ঢাকা ১১:৩৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
শেরেবাংলা নগরে সরছে সচিবালয়, অনুমোদন দিল মন্ত্রিসভা দেশ গড়ার কাজে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর মক্কা-মদিনায় হুমকি এলে বাংলাদেশ চুপ থাকবে না: শামা ওবায়েদ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে সফল পারমাণবিক বিক্রিয়া সম্পন্ন চলতি অক্টোবরের শেষ দিকে জাপান সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাৎ করলেন চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন উদ্বোধনের আগেই কক্সবাজার বিমানবন্দরের নতুন টার্মিনালে যাত্রীসেবা শুরু সাইবার সুরক্ষা আইন যেন নিপীড়নমূলক না হয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অক্টোবর-নভেম্বরে তিন দেশ সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘের সন্ত্রাস দমন তহবিলে কাতারের ১৪১ মিলিয়ন ডলার অনুদান

উপনিবেশোত্তর রাষ্ট্র ও সমাজে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সংকট

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় কাঠামো গঠনের প্রক্রিয়ায় ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষার ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক রাজনীতির প্রভাব এক বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে বাংলা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী চেতনার পাশাপাশি দেশের অবাঙালি সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর মানুষও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এমনকি অনেক অবাঙালি মুক্তিযোদ্ধা তাদের বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ রাষ্ট্রীয় খেতাবও অর্জন করেছিলেন। কিন্তু ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রের সংবিধান রচনার সময় শাসক দল আওয়ামী লীগ ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’কে একমাত্র মূলনীতি হিসেবে নির্ধারণ করে। সংবিধানের এই ভাষ্য অনুযায়ী, জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনকারী বাঙালি জাতির ঐক্যই হলো জাতীয়তাবাদের ভিত্তি। এই পদক্ষেপের ফলে ভারতের পশ্চিমবঙ্গসহ অন্যান্য অঞ্চলের বাঙালি থেকে বাংলাদেশের বাঙালিকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হলেও, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর জাতিগত স্বীকৃতির বিষয়টি অবহেলিত রয়ে যায়। ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষার ঔপনিবেশিক রাজনীতি ৩৪। আমরা আগেই বলেছি, বাংলাদেশের সশস্ত্র স্বাধীনতাযুদ্ধের পেছনে প্রধানত বাংলা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী চেতনা সক্রিয় থাকলেও, দেশটির অপরাপর অবাঙালি সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীসমূহের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ সেই মরণপণ যুদ্ধে নানাভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। সাংবিধানিকভাবে গৃহীত এই জাতীয়তাবাদের সংজ্ঞা নিরূপণ করেলেখা হয়, “ভাষাগত ও সংস্কৃতিগত একক সত্তাবিশিষ্ট যে বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ ও সংকল্পবদ্ধ সংগ্রাম করিয়া জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জন করিয়াছেন, সেই বাঙালি জাতির ঐক্য ও। 286. অর্থাৎ বাংলাদেশের অধিবাসী বাঙালি জনগোষ্ঠীর জাতীয়তাবাদই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জাতীয়তাবাদ। কিন্তু অগ্রে জাতি ভাষা না শিখিয়া পরের ভাষা শিখা কোনও মতে উচিত নহে।”২৯০ তথ্যসূত্র: ২৮৬ দেখুন, প্রাগুক্ত, ১৯৭২, অনুচ্ছেদ ৯ ২৮৭ আনিসুজ্জামান, “আমাদের মুক্তিসংগ্রাম ও সংবিধানের মূলনীতি”, বাঙালী ও বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা: ১১৪। একটি রাষ্ট্রকে একই সঙ্গে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ ও ‘ধর্মীয়প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে বিকশিত করার ধারণাটি হাস্যকর বটে। 124 ২৮৯ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান, ২০১১, অনুচ্ছেদ ৬[২] ২৯০ ঈশ্বরচন্দ্র শর্মা, “বাক্যকথন – ভাষা”, বোধোদয়, পৃষ্ঠা: ৩২।

