ঢাকা ০৫:১৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬, ৭ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
বাগেরহাটে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করলেন মামুনুল হক ক্ষমতায় গেলে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন হবে: তারেক রহমান বাংলাদেশের পরিবর্তনে গনভোটে হ্যাঁ ভোট জরুরি: সাখাওয়াত হোসেন পোস্টাল ভোট সফল করতে পারলে বাংলাদেশের নাম ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রিতে থাকবে: সিইসি ঢাকায় ফ্ল্যাট পাচ্ছে ওসমান হাদির পরিবার ইসির আচরণ ও কর্মকাণ্ড সন্দেহজনক : রিজভী নির্বাচনের আগেই লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার করতে হবে: প্রধান উপদেষ্টা ‘না’ ভোট দেওয়া মানেই স্বৈরাচারের পক্ষে দাঁড়ানো: শারমীন মুরশিদ নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার যেকোনো অপচেষ্টা মোকাবিলায় প্রশাসনকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে : পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বস্তিবাসীদের জন্য উন্নত শিক্ষা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা হবে: তারেক রহমান

ভেজা চোখের অনিশ্চিত রোহিঙ্গা জীবন

অাকাশ জাতীয় ডেস্ক:

টিনশেডের একটি ঘরে বিষণ্ণ মনে বসে আছে জুবায়ের – বয়স ১১-১২ বছরের মতো হবে। কেমন আছ? জানতে চাইতেই চোখ ভিজে উঠল। ছোট এই শিশু তার ভাষায় জানাল, বাবা-মার জন্য পেট পোড়ে- অর্থাৎ কষ্ট হয়।

জুবায়ের মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসেছে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে। তার বাবা-মাকে হত্যা করা হয়েছে। প্রতিবেশীদের সঙ্গে পালিয়ে এসে এখন সে রয়েছে উখিয়ার বালুখালি ক্যাম্পে।

প্রশ্ন ছিল কীভাবে সময় কাটে তার? জুবায়ের জানাল ক্যাম্পের একটা মক্তবে পড়াশোনা করে সে, আর থাকে একটা পরিবারের সঙ্গে, সেখানে খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা আছে। এটুকু বলতে গিয়েই কান্নায় গলা বুজে আসে তার, চোখে টলমল করে পানি।

জুবায়েরের মতো অসংখ্য শিশু কক্সবাজারের উখিয়া এবং টেকনাফে রয়েছে, সরকারি হিসাব বলছে এদের সংখ্যা ৪০ হাজারের মতো। তবে এসব শিশু অন্য শিশুদের তুলনায় একেবারে ভিন্ন, কারণ এরা বাবা-মা এবং পরিবারের সদস্যদের হারিয়েছে।

টিউবওয়েলে পানি তুলছিল নার্গিস। দুপুরবেলা – তাই আরও চার-পাঁচটি শিশুর সঙ্গে গোসলের জন্য পানির ব্যবস্থা করছে ১৩ বছরের নার্গিস । এরই এক ফাঁকে কথা বলছিলাম তার সঙ্গে।

নার্গিসের কথায় এখানে “একেবারেই আমার মন বসে না। আমি মিয়ানমারে ফেরত যেতে চাই। কারণ সেখানে আমার বাবা-মার কবর আছে”।

উখিয়ার ক্যাম্পগুলো ঘুরে আমি এমন অনেক শিশুর দেখা পেয়েছি, যারা তাদের বাবা-মাকে হারিয়ে ফেলেছে। তারা এখানে বিভিন্ন রোহিঙ্গা পরিবারের সঙ্গে থাকছে।

তাদের জন্য সরকারি এবং বেসরকারি বেশকিছু উদ্যোগও চোখে পড়ল।

উখিয়া উপজেলার সমাজসেবা কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাসান বলছিলেন যে, এতিম শিশুদের জন্য বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করেছে সরকার, তবে সেটা অল্প সময়ের।

“বেসরকারি সংস্থার ফান্ডে সরকার প্রকল্প হাতে নিয়েছে। কিন্তু সেটা ছয় মাসের জন্য। দীর্ঘমেয়াদে কোনো কিছু নেই আপাতত, কারণ এসব কিছু নির্ভর করে ফান্ডের উপর,” বলছিলেন মি. হাসান।

তিনি আরো বলেন, “বর্তমানে ৪০ হাজার শিশুর যে পরিমাণ পুষ্টিকর খাদ্য, চিকিৎসা এবং ভালো থাকার স্থান দরকার সেটা নেই। সবচেয়ে জরুরি যেটা দরকার সেটা হলো এতিম এসব শিশুর মানসিক সহায়তা দেয়া – যেটা একেবারেই নেই। কারণ তারা বাবা-মা হারিয়েছে তাদের সবচেয়ে বেশি মানসিক সাপোর্ট দরকার”।

নিয়ামত উল্লার বয়স ১২। থাকার জন্য সেই অর্থে তার কোনো পরিবার মেলেনি। কুতুপালং ক্যাম্পে রাতটা কোনোরকম পার করে। সারা দিন রাস্তায় ঘুরে বেড়ায় অথবা মক্তবে এসে পড়াশোনা করে।

“আমাদের বাড়িতে বোমা মারা হয়,” বলছিল নিয়ামত। “ওই সময় বাড়ির বাইরে থাকায় আমি বেঁচে যাই। আমার পরিবারের সবাই মারা গেছে”।

