অাকাশ জাতীয় ডেস্ক:
বাংলাদেশ যে উন্নয়ন করে বিশ্বের বুকে মর্যাদা লাভ করেছে, সেটি বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বলতে না পারার আক্ষেপের কথা তুলে ধরে আবেগে আপ্লুত হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেয়া দল আওয়ামী লীগের আলোচনায় অংশ নিয়ে বঙ্গবন্ধু কন্যা এসব কথা বলেন। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে শেখ হাসিনা যখন তার আবেগের কথা বলছিলেন তখন অনুষ্ঠানস্থল কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে নেমে এসেছিল পিনপতন নীরবতা।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি সব সময় এটাই চিন্তা করি যে, সারা জীবন কষ্ট করে জাতির পিতা আমাদেরকে স্বাধীনতা দিয়ে গেছেন। যখন দেশটা উন্নত হয়, তখন তার কথা মনে হয়।’ ‘জানি না, তিনি বেহেশত থেকে নিশ্চয় দেখেন। নিশ্চয় বাংলাদেশের মানুষের প্রতি নিশ্চয় তার দৃষ্টি আছে, নিশ্চয় তিনি এ দেশের মানুষের কথা ভাবেন।’
‘না হলে আমি যেটা ভাবি, আমার কী ক্ষমতা আছে, আমার কী যোগ্যতা আছে একটা রাষ্ট্র পরিচালনা করার আর এত উন্নতি করার?’ ‘নিশ্চয় তিনি বেহেশত থেকে এই দেশের মানুষের প্রতি নজর রাখেন বলেই আজকে আমরা কাজ করার সুযোগ পাই।’
বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, ‘মাঝে মাঝে আমার মনে হয়, আমি যদি আব্বাকে বলতে পারতাম, যদি বলতে পারতাম আপনার দেশের মানুষের জন্য এইটুকু কাজ করতে পেরেছি।’
‘আজকে একটা মানুষ কুঁড়ে ঘরে থাকে না, আজকে মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিতে পেরেছি। আমরা আরও করতে চাই।’ ‘আজকে আমরা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নীত হয়ে বিশ্বে সম্মান পেয়েছি, এটুকু যদি বলতে পারতাম, তাহলে বুকে শান্তি পেতাম।’ ‘হ্যাঁ, আমি বলি, আমরা দুই বোন যখন একসাথে থাকি তখন বলি। জানি না, মনে হয় আব্বা বোধহয় শুনতে পান।’
এটুকু বলে শেখ হাসিনা তার আবেগ সামলে বলেন, ‘স্বাধীনতা তিনি (বঙ্গবন্ধু) দিয়ে গেছেন। তার আকাঙ্ক্ষা ছিল এই দেশের মানুষ সুন্দরভাবে বাঁচবে, এই দেশের মানুষ একটা উন্নত জীবন পাবে। আর সেইটুকু যদি করে দিয়ে যেতে পারি, সেখানে সার্থকতা। সেটুকু আমরা চাই।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘স্বাধীনতা লাখো মানুষের রক্তের বিনিময়ে। এই স্বাধীনতা যেন কখনও ব্যর্থ হতে না পারে। আর যারা এই স্বাধীনতাকে ব্যর্থ করতে পারে, তারা যেন কখনও ক্ষমতায় আসতে না পারে।’
প্রধানমন্ত্রী বলন, ‘এই দেশ জঙ্গিদের হবে না, এই দেশ স্বাধীনতাবিরোধীদের হবে না, এই দেশ যুদ্ধাপরাধীদের হবে না। এই দেশ হবে মুক্তিযোদ্ধাদের আদর্শের দেশ। সেভাবেই আমরা দেশকে গড়তে চাই, সেভাবেই আমরা দেশকে নিয়ে যেতে চাই।’
প্রায় ৫০ মিনিটের বক্তব্যে শেখ হাসিনা পাকিস্তান আমলে পূর্ব বঙ্গের মানুষদের বৈষম্য, স্বাধীনতার জন্য বঙ্গবন্ধুর পরিকল্পনা, চেষ্টা, ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষণা, মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধ পরবর্তী দেশ গড়ার চেষ্টা, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা, হত্যার পর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতাবিরোধীদের ক্ষমতায় বসানো, যুদ্ধাপরাধের বিচার বন্ধ করে দেয়া, ৭৫ পরবর্তী সময়ে দেশের উন্নয়ন না হওয়াসহ নানা বিষয়ে বক্তব্য রাখেন।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘মনে হয় বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের মানুষকে ওই পাকিস্তানিদের মতো করেই পদানত করে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।’
‘কোনোমতেই বাঙালিরা শিক্ষা-দীক্ষায় উন্নত হোক, এটা তারা চায়নি। তাদের মনে ছিল তো পেয়ারে পাকিস্তান। ওটা তাদের দিলেই ছিল। বাংলাদেশ, বাঙালি বলতে তারা বিশ্বাস করত না।’
