আকাশ জাতীয় ডেস্ক:
মানুষের জীবনে অপমান, কষ্ট, বিশ্বাসঘাতকতা কিংবা অবিচারের মুখোমুখি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিশোধ নেওয়ার প্রবল ইচ্ছা জাগা মানবীয় স্বভাব। কিন্তু ইসলাম মানুষের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে তাকে উচ্চতর নৈতিকতায় উন্নীত হতে শিক্ষা দেয়। প্রতিশোধের পরিবর্তে ক্ষমা, বিদ্বেষের পরিবর্তে দয়া এবং ঘৃণার পরিবর্তে উদারতা— এগুলোই ইসলামের সৌন্দর্য। কুরআন ও সুন্নাহ আমাদের শেখায়, প্রকৃত শক্তি প্রতিশোধে নয়; বরং নিজের ক্রোধকে সংযত করে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ক্ষমা করে দেওয়ায়। যে হৃদয় ক্ষমা করতে শেখে, সে-ই প্রকৃত অর্থে বিজয়ী।
প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচার ও ক্ষমার শিক্ষা:
প্রচলিত একটি প্রবাদ আছে— প্রতিশোধের আগুন বুকে পুষে রাখা আর জ্বলন্ত কয়লা হাতে ধরে রাখার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই; অন্যকে পোড়ানোর আগে তা নিজেকেই দগ্ধ করে।
ইসলাম মানুষের ন্যায্য অধিকারকে অস্বীকার করে না। কেউ অন্যায় করলে তার সমপরিমাণ প্রতিকার নেওয়া বৈধ। কিন্তু প্রতিশোধপরায়ণতা, বিদ্বেষ এবং প্রতিহিংসাকে জীবনদর্শন বানিয়ে ফেলা ইসলামের শিক্ষা নয়। বরং আল্লাহ তাআলা ক্ষমাশীলতাকে তাকওয়াবানদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
কুরআনের শিক্ষা: ক্রোধ সংবরণ ও ক্ষমা-
ক্রোধ সংবরণ করে ক্ষমা করা প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ কুরআনুল কারিমে ইরশাদ করেন—
وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ ۗ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ
‘(মুত্তাকিরা) তারা, যারা ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে দেয়। আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ১৩৪)
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন—
وَجَزَاءُ سَيِّئَةٍ سَيِّئَةٌ مِّثْلُهَا ۖ فَمَنْ عَفَا وَأَصْلَحَ فَأَجْرُهُ عَلَى اللَّهِ
‘মন্দের প্রতিফল অনুরূপ মন্দ। তবে যে ক্ষমা করে এবং আপস-নিষ্পত্তি করে, তার প্রতিদান আল্লাহর জিম্মায়।’ (সুরা আশ-শুরা: আয়াত ৪০)
এটি ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ নীতি— ন্যায়বিচারের অধিকার আছে, কিন্তু ক্ষমা অধিক মর্যাদাপূর্ণ। আর আল্লাহ তাআলা বলেন—
ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِي بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّهُ وَلِيٌّ حَمِيمٌ
‘মন্দকে উত্তম আচরণের মাধ্যমে প্রতিহত কর। তখন দেখবে, যার সঙ্গে তোমার শত্রুতা ছিল, সে যেন অন্তরঙ্গ বন্ধু হয়ে গেছে।’ (সুরা ফুসসিলাত: আয়াত ৩৪)
হজরত আবু বকর (রা.)-এর অনন্য দৃষ্টান্ত:
ইফকের ঘটনায় আত্মীয় মিসতাহ ইবন উসাসাহ (রা.) জড়িয়ে পড়লে আবু বকর (রা.) তার আর্থিক সহায়তা বন্ধ করার শপথ করেছিলেন। তখন আল্লাহ তাআলা নাজিল করেন—
وَلْيَعْفُوا وَلْيَصْفَحُوا ۗ أَلَا تُحِبُّونَ أَنْ يَغْفِرَ اللَّهُ لَكُمْ
‘তারা যেন ক্ষমা করে এবং উপেক্ষা করে। তোমরা কি চাও না যে আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন?’ (সুরা আন-নূর: আয়াত ২২)
এই আয়াত শুনেই আবু বকর (রা.) বলেছিলেন, ‘অবশ্যই আমি চাই আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করুন।’ এরপর তিনি পুনরায় তার আত্মীয়ের ভরণপোষণ চালু করে দেন।
প্রকৃত শক্তি কী?
