ড্যারেন লেহম্যান কোচ। তিনি কোনোভাবেই এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন। ইয়ান রয় (তদন্ত কর্মকর্তা) সন্তুষ্ট কোচের ভূমিকা নিয়ে। তাই চুক্তির মেয়াদ (২০১৯ বিশ্বকাপ) পর্যন্ত ড্যারেনই কোচ থাকছেন। আর সেদিন তিনি ওয়াকিটকিতে বলেছিলেন, ‘এসব কী হচ্ছে!’ ড্যারেনের ভূমিকা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েই এটা জানিয়েছে ইয়ান।”
অবশ্য এই সাময়িক নিষেধাজ্ঞাই স্মিথ-ওয়ার্নারদের দুর্ভোগের শেষ নয়। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার রায় শোনার সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) কমিশনার রাজিব শুক্লা, ‘ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার তদন্ত প্রতিবেদনের অপেক্ষায় ছিলাম। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তাদের (স্মিথ ও ওয়ার্নার) এবারের আসরে খেলার অনুমতি প্রত্যাহার করে নিয়েছি।’ একই আওয়াজ তুলেছে সাজাপ্রাপ্ত ক্রিকেটারদের ব্যক্তিগত স্পন্সরও। এলজির মুখপাত্র যেমন জানিয়েছেন, ‘ওয়ার্নারের সঙ্গে এ মাসেই শেষ হতে যাওয়া চুক্তি নবায়নের ইচ্ছা আমাদের নেই।’
স্টিভেন স্মিথও নিশ্চিতভাবেই হারাবেন বেশ কিছু পণ্যের দূতিয়ালি। নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষে হয়তো আবার ফিরেও পাবেন সেসব। কিন্তু নামের সঙ্গে কাঁটা হয়ে বিঁধে যাওয়া ‘প্রতারক’ তকমাটা কি উপড়ে ফেলতে পারবেন আর কোনোদিন?
আকাশ নিউজ ডেস্ক 























