ঢাকা ০৩:১৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬, ১১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

জিয়াও বঙ্গবন্ধুকেই স্বাধীনতার ঘোষক বলেছেন

অাকাশ জাতীয় ডেস্ক:

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে একটি পক্ষ যাই বলুক না কেন, এটা সবাইকে মেনে নিতে হবে যে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই স্বাধীনতার ঘোষক।

রবিবার রাতে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল সংবাদপত্র পর্যালোচনা ‘আজকের সংবাদপত্র’ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে এই মন্তব্য করেন দৈনিক সমকালের সম্পাদক গোলাম সারওয়ার।

সমকালের সম্পাদক বলেন, ‘কে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন এটা একটা কূটতর্ক। তবে কূটতর্ক হোক আর যাই হোক সবাইকে এটা মেনে নিতে হবে জাতির পিতাই স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন, অন্য কেউ নয়।’

সমকালের সম্পাদক বলেন, ‘স্বাধীনতার ঘোষণা হয়েছিল ৭ মার্চ। বঙ্গবন্ধুর সেই আহ্বান, সেই দীপ্ত ঘোষণা ওটাই ছিল স্বাধীনতার ঘোষণা। ওটাই স্বাধীনতার ঘোষণা, এর বাইরে কেউ এসে স্বাধীনতার ঘোষণা করেননি।’

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অভিযান অপারেশন সার্চ লাইট শুরুর পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এরপর ইপিআরের ওয়্যারলেস দিয়ে সে ঘোষণা প্রচার হয়। আর পরের দুই দিন চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এটার প্রচার চলে।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশিত বিভিন্ন দৈনিক প্রত্রিকায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা সংক্রান্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে গ্রেপ্তারের পূর্বেই শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন।

বিএনপি নেতা মওদুদ আহমেদের লেখা ‘এরা অব শেখ মুজিব’ (শেখ মুজিবুরের শাসনামল) গ্রন্থেও বলা হয়, শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা করেছেন।

১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত লে. কর্নেল জিয়াউর রহমানের লেখা জাতির জনক শিরোনামের প্রবন্ধের জিয়াউর রহমান ওই ২৫ মার্চের বিস্তারিত বিবরণ দেন। কিন্তু কোথাও নিজেকে স্বাধীনতার ঘোষক দাবি করেননি। তিনি বঙ্গবন্ধুকে জাতির জনক বলে আখ্যায়িত করেন।

১৯৭৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি হিসেবে জিয়াউর রহমানের দেয়া ভাষণেও তিনি ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ সম্পর্কে বলেছিলেন ‘কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে আপনাদের উদ্দেশে কথা বলার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল।’ কিন্তু তিনি ওই ভাষণেও নিজেকে স্বাধীনতার ঘোষক দাবি করেননি।

শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে এতে বলা হয়, ছাত্রনেতা থেকে তিনি আওয়ামী লীগ নেতা এবং এরপর বাংলাদেশের স্বাধীনতার রূপকার হয়েছেন। জীবনের তিন ভাগের একভাগ শেখ মুজিব কারাগারে কাটিয়েছেন। তিনি একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতে গ্রেপ্তারের পর ৯ মাস পাকিস্তানের কারাগারে ছিলেন। কিন্তু পাকিস্তানি সামরিক সরকার তার মনোবলে একটুও চির ধরাতে পারেনি। কোনো মুচলেকায় তিনি স্বাক্ষর করেননি।

১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল সরকার গঠন করার পর প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ তার ভাষণে বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কে বলেন, ‘২৫ মার্চ মাঝরাতে ইয়াহিয়া খান তার রক্তলোলুপ সাঁজোয়া বাহিনীকে বাংলাদেশের নিরস্ত্র মানুষের ওপর লেলিয়ে দিয়ে যে নর-হত্যাযজ্ঞের শুরু করেন তা প্রতিরোধ করার আহ্বান জানিয়ে আমাদের প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।’

স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি

জেনারেল ওসমানী ১৯৭২ সালের স্বাধীনতা দিবসে ‘পূর্ব দেশ’কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে জেনারেল ওসমানী বলেছেন, ‘২৫ মার্চ রাত ১০টায় বঙ্গবন্ধু আমাকে বলেছিলেন আপনাকে যেন ওরা কোনো অবস্থাতেই ধরতে না পারে। তিনি আমার ওপর যুদ্ধ পরিচালনা করার নির্দেশ প্রদান করেন।’

