সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি প্রতিষ্ঠান সৌদি আরামকোর পূর্বাঞ্চলীয় ধাহরান শহরের একটি প্রশাসনিক ভবনে হামলা চালায় ইয়েমেনের ইরান সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা। মঙ্গলবার গভীর রাতে সংঘটিত এ ঘটনায় ভবনটিতে সীমিত আকারে আগুন ধরে যায়। বুধবার দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করে জানায়, ঘটনার পর পর যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। তবে রয়টার্সকে আরামকোর এক সূত্র জানিয়েছে, সদর দপ্তর কমপ্লেক্সের একটি অফিস টাওয়ারের ওপরের তিনটি তলা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই তথ্য নিশ্চিত করেছেন ওই বিষয়ে অবগত আরও দুই ব্যক্তি। ওই সূত্রের দাবি, কমপ্লেক্সের একটি অফিস টাওয়ারে ক্ষেপণাস্ত্রটি আঘাত হানে। এর আগে রয়টার্সকে ছয়টি সূত্র জানিয়েছিল, তারা আরামকোর কমপ্লেক্সের আশপাশে বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছে। জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মঙ্গলবার গভীর রাতে এ ঘটনার পরপরই কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়।
আরামকোর এই কমপ্লেক্স থেকে পুরো দেশের বিশাল তেল অবকাঠামো নেটওয়ার্ক তদারক করা হয়, যার মধ্যে রয়েছে ভূখণ্ডের ও সমুদ্রের তেলক্ষেত্র, শোধনাগার, পাইপলাইন এবং রপ্তানি টার্মিনাল। সম্প্রতি ইয়েমেনের নতুন সংঘাত শুরু হওয়ার পর ইয়েমেন সরকারকে সহায়তার প্রতিশোধ হিসেবে সৌদি আরবের নানা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় এক সপ্তাহ ধরে ক্রমাগত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে আসছে হুতি বিদ্রোহীরা। ইয়েমেনের ইরানপন্থি হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাত তীব্র হওয়ার মধ্যে এ হামলা হলো। আরামকোর ওই কমপ্লেক্সে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচালনাকেন্দ্র আছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
এর আগে রাজধানী রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতিরা চারবার হামলা চালায়। গত শনিবারের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৩ জন প্রাণ হারান, যা ছিল বিগত এক দশকে সৌদিতে সবচেয়ে ভয়াবহ আঘাত। দেশজুড়ে ধারাবাহিক হামলার মুখে একাধিক বিমানবন্দরে ফ্লাইট পরিচালনা স্থগিত করা হয়। ধাহরান হামলার প্রসঙ্গে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট জানায়, তারা একটি ক্ষেপণাস্ত্র আকাশে ধ্বংস করে, যার ধ্বংসাবশেষ আবাসিক এলাকায় পড়ে। এদিকে বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগ জানায়, রিয়াদের আকাশে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার পর পড়ে থাকা ধ্বংসাবশেষে দুইজন নারী, একজন পুরুষ ও এক শিশুসহ চারজন আহত হন এবং অন্তত ১৫টি বাড়ি সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে শনিবারের হামলায় ১৩ জন নিহত হন। এর পর দেশজুড়ে আরও হামলার কারণে বিভিন্ন বিমানবন্দরে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
হুতিদের মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি আগেই ধাহরানের আরামকো দপ্তর ও রিয়াদের শোধনাগারকে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। একই সঙ্গে তেল স্থাপনাগুলো থেকে কর্মীদের দূরে থাকার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। হুতিদের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছিল যে সৌদি জোট সানা শহর ও ইয়েমেন পেট্রোলিয়াম কোম্পানির সাবাহ কেন্দ্রীয় জ্বালানি ডিপোতে হামলা চালিয়েছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জোট এই হামলার কথা স্বীকার করে জানায়, আন্তর্জাতিক নৌপথ ও অঞ্চলটিতে হুতিদের সামরিক সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দেওয়াই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকেও হুতিদের পরিণতি ভোগের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে পুনর্বাসনে ও বাব আল মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে সৌদি আরব এই অভিযান পুনরায় জোরদার করে। লোহিত সাগরের কৌশলগত এই নৌপথ বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আক্রমণের পর হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ হলে এর গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। হুতিদের ওপর পাল্টা হামলা জোরদার করলেও যুক্তরাষ্ট্র সৌদিকে সরাসরি নিরাপত্তা সহযোগিতা প্রদানে এখনও সাড়া দেয়নি।
পুরো সংঘাতটি মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়া বৃহত্তর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনারই অংশ। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি আক্রমণের পর এই নতুন অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়। এদিকে সৌদি-হুতি সংঘাতের নিরসনে মধ্যস্থতা করার প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। রোববার দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এই প্রস্তাবের কথা জানান এবং সোমবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে একই বার্তা পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 





















