অাকাশ জাতীয় ডেস্ক:
বর্তমান সরকার দেশে ব্যাপক উন্নয়ন করেছে দাবি করে এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখার তাগিদ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বলেছেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ গড়ার লক্ষ্য পূরণ করা সম্ভব হবে।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের স্মরণে একই ময়দানে বুধবার বিকালে আওয়ামী লীগ আয়োজিত সমাবেশে এই কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
গত অক্টোবরে ৭ মার্চের ভাষণকে ইউনেস্কো বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার পর এই প্রথম উদযাপিত হচ্ছে দিবসটি। এর পাশাপাশি আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে দলের শক্তির মহড়াও দিয়েছে আওয়ামী লীগ।
সমাবেশে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা তাদের নির্বাচনী প্রতীক নৌকা নিয়ে হাজির হয়। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তৈরি করা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভের সামনের পানিতেও ভাসানো হয় বেশ কিছু সত্যিকারের নৌকা।
দুইয়ে মিলে সাম্প্রতিক অন্য সমাবেশগুলোর চেয়ে আজকের সমাবেশটি ছিল বেশ বড়। ঢাকা ছাড়াও রাজধানী লাগোয়া গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, নরসিংদী থেকে আওয়ামী লীগ ছাড়াও দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী এবং দল সমর্থিত পেশাজীবীরাও যোগ দেন এতে।
প্রধানমন্ত্রী তার ৪৩ মিনিটের ভাষণে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ, বাংলাদেশের স্বাধীনতা, বঙ্গবন্ধু হত্যা, দেশে সামরিক শাসন জারি, জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার আমলে স্বাধীনতাবিরোধীদেরকে রাষ্ট্র ক্ষমতায় নিয়ে আসা, বর্তমান সরকারের আমলের উন্নয়নের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
কেন আওয়ামী লীগের আমলে উন্নয়ন হয়, আর অন্যরা কেন তা পারে না, সেই বিষয়টিও বিবেচনা করতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
সরকারের উন্নয়ক কর্মকাণ্ড দেশবাসীর কাছে তুলে ধরতে নেতা-কর্মীদের প্রতি নির্দেশনা দেন শেখ হাসিনা। বলেন, ‘যে উন্নয়নের কাজ আমরা করেছি, তা সাধারণ মানুষের কাছে তা তুলে ধরতে হবে। আমাদের নেতা-কর্মী যারা আছে, তাদেরকে আহ্বান জানাব আপনারা গ্রামে গঞ্জে, প্রতিটি পাড়া মহল্লায় উন্নয়নের যে কাজ আমরা করেছি, সেটা জনগণের মধ্যে তুলে ধরবেন।’
‘ভবিষ্যতের যে কাজ আমরা করব, সেগুলোও যেন মানুষের কাছে তুলে ধরবেন। আমরা মেট্রোরেল তৈরি করছি। আমরা টানেল তৈরি করছি, আমরা ফ্লাইওভার তৈরি করছি, একটা মানুষও আজ কুঁড়েঘরে বাস করে না, গৃহহারা মানুষ, যারা একেবারে নিঃশ্ব তাদেরকে বিনা পয়সায় ঘর করে দিচ্ছি।’
‘আমরা বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, ৮০ হাজার প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের ভাতা দেই, আট লক্ষ প্রতিবন্ধীকে ভাতা দেই, ৬৭ লক্ষ মানুষকে আমরা বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, স্বামী পরিত্যাক্তা ভাতা দেই।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যুবকদের জন্য কর্মসংস্থান ব্যাংক করেছি। কোনো জামানত ছাড়াই দুই লক্ষ টাকা ঋণ নিয়ে ব্যবসা বাণিজ্য করে তারা নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে, এমনকি নিজেরা অন্যদের চাকরি দিতে পারে সেই ব্যবস্থাও আমরা করে দিয়েছি।’