১৯৯৬ সালের পর তিন দফায় আওয়ামী লীগ সরকারের উদ্যোগের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘চেষ্টা করলে যে পারা যায়, সেটা আমরা প্রমাণ করেছি।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘একটা প্রজন্ম তো ইতিহাস ভুলেই গিয়েছিল, জানেই না, জানতে পারেই না। এখনকার ছেলে মেয়েরা আবার উজ্জীবিত হচ্ছে ইতিহাস দেখে।’
বিএনপি সরকারের আমলে অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকের সঙ্গে বর্তমান আমলের তুলনা করেন প্রধানমন্ত্রী। বিএনপি সরকারের শেষ বছরের তুলনায় বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় প্রায় চার গুণ, বাজেটের আকার প্রায় সাত গুণ, উন্নয়ন বাজেট আট গুণেরও বেশি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ১০ গুণ, জিডিপির আকার চার গুণেরও বেশি, রপ্তানি প্রায় সাড়ে তিন গুণ, বিদ্যুৎ উৎপাদন তিন গুণেরও বেশি, বিদেশি বিনিয়োগ চার গুণ বেড়েছে।
‘এখন ভ্যানও চলে ব্যাটারিতে। ব্যাটারি চার্জ হয় বিদ্যুতে। একজন ভ্যানওয়ালাকে জিজ্ঞেস করলাম, কতটুকু বিদ্যুৎ আমার খরচ করো? বাচ্চা ছেলে, বলে, বেশি না আপা ৭০ ওয়াট হলেই হয়ে যায়। সেই হিসাবও তারা জানে।’
বিএনপি আমলে ঢাকা শহরে কী অবস্থা হয়েছিল সেটাও স্মরণ করে দেখতে বলেন প্রধানমন্ত্রী। বলেন, ‘পানির জন্য হাহাকার। সারা বাংলাদেশে বিদ্যুতের জন্য হাহাকার।’
‘আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর আমরা একে একে সব সমস্যার সমাধান করেছি। সারা বাংলাদেশে যেন বিশুদ্ধ পানি পায়, সেই ব্যবস্থাটা আমরা করেছি।’
‘১৮ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে মানুষ স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে, ৩০ প্রকাশ ওষুধ বিনামূ্ল্যে পাচ্ছে। আজকের বাংলাদেশ ডিজিটাল বাংলাদেশ। মানুষ কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে, তাদের কর্মসংস্থান হচ্ছে, আমরা এখন স্যাটেলাইটও উৎক্ষেপণ করতে যাচ্ছে।’
‘বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট। এটার ১৫ বছর মেয়াদ থাকে। এরপর পাঁচ বছরের মধ্যে আবার শুরু করতে হবে। এরপর বঙ্গবন্ধু-২, বঙ্গবন্ধু-৩ এভাবে পরিকল্পনা ভবিষ্যতের জন্য নেয়া আছে।’ ‘আমরা মেট্রোরেল নির্মাণ করছি, কর্ণফুলী টানেল নির্মাণ করছি, ফ্লাইওভার করেছি, হাইওয়েগুলো চার লেন বিশিষ্ট করছি।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘মানুষের জন্য কাজ করে যাওয়া, একজন রাজনীতিবিদের সেটাই কর্তব্য। জাতির পিতা তাই করে গেছেন। আর তার কন্যা হিসেবে আমিও সেটাই আমার দায়িত্ব মনে করি।’
‘নিজেদের সম্পদ করা না, জনগণ সম্পদশালী হোক, জনগণ উন্নত হোক, জনগণ সুন্দর জীবন পাক। বাংলাদেশের একটা মানুষও গৃহহারা থাকবে না, একটা মানুষও না খেয়ে কষ্ট পাবে না, একটা মানুষও বিনা চিকিৎসায় মারা যাবে না, আমরা সেটাই চাই।’
‘আমাদের উন্নয়ন, সেটার লক্ষ্যটাই হচ্ছে তৃণমূল পর্যায় থেকেই উন্নয়নের কাজ করা। …কোনো ঘর অন্ধকার থাকবে না। প্রতি ঘরকে আমরা আলোকিত করব। সেই লক্ষ্য নিয়ে সেই নীতি নিয়ে দেশ পরিচালনা করছি বলেই আজকে দেশের উন্নতিটা হচ্ছে।’
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, কেন্দ্রীয় নেতা তোফায়েল আহমেদ, আমির হোসেন আমু, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোশাররফ হোসেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হারুন অর রশীদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়র অধ্যাপক সাদেকা হালিম প্রমুখ এ সময় বক্তব্য দেন।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে বক্তব্যের জন্য ডাকা হলেও তিনি শারীরিক অসুস্থতার কথা জানিয়ে বক্তব্য রাখেননি।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 



