সেই সময়ের শাসকমহলের জাতীয়তাবাদী আত্মাভিমান এতটাই তীব্র ছিল যে, অবাঙালি সংখ্যালঘু জাতিসত্তাগুলোকে ‘উপজাতি’ বা অধস্তন মর্যাদায় দেখা হতো। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান এদেশের অবাঙালি জাতিগোষ্ঠীসমূহকে প্রকাশ্যে বাঙালি হয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত চাকমাসহ অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে ‘ট্রাইব’ হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের বাঙালি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার যে অভিপ্রায় দেখানো হয়েছিল, তা ছিল প্রকৃতপক্ষে উগ্র জাতিবাদী রাজনীতিরই বহিঃপ্রকাশ। সমালোচকদের মতে, জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ববাদ যদি ফ্যাসিবাদী ভাবাদর্শের অংশ হয়, তবে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর এই অবস্থান সেই ফ্যাসিবাদী চিন্তারই প্রতিফলন ছিল। পরবর্তীতে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’কে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ দ্বারা প্রতিস্থাপন করে কিছুটা অন্তর্ভুক্তিমূলক করার প্রয়াস চালানো হয়। তবে তখনও বিভিন্ন পর্যায়ে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে ‘উপজাতি’ বা ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’র মতো উপনিবেশবাদী বিশেষণে সংজ্ঞায়িত করার প্রথাটি বজায় থেকেছে। শুধু তা-ই নয়, স্বাধীনতা-উত্তর বাঙালি শাসকশ্রেণির ‘জাতিবাদী’ আত্মাভিমান এমন উৎকট পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, এই শাসকশ্রেণি অবাঙালি সংখ্যালঘু জাতিসত্বাগুলোকে ‘উপজাতি’র অধস্তন মর্যাদায় চিহ্নিত করে এবং সেই শাসকশ্রেণির প্রধান নেতা শেখ মুজিবুর রহমান এদেশের অবাঙালি। 287. ‘নিছক ট্রাইব’ আখ্যায়িত করে, মুজিব নিজের কথিত‘ঔদার্যবশত’ তাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে ‘প্রমোশন’ দেয়ার ইচ্ছাও প্রকাশ করেছিলেন।২৮৮ মুজিব ও লীগের তরফে এই ‘ঔদার্য’ প্রদর্শনের আকাঙ্ক্ষা আসলে ছিল বর্ণবাদী ঔপনিবেশিক চিন্তার অনুবর্তী এক উগ্র ‘জাতিবাদী’ রাজনীতির উৎকট অভিপ্রকাশ। অন্যদিক থেকে দেখলে, জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ববাদ যদি ফ্যাসিবাদী ভাবাদর্শের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক উপাদান হয়ে থাকে – বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে হিটলারের নেতৃত্বাধীন জার্মান শাসকশ্রেণীর চিন্তার মধ্যে আমরা যেমন দেখতে পাই – তাহলে বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে স্বাধীনতা-উত্তর। ২৮৮ Dr. Mizanur Rahman Shelley (ed। কিন্তু তখনো বাঙালি শাসকশ্রেণির দিক থেকে অবাঙালি জাতিগোষ্ঠীসমূহকে ‘ট্রাইব’, ‘উপজাতি’, ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ প্রভৃতি উপনিবেশবাদী চিন্তাপ্রসূত নেতিবাচক বিশেষণে আখ্যায়িত করা হতো – আজও তা অব্যাহত রয়েছে।এ বিষয়ে সমাজে ইতিমধ্যে বহু আলোচনা, সমালোচনা ও পর্যালোচনার। 2011. বলার অপেক্ষা রাখেনা, এই সব উৎকৃষ্টতাবাদী জাতিবাদ ও ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা মূলত আধিপত্যবাদ এদেশের শাসকশ্রেণীর ঔপনিবেশিক চিন্তা-চেতনারই বিভিন্ন অভিপ্রকাশ মাত্র।

