শীতের আগমনে পর্যটন মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে একটি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
মেরিন ড্রাইভ–সংলগ্ন পাটুয়ারটেক এলাকায় অবস্থিত ‘টুপ টুপ’ নামের ওই রিসোর্টে আগুন লেগে অন্তত ১০ জন পর্যটকের মর্মান্তিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশু রয়েছেন এবং একটি পরিবারেরই ছয়জন সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। ঢাকা ফেরার অপেক্ষায় থাকা এসব পর্যটক সমুদ্রের নীল জলরাশি আর বালুকাবেলায় প্রশান্তির খোঁজে গিয়ে শেষ পর্যন্ত আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। বাথরুমে আশ্রয় নিয়েও তাদের মধ্যে কেউ কেউ রক্ষা পাননি, সেখান থেকেই মরদেহগুলো উদ্ধার করা হয়েছে। এ বছর তা মনে হয় একটু আগেই দেখতে হলো এবং যথারীতি খুবই মর্মান্তিক। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে আছে নারী ও শিশু। ঘোরাঘুরি শেষে নিহতদের অনেকে ঢাকায় ফেরার অপেক্ষা ছিলেন। তাদের ফেসবুক টাইমলাইনে সমুদ্রের উপচে পড়া ঢেউ আর হাওয়ার সঙ্গে মাতামাতির রেশ মিইয়ে যাওয়ার আগেই মৃত্যুর শোক এসে সেখানে হানা দিয়েছে। যান্ত্রিক ও ক্লান্তিকর নগরজীবন থেকে দূরে সমুদ্রের নীল জলরাশি আর বালুকাবেলায় দুদণ্ড শান্তির খোঁজে গিয়েও পুড়ে মারা যেতে হয় মানুষকে, কী হতভাগ্য আমরা। দেশে চলমান নানা ইস্যুর মধ্যে খুবই ভয়াবহ এ ঘটনা কতটা আমাদের ভেতর নাড়া দিতে পেরেছে জানি না, নিত্যদিন এত এত মৃত্যুর ঘটনায় আমরা যে ‘অনুভূতিহীন’। শুধু দেশে না, দেশের বাইরে কতভাবেই না বাংলাদেশিরা মারা যাচ্ছে। ভূমধ্যসাগরে ডুবে, ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন হামলায়, সৌদির কারাগারে মৃত্যুদণ্ড হয়েও। কক্সবাজার যাওয়ার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় গোটা পরিবারসহ প্রাণহানির ঘটনা যদিও নতুন নয়। পর্যটনসংশ্লিষ্ট অনেকে এ রিসোর্টের গড়ে ওঠা নিয়ে সমালোচনা করছেন।
এই ট্র্যাজেডি পর্যটন খাতের চরম অব্যবস্থাপনা ও তদারকিহীনতাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। জানা গেছে, পাঁচ-ছয় বছর আগেও খালের ওপর নির্মিত এই স্থাপনাটি ছিল বস্তিসদৃশ কাঠের ঘর। পরবর্তী সময়ে সেখানে কাঠ, টিন ও ছন ব্যবহার করে হাজার হাজার টাকা ভাড়ার রিসোর্ট হিসেবে গড়ে তোলা হয়। নিচে রেস্তোরাঁ ও ওপরে থাকার ঘর থাকার কারণে অগ্নিকাণ্ডের সময় পর্যটকদের বের হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। রেস্তোরাঁর ভেতর দিয়ে যাতায়াত করতে হওয়ায় আগুন লাগার পর ওপরের তলার অতিথিরা কোনো বিকল্প পথ পাননি। লেখার শেষটুকু পর্যন্ত পড়লে এ প্রশ্নও সামনে আসবে, এটিই কি হওয়ার কথা ছিল না।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ জানিয়েছেন, গত জুন মাসে পরিদর্শনের পর রিসোর্টটিকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই সতর্কতা উপেক্ষা করেই রিসোর্টটি অবৈধভাবে কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল। চট্টগ্রাম বিভাগের উপপরিচালক মো. তৌফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, সমুদ্রের তীব্র বাতাসের কারণে কাঠের তৈরি ওই স্থাপনায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। রিসোর্টটিতে কোনো অগ্নিসংকেত, অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র বা প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না, ছিল না কোনো ফায়ার লাইসেন্সও।
পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ছাড়পত্র ছাড়াই রিসোর্ট পরিচালনার দায়ে গত এপ্রিলে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল এবং এক লাখ টাকা জরিমানাও করা হয়। তবে পরিবেশ আইনে জরিমানা করা গেলেও প্রতিষ্ঠানটি উচ্ছেদ বা বন্ধ করার আইনি এখতিয়ার তাদের নেই। আইন অনুযায়ী, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নকশার অনুমোদন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্ট এবং ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু ‘টুপ টুপ’ রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের এসবের কিছুই ছিল না।
দেশের পর্যটন খাত আজ বিশাল শিল্পে পরিণত হলেও যেন কোনো ‘মা-বাপ’ ছাড়াই চলছে। জিডিপিতে ৩.০২ শতাংশ অবদান রাখা ৮০-৯০ হাজার কোটি টাকার এই শিল্পে উদ্যোক্তারা যেমন অনেক ভোগান্তির শিকার হন, তেমনি অসাধু মালিকেরা কোনো ছাড়পত্র ছাড়াই ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পান। জেলা প্রশাসক, জেলা পরিষদ, পরিবেশ অধিদপ্তর ও ফায়ার সার্ভিসের সমন্বিত তদারকির অভাবে পাহাড়ে ও উপকূলীয় এলাকায় একের পর এক ঝুঁকিপূর্ণ রিসোর্ট গড়ে উঠছে।
তদারকি সংস্থাগুলোর কর্মকর্তাদের দাবি, বন্ধ বা উচ্ছেদের মতো পদক্ষেপে প্রায়ই রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হয়। রাজনৈতিক বিবেচনায় উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে এমন অবহেলা ও অব্যবস্থাপনা অস্বাভাবিক নয়। এ ধরনের ঘটনা আমাদের অনুভূতিকে কতটুকু নাড়া দেয়, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ, এর আগেও আগস্ট মাসে কলকাতায় অগ্নিকাণ্ডে নয়জন বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছিলেন। আগস্টে কলকাতায় হোটেলে আগুনে পুড়ে মারা যান ৯ জন বাংলাদেশি। বিদেশে এ ধরনের অগ্নিকাণ্ডে আট-দশজন মারা গেলে আমাদের মিডিয়াগুলো আন্তর্জাতিক ডেস্ক নিউজ করে। বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের পর্যটনকেন্দ্রে এত বড় ঘটনাও নিশ্চয়ই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে খবর হবে।
ইনানীর এই হৃদয়বিদারক অগ্নিকাণ্ড কি নীতিনির্ধারকদের ঘুম ভাঙাতে পারবে? নাকি কয়েক দিন হট্টগোলের পর সবকিছু আগের মতোই ধামাচাপা পড়ে যাবে? পর্যটনকেন্দ্রগুলো কি পর্যটকদের স্বস্তির জায়গা থাকবে, নাকি দায়িত্বহীনতা ও ব্যবসায়িক লোভের ফাঁদে পড়ে প্রাণ হারানোর কেন্দ্রে পরিণত হবে? আর দায়ভারের প্রশ্নে ‘ভিকটিম ব্লেমিং’-এর চিরাচরিত মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসার সময় হয়েছে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। হাল আমলে ভিকটিম ব্লেমিং নিয়ে ফেসবুকীয় সূত্র অনুসারে এর একটি সহজ উত্তর হতে পারে, তাঁদের মৃত্যুর জন্য তাঁরা নিজেরাই দায়ী।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 
