যিনি যুদ্ধ পরিচালনার জন্য সেনাপতি নিযুক্ত করেন তিনি যুদ্ধ ঘোষণা করেননি এ যুক্তি কোনোভাবে গ্রহণীয় নয়। ১৯৮০ সালে জেনারেল এমএজি ওসমানী বলেন, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ জিয়া স্বাধীনতা ঘোষণা করেননি। বঙ্গবন্ধুই সেদিন স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। ১৯৮০ সালের আগস্ট মাসে জাতীয় জনতা পার্টির কার্যালয়ে বঙ্গবন্ধুর স্মরণসভায় জেনারেল ওসমানী বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উদাহরণ সৃষ্টিকারী শীর্ষতম ব্যতিক্রম, তিনি একমাত্র মহান বাঙালি যিনি বিবেক ব্যবসা করেনি।’

জেনারেল ওসমানী জাতীয় সংসদে স্বাধীনতা ঘোষণা প্রসঙ্গত বিতর্কে সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে ১৯৮১ সালে পুনরায় দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুই, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।’

এ সম্পর্কে মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানী ২নং সেক্টর ও কে ফোর্সের অধিনায়ক শহীদ মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ বীর উত্তম বলেন, ‘১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আমি বিদেশে ছিলাম। ওমানের টেলিভিশন পর্দায় দেখেছি ভোটের ছবি। তার আগে ঝড়ের ছবি। দেশে ফিরে দেখলাম আমার দেখা বাংলাদেশের চেহারা পাল্টে গেছে। চারিদিকে দানা বেঁধে উঠেছে। সংগ্রাম, এবার স্বপ্ন স্বার্থক হবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর হবেন রাষ্ট্রনায়ক।’

‘ক্যান্টনমেন্টে এ নিয়ে আলোচনা হতো, মৃদু কণ্ঠে। এ আলোচনায় জাতিভেদ স্পষ্ট ছিল। কেউ প্রাণ খুলে আলোচনা করত না।’

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

জিয়াও বঙ্গবন্ধুকেই স্বাধীনতার ঘোষক বলেছেন

আপডেট সময় ০৬:২৮:০৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ মার্চ ২০১৮

অাকাশ জাতীয় ডেস্ক:

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে একটি পক্ষ যাই বলুক না কেন, এটা সবাইকে মেনে নিতে হবে যে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই স্বাধীনতার ঘোষক।

রবিবার রাতে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল সংবাদপত্র পর্যালোচনা ‘আজকের সংবাদপত্র’ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে এই মন্তব্য করেন দৈনিক সমকালের সম্পাদক গোলাম সারওয়ার।

সমকালের সম্পাদক বলেন, ‘কে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন এটা একটা কূটতর্ক। তবে কূটতর্ক হোক আর যাই হোক সবাইকে এটা মেনে নিতে হবে জাতির পিতাই স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন, অন্য কেউ নয়।’

সমকালের সম্পাদক বলেন, ‘স্বাধীনতার ঘোষণা হয়েছিল ৭ মার্চ। বঙ্গবন্ধুর সেই আহ্বান, সেই দীপ্ত ঘোষণা ওটাই ছিল স্বাধীনতার ঘোষণা। ওটাই স্বাধীনতার ঘোষণা, এর বাইরে কেউ এসে স্বাধীনতার ঘোষণা করেননি।’

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অভিযান অপারেশন সার্চ লাইট শুরুর পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এরপর ইপিআরের ওয়্যারলেস দিয়ে সে ঘোষণা প্রচার হয়। আর পরের দুই দিন চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এটার প্রচার চলে।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশিত বিভিন্ন দৈনিক প্রত্রিকায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা সংক্রান্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে গ্রেপ্তারের পূর্বেই শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন।

বিএনপি নেতা মওদুদ আহমেদের লেখা ‘এরা অব শেখ মুজিব’ (শেখ মুজিবুরের শাসনামল) গ্রন্থেও বলা হয়, শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা করেছেন।