যারা বিদেশে যায়, তাদের জন্য প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক করে দিয়েছি। সেখান থেকে ঋণ নিয়ে মানুষ বিদেশে যেতে পারে, ভিটামাটি বিক্রি করতে হয় না। পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক করে দিয়েছি, একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প করে দিয়েছি। প্রতিটি পরিবার যেন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে।
‘সমগ্র বাংলাদেশকে আমরা উন্নয়নের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি’ এমন মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘উন্নয়নের ধারাবাহিকতা যেন বজায় থাকে। উন্নয়নের এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ক্ষুধামু্ক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত, সোনার বাংলাদেশ হিসেবে আমরা গড়ে তুলতে পারব।’
বাংলাদেশ দরিদ্র থাকবে না, উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমাদের যে গ্র্যাজুয়েশন হবে, আমরা তা এগিয়ে নিয়ে যাব। এই বাংলাদেশ আমরা রক্ত দিয়ে স্বাধীন করেছি। এই বাংলাদেশকে জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তুলব।
তিনি (বঙ্গবন্ধু) রাজনৈতিক স্বাধীনতা দিয়ে গেছেন, অর্থনৈতিক মুক্তির পথে যখন পা বাড়িয়েছেন, কাজ শুরু করেছেন, আমাদের কাছ থেকে তখন কেড়ে নেয়া হয়েছে। আজকে আমাদের দায়িত্ব তার আকাঙ্ক্ষা পূরণ করা। অর্থনৈতিক মুক্তির মাধ্যমে ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে বিশ্বসভায় বিজয়ী জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে বাংলাদেশ চলবে।
বর্তমান সরকারের উন্নয়নের বর্ণনা দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা এটাই চাই, আজকে বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীনতার সুফল ভোগ করছে। আজকে আমাদের উন্নয়ন গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত। আমরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বিতার পথে এগিয়ে যাচ্ছি।’
শিক্ষার জন্য বিনামূল্যে বই বিতরণ, শিক্ষাবৃত্তি, ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠালে মায়েদের মোবাইল ফোনে টাকা পাঠানোর উদ্যোগের কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশ যেন কারও কাছে ভিক্ষা না করে চলে, তার দিকে লক্ষ্য রেখে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। ২৬ হাজার কিলোমিটার সড়ক করেছি। বিভিন্ন রাস্তাঘাট উন্নত করে দিয়েছি। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, ঢাকা ময়মনসিংহ মহাসড়ক চার লেন করেছি, ঢাকা-সিলেট করব এমনকি ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক যেন পায়রা বন্দর পর্যন্ত যায়, সেটা দেখব।’
‘পদ্মা সেতু নিজেদের অর্থায়নে আমরা তৈরি করে দিচ্ছি, ৪৯টি বড় সেতু করেছি, যোগাযোগ ব্যবস্থার সম্পূর্ণ নেটওয়ার্ক করে দিচ্ছি। …প্রবৃদ্ধি অর্জনে সারা বিশ্বে পাঁচটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ একটি।’
‘তারা কেন পারেনি?’
আওয়ামী লীগের সঙ্গে অন্য দলগুলোর তুলনা করারও আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে, দেশে উন্নয়ন হচ্ছে। আমার প্রশ্ন আওয়ামী লীগ থাকলে দেশ উন্নত হয়, এর আগে যারা ক্ষমতায় ছিল জেনারেল জিয়া, জেনারেল এরশাদ, খালেদা জিয়া, কই তারা তো দেশকে উন্নত করতে পারেনি।’
‘কেন পারেনি? কারণ, তারা তো স্বাধীনতায় বিশ্বাস করত না, বাংলাদেশের উন্নয়নে বিশ্বাস করত না। যুদ্ধাপরাধীদেরকে নিয়েই রাষ্ট্র চালাতে চাইত। যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতাই চায়নি, তারা দেশের জন্য উন্নতি করবে কেন? তারা নিজেদের উন্নতি করেছে।’
