বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে মায়ের সঙ্গে সর্বশেষ কথা বলেছিলেন মোহাম্মদ ইয়াছিন (১৮)। সেখান থেকে বৃহস্পতিবার চকরিয়ায় ফেরেন।
তখনো তিনি পিকআপে সবজি তোলার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। মাকে জানিয়েছিলেন, সবজি নিয়ে টেকনাফে যাচ্ছেন এবং সকালে ফিরে আসবেন। তবে মায়ের সেই প্রতীক্ষা আর সফল হয়নি। সকালে ইয়াছিন ফিরেছেন, কিন্তু জীবিত অবস্থায় নয়; নিথর দেহে। যে পিকআপ কেনার জন্য মা-বাবার কাছে বায়না ধরেছিলেন এবং মাত্র ১৫ দিন আগে সাত লাখ টাকা দিয়ে সেটি কিনেছিলেন, সেই গাড়িটিই শেষ পর্যন্ত তাঁর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াল। কিন্তু ঘুম থেকে উঠে মা শুনলেন, ছেলে আর নেই। যে পিকআপ কেনার জন্য মা-বাবার কাছে বায়না ধরেছিলেন, মাত্র ১৫ দিন আগে ৭ লাখ টাকা দিয়ে কেনা সেই পিকআপেই শেষ হলো তাঁর পথচলা। শেষবারের মতো তাঁকে দেখতে ভিড় করেন আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও পরিচিতজনেরা। ঘরের বারান্দা থেকে ভেসে আসছিল কান্নার শব্দ। ১৫ দিন আগে পিকআপটি কিনে দেওয়া হয়। বাড়ির উঠানে ছেলের নিথর দেহের পাশে স্বজনদের কান্নায় স্পষ্ট হয়ে উঠছিল, একজন তরুণের মৃত্যু কীভাবে তছনছ করে দিতে পারে একটি পরিবারকে।
কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার খুটাখালী ইউনিয়নের নয়াপাড়া সবুজ পাহাড় এলাকায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত সোয়া ১২টার দিকে দুর্ঘটনাটি ঘটে। একটি বাসের সঙ্গে ইয়াছিনের পিকআপটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই ইয়াছিনসহ দুজন নিহত হন। এই দুর্ঘটনায় নিহত অপর ব্যক্তি হলেন টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের ফুলের ডেইল এলাকার বাসিন্দা আবদুল্লাহ (২৭)।
শুক্রবার বিকেলে চকরিয়ার সাহারবিল ইউনিয়নের শাহপুরা এলাকায় ইয়াছিনের নানাবাড়ির উঠানে মরদেহ রাখা হলে স্বজন ও প্রতিবেশীদের আহাজারিতে এক হৃদয়বিদারক পরিবেশ তৈরি হয়। মা শওকত আরার বুকফাটা আর্তনাদে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশ। তিনি বারবার ছেলেকে ফিরে পাওয়ার আকুতি জানাচ্ছিলেন। ইয়াছিনের বড় বোন জান্নাতুল নাইমা জানান, আগে ইজিবাইক চালালেও নিজের একটি পিকআপ কেনার প্রবল ইচ্ছা ছিল ভাইয়ের। সেই স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়েই ঝরল প্রাণ। ছেলে কোথায়, কী করছেন জানতে ফোন করেছিলেন মা শওকত আরা। কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন শওকত আরা। ছেলেকে আর কোনো দিন ফিরে পাবেন না, এ সত্য যেন কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না তিনি।
ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, গত ১০-১২ দিন পিকআপটি চালক দিয়ে চালানো হলেও গত বুধবার থেকে ইয়াছিন নিজেই এটি চালানো শুরু করেন। সেদিন চট্টগ্রামে মালামাল পৌঁছে দেওয়ার পর বৃহস্পতিবার রাতে টেকনাফের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন তিনি। দুর্ভাগ্যবশত, এই যাত্রাটিই তাঁর জীবনের শেষ যাত্রা হয়ে রইল।
চার ভাইবোনের মধ্যে ইয়াছিন ছিলেন তৃতীয়। তাঁর বড় ভাই মোহাম্মদ সৈয়দ হোসেন মালয়েশিয়াপ্রবাসী, বড় বোন জান্নাতুল নাইমার বয়স ২২ এবং ছোট ভাই মোহাম্মদ রবিউল হোসেনের বয়স ১৫ বছর, যে কি না রাজমিস্ত্রির কাজ করে। তাঁদের বাবা মোহাম্মদ দুলাল লামায় ব্যবসা করেন। যদিও পরিবারটির পৈতৃক বাড়ি বান্দরবানের লামা উপজেলায়, তবে গত ২০ বছর ধরে তাঁরা চকরিয়ার সাহারবিল ইউনিয়নের শাহপুরা এলাকায় নানাবাড়িতে বসবাস করছেন। বড় ভাই মোহাম্মদ সৈয়দ হোসেন (২৬) মালয়েশিয়াপ্রবাসী।
শুক্রবার বিকেল পাঁচটায় শাহপুরা জামে মসজিদ মাঠে জানাজা শেষে স্থানীয় সামাজিক কবরস্থানে ইয়াছিনকে দাফন করা হয়। ১৫ দিন আগে শুরু হওয়া একটি নতুন স্বপ্নের পথচলা এভাবে করুণ পরিণতির মধ্য দিয়ে শেষ হলো, যা পুরো পরিবারকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে দিয়ে গেল।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 