১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত লে. কর্নেল জিয়াউর রহমানের লেখা জাতির জনক শিরোনামের প্রবন্ধের জিয়াউর রহমান ওই ২৫ মার্চের বিস্তারিত বিবরণ দেন। কিন্তু কোথাও নিজেকে স্বাধীনতার ঘোষক দাবি করেননি। তিনি বঙ্গবন্ধুকে জাতির জনক বলে আখ্যায়িত করেন।

১৯৭৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি হিসেবে জিয়াউর রহমানের দেয়া ভাষণেও তিনি ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ সম্পর্কে বলেছিলেন ‘কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে আপনাদের উদ্দেশে কথা বলার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল।’ কিন্তু তিনি ওই ভাষণেও নিজেকে স্বাধীনতার ঘোষক দাবি করেননি।

শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে এতে বলা হয়, ছাত্রনেতা থেকে তিনি আওয়ামী লীগ নেতা এবং এরপর বাংলাদেশের স্বাধীনতার রূপকার হয়েছেন। জীবনের তিন ভাগের একভাগ শেখ মুজিব কারাগারে কাটিয়েছেন। তিনি একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতে গ্রেপ্তারের পর ৯ মাস পাকিস্তানের কারাগারে ছিলেন। কিন্তু পাকিস্তানি সামরিক সরকার তার মনোবলে একটুও চির ধরাতে পারেনি। কোনো মুচলেকায় তিনি স্বাক্ষর করেননি।

১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল সরকার গঠন করার পর প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ তার ভাষণে বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কে বলেন, ‘২৫ মার্চ মাঝরাতে ইয়াহিয়া খান তার রক্তলোলুপ সাঁজোয়া বাহিনীকে বাংলাদেশের নিরস্ত্র মানুষের ওপর লেলিয়ে দিয়ে যে নর-হত্যাযজ্ঞের শুরু করেন তা প্রতিরোধ করার আহ্বান জানিয়ে আমাদের প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।’

স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি

জেনারেল ওসমানী ১৯৭২ সালের স্বাধীনতা দিবসে ‘পূর্ব দেশ’কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে জেনারেল ওসমানী বলেছেন, ‘২৫ মার্চ রাত ১০টায় বঙ্গবন্ধু আমাকে বলেছিলেন আপনাকে যেন ওরা কোনো অবস্থাতেই ধরতে না পারে। তিনি আমার ওপর যুদ্ধ পরিচালনা করার নির্দেশ প্রদান করেন।’

যিনি যুদ্ধ পরিচালনার জন্য সেনাপতি নিযুক্ত করেন তিনি যুদ্ধ ঘোষণা করেননি এ যুক্তি কোনোভাবে গ্রহণীয় নয়। ১৯৮০ সালে জেনারেল এমএজি ওসমানী বলেন, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ জিয়া স্বাধীনতা ঘোষণা করেননি। বঙ্গবন্ধুই সেদিন স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। ১৯৮০ সালের আগস্ট মাসে জাতীয় জনতা পার্টির কার্যালয়ে বঙ্গবন্ধুর স্মরণসভায় জেনারেল ওসমানী বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উদাহরণ সৃষ্টিকারী শীর্ষতম ব্যতিক্রম, তিনি একমাত্র মহান বাঙালি যিনি বিবেক ব্যবসা করেনি।’

জেনারেল ওসমানী জাতীয় সংসদে স্বাধীনতা ঘোষণা প্রসঙ্গত বিতর্কে সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে ১৯৮১ সালে পুনরায় দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুই, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।’

এ সম্পর্কে মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানী ২নং সেক্টর ও কে ফোর্সের অধিনায়ক শহীদ মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ বীর উত্তম বলেন, ‘১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আমি বিদেশে ছিলাম। ওমানের টেলিভিশন পর্দায় দেখেছি ভোটের ছবি। তার আগে ঝড়ের ছবি। দেশে ফিরে দেখলাম আমার দেখা বাংলাদেশের চেহারা পাল্টে গেছে। চারিদিকে দানা বেঁধে উঠেছে। সংগ্রাম, এবার স্বপ্ন স্বার্থক হবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর হবেন রাষ্ট্রনায়ক।’

‘ক্যান্টনমেন্টে এ নিয়ে আলোচনা হতো, মৃদু কণ্ঠে। এ আলোচনায় জাতিভেদ স্পষ্ট ছিল। কেউ প্রাণ খুলে আলোচনা করত না।’