‘ভাঙা স্যুটকেস জাদুর বাক্স হয়ে গেছে, ছেড়া গেঞ্জি ফ্রেঞ্চ শিফন হয়ে গেছে।’
প্রথমে জিয়াউর রহমান ও পরে খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসে যুদ্ধাপরাধী ও স্বাধীনতাবিরোধীদেরকে মন্ত্রী ও বঙ্গবন্ধুর খুনিদেরকে পুরষ্কৃত করার বিষয়টিও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
আপনাদের কাছে আমার আহ্বান, যুদ্ধাপরাধী, খুনিরা যেন আর কোনোদিন ক্ষমতায় আসতে না পারে। যারা এতিমের টাকা চুরি করে, যারা দেশের টাকা বিদেশে পাচার করে, যারা দেশের মানুষকে হত্যা করে, যারা আগুন দিয়ে মানুষ পোড়ায়…’
‘এরা ক্ষমতায় কোনোদিন যেন আর না থাকতে পারে, দেশকে যেন আর ধ্বংসের দিকে না নিতে পারে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় যেন বাংলাদেশ এগিয়ে যায়, তার জন্য সবাইকে আমি আহ্বান জানাই।’
‘দেশকে নরকে পরিণত করেছিল বিএনপি’
বিএনপি-জামায়াত জোটের শাসনামলেরও তীব্র সমালোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী। সে সময় ক্ষমতাসীনরা ব্যাপক দুর্নীতি করেছেন অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘৮১ সালে শুনেছি ভাঙা স্যুটকেস আর ছেড়া গেঞ্জি ছাড়া নাকি জিয়াউর রহমান কিছু রেখে যায়নি তার পরিবারের জন্য। আর তারাই আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ, সম্পদের পাহাড় গড়ল, বিদেশে অর্থ পাচার করল।’
‘তাদের দুর্নীতি, অপকর্ম, হত্যা, খুন, জঙ্গিবাদ সৃষ্টি, বাংলাভাই সৃষ্টি, কী না করেছে?’
‘তারা দেশকে নরকে পরিণত করেছিল। এমনকি সন্তান সম্ভবা নারীও রেহাই পায়নি। দুই দিন আগে সন্তান প্রসব করেছে, এমনকি বাচ্চা পেটে, তাদেরকেও রেপ করা হয়েছে।’
বিএনপির অপকর্মের জন্যই দেশে জরুরি অবস্থা জারি হয়েছিল অভিযোগ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। দুই জন সংসদ সদস্যকে হত্যা করা হয়েছে। ছয় বছরের শিশু থেকে শুরু করে গ্রামে গ্রামে মা বোনদের পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কায়দায় নির্যাতন করা হয়েছে।’
‘পুড়িয়ে মানুষ হত্যা ছিল খালেদার উৎসব’
২০১৪ সালে নির্বাচন ঠেকাতে এবং এক বছর পর সরকার পতনের দাবিতে আন্দোলনে নাশকতারও তীব্র সমালোচনা করেন শেখ হাসিনা। বলেন, ৩০৩৫ জন লোককে আগুন দিয়ে পুড়িয়েছে, ৫০০ এর কাছাকাছি মানুষকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে।’
খালেদার উৎসব ছিল আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মানুষকে হত্যা করা। মানুষকে পুড়িয়ে পুড়িয়ে হত্যা করা, ওইটাই তার আন্দোলন। জনগণের জন্য রাজনীতি করি, আর আন্দোলনের নামে মানুষকে পুড়িয়ে পুড়িয়ে হত্যা করা-এটা নাকি আন্দোলন!
যে কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়
মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদেরকে আশ্রয় দেয়ার কারণও জানান প্রধানমন্ত্রী। বলেন, ‘মিয়ানমারের ১০ লক্ষের বেশি মানুষ, তাদের ওপর অত্যাচার হয়েছে, তারা আমাদের কাছে আশ্রয় চেয়েছে, মানবিক কারণে আমরা তাদেরকে আশ্রয় দিয়েছি। তাদের রিলিফের ব্যবস্থা, থাকার ব্যবস্থা আমরা করে দিচ্ছি। তাদেরকে আশ্রয় দিয়ে আমরা মানবতার পরিচয় দিয়েছি।’
‘আমরা কেন করেছি? ৭১ সালে আমাদেরও এক সময় দুর্দিন ছিল। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কারণে আমাদেরও এক কোটি মানুষকে ভারতের মাটিতে আশ্রয় নিতে হয়েছিল। সেই কারণে আমরা তাদেরকে আশ্রয় দিয়েছি, তাদেরকে খাদ্য দিচ্ছি।’
‘আজকে সারা বিশ্ব আমাদের পক্ষে আছে, সারা বিশ্ব বাংলাদেশকে আজকে সম্মান জানাচ্ছে, সাধুবাদ জানাচ্ছে।’
আকাশ নিউজ ডেস্ক 




















