অাকাশ জাতীয় ডেস্ক:
ছোট-বড় অগনিত জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে বর্ণাঢ্য গণ শোভাযাত্রায় উৎসব মুখর পরিবেশে যশোরবাসীর গর্ব ৬ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক ‘যশোর মুক্ত দিবস’ উদযাপিত হয়েছে।
১৯৭১ সালের ১১ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জনসভার মাঠ ঐতিহাসিক টাউন হল ময়দানে যেখানে বক্তব্য রেখেছিলেন তৎকালীণ প্রবাসী সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজ উদ্দিন আহমেদসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ। সেই ঐতিহাসিক টাউন হল মাঠের শতাব্দী বটমূলে রওশন আলী মঞ্চে এ দিবস উপলক্ষে বুধবার সকাল সাড়ে ৯টায় হাজারো কণ্ঠে জাতীয় সংগীত পরিবেশিত হয়। এরপর বাদ্যের তালে তালে বেলুন-ফেস্টুন উড়িয়ে জাতীয় পতাকাশোভিত বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক আশরাফ উদ্দিন।
এসময় সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে মহান স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্তলগ্নে মুক্তিপাগল দামাল ছেলেদের অদম্য সাহস আর বীরত্ব গাঁথায় বিজয়ের আগেই যশোর জেলা বর্বর পাকিস্তানী হানাদারমুক্ত হয়। যশোর প্রতিষ্ঠিত হয় দেশের প্রথম শত্রুমুক্ত জেলা হিসেবে। তিনি বলেন, স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে। এখন সময় উন্নত বাংলাদেশ গড়ার। উন্নত মানুষ হয়ে উন্নত বাংলাদেশ গড়ায় সকলকে ভূমিকা রাখার আহবান জানান তিনি।
এসময় উপস্থিত ছিলেন জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সাইফুজ্জামান পিকুল, প্রবীণ শিক্ষক তারাপদ দাস, জাসদের কার্যকরী সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা অ্যাড. রবিউল আলম, একাত্তরের বৃহত্তর যশোরের মুজিব বাহিনীর কমান্ডার আলী হোসেন মণি, অশোক রায়, রাজেক আহমেদ, আবুল হোসেন, এএইচএম মুযহারুল ইসলাম মন্টু, মোহাম্মদ আলী স্বপন, আফজাল হোসেন দোদুল, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির পলিট ব্যুরো সদস্য ইকবাল কবির জাহিদ, জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি ডিএম শাহিদুজ্জামান, জেলা শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. মাহমুদ হাসান বুলু,যশোর সংবাদপত্র পরিষদের সভাপতিএকরাম-উদ-দ্দৌলাসহ যশোরের বীর মুক্তিযোদ্ধা, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, সরকারি-বেসরকারি প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মীবৃন্দ এবং বিভিন্ন বয়সের সাধারণ জনগণ অংশ নেন।
উদ্বোধনের পর বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা মুজিব সড়ক, দড়াটানা হয়ে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র সড়ক হয়ে চৌরাস্তা রবীন্দ্রনাথ সড়ক হয়ে বিজয় স্তম্ভে এসে শেষ হয়। সেখানে জেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে পুষ্পস্তবক অর্পন করা হয়।
শোভাযাত্রা শুরুর আগে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট যশোরের শিল্পীরা পরিবেশন করেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কালজয়ী গণসঙ্গীত। উল্লেখ্য বাঙালি জাতির জীবনে মহিমান্বিত এক গৌরবোজ্জ্বল দিন ৬ ডিসেম্বর। ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বরের এই দিনে মহান মুক্তিযুদ্ধে অবিভক্ত বাংলার প্রথম জেলা যশোর শত্রুমুক্ত হয়। সেদিনই মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশের মধ্যে প্রথম বিজয় সূচিত হয়। ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়ে যশোরের মুক্তিযোদ্ধারা তাদের জেলাকে প্রথম শত্রুমুক্ত করে। বয়ে আনেন যশোরবাসীর জন্য বিরল এক সম্মান।
যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশ নয় মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধকালীন পাকবাহিনীর পরাজয়ে এক অনাড়ম্বর আনুষ্ঠানিকতায় যশোরের কালেক্টরেট ভবনে ওড়ানো হয় স্বাধীন বাংলার পতাকা। তাই ১৯৭২ সাল থেকে প্রতিবছর যশোরবাসী বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনায় উদযাপন করে এ দিবস।
১৯৭১ সালের ৫ ডিসেম্বর যশোর ক্যান্টনমেন্টের অদূরে মনোহরপুর গ্রামে পাকসেনা বাহিনীর সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে তুমুল লড়াই হয়। প্রচুর হতাহতের এক পর্যায়ে পাকবাহিনী অস্ত্রশস্ত্র ফেলে পিছু হটে যশোর ক্যান্টনমেন্টে আশ্রয় নেয়। ঐদিনই বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী তথা মুক্তিযোদ্ধা ও বেঙ্গল রেজিমেন্টের সাথে ইতিহাসের খাতায় মিত্রবাহিনী নামে পরিচিত ভারতীয় সেনাবাহিনী তিন দিক অবরোধ করে পাকসেনাদের পালাবার পথ খোলা রেখে পাহারা দেয়।
১৯৭১-এর ৬ ডিসেম্বর যশোর ক্যান্টনমেন্টে পাকসেনা বাহিনী তাদের অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ সকল সরঞ্জাম রেখে পালিয়ে যায়। মূলতঃ তাদের খুলনা অভিমুখে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল তাদেরকে একযোগে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা। সে উদ্দেশ অনেকটা সফলও হয়।
১৯৭১ এর ৭ ডিসেম্বর মঙ্গলবার খুব ভোরে মুক্তিযুদ্ধকালীন ৮ নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর এম এ মঞ্জুর ও মিত্রবাহিনীর নবম ডিভিশন কমান্ডার মেজর জেনারেল দলবীর সিংহ যশোর ক্যান্টনমেন্টে প্রবেশ করেন। সে সময় তারা দেখেন সব কিছু ঠিকঠাক থাকলেও পাকবাহিনী রাতের আঁধারে পালিয়েছে। যশোর ক্যান্টনমেন্ট শত্রুমুক্ত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে। বিজয় উল্লাসে মেতে ওঠে যশোরসহ স্বাধীনতা ও মুক্তিকামী বীর বাঙালী। তৎকালীন যশোর ও ফরিদপুরের জোনাল অ্যাকটিং চেয়ারম্যান এমপি গৌর চন্দ্র বালা ও নন্দ দুলালের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা দলে দলে প্রবেশ করেন যশোর কালেক্টরেট ভবনে। যশোর হয় শত্রুমুক্ত ।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 






