পরবর্তীতে ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে নতুন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যেখানে বলা হয়—‘বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসাবে বাঙালি এবং নাগরিক হিসাবে বাংলাদেশি বলিয়া পরিচিত হইবেন।’ এই ধারাটি অবাঙালি জাতিগোষ্ঠীর জাতীয় পরিচয়কে এক প্রকার বাঙালি পরিচয়ের অধীনে নিয়ে আসে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে সাংবিধানিক মূলনীতি হিসেবে রাখা হয়েছে, যা রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে এক ধরনের পরস্পরবিরোধী ও সুবিধাবাদী অবস্থান হিসেবে চিহ্নিত হয়। যে রাষ্ট্রে সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মীয় বিশ্বাসকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া হয় এবং সংখ্যালঘুদের বিশ্বাসকে অধস্তন স্তরে রাখা হয়, তাকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে অভিহিত করা কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে তাত্ত্বিক প্রশ্ন থেকে যায়। “বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসাবে বাঙালি এবং নাগরিক হিসাবে বাংলাদেশি বলিয়া পরিচিত হইবেন।”২৮৯ স্পষ্টতই, বাংলাদেশের জনগণের অংশ হিসেবে, অবাঙালি জাতিগোষ্ঠীসমূহের জাতীয় পরিচয়ও ‘বাঙালি’ হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত থাকে। একদিকে লীগ কর্তৃপক্ষ রাষ্ট্রের একটি মূলনীতি হিসেবে ‘ধর্মনিরপেক্ষতাকে’ ফিরিয়ে আনে, অন্যদিকে ইসলামকে ‘রাষ্ট্রধর্ম’ হিসেবে অক্ষুণ্ন রাখে।

ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহ এশিয়া, আফ্রিকা ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশে দীর্ঘ ৫০০ বছরের বেশি সময় ধরে ইতিহাস চর্চা ও শিক্ষানীতির মাধ্যমে যেভাবে শোষণ-শাসন বজায় রেখেছিল, বাংলাদেশসহ আজকের রাষ্ট্রগুলোতেও তার অবশেষ পরিলক্ষিত হয়। তরুণ প্রজন্মের জন্য এই ইতিহাস অনুধাবন করা জরুরি, যাতে তারা কেবল পুরনো ঔপনিবেশিক কাঠামোয় আবদ্ধ না থেকে সমতাভিত্তিক সমাজ ও নতুন ইতিহাস বিনির্মাণের দিকে এগিয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশসহ যেকোনো উপনিবেশোত্তর রাষ্ট্রের প্রকৃত গণতান্ত্রিক মুক্তি তখনই সম্ভব, যখন শাসকশ্রেণি ও জনগণ তাদের মন ও মননের ‘বিউপনিবেশায়ন’ সম্পন্ন করতে পারবে। এছাড়া রাষ্ট্রকে ঔপনিবেশিক চিন্তাপ্রসূত শ্রেষ্ঠত্ববাদ ও ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার বৃত্ত থেকে মুক্ত করতে হবে। The Chittagong Hill Tracts of Bangladesh: The Untold Story, p। আমরা এই দীর্ঘ প্রবন্ধে দীর্ঘক্ষণ ধরে দেখেছি, ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহ নিজেদের স্বার্থে এশিয়া, আফ্রিকা এবং উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার নানা দেশে, ৫০০ বছরেরও বেশী সময় ধরে, ইতিহাস-চর্চা, ভাষা ও শিক্ষার উপনিবেশবাদী রাজনীতির মাধ্যমে,নানা ধরণের শোষণ-শাসন জারি রেখে। সেই ঔপনিবেশিক শোষন-শাসন ও নিপীড়নের দীর্ঘস্থায়ী বিষফল উপনিবেশোত্তর দেশ ও রাষ্ট্রসমূহের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনকে নেতিবাচকভাবে কিভাবে প্রভাবিত করেছে, করে চলেছে এখনো, তাও এই প্রবন্ধে আলোচিত হয়েছে। উপনিবেশোত্তর যে-কোনো সমাজের বিশেষত তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য এই ইতিহাস জেনে রাখা শুধু নয়, নিরন্তর মনে রাখাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই ইতিহাস পাঠ ও বিশ্লেষণের গুরুত্ব নিশ্চয় পুরনো ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহকে নিরন্তর অভিসম্পাত করে সেই পুরনো ইতিহাসের ভেতরেই নিজেদের বন্দী থাকার মধ্যে হতে পারে না, বরং আপন আপন দেশে সমতাভিত্তিক গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে তোলার লক্ষ্যে, পুরনো ঔপনিবেশিক।