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
لَيْسَ الشَّدِيدُ بِالصُّرَعَةِ، إِنَّمَا الشَّدِيدُ الَّذِي يَمْلِكُ نَفْسَهُ عِنْدَ الْغَضَبِ
‘প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে মানুষকে পরাজিত করে; বরং প্রকৃত শক্তিশালী সে, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।’ (বুখারি ৬১১৪, মুসলিম ২৬০৯)
আরেক হাদিসে তিনি বলেন—
وَمَا زَادَ اللَّهُ عَبْدًا بِعَفْوٍ إِلَّا عِزًّا
‘ক্ষমা করার কারণে আল্লাহ বান্দার সম্মানই বৃদ্ধি করেন।’ (মুসলিম ২৫৮৮)
রাসুলুল্লাহ (সা.): ক্ষমার সর্বোচ্চ আদর্শ:
হজরত আয়েশা (রা.) বলেন—
مَا انْتَقَمَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ لِنَفْسِهِ قَطُّ، إِلَّا أَنْ تُنْتَهَكَ حُرْمَةُ اللَّهِ
‘রাসূলুল্লাহ (সা.) কখনো ব্যক্তিগত কারণে প্রতিশোধ নেননি। তবে আল্লাহর সীমালঙ্ঘন হলে তিনি আল্লাহর জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করতেন।’ (বুখারি ৩৫৬০, মুসলিম ২৩২৭)
তায়েফে রক্তাক্ত হওয়ার পরও তিনি ধ্বংসের বদলে হেদায়েতের দোয়া করেছিলেন। পাহাড়ের ফেরেশতা যখন পুরো জাতিকে ধ্বংস করার অনুমতি চাইলেন, তখন তিনি বলেছিলেন—
‘আমি আশা করি, আল্লাহ তাদের বংশধরদের মধ্য থেকে এমন মানুষ সৃষ্টি করবেন, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে।’ (বুখারি ৩২৩১, মুসলিম ১৭৯৫)
আর মক্কা বিজয়ের দিন দুই দশকের নির্যাতনকারীদের উদ্দেশে তার ঐতিহাসিক ঘোষণা ছিল—
اذْهَبُوا فَأَنْتُمُ الطُّلَقَاءُ
‘যাও, আজ তোমরা মুক্ত।’
ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও এমন ক্ষমার নজির ইতিহাসে বিরল।
আধুনিক গবেষণাও যা বলছে:
আধুনিক মনোবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘদিন প্রতিশোধের চিন্তা লালন করলে মানসিক চাপ, উদ্বেগ, বিষণ্নতা, অনিদ্রা এবং উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রতিশোধ নেওয়ার পরও অধিকাংশ মানুষ প্রত্যাশিত মানসিক শান্তি পায় না; বরং ঘটনাটি নিয়ে আরও বেশি ভাবতে থাকে।
অন্যদিকে, যারা ক্ষমা করতে শেখেন, তাদের মানসিক সুস্থতা, পারিবারিক সম্পর্ক এবং জীবন-সন্তুষ্টি তুলনামূলক বেশি হয়। এ কারণেই বর্তমানে Forgiveness Therapy বা ক্ষমাভিত্তিক থেরাপি মনোবিজ্ঞানের একটি স্বীকৃত চিকিৎসা-পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
প্রতিশোধ মুহূর্তের তৃপ্তি দিতে পারে, কিন্তু ক্ষমা এনে দেয় স্থায়ী প্রশান্তি। প্রতিশোধ শত্রুতা বাড়ায়, ক্ষমা হৃদয় জয় করে। প্রতিশোধ মানুষকে অতীতের বন্দী বানায়, আর ক্ষমা তাকে মুক্ত করে আল্লাহর রহমতের দিকে এগিয়ে দেয়।
একজন মুমিন জানেন— নিজের ক্রোধকে দমন করা, অন্যকে ক্ষমা করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হৃদয়কে বিদ্বেষমুক্ত রাখা কোনো দুর্বলতার পরিচয় নয়; বরং এটিই ঈমানের পরিপক্বতা ও চরিত্রের মহত্ত্ব। তাই আসুন, আমরা প্রতিশোধ নয়, ক্ষমাকে বেছে নিই। কারণ মানুষের ক্ষমা হয়তো একটি হৃদয়কে বদলে দিতে পারে, আর আল্লাহর পক্ষ থেকে সেই ক্ষমার প্রতিদান হতে পারে জান্নাত ও চিরস্থায়ী সম্মান।
আকাশ নিউজ ডেস্ক 

