নিয়ামত উল্লার সঙ্গে যখন আমি কথা বলি, তখন তার চোখেমুখে ভাবলেশহীন একটা দৃষ্টি আমি দেখেছি। মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা হাজার হাজার এতিম শিশুর পড়াশোনা বলতে মক্তবে সময় কাটানো, আর মাথাগোঁজার জন্য কোনো রোহিঙ্গা পরিবারে ঠাঁই বা দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয়।

কিন্তু এতো অল্প বয়সে বাবা-মাকে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে দেখা এসব শিশুর মনের কষ্ট যে কোন কিছুতেই মেটে না, সেটা তাদের বারবার ভিজে ওঠা চোখ দেখলেই বোঝা যায়।

 

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ভেজা চোখের অনিশ্চিত রোহিঙ্গা জীবন

আপডেট সময় ০৯:০০:১০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০১৮

অাকাশ জাতীয় ডেস্ক:

টিনশেডের একটি ঘরে বিষণ্ণ মনে বসে আছে জুবায়ের – বয়স ১১-১২ বছরের মতো হবে। কেমন আছ? জানতে চাইতেই চোখ ভিজে উঠল। ছোট এই শিশু তার ভাষায় জানাল, বাবা-মার জন্য পেট পোড়ে- অর্থাৎ কষ্ট হয়।

জুবায়ের মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসেছে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে। তার বাবা-মাকে হত্যা করা হয়েছে। প্রতিবেশীদের সঙ্গে পালিয়ে এসে এখন সে রয়েছে উখিয়ার বালুখালি ক্যাম্পে।

প্রশ্ন ছিল কীভাবে সময় কাটে তার? জুবায়ের জানাল ক্যাম্পের একটা মক্তবে পড়াশোনা করে সে, আর থাকে একটা পরিবারের সঙ্গে, সেখানে খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা আছে। এটুকু বলতে গিয়েই কান্নায় গলা বুজে আসে তার, চোখে টলমল করে পানি।

জুবায়েরের মতো অসংখ্য শিশু কক্সবাজারের উখিয়া এবং টেকনাফে রয়েছে, সরকারি হিসাব বলছে এদের সংখ্যা ৪০ হাজারের মতো। তবে এসব শিশু অন্য শিশুদের তুলনায় একেবারে ভিন্ন, কারণ এরা বাবা-মা এবং পরিবারের সদস্যদের হারিয়েছে।

টিউবওয়েলে পানি তুলছিল নার্গিস। দুপুরবেলা – তাই আরও চার-পাঁচটি শিশুর সঙ্গে গোসলের জন্য পানির ব্যবস্থা করছে ১৩ বছরের নার্গিস । এরই এক ফাঁকে কথা বলছিলাম তার সঙ্গে।

নার্গিসের কথায় এখানে “একেবারেই আমার মন বসে না। আমি মিয়ানমারে ফেরত যেতে চাই। কারণ সেখানে আমার বাবা-মার কবর আছে”।

উখিয়ার ক্যাম্পগুলো ঘুরে আমি এমন অনেক শিশুর দেখা পেয়েছি, যারা তাদের বাবা-মাকে হারিয়ে ফেলেছে। তারা এখানে বিভিন্ন রোহিঙ্গা পরিবারের সঙ্গে থাকছে।

তাদের জন্য সরকারি এবং বেসরকারি বেশকিছু উদ্যোগও চোখে পড়ল।

উখিয়া উপজেলার সমাজসেবা কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাসান বলছিলেন যে, এতিম শিশুদের জন্য বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করেছে সরকার, তবে সেটা অল্প সময়ের।

“বেসরকারি সংস্থার ফান্ডে সরকার প্রকল্প হাতে নিয়েছে। কিন্তু সেটা ছয় মাসের জন্য। দীর্ঘমেয়াদে কোনো কিছু নেই আপাতত, কারণ এসব কিছু নির্ভর করে ফান্ডের উপর,” বলছিলেন মি. হাসান।

তিনি আরো বলেন, “বর্তমানে ৪০ হাজার শিশুর যে পরিমাণ পুষ্টিকর খাদ্য, চিকিৎসা এবং ভালো থাকার স্থান দরকার সেটা নেই। সবচেয়ে জরুরি যেটা দরকার সেটা হলো এতিম এসব শিশুর মানসিক সহায়তা দেয়া – যেটা একেবারেই নেই। কারণ তারা বাবা-মা হারিয়েছে তাদের সবচেয়ে বেশি মানসিক সাপোর্ট দরকার”।

নিয়ামত উল্লার বয়স ১২। থাকার জন্য সেই অর্থে তার কোনো পরিবার মেলেনি। কুতুপালং ক্যাম্পে রাতটা কোনোরকম পার করে। সারা দিন রাস্তায় ঘুরে বেড়ায় অথবা মক্তবে এসে পড়াশোনা করে।

“আমাদের বাড়িতে বোমা মারা হয়,” বলছিল নিয়ামত। “ওই সময় বাড়ির বাইরে থাকায় আমি বেঁচে যাই। আমার পরিবারের সবাই মারা গেছে”।

নিয়ামত উল্লার সঙ্গে যখন আমি কথা বলি, তখন তার চোখেমুখে ভাবলেশহীন একটা দৃষ্টি আমি দেখেছি। মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা হাজার হাজার এতিম শিশুর পড়াশোনা বলতে মক্তবে সময় কাটানো, আর মাথাগোঁজার জন্য কোনো রোহিঙ্গা পরিবারে ঠাঁই বা দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয়।

কিন্তু এতো অল্প বয়সে বাবা-মাকে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে দেখা এসব শিশুর মনের কষ্ট যে কোন কিছুতেই মেটে না, সেটা তাদের বারবার ভিজে ওঠা চোখ দেখলেই বোঝা যায়।