আপলোডকারীর তথ্য

স্মার্টফোন হারিয়ে গেলে হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট যেভাবে পুনরুদ্ধার করবেন

উপনিবেশোত্তর রাষ্ট্র ও সমাজে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সংকট

আপডেট সময় ১০:৩০:৪৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় কাঠামো গঠনের প্রক্রিয়ায় ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষার ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক রাজনীতির প্রভাব এক বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে বাংলা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী চেতনার পাশাপাশি দেশের অবাঙালি সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর মানুষও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এমনকি অনেক অবাঙালি মুক্তিযোদ্ধা তাদের বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ রাষ্ট্রীয় খেতাবও অর্জন করেছিলেন। কিন্তু ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রের সংবিধান রচনার সময় শাসক দল আওয়ামী লীগ ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’কে একমাত্র মূলনীতি হিসেবে নির্ধারণ করে। সংবিধানের এই ভাষ্য অনুযায়ী, জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনকারী বাঙালি জাতির ঐক্যই হলো জাতীয়তাবাদের ভিত্তি। এই পদক্ষেপের ফলে ভারতের পশ্চিমবঙ্গসহ অন্যান্য অঞ্চলের বাঙালি থেকে বাংলাদেশের বাঙালিকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হলেও, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর জাতিগত স্বীকৃতির বিষয়টি অবহেলিত রয়ে যায়। ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষার ঔপনিবেশিক রাজনীতি ৩৪। আমরা আগেই বলেছি, বাংলাদেশের সশস্ত্র স্বাধীনতাযুদ্ধের পেছনে প্রধানত বাংলা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী চেতনা সক্রিয় থাকলেও, দেশটির অপরাপর অবাঙালি সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীসমূহের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ সেই মরণপণ যুদ্ধে নানাভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। সাংবিধানিকভাবে গৃহীত এই জাতীয়তাবাদের সংজ্ঞা নিরূপণ করেলেখা হয়, “ভাষাগত ও সংস্কৃতিগত একক সত্তাবিশিষ্ট যে বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ ও সংকল্পবদ্ধ সংগ্রাম করিয়া জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জন করিয়াছেন, সেই বাঙালি জাতির ঐক্য ও। 286. অর্থাৎ বাংলাদেশের অধিবাসী বাঙালি জনগোষ্ঠীর জাতীয়তাবাদই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জাতীয়তাবাদ। কিন্তু অগ্রে জাতি ভাষা না শিখিয়া পরের ভাষা শিখা কোনও মতে উচিত নহে।”২৯০ তথ্যসূত্র: ২৮৬ দেখুন, প্রাগুক্ত, ১৯৭২, অনুচ্ছেদ ৯ ২৮৭ আনিসুজ্জামান, “আমাদের মুক্তিসংগ্রাম ও সংবিধানের মূলনীতি”, বাঙালী ও বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা: ১১৪। একটি রাষ্ট্রকে একই সঙ্গে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ ও ‘ধর্মীয়প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে বিকশিত করার ধারণাটি হাস্যকর বটে। 124 ২৮৯ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান, ২০১১, অনুচ্ছেদ ৬[২] ২৯০ ঈশ্বরচন্দ্র শর্মা, “বাক্যকথন – ভাষা”, বোধোদয়, পৃষ্ঠা: ৩২।

সেই সময়ের শাসকমহলের জাতীয়তাবাদী আত্মাভিমান এতটাই তীব্র ছিল যে, অবাঙালি সংখ্যালঘু জাতিসত্তাগুলোকে ‘উপজাতি’ বা অধস্তন মর্যাদায় দেখা হতো। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান এদেশের অবাঙালি জাতিগোষ্ঠীসমূহকে প্রকাশ্যে বাঙালি হয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত চাকমাসহ অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে ‘ট্রাইব’ হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের বাঙালি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার যে অভিপ্রায় দেখানো হয়েছিল, তা ছিল প্রকৃতপক্ষে উগ্র জাতিবাদী রাজনীতিরই বহিঃপ্রকাশ। সমালোচকদের মতে, জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ববাদ যদি ফ্যাসিবাদী ভাবাদর্শের অংশ হয়, তবে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর এই অবস্থান সেই ফ্যাসিবাদী চিন্তারই প্রতিফলন ছিল। পরবর্তীতে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’কে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ দ্বারা প্রতিস্থাপন করে কিছুটা অন্তর্ভুক্তিমূলক করার প্রয়াস চালানো হয়। তবে তখনও বিভিন্ন পর্যায়ে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে ‘উপজাতি’ বা ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’র মতো উপনিবেশবাদী বিশেষণে সংজ্ঞায়িত করার প্রথাটি বজায় থেকেছে। শুধু তা-ই নয়, স্বাধীনতা-উত্তর বাঙালি শাসকশ্রেণির ‘জাতিবাদী’ আত্মাভিমান এমন উৎকট পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, এই শাসকশ্রেণি অবাঙালি সংখ্যালঘু জাতিসত্বাগুলোকে ‘উপজাতি’র অধস্তন মর্যাদায় চিহ্নিত করে এবং সেই শাসকশ্রেণির প্রধান নেতা শেখ মুজিবুর রহমান এদেশের অবাঙালি। 287. ‘নিছক ট্রাইব’ আখ্যায়িত করে, মুজিব নিজের কথিত‘ঔদার্যবশত’ তাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে ‘প্রমোশন’ দেয়ার ইচ্ছাও প্রকাশ করেছিলেন।২৮৮ মুজিব ও লীগের তরফে এই ‘ঔদার্য’ প্রদর্শনের আকাঙ্ক্ষা আসলে ছিল বর্ণবাদী ঔপনিবেশিক চিন্তার অনুবর্তী এক উগ্র ‘জাতিবাদী’ রাজনীতির উৎকট অভিপ্রকাশ। অন্যদিক থেকে দেখলে, জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ববাদ যদি ফ্যাসিবাদী ভাবাদর্শের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক উপাদান হয়ে থাকে – বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে হিটলারের নেতৃত্বাধীন জার্মান শাসকশ্রেণীর চিন্তার মধ্যে আমরা যেমন দেখতে পাই – তাহলে বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে স্বাধীনতা-উত্তর। ২৮৮ Dr. Mizanur Rahman Shelley (ed। কিন্তু তখনো বাঙালি শাসকশ্রেণির দিক থেকে অবাঙালি জাতিগোষ্ঠীসমূহকে ‘ট্রাইব’, ‘উপজাতি’, ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ প্রভৃতি উপনিবেশবাদী চিন্তাপ্রসূত নেতিবাচক বিশেষণে আখ্যায়িত করা হতো – আজও তা অব্যাহত রয়েছে।এ বিষয়ে সমাজে ইতিমধ্যে বহু আলোচনা, সমালোচনা ও পর্যালোচনার। 2011. বলার অপেক্ষা রাখেনা, এই সব উৎকৃষ্টতাবাদী জাতিবাদ ও ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা মূলত আধিপত্যবাদ এদেশের শাসকশ্রেণীর ঔপনিবেশিক চিন্তা-চেতনারই বিভিন্ন অভিপ্রকাশ মাত্র।

পরবর্তীতে ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে নতুন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যেখানে বলা হয়—‘বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসাবে বাঙালি এবং নাগরিক হিসাবে বাংলাদেশি বলিয়া পরিচিত হইবেন।’ এই ধারাটি অবাঙালি জাতিগোষ্ঠীর জাতীয় পরিচয়কে এক প্রকার বাঙালি পরিচয়ের অধীনে নিয়ে আসে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে সাংবিধানিক মূলনীতি হিসেবে রাখা হয়েছে, যা রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে এক ধরনের পরস্পরবিরোধী ও সুবিধাবাদী অবস্থান হিসেবে চিহ্নিত হয়। যে রাষ্ট্রে সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মীয় বিশ্বাসকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া হয় এবং সংখ্যালঘুদের বিশ্বাসকে অধস্তন স্তরে রাখা হয়, তাকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে অভিহিত করা কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে তাত্ত্বিক প্রশ্ন থেকে যায়। “বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসাবে বাঙালি এবং নাগরিক হিসাবে বাংলাদেশি বলিয়া পরিচিত হইবেন।”২৮৯ স্পষ্টতই, বাংলাদেশের জনগণের অংশ হিসেবে, অবাঙালি জাতিগোষ্ঠীসমূহের জাতীয় পরিচয়ও ‘বাঙালি’ হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত থাকে। একদিকে লীগ কর্তৃপক্ষ রাষ্ট্রের একটি মূলনীতি হিসেবে ‘ধর্মনিরপেক্ষতাকে’ ফিরিয়ে আনে, অন্যদিকে ইসলামকে ‘রাষ্ট্রধর্ম’ হিসেবে অক্ষুণ্ন রাখে।

ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহ এশিয়া, আফ্রিকা ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশে দীর্ঘ ৫০০ বছরের বেশি সময় ধরে ইতিহাস চর্চা ও শিক্ষানীতির মাধ্যমে যেভাবে শোষণ-শাসন বজায় রেখেছিল, বাংলাদেশসহ আজকের রাষ্ট্রগুলোতেও তার অবশেষ পরিলক্ষিত হয়। তরুণ প্রজন্মের জন্য এই ইতিহাস অনুধাবন করা জরুরি, যাতে তারা কেবল পুরনো ঔপনিবেশিক কাঠামোয় আবদ্ধ না থেকে সমতাভিত্তিক সমাজ ও নতুন ইতিহাস বিনির্মাণের দিকে এগিয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশসহ যেকোনো উপনিবেশোত্তর রাষ্ট্রের প্রকৃত গণতান্ত্রিক মুক্তি তখনই সম্ভব, যখন শাসকশ্রেণি ও জনগণ তাদের মন ও মননের ‘বিউপনিবেশায়ন’ সম্পন্ন করতে পারবে। এছাড়া রাষ্ট্রকে ঔপনিবেশিক চিন্তাপ্রসূত শ্রেষ্ঠত্ববাদ ও ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার বৃত্ত থেকে মুক্ত করতে হবে। The Chittagong Hill Tracts of Bangladesh: The Untold Story, p। আমরা এই দীর্ঘ প্রবন্ধে দীর্ঘক্ষণ ধরে দেখেছি, ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহ নিজেদের স্বার্থে এশিয়া, আফ্রিকা এবং উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার নানা দেশে, ৫০০ বছরেরও বেশী সময় ধরে, ইতিহাস-চর্চা, ভাষা ও শিক্ষার উপনিবেশবাদী রাজনীতির মাধ্যমে,নানা ধরণের শোষণ-শাসন জারি রেখে। সেই ঔপনিবেশিক শোষন-শাসন ও নিপীড়নের দীর্ঘস্থায়ী বিষফল উপনিবেশোত্তর দেশ ও রাষ্ট্রসমূহের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনকে নেতিবাচকভাবে কিভাবে প্রভাবিত করেছে, করে চলেছে এখনো, তাও এই প্রবন্ধে আলোচিত হয়েছে। উপনিবেশোত্তর যে-কোনো সমাজের বিশেষত তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য এই ইতিহাস জেনে রাখা শুধু নয়, নিরন্তর মনে রাখাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই ইতিহাস পাঠ ও বিশ্লেষণের গুরুত্ব নিশ্চয় পুরনো ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহকে নিরন্তর অভিসম্পাত করে সেই পুরনো ইতিহাসের ভেতরেই নিজেদের বন্দী থাকার মধ্যে হতে পারে না, বরং আপন আপন দেশে সমতাভিত্তিক গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে তোলার লক্ষ্যে, পুরনো ঔপনিবেশিক।